প্রথম দৃশ্য

গ্রামের পথ

চতুর্ভুজবাবু এম. এ. পাস করিয়া গ্রামে আসিয়াছেন; মনে করিয়াছেন

গ্রামে হুলস্থূল পড়িবে। সঙ্গে একটা মোটাসোটা কাবুলি বিড়াল আছে

নীলরতনের প্রবেশ

নীলরতন । এই যে চতুবাবু , কবে আসা হল ?

চতুর্ভুজ । কালেজে এম. এ. একজামিন দিয়েই-

নীলরতন । বা বা , এ বেড়ালটি তো বড়ো সরেস ।

চতুর্ভুজ । এবারকার একজামিনেশন ভারি-

নীলরতন । মশায় , বেড়ালটি কোথায় পেলেন ?

চতুর্ভুজ । কিনেছি । এবারে যে সবজেক্ট্ নিয়েছিলুম-

নীলরতন । কত দাম লেগেছে মশায় ?

চতুর্ভুজ । মনে নেই । নীলরতনবাবু , আমাদের গ্রামের থেকে কেউ কি পাস হয়েছে ?

নীলরতন । বিস্তর । কিন্তু এমন বেড়াল এ মুল্লুকে নেই ।

চতুর্ভুজ । ( স্বগত) আ মোলো , এ যে কেবল বেড়ালের কথাই বলে — আমি যে পাস করে এলুম সে কথা যে আর তোলে না ।

জমিদারবাবুর প্রবেশ

জমিদার । এই-যে চতুর্ভুজ , এতকাল কলকাতায় বসে কী করলে বাপু ?

চতুর্ভুজ । আজ্ঞে এম. এ. দিয়ে আসছি ।

জমিদার । কী বললে ? মেয়ে দিয়ে এসেছ ? কাকে দিয়ে এসেছ ?

চতুর্ভুজ । তা নয় — বি. এ. দিয়ে-

জমিদার । মেয়ের বিয়ে দিয়েছ ? তা , আমরা কিছুই জানতে পারলেম না ?

চতুর্ভুজ । বিয়ে নয় — বি.এ.—

জমিদার । তবেই হল । তোমরা শহরে বল বি.এ. , আমরা পাড়াগাঁয়ে বলি বিয়ে । সে কথা যাক , এ বেড়ালটি তোফা দেখতে ।

চতুর্ভুজ । আপনার ভ্রম হয়েছে ; আমার—

জমিদার । ভ্রম কিসের — এমন বেড়াল তুমি এ জেলার মধ্যে খুঁজে বের করো দেখি!

চতুর্ভুজ । আজ্ঞে না , বেড়ালের কথা হচ্ছে না—

জমিদার । বেড়ালের কথাই তো হচ্ছে — আমি বলছি এমন বেড়াল মেলে না ।

চতুর্ভুজ । ( স্বগত) আ খেলে যা!

জমিদার । বিকেলের দিকে বেড়ালটি সঙ্গে করে আমাদের ও দিকে একবার যেয়ো । ছেলেরা দেখে ভারি খুশি হবে ।

চতুর্ভুজ । তা হবে বৈকি । ছেলেরা অনেক দিন আমাকে দেখে নি ।

জমিদার । হাঁ — তা তো বটেই — কিন্তু আমি বলছি , তুমি যদি যেতে না পার তো বেড়ালটি বেণীর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিয়ো — ছেলেদের দেখাব ।

[ প্রস্থান

সাতুখুড়োর প্রবেশ

সাতুখুড়ো । এই-যে , অনেক দিনের পর দেখা ।

চতুর্ভুজ । তা আর হবে না! কতগুলো একজামিন-

সাতুখুড়ো । এই বেড়ালটি —

চতুর্ভুজ । ( সরোষে) আমি বাড়ি চললেম ।

[ প্রস্থানোদ্যম

সাতুখুড়ো । আরে , শুনে যাও-না — এ বেড়ালটি —

চতুর্ভুজ । না মশায় , বাড়িতে কাজ আছে ।

সাতুখুড়ো । আরে , একটা কথার উত্তরই দাও-না — এ বেড়ালটি-

[ কোনো উত্তর না দিয়া হন্‌হন্‌ বেগে চতুর্ভুজের প্রস্থান

সাতুখুড়ো । আ মোলো! ছেলেপুলেগুলো লেখাপড়া শিখে ধনুর্ধর হয়ে ওঠেন । গুণ তো যথেষ্ট — অহংকার চার পোয়া!

[ প্রস্থান

দ্বিতীয় দৃশ্য

চতুর্ভুজের বাটীর অন্তঃপুর

দাসী । মাঠাকরুন , দাদাবাবু একেবারে আগুন হয়ে এসেছেন ।

মা । কেন রে ?

দাসী । কী জানি বাপু!

চতুর্ভুজের প্রবেশ

ছোটো ছেলে । দাদাবাবু , এ বেড়ালটি আমাকে —

চতুর্ভুজ । ( তাহাকে এক চপেটাঘাত) দিন রাত্রি কেবল বেড়াল বেড়াল বেড়াল!

মা । বাছা সাধে রাগ করে! এত দিন পরে বাড়ি এল , ছেলেগুলি বিরক্ত করে খেলে । যা , তোরা সব যা! (চতুর্ভুজের প্রতি) আমাকে দাও বাছা — দুধভাত রেখে দিয়েছি , আমি তোমার বেড়ালকে খাইয়ে আনছি ।

চতুর্ভুজ । ( সরোষে) এই নাও মা , তোমরা বেড়ালকেই খাওয়াও আমি খাব না , আমি চললেম ।

মা । ( সকাতরে) ও কী কথা! তোমার খাবার তো তৈরি আছে বাপ , এখন নেয়ে এলেই হয় ।

চতুর্ভুজ । আমি চললেম — তোমাদের দেশে বেড়ালেরই আদর , এখানে গুণবানের আদর নেই ।

বিড়ালের প্রতি লাথি-বর্ষণ

মাসিমা । আহা , ওকে মেরো না — ও তো কোনো দোষ করে নি ।

চতুর্ভুজ । বেড়ালের প্রতিই যত তোমাদের মায়ামমতা — আর মানুষের প্রতি একটু দয়া নেই ।

[ প্রস্থান

ছোটো মেয়ে । ( নেপথ্যের দিকে নির্দেশ করিয়া) হরিখুড়ো দেখে যাও , ওর লেজ কত মোটা ।

হরি । কার ?

মেয়ে । ঐ-যে ওর!

হরি । চতুর্ভুজের ?

মেয়ে । না , ঐ বেড়ালের ।

তৃতীয় দৃশ্য

পথ। ব্যাগ হস্তে চতুর্ভুজ। সঙ্গে বিড়াল নাই

সাধুচরণ । মশায় , আপনার সে বেড়ালটি গেল কোথায় ?

চতুর্ভুজ । সে মরেছে!

সাধুচরণ । আহা , কেমন করে মোলো ?

চতুর্ভুজ । ( বিরক্ত হইয়া) জানি নে মশায়!

পরানবাবুর প্রবেশ

পরান । মশায় , আপনার বেড়াল কী হল ?

চতুর্ভুজ । সে মরেছে ।

পরান । বটে! মোলো কী করে ?

চতুর্ভুজ । এই তোমরা যেমন করে মরবে । গলায় দড়ি দিয়ে ।

পরান । ও বাবা , এ যে একেবারে আগুন ।

চতুর্ভুজের পশ্চাতে ছেলের পাল লাগিল

হাততালি দিয়া ‘ কাবুলি বিড়াল ' ‘ কাবুলি বিড়াল ' বলিয়া খেপাইতে লাগিল