আত্মশক্তি/ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ

আত্মশক্তি ¢ ዓኡ ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ অদ্য বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য বঙ্গীয়সাহিত্য-পরিবৎ এই সভা আহবান করিয়াছেন । তোমাদিগকে সর্বপ্রথমে সম্ভাষণ করিবার ভার আমার উপরে পড়িয়াছে । , ছাত্রদের সহিত বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের কোনখানে যোগ সে-কথা হয়তো তোমরা জিজ্ঞাসা করিতে পার। যোগ আছে। সেই যোগ অনুভব করা ও ঘনিষ্ঠ করিয়া তোলাই অদ্যকার এই সভার একটি উদ্দেশু । তোমরা সকলেই জান, আকাশে যে-ছায়াপথ দেখা যায় তাহার স্থানে স্থানে তেজ পুঞ্জীভূত হইয়া নক্ষত্র-আকার ধারণ করিতেছে এবং অপর অংশে জ্যোতির্বাস্প অসংহতভাবে ব্যাপ্ত হইয়া আছে— কিন্তু সংহত-অসংহত সমস্তটা লইয়াই এই ছায়াপথ । আমাদের বাংলাদেশেও যে জ্যোতির্ময় সারস্বত ছায়াপথ রচিত হইয়াছে, বঙ্গীয়সাহিত্য-পরিষৎকে তাহারই একটি কেন্দ্রবদ্ধ সংহত অংশ বলা যাইতে পারে, ছাত্রমগুলী তাহার চতুর্দিকে জ্যোতির্বাম্পের মতো বিকীর্ণ অবস্থায় আছে। এই ঘন অংশের সঙ্গে বিকীর্ণ অংশের যখন জাতিগত ঐক্য আছে, তখন সে-ঐক্য সচেতনভাবে অনুভব করা চাই, তখন এই দুই আত্মীয় অংশের মধ্যে আদানপ্রদানের যোগস্থাপন করা নিতান্ত আবশু্যক । যে-ঐক্যের কথা আজ আমি বলিতেছি পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে তাহা মুখে আনিবার জো ছিল না। তখন ইংরেজি-শিক্ষামদে-উন্মত্ত ছাত্রগণ মাতৃভাষার দৈন্তকে পরিহাস করিতে কুষ্ঠিত হন নাই এবং উপবাসী দেশীয় সাহিত্যকে একমুষ্টি অন্ন না দিয়া বিদায় করিয়াছেন । * আমাদের বাল্যকালেও দেশের সাহিত্যসমাজ ও দেশের শিক্ষিতসমাজের মাঝখানকার ব্যবধানরেখা অনেকটা স্পষ্ট ছিল । তখনো ইংরেজি রচনা ও ইংরেজি বকৃতায় খ্যাতিলাভ করিবার আকা জঙ্কা ছাত্রদের মনে সকলের চেয়ে প্রবল ছিল । এমন কি, র্যাহারা বাংলা সাহিত্যের প্রতি কৃপাদৃষ্টিপাত করিতেন তাহারা ইংরেজি মাচার উপরে চড়িয়া তবে সেটুকু প্রশ্রয় বিতরণ করিতে পারিতেন । সেইজন্য তখনকার দিনে মধুসূদনকে মধুসূদন, হেমচন্দ্রকে হেমচন্দ্র, বঙ্কিমকে বঙ্কিম জানিয়া আমাদের তৃপ্তি ছিল না, তখন কেহ বা বাংলার মিন্টন, কেহ বা বাংলার বায়রন, (tbr a রবীন্দ্র-রচনাবলী কেহ বা বাংলার স্কট বলিয়া পরিচিত ছিলেন,– এমন কি, বাংলার অভিনেতাকে সম্মানিত করিতে হইলে তাহাকে বাংলার গ্যারিক ‘বলিলে আমাদের আশ মিটিত, অথচ গ্যারিকের সহিত কাহারও সাদৃশুনির্ণয় আমাদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না ; কারণ গ্যারিক যখন নটলীলা সংবরণ করিয়াছিলেন তখন আমাদের দেশের নাট্যাভিনয় যাত্রার দলের মধ্যে জন্মান্তর যাপন করিতেছিল । কিন্তু, প্রথম অবস্থার চেয়ে এই দ্বিতীয় অবস্থাটা আমাদের পক্ষে আশাজনক । কারণ, বাংলায় বায়রন-স্কটে স্বদুর সাদৃশ্ব যে মিলিতে পারে, এ-কথা ইংরেজিওয়ালার পক্ষে স্বীকার করা তখনকার দিনের একটা স্বলক্ষণ বলিতে হইবে । এখনকার তৃতীয় অবস্থায় ঐ ইংরেজি উপাধিগুলার কুয়াশা কাটিয়া গিয়া বাংলা সাহিত্য আর কাহারও সহিত তুলনার আশ্রয় না লইয়া নিজমূর্তিতে প্রকাশ পাইবার চেষ্টা করিতেছে । আমাদের সাহিত্যের প্রতি দেশের লোকের যথার্থ সম্মান ইহাতে ব্যক্ত হইতেছে । ইহার কারণ, বাংলা সাহিত্য ক্রমশ আপনার মধ্যে একটা স্বাধীনতার তেজ অনুভব করিতেছে । ইহাতে প্রমাণ হয়, আমাদের মনটা ইংরেজি গুরুমহাশয়ের অপরিমিত শাসন হইতে অল্পে অল্পে মুক্ত হইয়া আসিতেছে। একদিন গেছে যখন আমাদের শিক্ষিত লোকেরা ইংরেজি পুথির প্রত্যেক কথাই বেদবাক্য বলিয়া জ্ঞান করিত। ইংরেজিগ্রস্ততা এতদূর পর্যস্ত সাংঘাতিক হইয়া উঠিয়াছিল যে, ইংরেজি বিধিবিধানের সহিত কোনোপ্রকারে মিলাইতে না পারিয়া জামাইষষ্ঠ ফিরাইয়া দিয়াছে এবং আমোদ করিয়া বান্ধবের গায়ে আবির-লেপনকে চরিত্রের একটা চিরস্থায়ী কলঙ্ক বলিয়া গণ্য করিয়াছে— এতবড়ো শিক্ষিত-মূৰ্খতার প্রমাণ আমরা পাইয়াছি । এ-রোগের সমস্ত উপসর্গ যে একেবারে কাটিয়াছে, তাহা বলিতে পারি না, কিন্তু আরোগ্যের লক্ষণ দেখা দিয়াছে । আজকাল আমরা ইংরেজি ছাপাখানার দ্বারে ধন্না না দিয়া নিজে সন্ধান করিতে, নিজে যাচাই করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি, এমন কি পুথির প্রতিবাদ করিতেও সাহস হয় । নিজের মধ্যে এই যে একটা স্বাতন্ত্র্যের অনুভূতি যে-অনুভূতি না থাকিলে শক্তির যথার্থ ক্ষতি হইতে পারে না, ইহা কোনো একটা দিকে আরম্ভ হইলে ক্রমে সকল দিকেই আপনাকে প্রকাশ করিতে থাকে । ধর্মে, কর্মে, সমাজে, সর্বত্র আমরা ইহার পরিচয় পাইতেছি । কিছুকাল পূর্বে আমাদের দেশের শাস্ত্র এবং শাসন সমস্তই আমরা খ্ৰীস্টান পাদরির চোখে দেখিতাম— পাদরির কষ্টিপাথরে কোনটাতে কী রকম আত্মশক্তি ●b"> দাগ পড়িতেছে, ইহাই আলোচনা করিয়া দেশের সমস্ত জিনিসকে বিচার করিতে इहैऊ । প্রথম-প্রথম সে-বিচারে দেশের কোনো জিনিসেরই মূল্য ছিল না। তার পরে মাঝে আর-একটু ভালো লক্ষণ দেখা দিল । তখন আমরা বিলিতি গুরুকে বলিতে লাগিলাম, তোমাদের দেশে যা-কিছু গৌরবের বিষয় আছে, আমাদের দেশেও তা সমস্তই ছিল ; আমাদের দেশে রেলগাড়ি এবং বেলুন ছিল, শাস্ত্রে তাহার প্রমাণ আছে এবং ঋষিরা জানিতেন স্বর্যালোকে গাছপালা অক্সিজেন নিশ্বাস পরিত্যাগ করে, সেইজন্যই প্রাতঃকালে পূজার পুষ্পচয়নের বিধান হুইয়াছে। এ-কথা বলিবার সাহস ছিল না যে, রেলগাড়ি-বেলুন না থাকিলেও গৌরবের কারণ থাকিতে পারে এবং ফাকি দিয়া অক্সিজেন বাষ্প গ্রহণ করানোর চেয়ে নির্মল প্রত্যুষে সৰ্বকৰ্মারম্ভে স্বন্দরভাবে দেবতার সেবায় লোকের মনকে নিযুক্ত করিবার মাহাত্ম্য অধিক । এখনো এ-ভাবটা আমরা যে সম্পূর্ণ ত্যাগ করিতে পারিয়াছি, তা নয় । এ-কথা এখনো সম্পূর্ণ ভুলিতে পারি নাই যে, পাদরির কষ্টিপাথরে যাহা উজ্জল দাগ দেয় তাহা মূল্যবান হইতে পারে, কিন্তু জগতে সোনাই তো একমাত্র মূল্যবান পদার্থ নয় — পাথরে কিছুমাত্র দাগ টানে না, এমন মূল্যবান জিনিসও জগতে আছে । যাহা হউক, বন্ধন শিথিল হইতেছে । আজকাল অল্প অল্প করিয়া এ-কথা বলিতে আমরা সাহস করিতেছি যে, পাদরির বিচারে যাহা নিন্দনীয়, বিলাতের বিধানে যাহা গহিত, আমাদের দিক হইতে তাহার পক্ষে বলিবার কথা অনেক আছে । আমরা যাহাকে পলিটিক্স বলি, তাহার মধ্যেও এই ভাবটা দেখিতে পাই । প্রথমে যাহা সামুনয় প্রসাদভিক্ষা ছিল দ্বিতীয় অবস্থাতে তাহার ঝুলি খসে নাই, কিন্তু তাহার বুলি অন্তরকম হইয়া গেছে— ভিক্ষুকতা যতদূর পর্যন্ত উদ্ধত স্পধার আকার ধারণ করিতে পারে, তাহা করিয়াছে । আমাদের আধুনিক আন্দোলনগুলিকে আমরা বিলাতি রাষ্ট্রনৈতিক ক্রিয়াকলাপের অনুরূপ মনে করিয়া উৎসাহবোধ করিতেছি । তৃতীয় অবস্থায় আমরা ইহার উপরের ধাপে উঠিবার চেষ্টা করিতেছি । এ-কথা বলিতে শুরু করিয়াছি যে, হাতজোড় করিয়াই ভিক্ষা করি আর চোখ রাঙাইয়াই ভিক্ষা করি, এত সহজ উপায়ে গৌরবলাভ করা যায় না— দেশের জন্ত স্বাধীন শক্তিতে যতটুকু কাজ নিজে করিতে পারি, তাহাতে জুই দিকে লাভ– এক তো ফললাভ ; দ্বিতীয়ত নিজে কাজ করাটাই একটা লাভ, সেটা ফললাভের চেয়ে বেশি বই কম নয়— সেই গৌরবের প্রতি লক্ষ্য করিয়াই আমাদের দেশের গুরু বলিয়াছেন, ফলের \3ա Պ 3 ¢w२ রবীন্দ্র-রচনাবলী প্রতি আসক্তি না রাখিয়া কৰ্ম করিবে । ভিক্ষার অগৌরব এই যে, ফললাভ হইলেও নিজের শক্তি নিজে খাটাইবার যে সার্থকতা, তাহা হইতে বঞ্চিত হইতে হয় । যাহা হউক, ইহা দেখা যাইতেছে যে, সকল দিক দিয়াই আমরা নিজের স্বাধীন শক্তির গৌরৰ অনুভব করিবার একটা উদ্যম অস্তরের মধ্যে অনুভব করিতেছি— সাহিত্য হইতে আরম্ভ করিয়া পলিটিক্স পর্যন্ত কোথাও ইহার বিচ্ছেদ নাই । ইহার একটা ফল এই দেখিতেছি, পূর্বে ইংরেজি শিক্ষা আমাদের দেশে প্রাচীননবীন, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, উচ্চ নীচ, ছাত্র ও সংসারীর মধ্যে যে একটা বিচ্ছেদের স্থষ্টি করিয়াছিল, এখন তাহার উলটা কাজ আরম্ভ হইয়াছে, এখন আবার আমরা নিজেদের ঐক্যসূত্র সন্ধান করিয়া পরস্পর ঘনিষ্ঠ হইবার চেষ্টা করিতেছি । মধ্যকালের এই বিচ্ছিন্নতাই পরিণামের মিলনকে যথার্থভাবে সম্পূর্ণ করিবে, তাহার সন্দেহ নাই । এই মিলনের আকর্ষণেই আজ বঙ্গভাষা বঙ্গসাহিত্য আমাদের ইংরেজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকেও আপন করিয়াছে। একদিন যেখানে বিপক্ষের দুর্ভেদ্য দুর্গ ছিল সেখান হইতেও বঙ্গের বিজয়িনী বাণী স্বেচ্ছাসমাগত সেবকদের অর্ঘ্যলাভ করিতেছেন । পূর্বে এমন দিন ছিল যখন ইংরেজি পাঠশালা হইতে আমাদের একেবারে ছুটি ছিল না। বাড়ি আসিতাম, সেখানেও পাঠশালা পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিয়া আসিত। বন্ধুকেও সম্ভাষণ করিতাম ইংরেজিতে, পিতাকেও পত্র লিখিতাম ইংরেজিতে, প্রাণের কথা বলিতাম ইংরেজি কাব্যে, দেশের লোককে সভায় আহবান করিতাম ইংরেজি বক্তৃতায় । আজ যখন সেই পাঠশালা হইতে, একেবারে না হউক, ক্ষণে ক্ষণে ছুটি পাইয়া থাকি তখন সেই ছুটির সময়টাতে আনন্দ করিব কোথায় । মাতার অন্তঃপুরে নহে কি । দিনের পড়া তো শেষ হইল, তার পরে ক্রিকেট খেলাতেও না হয় রণজিৎ হইয়া উঠিলাম। তার পরে ? তার পরে গৃহবাতায়ন হইতে মাতার স্বহস্তজালিত সন্ধ্যাদীপটি কি চোখে পড়িবে না। যদি পড়ে, তবে কি অবজ্ঞা করিয়া বলিব, ওটা মাটির প্রদীপ । ওই মাটির প্রদীপের পশ্চাতে কি মাতার গৌরব নাই। যদি মাটির প্রদীপই হয় তো সে দোষ কার। মাতার কক্ষে সোনার প্রদীপ গড়িয়া দিতে কে বাধা দিয়াছে। যেমনই হউক না কেন, মাটিই হউক আর সোনাই হউক, যখন আনন্দের দিন আসিবে তখন ওইখানেই আমাদের উৎসব ; আর যখন দুঃখের অন্ধকার ঘনাইয়া আসে তখন রাজপথে দাড়াইয়া চোখে জল ফেলা যায় না, তখন ওই গৃহ ছাড়া আর গতি নাই । 彈 আজ এখানে আমরা সেই পাঠশালার ফেরত আসিয়াছি । আজ, সাহিত্য আত্মশক্তি &brరీ পরিষং জামাদিগকে যেখানে আহবান করিয়াছেন তাহা কলেজ-ক্লাস হইতে দূরে, তাহা ক্রিকেট-ময়দানেরও সীমান্তরে, সেখানে আমাদের দরিদ্র জননীর সন্ধ্যাবেলাকার । মাটির প্রদীপটি জলিতেছে । সেখানে আয়োজন খুব বেশি নাই – কিন্তু, তোমরা এক সময়ে তাহার কাছে শ্রান্তদেহে ফিরিয়া আসিবে বলিয়া সমস্ত দিন যিনি পথ তাকাইয়া বসিয়া আছেন, আয়োজনে কি তাহার গৌরব প্রমাণ হইবে । তিনি এইমাত্র জানেন যে, তোমরাই তাহার একমাত্র গৌরব এবং আমরা জানি, তোমাদের একমাত্র গৌরব তাহার চরণের ধূলি, ভিক্ষালব্ধ রাজপ্ৰসাদ নহে। পরীক্ষাশালা হইতে আজ তোমরা সদ্য আসিতেছ, সেইজন্য ঘরের কথা আজই তোমাদিগকে স্মরণ করাইবার যথার্থ অবকাশ উপস্থিত হইয়াছে—সেইজন্যই বঙ্গবাণীর হইয়া বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষং আজ তোমাদিগকে আহবান করিয়াছেন । কলেজের বাহিরে যে-দেশ পড়িয়া আছে তাহার মহত্ব একেবারে ভুলিলে চলিবে না । কলেজের শিক্ষার সঙ্গে দেশের একটা স্বাভাবিক যোগ স্থাপন করিতে হইবে । অন্য দেশে সে-যোগ চেষ্টা করিয়া স্থাপন করিতে হয় না । সে-সকল দেশের কলেজ দেশেরই একটা অঙ্গ— সমস্ত দেশের আভ্যন্তরিক প্রকৃতি তাহাকে গঠিত করিয়া তোলাতে দেশের সহিত কোথাও তাহার কোনো বিচ্ছেদের রেখা নাই । আমাদের কলেজের সহিত দেশের ভেদচিহ্নহীন স্বন্দর ঐক্য স্থাপিত হয় নাই । যেরূপ দেখা যাইতেছে, বিস্তাশিক্ষা কালক্রমে কতৃপক্ষের সম্পূর্ণ আয়ত্তাধীন হইয়া এই প্রভেদকে বাড়াইয়া তুলিবে । এমন অবস্থায় আমাদের বিশেষ চিন্তার বিষয় এই হইয়াছে, কী করিলে বিদেশীচালিত কলেজের শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদিগকে একটা স্বাধীন শিক্ষায় নিযুক্ত করিয়া শিক্ষাকার্যকে যথার্থভাবে সম্পূর্ণ করা যাইতে পারে । তাহা না করিলে শিক্ষাকে কোনোমতে পুথির গণ্ডির বাহিরে আনা দুঃসাধ্য হইবে । নানা আলোচনা নানা বাদ প্রতিবাদের ভিতর দিয়া পাঠ্যবিষয়গুলি যেখানে প্রত্যহ প্রস্তুত হইয়া উঠিতেছে, যাহারা আবিষ্কার করিতেছেন, স্বষ্টি করিতেছেন, প্রকাশ করিতেছেন, র্তাহারাই যেখানে শিক্ষা দিতেছেন, সেখানে শিক্ষা জড় শিক্ষা নহে। সেখানে কেবল যে বিষয়গুলিকেই পাওয়া যায়, তাহা নহে, সেই সঙ্গে দৃষ্টির শক্তি, মননের উদ্যম, স্বষ্টির উৎসাহ পাওয়া যায়। এমন অবস্থায় পুথিগত বিদ্যার অসহ জুলুম থাকে না, গ্রন্থ হইতে যেটুকু লাভ করা যায়, তাহারই মধ্যে একান্তভাবে दक इझे८ङ झग्न नां । আমাদের দেশেও পুথিকে মনের রাজা না করিয়া মনকে পুথির উপর আধিপত্য ●b“8。 রবীন্দ্র-রচনাবলী দিবার উপায় একটু ৰিশেষভাবে চিন্তা ও একটু বিশেষ উদ্যোগের সহিত সম্পন্ন করিতে হইবে । এই কাজের জন্য আমি বন্দ্রীয়-সাহিত্য-পরিষৎকে অনুরোধ করিতেছি। আমার অকুনয়, ৰাঙালী ছাত্রদের জন্য র্তাহারা যথাসম্ভব একটি স্বাধীন শিক্ষার ক্ষেত্র প্রসারিত করিয়া দিন—যে ক্ষেত্রে ছাত্রগণ কিঞ্চিৎপরিমাণেও নিজের শক্তিপ্রয়োগ ও বুদ্ধির কতৃৰ্ত্ত অনুভব করিয়া চিত্তবৃত্তিকে ফুতিদান করিতে পারিৰে । বাংলাদেশের সাহিত্য, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব, লোকবিবরণ প্রভৃতি যাহা-কিছু আমাদের জ্ঞাতব্য, সমস্তই বঙ্গীয়-সাহিত্য পরিষদের অঙ্গুসন্ধান ও আলোচনার বিষয় । দেশের এই-সমস্ত বৃত্তান্ত জানিবার ঔংস্থক্য আমাদের পক্ষে স্বাভাবিক হওয়া উচিত ছিল—কিন্তু তাহা ন হইবার কারণ, আমরা শিশুকাল হইতে ইংরেজি বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক, যাহা ইংরেজ ছেলেদের জন্য রচিত, তাহাই পড়িয়া আসিতেছি ; ইহাতে নিজের দেশ আমাদের কাছে অস্পষ্ট এবং পরের দেশের জিনিস আমাদের কাছে অধিকতর পরিচিত হইয়া আসিয়াছে । এজন্য কাহাকেও দোষ দেওয়া যায় না। আমাদের দেশের যথার্থ বিবরণ আজ পর্যন্ত প্রস্তুত হইয়া উঠে নাই, সেইজন্য যদিও আমরা স্বদেশে বাস করিতেছি তথাপি স্বদেশ আমাদের জ্ঞানের কাছে সর্বাপেক্ষ ক্ষুদ্র হইয়া আছে । এইরূপে স্বদেশকে মুখ্যভাবে সম্পূর্ণভাবে আমাদের জ্ঞানের আয়ত্ত না করিবার একটা দোষ এই যে, স্বদেশের সেবা করিবার জন্য আমরা কেহ যথার্থ ভাবে যোগ্য হইতে পারি না। আর-একটা কথা এই, জ্ঞানশিক্ষা নিকট হইতে দূরে, পরিচিত হইতে অপরিচিতের দিকে গেলেই তাহার ভিত্তি পাকা হইতে পারে। যে-বস্তু চতুর্দিকে বিস্তৃত নাই, ষে-বস্তু সম্মুখে উপস্থিত নাই, আমাদের জ্ঞানের চর্চা যদি প্রধানত তাহাকে অবলম্বন করিয়াই হইতে থাকে, তবে সে-জ্ঞান দুর্বল হইবেই । যাহা পরিচিত তাহাকে সম্পূর্ণরূপে যথার্থভাবে আয়ত্ত করিতে শিখিলে, তবে যাহা অপ্রত্যক্ষ যাহা অপরিচিত, তাহাকে গ্রহণ করিবার শক্তি জন্মে । আমাদের বিদেশী গুরুর প্রায়ই আমাদিগকে খোটা দিয়া বলেন যে এতদিন যে তোমরা আমাদের পাঠশালে এত করিয়া পড়িলে, কিন্তু তোমাদের উদ্ভাবনাশক্তি জন্মিল না, কেবল কতকগুলো মুখস্থবিদ্যা সংগ্ৰহ করিলে মাত্র । যদি তাহাদের এ-অপবাদ সত্য হয় তবে ইহার প্রধান কারণ এই, বস্তুর সহিত বহির সহিত আমরা মিলাইয়া শিথিবীর অবকাশ পাই না। আমাদের অধিকাংশ निक ८६-नकल नूडेोख् श्राथञ्च कcद्र डांश आभाप्नद्र नृष्टिरशांछद्र नरश् । आभद्रा ইতিহাস পড়ি—কিন্তু ৰে ইতিহাস আমাদের দেশের জনপ্রবাহকে অবলম্বন করিয়া আত্মশক্তি Qvむ প্রস্তুত হইয়া উঠিয়াছে, যাহার নানা লক্ষণ, নানা স্মৃতি আমাদের ঘরে বাহিরে নানা স্থানে প্রত্যক্ষ হইয়া আছে, তাহ আমরা আলোচনা করি না বলিয়া ইতিহাস যে কী জিনিস তাহার উজ্জল ধারণা আমাদের হইতেই পারে না। আমরা ভাষাতত্ত্ব মুখস্থ করিয়া পরীক্ষায় উচ্চ স্থান অধিকার করি, কিন্তু আমাদের নিজের মাতৃভাষা কালে কালে প্রদেশে প্রদেশে কেমন করিয়া ধে নানা রূপান্তরের মধ্যে নিজের ইতিহাস প্রত্যক্ষ নিবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে তাহা তেমন করিয়া দেখি না বলিয়াই ভাষারহস্ত আমাদের কাছে স্বম্পষ্ট হইয়া উঠে না । এক ভারতবর্ষে সমাজ ও ধর্মের যেমন বহুতর অবস্থাবৈচিত্র্য আছে, এমন বোধ হয় আর কোনো দেশে নাই । অনুসন্ধানপূর্বক, অভিনিবেশপূর্বক সেই বৈচিত্র আলোচনা করিয়া দেখিলে সমাজ ও ধর্মের বিজ্ঞান আমাদের কাছে যেমন উদ্ভাসিত হইয়া উঠিবে, এমন দূর দেশের ধর্ম ও সমাজ সম্বন্ধীয় বই পড়িয়ামাত্র কখনো হইতেই পারে না । ধারণা যখন অস্পষ্ট ও দুর্বল থাকে তখন উদ্ভাবনাশক্তির আশা করা যায় না । এমন কি, তখনকার সমস্ত উদ্ভাবনা অবাস্তবিক অদ্ভুত আকার ধারণ করে । এইজন্যই আমরা কেতাবে ইতিহাস শিথিয়াও ঐতিহাসিক বিচার তেমন করিয়া আয়ত্ত করিতে পারি নাই ; কেতাবে বিজ্ঞান শিপিয়াও অভূতপূর্ব কাল্পনিকতাকে বিজ্ঞান বলিয়া চালাইয়া থাকি ; ধর্ম, সমাজ, এমন কি, সাহিত্য-সমালোচনাতেও অপ্রমত্ত পরিমাণবোধ রক্ষা করিতে পারি না । বাস্তবিকতাবিবর্জিত হইলে আমাদের মনই বল, হৃদয়ই বল, কল্পনাই বল, কৃশ এবং বিকৃত হইয়া যায় । আমাদের দেশহিতৈষী ইহার প্রমাণ । দেশের লোকের হিতের সঙ্গে এই হিতৈষার যোগ নাই । দেশের লোক রোগে মরিতেছে, দারিদ্রে জীর্ণ হইতেছে, অশিক্ষা ও কুশিক্ষায় নষ্ট হইতেছে, ইহার প্রতিকারের জন্য যাহারা কিছুমাত্র নিজের চেষ্টা প্রয়োগ করিতে প্রবৃত্ত হয় না তাহারা বিদেশী সাহিত্য-ইতিহাসের পুথিগত পেটিয়টিজম নানাপ্রকার অসংগত অনুকরণের দ্বারা লাভ করিয়াছি বলিয়া কল্পনা করে। এইজন্তই, এতকাল গেল, তথাপি এই পেটিয়টিজম আমাদিগকে যথার্থ কোনো ত্যাগস্বীকারে প্রবৃত্ত করিতে পারিল না । যে দেশে পেটিয়টিজম অবাস্তব নহে, পুথিগত অমুকরণমূলক নহে, সেখানকার লোক দেশের জন্য অনায়াসে প্রাণ দিতেছে ; আমরা সামান্য অর্থ দিতে পারি না, সময় দিতে পারি না, আমাদের দেশ যে কিরূপ তাহা সন্ধানপূর্বক জানিবার জন্য উৎসাহ অনুভব করি না । ঘোশিদা তোরাজিরো জাপানের এক জন বিখ্যাত পেটিয়ট ছিলেন । তিনি র্তাহার প্রথমাবস্থায় চালচিড়া বাধিয়া পায়ে হাটিয়া ক্রমাগতই সমস্ত দেশ কেবল ভ্রমণ করিয়াই বেড়াইয়াছেন । রবীন্দ্র-রচনাবলী । والمطه এইরূপে দেশকে তন্ন তন্ন করিয়া জানিয়া তাহার পরে ছাত্র পড়াইবার কাজে নিযুক্ত হন— শেযদশায় তাহাকে দেশের কাজে প্রাণ দিতে হইয়াছিল। এইরূপ পেটি টিজমের অর্থ বোঝা যায়। দেশের বাস্তবিক জ্ঞান এবং দেশের বাস্তবিক কাজের উপরে যখন দেশহিতৈষী প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই তাহ মাটিতে বদ্ধমূল গাছের মতো ফল দিতে Qों८क । অতএব এ-কথা যদি সত্য হয় যে, প্রত্যক্ষবস্তুর সহিত সংস্রব ব্যতীত জ্ঞানই বল, ভাবই বল, চরিত্রই বল, নিজীব ও নিফল হইতে থাকে, তবে আমাদের ছাত্রদের শিক্ষাকে সেই নিষ্ফলতা হইতে যথাসাধ্য রক্ষা করিতে চেষ্টা করা অর্ত্যাবশুক । বাংলাদেশ আমাদের নিকটতম—ইহারই ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব প্রভৃতিকে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ আপনার আলোচ্য বিষয় করিয়াছেন । পরিষদের নিকট আমার নিবেদন এই যে, এই আলোচনাব্যাপারে তাহারা ছাত্রদিগকে আহবান করিয়া লউন । তাহা হইলে প্রত্যক্ষবস্তুর সম্পর্কে ছাত্রদের বীক্ষণশক্তি ও মননশক্তি সবল হইয়া উঠিবে এবং নিজের চারিদিককে, নিজের দেশকে ভালো করিয়া জানিবার অভ্যাস হইলে অন্য সমস্ত জানিবার যথার্থ ভিত্তিপত্তন হইতে পারিবে । তা ছাড়া, নিজের দেশকে ভালো করিয়া জানার চর্চা নিজের দেশকে যথার্থভাবে প্রীতির চর্চার অঙ্গ । կ বাংলাদেশে এমন জিলা নাই যেখান হইতে কলিকাতায় ছাত্রসমাগম না হইয়াছে । দেশের সমস্ত বৃত্তান্তসংগ্রহে ইহাদের যদি সহায়তা পাওয়া যায়, তবে সাহিত্য-পরিষৎ সার্থকতা লাভ করিবেন। এ-সাহায্য কিরূপ এবং তাহার কতদূর প্রয়োজনীয়ত, তাহার দুই-একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতে পারে। * на в বাংলাভাষায় একখানি ব্যাকরণ-রচনা সাহিত্য-পরিষদের একটি প্রধান কাজ । কিন্তু কাজটি সহজ নহে। এই ব্যাকরণের উপকরণ সংগ্রহ একটি দুরূহ ব্যাপার । বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন অংশে যতগুলি উপভাষা প্রচলিত আছে তাহারই তুলনাগত ব্যাকরণই যথার্থ বাংলার বৈজ্ঞানিক ব্যাকরণ। আমাদের ছাত্রগণ সমবেতভাবে কাজ করিতে থাকিলে এই বিচিত্র উপভাষার উপকরণগুলি সংগ্রহ করা কঠিন হইবে না । বাংলায় এমন প্রদেশ নাই যেখানে স্থানে স্থানে প্রাকৃত লোকদের মধ্যে নূতন নূতন ধর্মসম্প্রদায়ের স্বষ্টি না হইতেছে। শিক্ষিত লোকেরা এগুলির কোনো খবরই রাখেন না । তাহার এ কথা মনেই করেন না, প্রকাণ্ড জনসম্প্রদায় অলক্ষ্য গতিতে নিঃশব্দচরণে চলিয়াছে ; আমরা অৰজ্ঞা করিয়া তাহাদের দিকে তাকাই না বলিয়া যে তাহারা স্থির হইয়া বসিয়া আছে, তাহা নহে— নূতন কালের নূতন শক্তি তাহাদের আত্মশক্তি 4\rግ মধ্যে পরিবর্তনের কাজ করিতেছেই; সে-পরিবতন কোন পথে চলিতেছে, কোন রূপ ধারণ করিতেছে, তাহ ন জানিলে দেশকে জানা হয় না। শুধু যে দেশকে জানাই চরম লক্ষ্য, তাহা অামি বলি না – যেখানেই হোক না কেন, মানব-সাধারণের মধ্যে ধl-কিছু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলিতেছে, তাহা ভালো করিয়া জানারই একটা সার্থকতা আছে । পুথি ছাড়িয়া সজীব মানুষকে প্রত্যক্ষ পড়িবার চেষ্টা করাতেই একটা শিক্ষা আছে ; তাহাতে শুধু জানা নয়, কিন্তু জানিবার শক্তির এমন একটা বিকাশ হয় যে কোনো ক্লাসের পড়ায় তাহা হইতেই পারে না। পরিষদের অধিনায়কতায় ছাত্ৰগণ যদি স্বস্ব প্রদেশের নিম্নশ্রেণীর লোকের মধ্যে যে-সমস্ত ধৰ্মসম্প্রদায় আছে তাহাদের বিবরণ সংগ্ৰহ করিয়া আনিতে পারেন, তবে মন দিয়া মানুষের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবার যে একটা শিক্ষা তাহাও লাভ করিবেন এবং সেই সঙ্গেই দেশেরও কাজ করিতে পরিবেন। আমরা নৃতত্ত্ব অর্থাৎ ethnologyর বই ষে পড়ি না তাহী নহে, কিন্তু যখন দেখিতে পাই, সেই বই পড়ার দরুন আমাদের ঘরের পাশে যে হাড়ি-ডোম কৈবতবাগদি রহিয়াছে তাহাদের সম্পূর্ণ পরিচয় পাইবার জন্য আমাদের লেশমাত্র ঔংস্থক্য জন্মে না, তখনই বুঝিতে পারি, পুথি সম্বন্ধে আমাদের কত বড়ো একটা কুসংস্কার জন্মিয়া গেছে— পুথিকে আমরা কত বড়ো মনে করি এবং পুথি যাহার প্রতিবিম্ব তাহাকে কতই তুচ্ছ বলিয়া জানি । কিন্তু, জ্ঞানের সেই আদিনিকেতনে একবার যদি জড়ত্ব ত্যাগ করিয়া প্রবেশ করি, তাহা হইলে আমাদের ঔৎস্থক্যের সীমা থাকিবে না । আমাদের ছাত্ৰগণ যদি তাহীদের এই-সকল প্রতিবেশীদের সমস্ত খোজে একবার ভালো করিয়া নিযুক্ত হন, তবে কাজের মধ্যেই কাজের পুরস্কার পাইবেন, তাহাতে नहन्मट् माझे । 馨 _ সন্ধান ও সংগ্ৰহ করিবার বিষয় এমন কত আছে তাহার সীমা নাই। আমাদের ব্ৰতপার্বণগুলি বাংলার এক অংশে যেরূপ অন্য অংশে সেরূপ নহে। স্থানভেদে সামাজিক প্রথার অনেক বিভিন্নতা আছে। এ ছাড়া গ্রাম্য ছড়া, ছেলে ভুলাইবার ছড়া, প্রচলিত গান প্রভৃতির মধ্যে অনেক জ্ঞাতব্য বিষয় নিহিত আছে। বস্তুত, দেশবাসীর পক্ষে দেশের কোনো বৃত্তান্তই তুচ্ছ নহে, এই কথা মনে রাখিয়াই সাহিত্য পরিধ২ নিজের কত ব্যনিরূপণ করিয়াছেন। -- আমাদের ছাত্রগণকে পরিষদের কর্মশালায় সহায়স্বরূপে আকর্ষণ করিবার জন্য আমার অনুরোধ পরিষৎ গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়াই আদ্যকার এই সভায় আমি ছাত্রগণকে আমন্ত্রণ করিবার ভার লইয়াছি। সেই কাজে প্রবৃত্ত হইবার সময় আমাদের তরুণাবস্থার কথা আমার মনে পড়িতেছে। z · (t Երեր রবীন্দ্র-রচনাবলী আমাদের তরুণাবস্থা বলিলে ষে অত্যন্ত স্থদুরকালের কথা বোঝায়, এভবড়ে প্রাচীনত্বের দাবি আমি করিতে পারি না— কিন্তু, আমাদের তখনকার দিনের সঙ্গে এখনকার দিনের এমন একটা পরিবর্তন দেখিতে পাই যে, সেই অদূরবর্তী সময়কে ধেন একটা যুগান্তর বলিয়া মনে হয়। এই পরিবর্তনটা বয়সের দোষে আমি দেখিতেছি অথবা এই পরিবর্তনটা সত্যই ঘটয়াছে, তাহা ভাবিবার বিষয়। একটু বয়স বেশি হইলেই প্রাচীনতর লোকেরা তাহাদের সেকালের সঙ্গে তুলনা করিয়া একালকে খোটা দিতে বসেন – তাহার একটা কারণ, সেকাল তাহাজের অfশা করিবার কাল ছিল এবং একালট। তাহাদের হিসাব বুঝিবার দিন । তাহারা ভুলিয়া যান, একালের যুবকেরাও আশা করিয়া জীবন আরম্ভ করিতেছে, এখনো তাহারা চশমা চোখে হিসাব মিটাইতে বসে নাই । অতএব, আমাদের সেদিনকার কালের সঙ্গে অন্তকার কালের যে প্রভেদটা আমি দেখিতেছি তাহা যথার্থ কি না, তাহার বিচারক একা আমি নহি, তোমাদিগকেও তাহা বিচার করিয়া দেখিতে হইবে । সত্যমিথ্যা নিশ্চয় জানি না, কিন্তু মনে হয়, এখনকার ছেলেদের চেয়ে তখন আমরা অনেক বেশি ছেলেমানুষ ছিলাম। সেটা ভালো কি মন্দ তাহার দুই পক্ষেই বলিবার কথা আছে— কিন্তু, ছেলেমানুষ থাকিবার একটা গুণ ছিল যে, আমাদের আশার অস্ত ছিল না, ভবিষ্যতের দিকে কী চোখে যে চাহিতাম, কিছুই অসাধ্য এবং অসম্ভব বলিয়া মনে হইত না । তখন আমরা এমন-সকল সভা করিয়াছিলাম, এমন-সকল দল বধিয়াছিলাম, এমন-সকল সংকল্পে বদ্ধ হইয়াছিলাম যাহা এখনকার দিনে তোমরা শুনিলে নিশ্চয় হাস্যসংবরণ করিতে পারিবে না— এবং আমাদের সাহিত্যে কোনো কোনো স্থলে আমাদের সেদিনকার চিত্র হাস্যরসরঞ্জিত তুলিকায় চিত্রিত হইয়াছে বলিয়া অামার বিশ্বাস । কিন্তু, সব কথা যদি খুলিয়া বলি তবে তোমরা এই মনে করিয়া বিস্মিত হইবে যে, আমাদের সেকালে আমরা, বালকেরা, সকলেই যে একবয়সী ছিলাম তাহা নহে, আমাদের মধ্যে পঙ্ককেশের অভাব ছিল না এবং তাহীদের আশ ও উৎসাহ আমাদের চেয়ে যে কিছুমাত্র অল্প ছিল, তাহাও বলিতে পারি না। তখন আমরা নবীনে-প্রবীপে মিলিয়া ভয়-লঙ্গা-নৈরাশু কেমন নিঃশেষে বিসর্জন দিয়াছিলাম, তাহ আজও ভুলিতে পারিব না । সেদিনের চেয়ে নিঃসন্দেহই আজ আমরা অনেক বিষয়ে অগ্রসর হইয়াছি, কিন্তু আজ আকাশে আশার আলোক যেন মান এবং পথিকের হস্তে আনন্দের পাথেয় যেন অপ্রচুর। ट्रांप्यूभांखिक Q切。 কেন এমনটা ঘটিল তাহার জবাবদিহি এখনকার কালের নহে, আমাদিগকেই তাহার কৈফিয়ত দিতে হুইবে । যে-আশার সম্বল লইয়া যাত্রা আরম্ভ করিয়াছিলাম তাহা পথের মধ্যে কোনখানে উড়াইয়া-পুড়াইয়া দিয়া আজ এমন রিক্ত হইয়া বসিয়া আছি । অপরিমিত আশা-উৎসাহ আমাদের অল্পবয়সের প্রথম সম্বল ; কর্মের পথে যাত্রা করিবার আরম্ভকালে বিধাতৃমাতা এইটে আমাদের অঞ্চল প্রান্তে বাধিয়া আশীৰ্বাদ করিয়া প্রেরণ করেন। কিন্তু অর্থ যেমন খাদ্য নহে, তাহা ভাঙাইয়া তবে খাইতে হয়, তেমনি আশা-উৎসাহমাত্র আমাদিগকে সার্থক করে না, তাহাকে বিশেষ কাজে খাটাইয়া তবে ফললাভ করি । সে-কথা তুলিয়া আমরা বরাবর ওই আশা-উৎসাহেই পেট ভরাইবার চেষ্টা করিয়াছিলাম । শিশুরা শুইয়া শুইয়াই হাত-পা ছুড়িতে থাকে,— তাহাদের সেই শরীরসঞ্চালনের কোনো লক্ষ্য নাই। প্রথমাবস্থায় শক্তির এইরূপ অনির্দিষ্ট বিক্ষেপের একটা অর্থ আছে,— কিন্তু, সেই অকারণ হাত-পা-ছোড়া ক্রমে যদি তাহাকে সকারণ চেষ্টার জন্য প্রস্তুত করিয়া না তোলে তবে তাহা ব্যাধি বলিয়াই গণ্য হইবে । আমাদেরও অল্পবয়সে উদ্যমগুলি প্রথমে কেবলমাত্র নিজের আনন্দেই বিক্ষিপ্তভাবে উদামভাবে চারিদিকে সঞ্চালিত হইতেছিল— তখনকার পক্ষে তাহা অদ্ভুত ছিল না, তাহা বিদ্রুপের বিষয় ছিল না । কিন্তু ক্রমেই যখন দিন ৰাইতে লাগিল এবং আমরা কেবল পড়িয়া পড়িয়া অঙ্গসঞ্চালন করিতে লাগিলাম কিন্তু চলিতে লাগিলাম না, শরীরের আক্ষেপবিক্ষেপকেই অগ্রসর হইবার উপায় বলিয়া কল্পনা করিতে লাগিলাম, তখন আর আনন্দের কারণ রহিল না— এবং এক সময়ে যাহা আবশ্বক ছিল অন্ত সময়ের পক্ষে তাহাই দুশ্চিস্তার বিষয় হইয়া উঠিল। আমাদের প্রথমবয়সে ভারতমাতা, ভারতলক্ষ্মী প্রভৃতি শব্দগুলি বৃহদায়তন লাভ করিয়া আমাদের কল্পনাকে আচ্ছন্ন করিয়াছিল। কিন্তু মাতা যে কোথায় প্রত্যক্ষ । আছেন তাহা কখনো স্পষ্ট করিয়া ভাবি নাই ; লক্ষ্মী দূরে থাকুন, তাহার পেচকটাকে পর্বত্ত কখনো চক্ষে দেখি নাই । আমরা বায়রনের কাব্য পড়িয়াছিলাম, গারিবলভির জীবনী আলোচনা করিয়াছিলাম এবং পেটিয়টিজমের ভাবরসসম্ভোগের নেশায় একেবারে তলাইয়া গিয়াছিলাম । মাতালের পক্ষে মদ্য যেরূপ খাদ্যের অপেক্ষ প্রিয় হয়, আমাদের পক্ষেও দেশহিতৈষার নেশা স্বয়ং দেশের চেয়েও বড়ো হইয়া উঠিয়াছিল। যে-দেশ প্রত্যক্ষ তাহার ভাষাকে বিশ্বত হইয়া, তাহার ইতিহাসকে অপমান করিয়া, তাহার স্থখহুঃখকে \Ֆա Գ(* ് 6:3 е রবীন্দ্র-রচনাবলী নিজের জীবনযাত্রা হইতে বহুদূরে রাখিয়াও আমরা দেশহিতৈষী হইতেছিলাম। দেশের সহিত লেশমাত্র লিপ্ত না হইয়াও বিদেশীর রাজদরবারকেই দেশহিতৈষিতার একমাত্র কার্যক্ষেত্র বলিয়া গণ্য করিতেছিলাম— এমন অবস্থাতেও, এমন ফাকি দিয়াও, ফললাভ করিব, আনন্দলাভ করিব, উৎসাহকে বরাবর বজায় রাখিব, এমন আশা করিতে গেলে বিশ্ববিধাতার চক্ষে ধূলা দিবার আয়োজন করিতে হয়। আইডিয়া ষত বড়োই হউক, তাহাকে উপলব্ধি করিতে হইলে একটা নিদিষ্ট সীমাবদ্ধ জায়গায় প্রথম হস্তক্ষেপ করিতে হইবে । তাহা ক্ষুদ্র হউক, দীন হউক, তাহাকে লঙ্ঘন করিলে চলিবে না। দূরকে নিকট করিবার একমাত্র উপায় নিকট হইতে সেই দূরে যাওয়া । ভারতমাতা যে হিমালয়ের দুর্গম চূড়ার উপরে শিলাসনে বসিয়া কেবলই করুণ স্বরে বীণা বাজাইতেছেন, এ-কথা ধ্যান করা নেশা করা মাত্র— কিন্তু, ভারতমাতা যে আমাদের পল্লীতেই পঙ্কশেষ পানাপুকুরের ধারে ম্যালেরিয়াজীর্ণ প্লীহারোগীকে কোলে লইয়া তাহার পথ্যের জন্য আপন শূন্ত ভাণ্ডারের দিকে হতাশদৃষ্টিতে চাহিয়া আছেন, ইহা দেখাই যথার্থ দেখা । যে-ভারতমাতা ব্যাস-বশিষ্ঠবিশ্বামিত্রের তপোবনে শমীবৃক্ষমূলে আলবালে জলসেচন করিয়া বেড়াইতেছেন তাহাকে করজোড়ে প্রণাম করিলেই যথেষ্ট, কিন্তু আমাদের ঘরের পাশে যে জীর্ণচীরধারিণী ভারতমাতা ছেলেটাকে ইংরেজি বিদ্যালয়ে শিখাইয়া কেরানিগিরির বিড়ম্বনার মধ্যে স্বপ্রতিষ্ঠিত করিয়া দিবার জন্য অধ্যাশনে পরের পাকশালে রাধিয়া বেড়াইতেছেন, তাহাকে তো আমন কেবলমাত্র প্রণাম করিয়া সারা যায় না। যাহাই হউক, কিছুই হইল না। বিজয়ীর মতো বাহির হইলাম, ভিখারির মতো পরের দ্বারে দাড়াইলাম, অবশেষে সংসারী হইয়া দাওয়ায় বসিয়া সেভিংস ব্যাঙ্কের খাত খুলিলাম। কারণ, যে-ভারতমাতা, যে-ভারতলক্ষ্মী কেবল সাহিত্যের ইন্দ্রধচুবাম্পে রচিত, যাহা পরামুসরণের মৃগতৃষ্ণিকার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত, তাহার চেয়ে নিজের সংসারটুকু যে ঢের বেশি প্রত্যক্ষ, নিজের জঠরগহবরটা যে ঢের বেশি স্বনির্দিষ্ট— এবং ভারতমাতার অশ্রুধারা বিঝিট-খাম্বাজ রাগিণীতে যতই মৰ্মভেদী হউক না, ডেপুটিগিরিতে মাসে মাসে যে স্বর্ণঝংকারমধুর বেতনটি মিলে তাহাতে সম্পূর্ণ সাৰন পাওয়া যায়, ইহা পরীক্ষিত। এমনি করিয়া ষে-মানুষ একদিন উদার ভাবে বিস্ফারিত হইয়া দিন আরম্ভ করে সে যখন সেই ভাবপুঞ্জকে কোনো প্রত্যক্ষবস্তুতে প্রয়োগ করিতে না পারে, তখন সে আত্মম্ভরি স্বার্থপর হইয়া ব্যর্থভাবে দিন শেষ করে — একদিন যে-ব্যক্তি নিজের ধনপ্রাণ সমস্তই হঠাৎ দিয়া ফেলিবার জন্ত প্রস্তুত হয় সে যখন দান করিবার কোনো লক্ষ্যনির্ণয় করিতে পারে না, কেবল সংকল্প-কল্পনার বিলাসভোগেই আত্মশক্তি @> আপনাকে পরিতৃপ্ত করে, সে একদিন এমন কঠিনহৃদয় হইয় উঠে যে, উপবাসী স্বদেশকে যদি স্থদুরপথে দেখে, তবে টাকা ভাঙাইয়া লিকিটি বাহির করিবার ভয়ে দ্বার রুদ্ধ করিয়া দেয়। ইহার কারণ এই যে, শুদ্ধমাত্র ভাব যত বড়োই হউক, ক্ষুদ্রতম প্রত্যক্ষবস্তুর কাছে তাহাকে পরাস্ত হইতে হইবে । এইজন্যই বলিতেছিলাম, যাহা আমরা পুথি হইতে পড়িয়া পাইয়াছি, যাহাকে আমরা ভাবসম্ভোগ বা অহংকার তৃপ্তির উপায়স্বরূপ করিয়া রসালসঙ্গড়ত্বের মধ্যে উপস্থিত হইয়াছি ও ক্রমে অবসাদের মধ্যে অবতরণ করিতেছি, তাহাকে প্রত্যক্ষতার মূতি, বাস্তবিকতার গুরুত্ব দান করিলে তবে আমরা রক্ষা পাইব । শুধু বড়ো জিনিস কল্পনা করিলেও হইবে না, বড়ো দান ভিক্ষা করিলেও হইবে না এবং ছোটো মুখে বড়ো কথা বলিলেও হইবে না, স্বারের পাশ্বে নিতান্ত ছোটো কাজ শুরু করিতে হুইবে । বিলাতের প্রাসাদে গিয়া রোদন করিলে হইবে না, স্বদেশের ক্ষেত্রে বসিয়া কণ্টক উৎপাটন করিতে হইবে । ইহাতে আমাদের শক্তির চর্চা হইবে— সেই শক্তির চর্চামাত্রেই স্বাধীনতা, এবং স্বাধীনতামাত্রেই আনন্দ । আজ তোমাদের তারুণ্যের মধ্যে আমার অবারিত প্রবেশাধিকার নাই, তোমাদের আশা আকাঙ্ক্ষা আদর্শ যে কী, তাহা স্পষ্টরূপে অনুভব করা আজ আমার পক্ষে অসম্ভব— কিন্তু, নিজেদের নবীন কৈশোরের স্মৃতিটুকুও তো ভস্মাবৃত অগ্নিকণার মতো পককেশের নিচে এখনো প্রচ্ছন্ন হইয়া আছে । সেই স্মৃতির বলে ইহা নিশ্চয় জানিতেছি যে, মহৎ আকাঙ্ক্ষার রাগিণী মনে যে-তারে সহজে বাজিয়া উঠে তোমাদের অন্তরের সেই সূক্ষ্ম সেই তীক্ষু সেই প্রভাতসূর্যরশ্মি-নির্মিত তত্ত্বর ন্যায় উজ্জল তন্ত্রীগুলিতে এখনো অব্যরহারের মরিচা পড়িয়া যায় নাই— উদার উদ্দেশ্যের প্রতি নির্বিচারে আত্মবিসর্জন করিবার দিকে মানুষের মনের যে একটা স্বাভাবিক ও স্বগভীর প্রেরণা আছে, তোমাদের অস্তঃকরণে এখনো তাহা ক্ষুদ্র বাধার দ্বারা বারংবার প্রতিহত হইয়া নিস্তেজ হয় নাই ; আমি জানি, স্বদেশ যখন অপমানিত হয় আহত অগ্নির ন্যায় তোমাদের হৃদয় উদ্দীপ্ত হইয়া উঠে—নিজের ব্যবসায়ের সংকীর্ণতা ও স্বার্থসাধনের চেষ্টা তোমাদের সমস্ত মনকে গ্রাস করে নাই ; দেশের অভাব ও অগৌরব ষে কেমন করিয়া দূর হইতে পারে, সেই চিন্তা নিশ্চয়ই মাঝে মাঝে তোমাদের রজনীর বিনিদ্র প্রহর ও দিবসের নিভৃত অবকাশকে আক্রমণ করে— আমি জানি, ইতিহাসবিশ্রত যে-সকল মহাপুরুষ দেশহিতের জন্য লোকহিতের জন্য আপনাকে উৎসর্গ করিয়া মৃত্যুকে পরাস্ত, স্বার্থকে লজ্জিত ও দুঃখক্লেশকে অমর মহিমায় সমুজ্জল করিয়া গেছেন, তাহাদের দৃষ্টান্ত তোমাদিগকে যখন আহবান করে তখন তাহাকে আজও তোমরা বিজ্ঞ বিষয়ীর মতো ¢*२. রবীন্দ্র-রচনাবলী বিদ্রুপের সহিত প্রত্যাখ্যান করিতে চাও না— তোমাদের সেই অনাস্ত্ৰাত পুষ্প অখণ্ড পুণ্যের স্তায় নবীন হৃদয়ের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষাকে আমি আজ তোমাদের দেশের সারস্বতবর্গের নামে আহবান করিতেছি— ভোগের পথে নহে, ভিক্ষার পথে নহে, কর্মের পথে। কর্মশালার প্রবেশদ্বার অতি ক্ষুদ্র, রাজপ্রাসাদের সিংহদ্বারের ন্যায় ইহা অভ্ৰভেদী নহে কিন্তু গৌরবের বিষয় এই যে, এখানে নিজের শক্তি সম্বল করিয়া প্রবেশ করিতে হয়, ভিক্ষাপাত্র লইয়া নহে— গৌরবের বিষয় এই যে, এখানে প্রবেশের জন্য দ্বারীর অনুমতির অপমান স্বীকার করিতে হয় না, ঈশ্বরের আদেশ শিরোধার্য করিয়া আসিতে হয় ; এখানে প্রবেশ করিতে গেলে মাথা নত করিতে হয় বটে, কিন্তু সে কেবল নিজের উচ্চ আদর্শের নিকট, দেশের নিকট, যিনি নত ব্যক্তিকে উন্নত করিয়া দেন, সেই মঙ্গলবিধাতার নিকট । তোমাদিগকে আহবান করিয়া এ-পর্যন্ত কেহ তো সম্পূর্ণ নিরাশ হন নাই ; দেশ যখন বিলাতি বিষাণ বাজাইয়া ভিক্ষা করিতে বাহির হইয়াছিল তখন তোমরা পশ্চাৎপদ হও নাই— প্রাচীন শ্লোকে যে-স্থানটাকে শ্মশানের ঠিক পূর্বেই বসাইয়াছেন সেই রাজদ্বারে তোমরা যাত্রা করিয়া আপনাকে সার্থক জ্ঞান করিয়াছ— আর, আজ সাহিত্য-পরিষৎ তোমাদিগকে যে আহবান করিতেছেন তাহার ভাষা মাতৃভাষা ও তাহার কার্য মাতার অন্তঃপুরের কার্য বলিয়াই কি তাহা ব্যর্থ হইবে— সে আহবান দেশের উৎসবে ব্যসনে চৈব”, কিন্তু "রাজদ্বারে শ্মশানে চ” নয় বলিয়াই কি তোমাদের উৎসাহ হইবে না । সাহিত্য-পরিষদে আমরা দেশকে জানিবার জন্ত প্রবৃত্ত হইয়াছি— দেশের কাব্যে, গানে, ছড়ায়, প্রাচীন মন্দিরের ভগ্নাবশেষে, কীটদষ্ট পুথির জীর্ণ পত্রে, গ্রাম্য পার্বণে, ব্ৰতকথায়, পল্লীর কৃষিকুটিরে পরিষৎ যেখানে স্বদেশকে সন্ধান করিবার জন্য উদ্যত হইয়াছেন সেখানে বিদেশী লোকে কোনোদিন বিস্ময়দৃষ্টিপাত করে না, সেখান হইতে সংবাদপত্রবাহন খ্যাতি সমুদ্রপারে জয়ঘোষণা করিতে যায় না, সেখানে তোমাদের কোনো প্রলোভন নাই— কিন্তু তোমাদের মধ্যে কেহ মাতার নিঃশব্দ আশিসমাত্রকে যদি রাজমহিষীর ভোজ্যবশেষের চেয়ে অধিক মনে করিতে পার তবে মাতার নিভূত-অন্তঃপুরচারী এই-সকল মাতৃসেবকদের পাশ্বে আসিয়া দণ্ডায়মান হও এবং দিনের পর দিন বিনা বেতনে বিনা পুরস্কারে খ্যাতিবিহীন কর্মে স্বদেশপ্রেমকে সার্থক করো। তাহা হইলে অন্তত এইটুকু বুঝিবে যে, যদি শক্তি থাকে তবে কর্মও আছে, যদি প্রীতি থাকে তবে সেবার উপলক্ষ্যের অভাব নাই, সে-জষ্ঠ গবর্মেন্টের কোনো আইনপাশের অপেক্ষা করিতে হয় না এবং কোনো অধিকারভিক্ষার প্রত্যাশায় রুদ্ধ দ্বারের কাছে অনন্তকর্ম হইয়া দিনরাত্রি যাপন করা অত্যাবগুক নহে। আত্মশক্তি- (సిరి আমার আশঙ্কা হইতেছে, অন্তকার বক্তব্য বিষয় সম্বন্ধে আমি ঠিক মাত্রারক্ষা করিতে পারি নাই । কথাটা তো শুদ্ধমাত্র এই যে, দেশী ভাষার ব্যাকরণ চর্চা করে, অভিধান সংকলন করে, পল্লী হইতে দেশের আভ্যন্তরিক বিবরণ সংগ্রহ করে। এই সামান্য প্রস্তাবের অবতারণার জন্য এমন করিয়া উচ্চভাবের দোহাই দিয়া দীর্ঘ ভূমিকা রচনা করা কিছু যেন অসংগত হইয়াছে ৷ হইয়াছে স্বীকার করি—কিন্তু, কালের গতিকে এইরূপ অসংগত ব্যাপার অামাদের দেশে আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে, ইহাই আমাদের দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। যদি কোনো মাতার এমন অবস্থা হয় যে, ছেলের প্রতি তাহার কর্তব্য কী, তাহাই নিরূপণ করিবার জন্য দেশবিদেশের বিজ্ঞান দর্শন ও ধর্মশাস্ত্র পড়িয়া তিনি কুলকিনারা পাইতেছেন না, তবে তাহাকে এই অত্যন্ত সহজ কথাটি যত্ন করিয়া বুঝাইতে হয়— আগে দেখো তোমার ছেলেটা কোথায় আছে, কী করিতেছে, সে পাতকুয়ায় পড়িল কি আলপিন গিলিয়া বসিল, তাহার ক্ষুধা পাইয়াছে কী শীত করিতেছে। এ-সব কথা সাধারণত বলিতেই হয় না, কিন্তু যদি দুৰ্দৈবক্রমে বিশেষ স্থলে বলা আবশ্যক হইয় পড়ে, তবে বাহুল্য করিয়াই বলিতে হয় । বর্তমান কালে আমাদের দেশে যদি বলা যায় যে, দেশের জন্য বক্তৃতা করো, সভা করে, তর্ক করে, তবে তাহা সকলে অতি সহজেই বুঝিতে পারেন ; কিন্তু যদি বলা হয়, দেশকে জানো ও তাহার পরে স্বহস্তে যথাসাধ্য দেশের সেবা করে, তবে দেখিয়াছি, অর্থ বুঝিতে লোকের বিশেষ কষ্ট হয়। এমন অবস্থায় দেশের প্রতি কর্তব্য সম্বন্ধে দুটো-একটা সামান্য কথা বলিতে যদি অসামান্য বাক্যব্যয় করিয়া থাকি, তবে মার্জনা করিতে হইবে । বস্তুত, সকালবেলায় যদি ঘন কুয়াশা হইয়া থাকে তবে অধীর হইয়া ফল নাই এবং হতাশ হইবারও প্রয়োজন দেখি না— স্বর্য সে-কুয়াশা ভেদ করিবেনই এবং করিবামাত্র সমস্ত পরিষ্কার হইয়া যাইবে । আজ আমি অধীরভাবে অধিক আকাঙ্ক্ষা করিব না— অবিচলিত আশার সহিত আনন্দের সহিত এই কথাই বলিব, নিবিড় কুত্মটিকার মাঝে মাঝে ওই যে বিচ্ছেদ দেখা যাইতেছে— সূর্যরশ্মির ছটা খরধার কৃপাণের মতো আমাদের দৃষ্টির আবরণ তিন-চারি জায়গায় ভেদ করিয়াছে— আর ভয় নাই, গৃহদ্বারের সম্মুখেই আমাদের যাত্রাপথ অনতিবিলম্বে পরিস্ফুটন্ধপে প্রকাশিত হইয়া পড়িবে— তখন দিগবিদিক সম্বন্ধে দশ জন মিলিয়া দশ প্রকারের মত লইয়া ঘরে বসিয়া বাদবিতণ্ড করিতে হইবে না— তখন সকলে আপন-আপন শক্তি অনুসারে আপন.আপন পথ নির্বাচন করিয়া তর্কসভা হইতে, পুথির রুদ্ধ কক্ষ হইতে বাহির হইয়া পড়িব, তখন নিকটের কাজকে দূর মনে হইবে না এবং অত্যাবস্তক কাজকে ক্ষুদ্র বলিয়া অবজ্ঞা জন্মিবে না। এই শুভক্ষণ আসিবে বলিয়া আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস আছে— {{సి 8 রবীন্দ্র-রচনাবলী সেইজন্য, পরিষদের অন্তকার আহবান যদি তোমাদের অন্তরে স্থান না পায়, বাংলা দেশের ঘরের কথা জানাকে যদি তোমরা বেশি একটা কিছু বলিয়া না মনে কর— তবু আমি ক্ষুব্ধ হইব না এবং আমার যে মাতৃভূমি এতদিন তাহার সস্তানগণের গৃহপ্রত্যাগমনের জন্য অনিমেষদৃষ্টিতে প্রতীক্ষা করিয়া আছেন, তাহাকে আশ্বাস দিয়া বলিব, জননী, সময় নিকটবতী হইয়াছে, ইস্কুলের ছুটি হইয়াছে, সভা ভাঙিয়াছে, এইবার তোমার কুটিরপ্রাঙ্গণের অভিমুখে তোমার ক্ষুধিত সস্তানদের পদধ্বনি ওই শোনা যাইতেছে— এখন বাজাও তোমার শঙ্খ, জালো তোমার প্রদীপ, তোমার প্রসারিত শীতলপাটির উপরে আমাদের ছোটো বড়ো সকল ভাইয়ের মিলনকে তোমার অশ্রীগদগদ আশীর্বচনের দ্বারা সার্থক করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া থাকো । ভাসিটি বিল এতকাল ধরিয়া য়ুনিভার্সিটি বিলের বিধিবিধান লইয়া তন্নতন্ন করিয়া অনেক আলোচনাই হইয়া গেছে, সেগুলির পুনরুক্তি বিরক্তিকর হইবে । মোটামুটি দুই-একট। কথা বলিতে চাই । I টাকা থাকিলে, ক্ষমতা থাকিলে, সমস্ত অবস্থা অমুকুল হইলে বন্দোবস্তর চূড়ান্ত করা যাইতে পারে, সে-কথা সকলেই জানে। কিন্তু অবস্থার প্রতি তাকাইয়া দুরাশাকে খৰ্ব করিতে হয়। লর্ড কর্জন ঠিক বলিয়াছেন, বিলাতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ খুব ভালো— কিন্তু ভারতবন্ধু লাটসাহেব তো বিলাতের সব ভালো আমাদিগকে দিবার কোনো বন্দোবস্ত করেন নাই, মাঝে হইতে কেবল একটা ভালোই মানাইবে কেন ? প্রত্যেকের সাধ্যমতো যে ভালো, সে-ই তাহার সর্বোত্তম ভালো, তাহার চেয়ে ভালো আর হইতে পারে না— অন্যের ভালোর প্রতি লোভ করা বৃথা । । বিলাতি য়ুনিভাসিটিগুলাও একেবারেই আকাশ হইতে পড়িয়া অথবা কোনো জবরদস্ত শাসনকর্তার আইনের জোরে এক রাত্রে পূর্ণপরিণত হইয়া উঠে নাই । তাহার একটা ইতিহাস আছে । দেশের অবস্থা এবং ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে তাহারা স্বভাবত বাড়িয়া উঠিয়াছে। ইহার প্রতিবাদে বলা যাইতে পারে, আমাদের য়ুনিভার্সিটি গোড়াতেই বিদেশের নকল— স্বাভাবিক নিয়মের কথা ইহার সম্বন্ধে খাটিতে পারে না ।