অদ্বৈতচরণ চট্টোপাধ্যায় ও চিন্তামণি কুণ্ডু

অদ্বৈত । তুমি কে ?

চিন্তামণি । আমি আর্য , আমি হিন্দু ।

অদ্বৈত । নাম কী ?

চিন্তামণি । শ্রীচিন্তামণি কুণ্ডু ।

অদ্বৈত । কী অভিপ্রায় ?

চিন্তামণি । মহাশয়ের কাগজে আমি লিখব ।

অদ্বৈত । কী লিখবেন ?

চিন্তামণি । আমি আর্য — আর্যধর্ম সম্বন্ধে লিখব ।

অদ্বৈত । আর্য জিনিসটা কী মশায় ?

চিন্তামণি । ( বিস্মিত হইয়া ) আজ্ঞে , আর্য কাকে বলে জানেন না ? আমি আর্য , আমার বাবা শ্রীনকুড় কুণ্ডু আর্য , তাঁর বাবা ৺নফর কুণ্ডু আর্য , তাঁর বাবা-

অদ্বৈত । বুঝেছি! আপনাদের ধর্মটা কী ?

চিন্তামণি । বলা ভারি শক্ত । সংক্ষেপে এই পর্যন্ত বলা যায় যে , যা অনার্যদের ধর্ম তা আর্যদের ধর্ম নয় ।

অদ্বৈত । অনার্য আবার কারা ?

চিন্তামণি । যারা আর্য নয় তারাই অনার্য । আমি অনার্য নই , আমার বাবা শ্রীনকুড় কুণ্ডূ অনার্য নয় , তাঁর বাবা ৺নফর কুণ্ডূ অনার্য নয় , তাঁর বাবা-

অদ্বৈত । আর বলতে হবে না । অতএব যে-হেতুক শ্রীনকুড় কুণ্ডু আমার বাবা নন এবং ৺নফর কুণ্ডূর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই , আমিই হচ্ছি অনার্য ।

চিন্তামণি । তা স্থির বলতে পারি নে ।

অদ্বৈত । ( ক্রুদ্ধ হইয়া ) এ তোমার কিরকম কথা! স্থির বলতে পারি নে কি! নকুড় আমার বাবা নয় তুমি স্থির বলতে পার না ? তুমি কোথাকার কী জাত , তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কিসের!

চিন্তামণি । জাতের কথা হচ্ছে না , বংশের কথা হচ্ছে । আপনিও তো ভুবনবিদিত আর্যবংশে জন্মগ্রহণ-

অদ্বৈত । তোমার বাবা নকুড় কুণ্ডু যে বংশে জন্মেছে আমিও সেই বংশে জন্মেছি! চাষার ঘরে জন্মে তোমার এতবড়ো আস্পর্ধা!

চিন্তামণি । যে আজ্ঞে , আপনি নাহয় আর্য না হলেন , আমি এবং আমার শ্রীবাবা আর্য! হায়! কোথায় আমাদের সেই পূর্বপুরুষগণ , কোথায় কশ্যপ ভরদ্বাজ ভৃগু-

অদ্বৈত । এ ব্যক্তি বলে কী! কশ্যপ তো আমাদের পূর্বপুরুষ , আমাদের কাশ্যপ গোত্রে জন্ম — তোমার পূর্বপুরুষ কশ্যপ ভরদ্বাজ ভৃগু এ কিরকম কথা!

চিন্তামণি । আপনি এ-সকল বিষয় সম্পূর্ন অজ্ঞ , আপনার সঙ্গে এ সম্বন্ধে কোনো আলোচনা হতেই পারে না । হায়! এ-সকল ইংরাজি শিক্ষার শোচনীয় ফল ।

অদ্বৈত । ইংরিজি শিক্ষা আপনাতে কি ফলে নি ?

চিন্তামণি । আজ্ঞে , সে দোষ আমাকে দিতে পারবেন না , স্বাভাবিক আর্যরক্তের তেজে আমি অতি বাল্যকালেই ইস্কুল পালিয়েছিলুম ।

হরিহরবাবু এবং অন্যান্য অনেকানেক লেখকের প্রবেশ

অদ্বৈত । আসতে আজ্ঞে হোক । লেখা সমস্ত প্রস্তুত ?

হরিহর । এই দেখুন-না

চিন্তামণি । কী বিষয়ে লিখেছেন মশায় ?

হরিহর । নানা বিষয়ে ।

চিন্তামণি । আর্যদের সম্বন্ধে কিছু লিখেছেন ?

হরিহর । না ।

চিন্তামণি । আর্যদের বিজ্ঞান সম্বন্ধে-

হরিহর । য়ুরোপীয়েরা আর্যজাতি এবং তাদের বিজ্ঞান —

চিন্তামণি । য়ুরোপীয়েরা অতি নিকৃষ্ট জাতি এবং বিজ্ঞান সম্বন্ধে আমাদের পূর্বপুরুষ আর্যদের তুলনায় তারা নিতান্ত মুর্খ — আমি প্রমাণ করে দেব । এখনো আর্যবংশীয়েরা তেল মাখার পূর্বে অশ্বত্থামাকে স্মরণ করে ভূমিতে তিন বার তৈল নিক্ষেপ করেন । কেন করেন আপনি জানেন ?

হরিহর । না ।

চিন্তামণি । আপনি ?

অদ্বৈত । না ।

চিন্তামণি । আপনি জানেন ?

প্রথম লেখক । না ।

চিন্তামণি । না যদি জানেন তবে আপনারা বিজ্ঞান সম্বন্ধে কথা কইতে যান কেন ? হাই তোলবার সময় আর্যরা তুড়ি দেন কেন আপনারা কেউ জানেন ?

সকলে । ( সমস্বরে ) আজ্ঞে , আমরা কেউ জানি নে ।

চিন্তামণি । তবে ? এই-যে আমাদের আর্য মেয়েরা বাতাস করতে করতে পাখা গায়ে লাগলে ভূমিতে একবার ঠেকায় , তার কারণ আপনারা কিছু জানেন ?

সকলে । কিছু না!

চিন্তামণি । এই দেখুন দেখি! এই-সকল বিষয় কিছুমাত্র আলোচনা না করেই , অনুসন্ধান না করেই , আপনারা বলেন য়ুরোপীয় বিজ্ঞান শ্রেষ্ঠ! অথচ আর্যরা হাঁচে কেন , হাই তোলে কেন , তেল মাখে কেন , এ আপনারা কিছু জানেন না!

হরিহর । আচ্ছা মশায় , আপনিই বলুন । তেল মাখবার পূর্বে ভূমিতে তৈল নিক্ষেপ করবার কারণ কী ?

চিন্তামণি । ম্যাগ্‌নেটিজ্‌ম্‌! আর কিছু নয় । ইংরাজিতে যাকে বলে ম্যাগ্‌নেটিজ্‌ম্‌ ।

হরিহর । ( সবিস্ময়ে ) আপনি ম্যাগ্‌নেটিজ্‌ম্‌ সম্বন্ধে ইংরাজি বিজ্ঞানশাস্ত্র কিছু পড়েছেন ?

চিন্তামণি । কিছু না । দরকার নেই । বিজ্ঞান শিক্ষা কিংবা কোনো শিক্ষার জন্য ইংরিজি পড়বার কিছু প্রয়োজন নেই । আমাদের আর্যেরা কী বলেন ? প্রাণশক্তি কারণশক্তি এবং ধারণশক্তি এই তিন শক্তি আছে , তার উপরে তৈলের সারণশক্তি যোগ হয়ে ঠিক স্নানের অব্যবহিত পূর্বেই আমাদের শরীরের মধ্যে ভৌতিক বারণশক্তির উত্তেজনা হয় — এই তো ম্যাগ্‌নেটিজ্‌ম্‌ । ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজেরা স্নানের পরে যে গায়ে তোয়ালে ঘষে , তার কত হাজার বৎসর আগে আমাদের আর্যদের মধ্যে গামছা দিয়ে গাত্রমার্জন প্রথা প্রচলিত ছিল ভেবে দেখুন দেখি ।

লেখকগণ । ( সবিস্ময়ে) আশ্চর্য! ধন্য! আর্যদের কী বিজ্ঞানপারদর্শিতা! আর্য কুণ্ডুমশায়ের কী গবেষণা!

হরিহর । ভালো মূর্খের হাতেই আজ পড়া গিয়েছে । কিন্তু একে চটিয়ে কাজ নেই । নানা কাগজে লিখে থাকে । শুনেছি নাকি এই আর্য কুণ্ডু ভদ্রলোকদের বড্ড গাল দিতে পারে । সেইজন্যেই বিখ্যাত ।

চিন্তামণি । ঐ দেখুন — ঐ আর্য ব্রাহ্মণ প্রাতঃকালে যে ফুল তুলছে , কেন তুলছে বলুন দেখি ।

অদ্বৈত । পূজার সময় দেবতাকে দেবে বলে ।

চিন্তামণি । ছি ছি , আপনারা কিছুই গভীর তলিয়ে দেখেন না । সকালে ফুল তুলতে যখন ঋষিরা অনুমতি করেছেন তখন স্পষ্টই প্রমাণ হচ্ছে যে , বাতাসে অক্সিজেন বাষ্প যে আছে এ তাঁরা জানতেন । তা যখন জানা ছিল , তখন অবশ্য অন্যান্য বাষ্পের কথাও তাঁরা জানতেন সন্দেহ নেই । এইরকম একে একে অতি স্পষ্ট করে প্রমাণ করে দেওয়া যায় যে , আধুনিক য়ুরোপীয় রসায়নশাস্ত্রের কিছুই তাঁদের অগোচর ছিল না । হাই তোলবার সময় তুড়ি দেওয়া কেন ? সেও ম্যাগ্‌নেটিজ্‌ম্‌ । উত্তানবায়ুর সঙ্গে আধানশক্তির যোগ হয়ে যখন ভৌতিক বলে পরিচালিত নিধানশক্তি স্বশক্তির প্রভাবে প্রাণ কারণ এবং ধারণ এই তিনটেকে অতিক্রম করতে থাকে তখন সত্ত্ব রজ এবং তম এই তিনেরই ব্যতিক্রমদশা ঘটে । এমন সময়ে মধ্যমা এবং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের ঘর্ষণ-জনিত বায়ব তাপের কারণভূত স্নায়ব তাপ সৌর তাপের সঙ্গে মিলিত হয়ে জীবদেহের ভৌতিক তাপের আত্যন্তিক প্রলয়দশা ঘটতে দেয় না । একে বিজ্ঞান বলে না তো কাকে বিজ্ঞান বলে ? অথচ আমাদের আর্য ঋষিগণ ডারুয়িনের কোনো গ্রন্থই পড়েন নি!

লেখকগণ । আশ্চর্য! ধন্য! ধন্য আর্যমহিমা! আমরা এতদিন এ-সকল কথার কিছুই বুঝতুম না!

হরিহর । ( স্বগত ) এবং আজও কিছু বুঝতে পারছি নে!

চিন্তামণি । মাটিতে পাখা ঠোকার বিষয়ে যদি জিজ্ঞাসা করেন তো সেও ম্যাগ্‌নেটিজ্‌ম্‌! সম্প্রসারণ এবং নিঃসারণ , বিপ্রকর্ষণ এবং নিকর্ষণ এই ক'টা ভৌতিক ক্রিয়ার যোগে-

অদ্বৈত । রক্ষা করুন মশায় , আমার মাথা ঘুরছে । পাখা ঠোকার বিষয়ে আপনি আমার কাগজে লিখবেন এখন! আপনি অনেক বকেছেন , আপনাকে একটা পান আনিয়ে দিই ।

চিন্তামণি । আজ্ঞে না , আপনার এখেনে আমি পান খেতে পারি নে । আপনি আর্যক্রিয়াকলাপ অনুসরণ করেন না — যে আধ্যাত্মিক শক্তি আমাদের আর্যনাড়ীতে কুলক্রমাগত প্রবাহিত হয়ে আসছে সেই শক্তি-

অদ্বৈত । মশায় , থাক্‌ মশায় , আপনাকে পান দেব না , আপনি পান নেই খেলেন । অনুমতি করেন তো বরঞ্চ তামাক আনিয়ে দিচ্ছি ।

চিন্তামণি । তামাক! কী সর্বনাশ! সে আরো খারাপ! উৎ কৃষ্ট জাতি নিকৃষ্ট জাতির হুঁকোয় তামাক খায় না কেন ? এক জাতি আর-এক জাতির স্পৃষ্ঠ অন্ন খায় না কেন ? আগে আর্য অনার্যের ছায়া মাড়াতেন না কেন ? তার মধ্যে কি বিজ্ঞান নেই ? অবশ্য আছে । আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি । সেও ম্যাগ্‌নেটিজ্‌ম্‌ । উত্তম মধ্যম এবং অধম এই তিন প্রকার দেহজ বিকিরণশক্তি-

অদ্বৈত । থামুন থামুন — তামাক দেব না মশায় , কাজ নেই আপনার তামাক খেয়ে । পানও থাক্‌ , তামাকও থাক্‌ — যাতে আপনার সুবিধে হয় , যাতে আপনার দেহজ বিকিরণশক্তি রক্ষা হয় , তাই করুন ।

লেখকগণ । ধিক্‌ অদ্বৈতবাবু , আপনি আর্যশ্রেষ্ঠ কুণ্ডুমশায়ের জ্ঞানগর্ভ কথা শুনতে দিলেন না ।

প্রথম লেখক । ( দ্বিতীয়ের প্রতি) কুণ্ডুমশায়ের কী অসাধারণ যুক্তিশক্তি ও জ্ঞান । কিন্তু কিছু কি বুঝতে পারলে ভাই ?

দ্বিতীয় লেখক । না ভাই , বোঝা গেল না । ভালো করে জিজ্ঞাসা করা যাক-না । আচ্ছা মশায় , আপনি ধারণ কারণ প্রভৃতি যে-সকল শক্তির উল্লেখ করলেন , সেগুলো কী ?

চিন্তামণি । সেগুলো আর কিছু নয় — ইংরেজিতে যাকে বলে ফোর্স্‌ , যাকে বলে ম্যাগ্‌নেটিজ্‌ম্‌ ।

লেখকগণ । ( সমস্বরে ) ওঃ , বুঝেছি ।

হরিহর । আজ্ঞে , আমি এখনো কিছু বুঝতে পারছি নে ।

লেখকগণ । ( বিরক্ত হইয়া) বুঝতে পারছেন না! ম্যাগ্‌নেটিজ্‌ম্‌ — ফোর্স্‌ — সোজা কথা । ম্যাগ্‌নেটিজ্‌ম্‌ তো জানেন ? ফোর্স্‌ তো জানেন ? এও তাই আর-কি । আর্যদের অসাধারন বিজ্ঞানচর্চা ।

প্রথম লেখক । এ-সকল স্পষ্ট বুঝতে গেলে নানা শাস্ত্র জানা আবশ্যক । মশায়ের বোধ করি নানা শাস্ত্র অধ্যায়ন করা হয়েছে?

চিন্তামণি । না , শাস্ত্রটা এখনো পড়া হয় নি । আমি , আমার বাবা এবং ৺নফর কুণ্ডু আর্য — এইজন্য শাস্ত্র অধ্যয়ন আমি বাহুল্য বিবেচনা করেছি ।

দ্বিতীয় লেখক । তা বটে , কিন্তু বিজ্ঞানটা আপনি অবিশ্যি ভালো করেই পড়েছেন ।

চিন্তামণি । আজ্ঞে না , আমি চিন্তাশক্তির প্রভাবে আমাদের আর্যজাতির হাঁচি কাশি তুড়ি আঙুল-মটকানো প্রভৃতি আচার-ব্যবহারের নানাবিধ সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক তত্ত্বসকল আয়ত্ত করেছি । আমার বিজ্ঞান পড়া আবশ্যক হয় নি । আপনারা শুনে হয়তো বিশ্বাস করবেন না , কিন্তু আর্যশাস্ত্রের দিব্যি নিয়ে আমি শপথ করতে পারি , আমি আর্যশাস্ত্র কিংবা বিজ্ঞান কিছুই পড়ি নি । আমার সমস্ত বিদ্যা স্বাধীনচিন্তাপ্রসূত ।

হরিহর । আজ্ঞে , শপথ করবার আবশ্যক নেই — পড়াশুনো আছে , এরূপ অপবাদ আপনাকে কেউ দেবে না ।