আত্মশক্তি/স্বদেশী সমাজ প্রবন্ধের পরিশিষ্ট

স্বদেশী সমাজ' প্ৰবন্ধের পরিশিষ্ট


স্বদেশী সমাজ শীৰ্ষক যে-প্ৰবন্ধ আমি প্ৰথমে মিনাৰ্ভা ও পরে কৰ্জন রঙ্গমঞ্চে পাঠ করি , তৎসম্বন্ধে আমার শ্ৰদ্ধেয় সুস্থাৎ শ্ৰীযুক্ত বলাইচাঁদ গোস্বামী মহাশয় কয়েকটি প্ৰশ্ন উথাপন করিয়াছেন । নিজের ব্যক্তিগত কৌতুহলনিবৃত্তির জন্য এ প্রশ্নগুলি তিনি আমার কাছে পাঠান নাই, হিন্দুসমাজনিষ্ঠ ব্যক্তিমাত্রেরই যে যে স্থানে লেশমাত্ৰ সংশয় উপস্থিত হইতে পারে, সেই সেই স্থানে তিনি আমার মনোযোগ অাকৰ্ষণ করিয়া আন্তরিক কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন । কিন্তু প্রশ্নোত্তরের মতো লিখিতে গেলে লেখা নিতান্তই আদালতের সওয়ালজবাবের মতো হইয়া দাঁড়ায় । সেরাপ খাপছাড়া লেখায় সকল কথা সুস্পষ্ট হয় না, এইজন্য সংক্ষিপ্ত প্ৰবন্ধ অাকারে অামার কথাটা পরিকুট করিবার চেষ্টা করি। কৰ্ণ যখন তাহার সহজ কবচটি ত্যাগ করিয়াছিলেন তখনই তাহার মৃত্যু ঘনাইয়া ছিল , অজুন যখন তাহার গাণ্ডীব তুলিতে পারেন নাই তখনই তিনি সামান্য দসুর হাতে পরাস্ত । হইয়াছিলেন । ইহা হইতে বুঝা যায়, শক্তি সকলের এক জায়গায় নাই— কোনো দেশ নিজের অস্ত্ৰশস্তুের মধ্যে নিজের বল রক্ষা করে, কোনো দেশ নিজের সর্বাঙ্গে শক্তি কবচ ধারণ করিয়া জয়ী হয় । যুরোপের যেখানে বল অামাদের সেখানে বল নহে । যুরোপ আত্মরক্ষার জন্য যেখানে উদ্যম প্ৰয়োগ করে আমাদের আত্মরক্ষার জন্য সেখানে উদ্যমপ্ৰয়োগ বৃথা । যুরোপের শক্তির ভাণ্ডার স্টেট অৰ্থাৎ সরকার । সেই স্টেট দেশের সমস্ত হিতকর আত্মশক্তি @@@ কর্মের ভার গ্রহণ করিয়াছে— স্টেটই ভিক্ষাদান করে, স্টেটই বিস্তাদান করে, ধর্মরক্ষার ভারও স্টেটের উপর । অতএব এই স্টেটের শাসনকে সর্বপ্রকারে সবল, কমিষ্ঠ ও সচেতন করিয়া রাখা, ইহাকে আভ্যন্তরিক বিকলতা ও বাহিরের আক্রমণ হইতে বাচানোই য়ুরোপীয় সভ্যতার প্রাণরক্ষার উপায় । আমাদের দেশে কল্যাণশক্তি সমাজের মধ্যে । তাহা ধৰ্মরূপে আমাদের সমাজের সর্বত্র ব্যাপ্ত হইয়া আছে। সেইজন্যই এতকাল ধমকে সমাজকে বাচানোই ভারতবর্ষ একমাত্র আত্মরক্ষার উপায় বলিয়া জানিয়া আসিয়াছে । রাজত্বের দিকে তাকায় নাই, সমাজের দিকেই দৃষ্টি রাখিয়াছে। এইজন্য সমাজের স্বাধীনতাই যথার্থভাবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা । কারণ, মঙ্গল করিবার স্বাধীনতাই স্বাধীনতা, ধর্মরক্ষার স্বাধীনতাই স্বাধীনতা । এতকাল নানা দুর্বিপাকেও এই স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ ছিল । কিন্তু এখন ইহা আমরা অচেতনভাবে, মূঢ়ভাবে পরের হাতে প্রতিদিন তুলিয়া দিতেছি । ইংরেজ আমাদের রাজত্ব চাহিয়াছিল, রাজত্ব পাইয়াছে, সমাজটাকে নিতান্ত উপরি-পাওনার মতো লইতেছে—ফাউ বলিয়া ইহা আমরা তাহার হাতে বিনামূল্যে তুলিয়া দিতেছি। তাহার একটা প্রমাণ দেখো । ইংরেজের আইন আমাদের সমাজরক্ষার ভার লইয়াছে। হয়তো যথার্থভাবে রক্ষা করিতেছে, কিন্তু তাই বুঝিয়া খুশি থাকিলে চলিবে না। পূর্বকালে সমাজবিদ্রোহী সমাজের কাছে দণ্ড পাইয়া অবশেষে সমাজের সঙ্গে রফ করিত । সেই রফা-অনুসারে আপসে নিম্পত্তি হইয়া যাইত । তাহার ফল হইত এই, সামাজিক কোনো প্রথার ব্যত্যয় যাহারা করিত তাহারা স্বতন্ত্র সম্প্রদায়রূপে সমাজের বিশেষ একটা স্থানে আশ্রয় লইত। এ-কথা কেহই বলিবেন না, হিন্দুসমাজে আচারবিচারের কোনো পার্থক্য নাই। পার্থক্য যথেষ্ট আছে, কিন্তু সেই পার্থক্য সামাজিক ব্যবহারগুণে গণ্ডিবদ্ধ হইয়া, পরস্পরকে আঘাত করে না । আজ আর তাহা হইবার জো নাই। কোনো অংশে কোনো দল পৃথক হইতে গেলেই হিন্দুসমাজ হইতে তাহাকে ছিন্ন হইতে হয়। পূর্বে এরূপ ছিন্ন হওয়া একটা বিভীষিকা বলিয়া গণ্য হইত। কারণ, তখন সমাজ এরূপ সবল ছিল ষে, সমাজকে অগ্রাহ করিয়া টিকিয়া থাকা সহজ ছিল না। স্বতরাং বে-দল কোনো পার্থক্য অবলম্বন করিত সে উদ্ধতভাবে বাহির হইয়া যাইত না । সমাজও নিজের শক্তি সম্বন্ধে নিঃসংশয় ছিল বলিয়াই অবশেষে ঔদার্থ প্রকাশ করিয়া পৃথক পন্থাবলম্বীকে যথাযোগ্য ●i८य निष्छब्र अत्रौडूङ कब्रिग्ना लझेऊ । «es ब्रदौट-ब्रछन्नांवलौ এখন যে-দল একটু পৃথক হয় তাহাকে ত্যাগ করিতে হয় । কারণ, ইংরেজের আইন কোনটা হিন্দু কোনটা অহিন্দু তাহা স্থির করিবার ভার লইয়াছে— রফ করিবার ভার ইংরেজের হাতে নাই, সমাজের হাতেও নাই। তাহার কারণ, পৃথক হওয়ার দরুন কাহারও কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি নাই—ইংরেজরচিত স্বতন্ত্র আইনের আশ্রয়ে কাহারও কিছুতে বিশেষ ব্যাঘাত ঘটে না । অতএব, এখন হিন্দুসমাজ কেবলমাত্র ত্যাগ করিতেই পারে । শুদ্ধমাত্র ত্যাগ করিবার শক্তি বলরক্ষা-প্রাণরক্ষার উপায় নহে । আক্কেল দাত যখন ঠেলিয়া উঠিতে থাকে তখন বেদনায় অস্থির করে। কিন্তু যখন সে উঠিয়া পড়ে তখন শরীর তাহাকে স্বস্থভাবে রক্ষা করে। যদি দাত উঠিবার কষ্টের কথা স্মরণ করিয়া দাতগুলাকে বিসর্জন দেওয়াই শরীর সাব্যস্ত করে তবে বুঝিব, তাহার অবস্থা ভালো নহে—বুঝিব, তাহার শক্তিহীনতা ঘটিয়াছে। সেইরূপ সমাজের মধ্যে কোনো প্রকার নূতন অভু্যদয়কে স্বকীয় করিয়া লইবার শক্তি একেবারেই না থাকা, তাহাকে বর্জন করিতে নিরুপায়ভাবে বাধ্য হওয়া সমাজের সজীবতার লক্ষণ নহে ; এবং এই বর্জন করিবার জন্য ইংরেজের আইনের সহায়তা লওয়া সামাজিক আত্মহত্যার উপায় । যেখানেই সমাজ আপনাকে খণ্ডিত করিয়া গগুটিকে আপনার বাহিরে ফেলিতেছে সেখানে যে কেবল নিজেকে ছোটো করিতেছে তাহা নহে—ঘরের পাশেই চিরস্থায়ী বিরোধ স্থষ্টি করিতেছে । কালে কালে ক্রমে ক্রমে এই বিরোধী পক্ষ যতই বাড়িয়া উঠিতে থাকিবে, হিন্দুসমাজ ততই সপ্তরর্থীর বেষ্টনের মধ্যে পড়িবে। কেবলই খোয়াইতে থাকিব, এই যদি আমাদের অবস্থা হয় তবে নিশ্চয় দুশ্চিন্তার কারণ ঘটিয়াছে। পূর্বে আমাদের এ-দশা ছিল না । আমরা খোওয়াই নাই, আমরা ব্যবস্থাবদ্ধ করিয়া সমস্ত রক্ষা করিয়াছি—ইহাই আমাদের বিশেষত্ব, ইহাই আমাদের বল । শুধু এই নয়, কোনো কোনো সামাজিক প্রথাকে অনিষ্টকর জ্ঞান করিয়া আমরা ইংরেজের আইনকে ঘাটাইয়া তুলিয়াছি, তাহাও কাহারও অগোচর নাই । যেদিন কোনো পরিবারে সস্তানদিগকে চালনা করিবার জন্য পুলিসম্যান ডাকিতে হয়, সেদিন আর পরিবাররক্ষার চেষ্টা কেন । সেদিন বনবাসই শ্রেয় । মুসলমান সমাজ আমাদের এক পাড়াতেই আছে এবং খ্ৰীস্টানসমাজ আমাদের সমাজের ভিতের উপর বস্তার মতো ধাক্কা দিতেছে। প্রাচীন শাস্ত্রকারদের সময়ে এ-সমস্যাট ছিল না। যদি থাকিত তবে তাহারা হিন্দুসমাজের সহিত এই-সকল আত্মশক্তি @@@ পরসমাজের অধিকার নির্ণয় করিতেন— এমনভাবে করিতেন যাহাতে পরম্পরের মধ্যে নিয়ত বিরোধ ঘটিত না । এখন কথায় কথায় ভিন্ন ভিন্ন পক্ষে দ্বন্দ্ব বাধিয়া উঠিতেছে, এই দ্বন্দ্ব অশাস্তি, অব্যবস্থা ও দুর্বলতার কারণ। যেখানে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব বাধিতেছে না সেখানে ভিতরে ভিতরে অলক্ষিতভাবে সমাজ বিশ্লিষ্ট হইয়া পড়িতেছে । এই ক্ষয়রোগও সাধারণ রোগ নহে। এইরূপে সমাজ পরের সঙ্গে আপনার সীমানির্ণয় সম্বন্ধে কোনো কতৃত্বপ্রকাশ করিতেছে না ; নিজের ক্ষয়নিবারণের প্রতিও তাহার কতৃত্ব জাগ্রত নাই। ষাহ। আপনি হইতেছে তাহাই হইতেছে ; যখন ব্যাপারটা অনেকদূর অগ্রসর হইয়া পরিস্ফুট হইতেছে তখন মাঝে মাঝে হাল ছাড়িয়া বিলাপ করিয়া উঠিতেছে। কিন্তু, আজ পর্যন্ত বিলাপে কেহ বন্যাকে ঠেকাইতে পারে নাই এবং রোগের চিকিৎসাও বিলাপ নহে । বিদেশী শিক্ষা বিদেশী সভ্যতা আমাদের মনকে আমাদের বুদ্ধিকে যদি অভিভূত করিয়া না ফেলিত তবে আমাদের সামাজিক স্বাধীনতা এত সহজে লুপ্ত হইতে বসিত না । গুরুতর রোগে যখন রোগীর মস্তিষ্ক বিকল হয় তখনই ডাক্তার ভয় পায় । তাহার কারণ, শরীরের মধ্যে রোগের আক্রমণ-প্রতিরোধের যে-ব্যবস্থা তাহা মস্তিষ্কই করিয়া থাকে- সে যখন অভিভূত হইয়া পড়ে তখন বৈদ্যের ঔষধ তাহার সর্বপ্রধান সহায় হইতে বঞ্চিত হয় । প্রবল ও বিচিত্র শক্তিশালী যুরোপীয় সভ্যতা অতি সহজে আমাদের মনকে অভিভূত করিয়াছে । সেই মনই সমাজের মস্তিষ্ক ; বিদেশী প্রভাবের হাতে সে যদি আত্মসমপণ করে তবে সমাজ আর আপনার স্বাধীনতা রক্ষা করিবে কী করিয়া । এইরূপে বিদেশী শিক্ষার কাছে সমাজের শিক্ষিত লোক হৃদয়মনকে অভিভূত হইতে দিয়াছে বলিয়া কেহ বা তাহাকে গালি দেয়, কেহ বা প্রহসনে পরিহাস করে । কিন্তু শাস্তভাবে কেহ বিচার করে না যে, কেন এমনটা ঘটিতেছে । ডাক্তাররা বলেন, শরীর যখন সবল ও সক্রিয় থাকে, তখন রোগের আক্রমণ ঠেকাইতে পারে । নিদ্রিত অবস্থায় সদিকসি-ম্যালেরিয়া চাপিয়া ধরিবার অবসর পায় । বিলাতি সভ্যতার প্রভাবকে রোগের সঙ্গে তুলনা করিলাম বলিয়া মার্জনা প্রার্থনা করি । স্বস্থানে সকল জিনিসই ভালো, অস্থানে পতিত ভালো জিনিসও জঞ্জাল । চোখের কাজল গালে লেপিলে লজার বিষয় হইয়া উঠে । আমার উপমার ইহাই কৈফিয়ত । too রবীন্দ্র-রচনাবলী ৰাহা হউক, আমাদের চিত্ত যদি সকল বিষয়ে সতেজ সক্রিয় থাকিত তাহা হইলে বিলাত আমাদের সে-চিত্তকে বিহ্বল করিয়া দিতে পারিত না । দুৰ্ভাগ্যক্রমে ইংরেজ যখন তাহার কলবল, তাহার বিজ্ঞান-দর্শন লইয়া আমাদের স্বারে আসিয়া পড়িল তখন আমাদের চিত্ত নিশ্চেষ্ট ছিল । যে-তপস্তার প্রভাবে ভারতবর্ষ জগতের গুরুপদে আসীন হইয়াছিল সেই তপস্যা তখন ক্ষান্ত ছিল । আমরা তখন কেবল মাঝে মাঝে পুথি রৌদ্রে দিতেছিলাম এবং গুটাইয়া ঘরে তুলিতেছিলাম। আমরা কিছুই করিতেছিলাম না। আমাদের গৌরবের দিন বহুদূরপশ্চাতে দিগন্তরেখায় ছায়ার মতো দেখা যাইতেছিল । সম্মুখের পুষ্করিণীর পাড়িও সেই পর্বতমালার চেয়ে বৃহৎরুপে সত্যরূপে প্রত্যক্ষ হয়। যাহা হউক, আমাদের মন যখন নিশ্চেষ্ট নিক্রিয় সেই সময়ে একটা সচেষ্ট শক্তি, শুষ্ক জ্যৈষ্ঠের সম্মুখে আষাঢ়ের মেঘাগমের ন্যায়, তাহার বজ্রবিদ্যুৎ, বায়ুবেগে ও বারিবর্ষণ লইয়া অকস্মাৎ দিগ দিগন্তু বেষ্টন করিয়া দেখা দিল । ইহাতে অভিভূত করিবে না কেন । আমাদের বাচিবার উপায় আমাদের নিজের শক্তিকে সর্বতোভাবে জাগ্রত করা । আমরা যে আমাদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি বসিয়া বসিয়া ফুকিতেছি, ইহাই আমাদের গৌরব নহে ; আমরা সেই ঐশ্বৰ্ষ বিস্তার করিতেছি, ইহাই যখন সমাজের সর্বত্র আমরা উপলব্ধি করিব তখনই নিজের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা সঞ্জাত হইয়া আমাদের মোহ ছুটিতে থাকিবে । আমাদের এই নিক্রিয় নিশ্চেষ্ট অবস্থা কেন ঘটিয়াছে, আমার প্রবন্ধে তাহার কারণ দেখাইয়াছি। তাহার কারণ ভীরুতা। আমাদের যাহা-কিছু ছিল তাঁহারই মধ্যে কুঞ্চিত হইয়া থাকিবার চেষ্টাই বিদেশী সভ্যতার আঘাতে আমাদের অভিভূত হইবার কারণ। - কিন্তু, প্রথমে যাহা আমাদিগকে অভিভূত করিয়াছিল তাহাই আমাদিগকে জাগ্ৰত করিতেছে। প্রথম স্বপ্তিভঙ্গে যে প্রখর আলোক চোখে ধাঁধা লাগাইয়া দেয় তাহাই ক্রমশ আমাদের দৃষ্টিশক্তির সহায়তা করে। এখন আমরা সজাগভাবে সজ্ঞানভাবে নিজের দেশের আদর্শকে উপলব্ধি করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি । বিদেশী আক্রমণের বিরুদ্ধে নিজের দেশের গৌরবকে বৃহৎভাবে প্রত্যক্ষভাবে দেখিতেছি । এখন এই আদর্শকে কী করিয়া বাচানো যাইবে, সেই ব্যাকুলত নানাপৰাচুসন্ধানে আমাদিগকে প্রবৃত্ত করিতেছে। যেমন আছি ঠিক তেমনি বলিয়া থাকিলেই যদি সমস্ত রক্ষণ পাইত, তবে প্রতিদিন পদে পদে আমাদের এমন দুৰ্গতি ঘটিত না । আত্মশক্তি இ. eta আমি যে ভাষার ছটায় মুগ্ধ করিয়া তলে তলে হিন্দুসমাজকে একাকার করিয়া দিবার মতলব মনে মনে অঁাটিয়াছি, ‘বঙ্গবাসী’র কোনো কোনো লেখক এরূপ জাশঙ্কা অনুভব করিয়াছেন । আমার বুদ্ধিশক্তির প্রতি র্তাহার যতদূর গভীর অনাস্থা, আশা করি, অন্য দশ জনের ততদূর না থাকিতে পারে। আমার এই ক্ষীণহস্তে কি ভৈরবের সেই পিনাক আছে। প্রবন্ধ লিথিয়া আমি ভারতবর্ষ একাকার করিব ! যদি এমন মতলবই আমার থাকিবে তবে আমার কথার প্রতিবাদেরই বা চেষ্টা কেন । কোনো বালক যদি নৃত্য করে, তবে তাহার মনে মনে ভূমিকম্পস্থষ্টির মতলব আছে, শঙ্কা করিয়া কেহ কি গৃহস্থদিগকে সাবধান করিয়া দিবার চেষ্টা করে । ব্যবস্থাবুদ্ধির দ্বারা ভারতবর্ষ বিচিত্রের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করে, এ-কথার অর্থ ইহা হইতেই পারে না, ভারতবর্ষ ষ্টুমরোলার বুলাইয়। সমস্ত বৈচিত্র্যকে সমভূম সমতল করিয়া দেয় । বিলাত পরকে বিনাশ করাই, পরকে দূর করাই আত্মরক্ষার উপায় বলিয়া জানে ; ভারতবর্ষ পরকে আপন করাই আত্মসার্থকতা বলিয়া জানে । এই বিচিত্রকে এক করা, পরকে আপন করা যে একাকার নহে, পরন্তু পরস্পরের অধিকার স্বম্পষ্টরূপে নিদিষ্ট করিয়া দেওয়া, এ-কথা কি আমাদের দেশেও চীৎকার করিয়া বলিতে হইবে । আজ যদি বিচিত্রের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করিতে, পরকে আপন করিতে না পারি— আমরাও যদি পদশকটি শুনিলেই, অতিথি-অভ্যাগত দেখিলেই, অমনি হা হাঃ শবে লাঠি হাতে করিয়া ছুটিয়া যাই, তবে বুঝিব, পাপের ফলে আমাদের সমাজের লক্ষ্মী আমাদিগকে পরিত্যাগ করিতেছেন এবং এই লক্ষ্মীছাড়া অরক্ষিত ভিটাকে আজ নিয়ত কেবল লাঠিয়ালি করিয়াই বাচাইতে হইবে— ইহার রক্ষণদেবতা যিনি সহাস্যমুখে সকলকে ডাকিয়া আনিয়া সকলকে প্রসাদের ভাগ দিয়া অতি নিঃশব্দে অতি নিরুপন্দ্রবে ইহাকে বাচাইয়া আসিয়াছেন, তিনি কখন ফাকি দিয়া অদৃশু হইবেন, তাহারই অবসর খুজিতেছেন। - গোস্বামী মহাশয় আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, আমি যেখানে নূতন নূতন যাত্ৰ-কথকতা প্রভৃতি রচনার প্রস্তাব করিয়াছি, সে-স্থলে 'নুতন’ কথাটার তাৎপর্ব কী। পুরাতনই যথেষ্ট নহে কেন । রামায়ণের কবি রামচন্দ্রের পিতৃভক্তি, সত্যপালন, সৌভ্রাত্র, দাম্পত্য প্রেম, ভক্তবাৎসল্য প্রভৃতি অনেক গুণগান করিয়া যুদ্ধকাও পর্যস্ত ছয় কাগু মহাকাব্য শেষ করিলেন ; কিন্তু তবু নূতন করিয়া উত্তরকাগু রচনা করিতে হইল। তাহার ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক গুণই যথেষ্ট হইল না, সর্বসাধারণের প্রতি র্তাহার কর্তব্যনিষ্ঠা ج 6 صدp\ (f tve இ. রবীন্দ্র-রচনাবলী অত্যন্ত কঠিনভাবে উহার পূর্ববর্তী সমস্ত গুণের উপরে প্রতিষ্ঠিত হইয় তাহার চরিতগানকে মুকুটিত করিয়া তুলিল । o আমাদের যাত্ৰ-কথকতায় অনেক শিক্ষা আছে, সে-শিক্ষা আমরা ত্যাগ করিতে চাই না, কিন্তু তাছার উপরে নূতন করিয়া আরো-একটি কর্তব্য শিক্ষা দিতে হইবে । দেবতা, সাধু, পিতা, গুরু, ভাই, ভূত্যের প্রতি আমাদের কী কর্তব্য, তাহাজের জন্ত কতদূর ত্যাগ করা যায়, তাহা শিখিব ; সেই সঙ্গে সাধারণের প্রতি দেশের প্রতি আমাদের কী কর্তব্য, তাহাও নূতন করিয়া আমাদিগকে গান করিতে হইবে,— ইহাতে কি কোনো পক্ষের বিশেষ শঙ্কার কারণ কিছু আছে ? একটা প্রশ্ন উঠিয়াছে, সমুদ্রযাত্রার আমি সমর্থন করি কি না ; যদি করি তবে হিন্দুধর্মাতুগত আচারপালনের বিধি রাখিতে হইবে কি না । এ-সম্বন্ধে কথা এই, পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া পৃথিবীর পরিচয় হইতে বিমুখ হওয়াকে আমি ধর্ম বলি না । কিন্তু বর্তমান প্রসঙ্গে এ-সমস্ত কথাকে অত্যন্ত প্রাধান্ত দেওয়া আমি অনাবশু্যক জ্ঞান করি । কারণ, আমি এ-কথা বলিতেছি না যে, আমার মতেই সমাজগঠন করিতে হইবে । আমি বলিতেছি, আত্মরক্ষার জন্য সমাজকে জাগ্রত হইতে হইবে, কতৃত্ব গ্রহণ করিতে হুইবে । সমাজ যেকোনো উপায়ে সেই কতৃত্ব লাভ করিলেই আপনার সমস্ত সমস্যার মীমাংসা আপনি করিবে । তাহার সেই স্বকৃত মীমাংসা কখন কিরূপ হইবে, আমি তাহা গণনা করিয়া বলিতে পারি না । অতএব প্রসঙ্গক্রমে আমি দু-চারিটা কথ। যাহা বলিয়াছি, অতিশয় সূক্ষ্মভাবে তাহার বিচার করিতে বসা মিথ্যা। আমি যদি স্থপ্ত জহরিকে ভাকিয়া বলি “ভাই, তোমার হীরামুক্তার দোকান সামলাও”, তখন কি সে এই কথা লইয়া আলোচনা করিবে যে, কঙ্কণ-রচনার গঠন সম্বন্ধে তাহার সঙ্গে আমার মতভেদ আছে অতএব আমার কথা কৰ্ণপাতের যোগ্য নহে। তোমার কঙ্কণ তুমি যেমন খুশি গড়িয়ে, তাহা লইয়া তোমাতে আমাতে হয়তো চিরদিন বাদপ্রতিবাদ চলিবে; কিন্তু আপাতত চোখ জল দিয়া ধুইয়া ফেলো, তোমার মণিমাণিক্যের পসরা সামলাও— দস্থ্যর সাড়া পাওয়া গেছে এবং তুমি যখন অসাড় অচেতন হইয়া দ্বার জুড়িয়া পড়িয়া আছ তখন তোমার প্রাচীন ভিত্তির পরে সি খেলের সিধকাঠি এক মুহূত বিশ্রাম করিতেছে না । 弹 *.