প্রধান মেনু খুলুন

একাদশী বৈরাগী কালীদহ গ্রামটা ব্রাহ্মণ-প্রধান স্থান। ইহার গোপাল মুখুয্যের ছেলে অপুৰ্ব্ব ছেলেবেলা হইতেই ছেলেদের মোড়ল ছিল। এবার সে যখন বছর পাচ-ছয় কলিকাতার মেসে থাকিয়া অনার-সমেত বি-এ পাশ করিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিল, তখন গ্রামের মধ্যে তাহার প্রসার-প্রতিপত্তির আর অবধি রহিল না। গ্রামের মধ্যে জীর্ণ-শীর্ণ একটা হাইস্কুল ছিল—তাহার সমবয়সীরা ইতিমধ্যেই ইহাতেই পাঠ সাঙ্গ করিয়া, সন্ধ্যাহিক ছাড়িয়া দিয়া দশ-আন ছ’আন চুল ছাটিয়া বসিয়াছিল ; কিন্তু কলিকাতা-প্রত্যাগত এই গ্রাজুয়েট ছোকরার মাথার চুল সমান করিয়া তাহারই মাঝখানে একথও নধর টিকির সংস্থান দেখিয়া শুধু ছোকরা কেন, তাহদের বাবাদের পর্য্যন্ত বিস্ময়ে তাক লাগিয়া গেল । সহরের সভা-সমিতিতে যোগ দিয়া, জ্ঞানী লোকদিগের বক্তৃতা শুনিয়া, অপূৰ্ব্ব সনাতন হিন্দুদের অনেক নিগূঢ় রহস্তের মৰ্ম্মোন্তেদ করিয়া দেশে গিয়াছিল। এখন সঙ্গীদের মধ্যে ইহাই মুক্ত-কণ্ঠে প্রচার করিতে লাগিল যে, এই হিন্দুধৰ্ম্মের মত এমন সনাতন ধৰ্ম্ম আর নাই ; কারণ ইহার প্রত্যেক ব্যবস্থাই বিজ্ঞান-সন্মত। টিকির বৈদ্যুতিক উপযোগিতা, দেহরক্ষা-ব্যাপারে সন্ধ্যাহিকের পরম উপকারিতা, কাচকল ভক্ষণের রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া, ইত্যাদি বহুবিধ অপরিজ্ঞাত তত্বের ব্যাখ্যা শুনিয়া গ্রামের ছেলে-বুড়ো-নির্বিশেষে অভিভূত হইয়া গেল এবং তাহার ফল হইল এই যে, অনতিকাল মধ্যেই ছেলেদের টিকি হইতে আরম্ভ করিয়া সন্ধ্যাহিক, একাদশী, পূর্ণিমা ও গঙ্গাস্নানের ঘটায় বাড়ির মেয়েরাও হার মানিল। হিন্দুধৰ্ম্মের পুনরুদ্ধার, দেশোদ্ধার ইত্যাদির জল্পনায় কল্পনায় যুবক-মহলে একেবারে হৈ হৈ পড়িয়া গেল। বুড়ার বলিতে লাগিল, হুঁ, গোপাল মুখুয্যের বরাত বটে। মা কমলারও যেমন সুদৃষ্টি, সন্তান জন্মিয়াছেও তেমনি। না হইলে আজকালকার কালে এতগুলো ইংরাজী পাশ করিয়াও এই বয়সে এমনি ধৰ্ম্মে মতিগতি কয়টা দেখা যায়! সুতরাং দেশের মধ্যে অপূৰ্ব্ব একটা অপূৰ্ব্ব বস্তু হইয়া উঠিল। তাহার হিন্দুধৰ্ম্ম-প্রচারিণী, ধূমপান-নিবারণী ও দুর্নীতিদলনী—এই তিন তিনটা সভার আস্ফালনে গ্রামে চাষাভূষার দল পর্য্যন্ত সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল। পাঁচকড়ি তেওর তাড়ি খাইয় তাহার স্ত্রীকে প্রহার করিয়াছিল শুনিতে পাইয়া অপূৰ্ব্ব সদলবলে উপস্থিত হইয়া পাঁচকড়িকে এমনি শাসিত করিয়া দিল যে, ৩২৭ শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ পরদিন পাচকড়ির স্ত্রী স্বামী লইয়া বাপের বাড়ি পলাইয় গেল। ভগা কাওরা অনেকরাত্রে বিল হইতে মাছ, ধরিয়া বাড়ি ফিরিবার পথে গাজার ঝেণকে নাকি বিস্তাম্বন্দরের মালিনীর গান গাহিয়া যাইতেছিল। ব্রাহ্মণপাড়ার অবিনাশের কানে যাওয়ায়, সে তার নাক দিয়া রক্ত বাহির করিয়া তবে ছাড়িয়া দিল। দুর্গ ডোমের চৌদ-পনর বছরের ছেলে বিড়ি খাইয়া মাঠে যাইতেছিল ; অপূৰ্ব্বর দলের ছোকরার চোখে পড়ায়, সে তাহার পিঠের উপর সেই জলন্ত বিড়ি চাপিয়া ধরিয়া ফোস্কা তুলিয়া দিল। এমনি করিয়া অপূৰ্ব্বর হিন্দুধৰ্ম্ম-প্রচারিণী ও দুর্নীতি-দলনী সভা ভানুমতীর আমগাছের মত সদ্য-সদ্যই ফুলে-ফলে কালীদহ গ্রামটাকে একেবারে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। এইবার গ্রামের মানসিক উন্নতির দিকে নজর দিতে গিয়া অপূৰ্ব্বর চোখে পড়িল যে, স্কুলের লাইব্রেরীতে শশীভূষণের দেড়খানা মানচিত্র ও বঙ্কিমের আড়াইখানা উপন্যাস ব্যতীত আর কিছুই নাই। এই দীনতার জন্য সে হেডমাষ্টারকে অশেষরূপে লাঞ্ছিত করিয়া অবশেষে নিজেই লাইব্রেরী গঠন করিতে কোমর বাধিয়া লাগিয়া গেল। তাহার সভাপতিত্বে চাদার খাতা, আইন-কাচনের তালিকা এবং পুস্তকের লিষ্ট তৈরী হইতে বিলম্ব হইল না। এতদিন ছেলেদের ধৰ্ম্মপ্রচারের উৎসাহ গ্রামের লোকেরা কোনমতে সহিয়াছিল ; কিন্তু দুই-একদিনের মধ্যেই তাহদের চাদ আদায়ের উৎসাহ গ্রামের ইতর-ভদ্র গৃহস্থের কাছে এমনি ভয়াবহ হইয়া উঠিল যে, খাতা-বগলে ছেলে দেখিলেই তাহারা বাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ করিয়া ফেলিতে লাগিল। বেশ দেথা গেল, গ্রামে ধৰ্ম্ম-প্রচার দুনীতি-দলনের রাস্ত যতখানি চওড়া পাওয়া গিয়াছিল, লাইব্রেরীর জন্য অর্থ-সংগ্রহের পথ তাহার শতাংশের একাংশও প্রশস্ত নয়। অপূৰ্ব্ব কি করিবে ভাবিতেছে, এমন সময় হঠাৎ একটা ভারি সুরাহা চোখে পড়িল। স্কুলের অদূরে একটা পরিত্যক্ত পোড়ে ভিটার প্রতি একদিন অপূৰ্ব্বর দৃষ্টি আকৃষ্ট হইল। শোনা গেল, ইহা একাদশী বৈরাগীর। অমুসন্ধান করিতে জানা গেল, লোকেটা কি একটা গৰ্হিত সামাজিক অপরাধ করায় গ্রামের ব্রাহ্মণের তাহার ধোপা, নাপিত, মুী প্রভৃতি বন্ধ করিয়া বছর-দশেক পূর্বে উদ্বাস্ত করিয়া নির্বাসিত করিয়াছেন। এখন সে ক্রোশ-দুই উত্তরে বারুইপুর গ্রামে বাস করিতেছে। লোকটা নাকি টাকার কুমীর ; কিন্তু তাঁহার সাবেক নাম যে কি, তাহ কেহই বলিতে পারে না—হাড়ি-ফাটার ভয়ে বহুদিনের অব্যবহারে মামুষের স্থতি হইতে একেবারে লুপ্ত' হইয়া গেছে। তদবধি এই একাদশী নামেই বৈরাগী মহাশয় স্বপ্রসিদ্ধ। অপূর্ব তাল ঠুকিয়া কহিল, টাকার কুমীর । সামজিক কদাচার। তবে ত এই ব্যাটাই লাইব্রেরীর অর্ধেক ভার বহন করিতে বাধ্য। |రినy একাদশী বৈরাগী ন হইলে সেখানের ধোপা, নাপিত, মুীও বন্ধ ! বারুইপুরের জমিদার ত দিদির , মামাশ্বশুর। 尊 ছেলের মাতিয়া উঠিল এবং অবিলম্বে ডোনেশনের খাতায় বৈরাগীর নামের পিছনে একটা মস্ত অঙ্কপাত হইয়া গেল। একাদশীর কাছে টাকা আদায় করা হইবে, ন হইলে অপূৰ্ব্ব তাহার দিদির মামাশ্বশুরকে বলিয় বারুইপুরেও ধোপা নাপিত বন্ধ করিবে, সংবাদ পাইয়া রসিক স্মৃতিরত্ন লাইব্রেরীর মঙ্গলার্থ উপযাচক হইয়া পরামর্শ দিয়া গেলেন যে, বেশ একটু মোটা টাকা না দিলে মহাপাপী ব্যাটা কালীদহে বাস্তু কি করিয়া রক্ষা করে, দেখিতে হইবে। কারণ, বাস না করিলেও এই বাস্তুভিটার উপর একাদশীর যে অত্যন্ত মমতা, স্মৃতিরত্বের তাহা অগোচর ছিল না। যে-হেতু বছর-দুই পুৰ্ব্বে এই জমিটুকু খরিদ করিয়া নিজের বাগানের অঙ্গীভূত করিবার অভিপ্রায়ে সবিশেষ চেষ্টা করিয়াও তিনি সফলকাম হইতে পারেন নাই । তাহার প্রস্তাবে তখন একাদশী অত্যন্ত সাধু ব্যক্তির ন্তায় কানে আঙুল দিয়া বলিয়াছিল, এমন অনুমতি করবেন না ঠাকুরমশাই, ঐ একফোটা জমির বদলে ব্রাহ্মণের কাছে দাম নিতে আমি কিছুতেই পারব না। ব্রাহ্মণের সেবায় লাগবে, এ ত আমার সাত-পুরুষের ভাগ্য। স্থতিরত্ব নিরতিশয় পুলকিত-চিত্তে তাহার দেব-দ্বিজে ভক্তিশ্রদ্ধার লক্ষকোটি মুখ্যাতি করিয়া অসংখ্য আশীৰ্ব্বাদ করার পরে, একাদশী করযোড়ে সবিনয়ে নিবেদন করিয়াছিল, কিন্তু এমনি পোড়া অদৃষ্ট ঠাকুরমশাই যে, সাত-পুরুষের ভিটে আমার কিছুতেই হাতছাড়া করবার জো নাই। বাবা মরণকালে মাথার দিব্যি দিয়ে বলে গিয়েছিলেন, খেতেও যদি না পাস বাবা, বাস্তুভিটে কখনো ছাড়িসনে । ইত্যাদি ইত্যাদি । সে আক্রোশ স্মৃতিরত্ব বিস্তৃত হন নাই । দিন-পাচেক পরে, একদিন সকালবেল এই ছেলের দলটি দুই ক্রোশ পথ ইটিয়া একাদশীর সদরে অসিয়া উপস্থিত হইল। বাড়িটি মাটর, কিন্তু পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন। দেখিলে মনে হয়, লক্ষ্মীশ্ৰী আছে। অপূৰ্ব্ব কিংবা তাহার দলের আর কেহ একাদশীকে পূৰ্ব্বে কখনো দেখে নাই ; সুতরাং চণ্ডীমণ্ডপে পা দিয়াই তাহাদের মন বিতৃষ্ণায় ভরিয়া গেল। এ-লোক টাকার কুমীরই হোক, হাঙ্গরই হোক, লাইব্রেরীর সম্বন্ধে যে পুট মাছটির উপকারে আসিবে না, তাহ নিঃসন্দেহ। একাদশীর পেশা তেজারতি। বয়স ষাটের উপর গিয়াছে। সমস্ত দেহ যেমন শীর্ণ, তেমনি শুষ্ক । কণ্ঠভর তুলসীর মালা। দাড়ী-গোফ কামান, মুখখানার প্রতি চাহিলে মনে হয় না যে কোথাও ইহার লেশমাত্র রসকস আছে। ইক্ষু যেমন নিজের রস কলের পেষণে বাহির করিয়া দিয়া, অবশেষে নিজেই ইন্ধন হইয় তাহাকে জালাইয় শুষ্ক ৩২৯ শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ করে, এ ব্যক্তি যেন তেমনি মানুষকে পুড়াইয়া শুষ্ক করিবার জন্তই নিজের সমস্ত মহস্তত্বকে নিঙড়াইয়া বিসর্জন দিয়া মহাজন হইয়া বসিয়া আছে। তাহার শুধু চেহারা দেখিয়াই অপূৰ্ব্ব মনে মনে দমিয়া গেল। চণ্ডীমণ্ডপের উপর ঢালা বিছানা। মাঝখানে একাদশী বিরাজ করিতেছে। তাহার সম্মুখে একটা কাঠের হাত-বাক্স এবং একপাশে থাক-দেওয়া হিসেবের খাতাপত্র। একজন বৃদ্ধ-গোছের গোমস্ত খালি-গায়ে পৈতার গোছা গলায় ঝুলাইয়া শ্লেটের উপর মুদের হিসাব করিতেছে ; এবং সম্মুখে, পার্থে, বারান্দায় খুটির আড়ালে নানা বয়সের নানা অবস্থার স্ত্রী-পুরুষ য়ান-মুখে বসিয়া আছে। কেহ ঋণ গ্রহণ করিতে, কেহ সুদ দিতে, কেহ-বা শুধু সময় ভিক্ষা করিতেই আসিয়াছে, কিন্তু ঋণ পরিশোধের জন্য কেহ যে বসিয়াছিল, তাহ কাহারও মুখ দেখিয়া মনে হইল না । 顯 অকস্মাং কয়েকজন অপরিচিত ভদ্রসন্তান দেখিয়া একাদশী বিস্ময়াপন্ন হইয়৷ চাহিল। গোমস্তা শ্লেটখানা রাখিয়া দিয়া কহিল, কোথেকে আসচেন ? অপূৰ্ব্ব কহিল, কালীদহ থেকে। মশায় আপনার ? আমরা সবাই ব্রাহ্মণ । ব্রাহ্মণ শুনিয়া একাদশী সসন্ত্রমে উঠিয়া দাড়াইয়া ঘাড় ঝু’কাইয়া প্রণাম করিল ; কহিল, বসতে আজ্ঞা হোক ! সকলে উপবেশন করিলে একাদশী নিজেও বসিল । গোমস্ত প্রশ্ন করিল, আপনাদের কি প্রয়োজন ? অপূৰ্ব্ব লাইব্রেরীর উপকারিতা-সম্বন্ধে সামান্ত একটু ভূমিকা করিয়া চাদার কথা পাড়িতে গিয়া দেখিল, একাদশীর ঘাড় আর একদিকে ফিরিয়া গিয়াছে। সে খুঁটির আড়ালের স্ত্রীলোকটিকে সম্বোধন করিয়া কহিতেছে, তুমি কি ক্ষেপে গেলে হারুর মা ? সুদ ত হয়েচে কুললে সাত টাকা দু’আন ; তার দু'আনাই যদি ছাড়, করে নেবে, তার চেয়ে আমার গলায় পা দিয়ে জিভ বের করে মেরে ফেল না কেন ? তাহার পরে উভয়ে এমনি ধ্বস্তাধবস্তি সুরু করিয়া দিল, যেন এই দু’আন পয়সার উপরেই তাহীদের জীবন নির্ভর করিতেছে। কিন্তু হারুর মাও যেমন স্থিরসঙ্কল্প, একাদশীও তেমনি অটল। দেরী হইতেছে দেখিয়া অপূৰ্ব্ব উভয়ের বাগবিতণ্ডার মাঝখানেই বলিয়া উঠিল, আমাদের লাইব্রেরীর কথাটা— একাদশী মুখ ফিরাইয়া বলিল, আঙ্কে, এই যে শুনি –ই রে নফর, তুই কি আমাকে মাথায় পা দিয়ে ডুবুতে চাস রে! সে দুটাক এখনো শোধ দিলিনে, VLLE একাদশী বৈরাগী আবার একটাক চাইতে এসেচিস্ কোন লজ্জায় শুনি ? বলি সুদ-টুদ কিছু এনেচিম ? নফর ট্যাক খুলিয়া এক আনা পয়সা বাহির করিতেই একাদশী চোখ রাঙাইয় কহিল, তিন মাস হয়ে গেল না রে ? অার দু’টো পয়সা কই ? নফর হাত-যোড় করিয়া বলিল, আর নেই কৰ্ত্ত ; ধাড়ার পোর কত হাতে-পায়ে পড়ে পয়সা চারটি ধার করে আনচি, বাকি দুটো পয়সা আসচে হাট-বারেই দিয়ে যাব। একাদশী গলাবাড়াইয়া দেখিয়া বলিল, দেখি তোর ওদিকের ট্যাকটা ? নফর বঁা-দিকের ট্যাকটা দেখাইয়া অভিমানভরে কহিল, দুটো পয়সার জন্ত মিছে কথা কইচি কৰ্ত্ত ? যে শালা পয়সা এনেও তোমাদের ঠকায়, তার মুখে পোকা পডুক, এই বলে দিলুম। একাদশী তীক্ষ-দৃষ্টিতে চাহিয়া কহিল, তুই চারটে পয়সা ধার করে আনতে পারলি, আর দুটো এমনি ধার করতে পারলিনে ? i. নফর রাগিয়া কহিল, মাইরি দিলাসা করলুম না কৰ্ত্তা ! মুখে পোকা পড়ুক— অপূৰ্ব্বর গা জলিয়া যাইতেছিল, সে আর সহ করিতে না পারিয়া বলিয়া উঠিল, আচ্ছা লোক তুমি মশায় ! একাদশী একবার চাহিয়া দেখিল মাত্র, কোন কথা কহিল না। পরাণ বাগদী সম্মুখের উঠান দিয়া যাইতেছিল ; একাদশী হাত নাড়িয়া ডাকিয়া কহিল, পরাণ, নফরার কাছাটা একবার খুলে দেখ, ত রে, পয়সা দুটাে বাধা আছে নাকি ? পরাণ উঠিয়া আসিতেই নফর রাগ করিয়া তাহার কাছার খুটে বাধা পয়সা দুটো খুলিয়া একাদশীর স্বমুখে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিল। একাদশী এই বেয়াদপিতে কিছুমাত্র রাগ করিল না । গম্ভীর-মুখে পয়সা ছয়টা বাক্সে তুলিয়া রাখিয়া গোমস্তাকে কহিল, ঘোষালমশাই, নফরার নামে সুদ আদায় জমা করে নেন । ই রে, একটা টাকা কি আবার করবি রে ? নফর কহিল, আবশ্যক না হলেই কি এসেচি মশাই ? একাদশী কহিল, আট আনা নিয়ে যা না ! গোটা টাকা নিয়ে গেলেই ত নয় ছয় করে ফেলবি রে । তার পরে অনেক কষা-মাজা করিয়া নফর মোড়ল বারে আনা পয়সা কর্জ দইয়া প্রস্থান করিল। বেলা বাড়িয়া উঠিয়াছিল। অপুৰ্ব্বর সঙ্গী অনাথ চাদার খাতাটা একাদশীর সম্মুখে নিক্ষেপ করিয়া কহিল, যা দেবেন দিয়ে দিন মশাই, আমরা আর দেরি করতে পারিনে । \రిరి -8 শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ একাদশী খাতাটা তুলিয়া লইয়া প্রায় পোনর মিনিট ধরিয়া আগাগোড়া তন্ন তন্ন করিয়া নিরীক্ষণ করিয়া শেষে একটা নিশ্বাস ফেলিয়া খাতাটা ফিরাইয়া দিয়া বলিল, আমি বুড়োমানুষ, আমার কাছে আবার চাঁদা কেন ? অপূৰ্ব্ব কোনমতে রাগ সামলাইয়া কহিল, বুড়োমানুষ টাকা দেবে না ত কি ছোটছেলেতে টাকা দেবে ? তারা পাবে কোথায় শুনি ? বুড়ে সে-কথার উত্তর না দিয়া কহিল, ইস্কুল ত হয়েচে কুড়ি-পঁচিশ বছর ; কৈ, এতদিন ত কেউ লাইব্রেরীর কথা তোলেনি বাবু? তা যাক, এ ত আর মন্দ কাজ নয়, আমাদের ছেলেপুলে বই পড়ুক আর না পড়ুক, আমার গায়ের ছেলেরাই পড়বে ত! কি বল ঘোষালমশাই ? ঘোষাল ঘাড় নাড়িয়া কি যে বলিল, বোঝা গেল না । একাদশী কহিল, তা বেশ, চাদ দেব আমি, একদিন এসে নিয়ে যাবেন চার আনা পয়সা । কি বল ঘোষাল, এর কমে আর ভাল দেখায় না। অতদূর থেকে ছেলেরা এসে ধরেচে, যা হোক একটু নাম-ডাক আছে বলেই ত? আরও ত লোক আছে, তাদের কাছে ত চাইতে যায় না, কি বল হে ? ক্রোধে অপূৰ্ব্বর মুখ দিয়া কথা বাহির হইল না। অনাথ কহিল, এই চার আনার জন্তে আমরা এতদুরে এসেচি ? তাও আবার আর একদিন এসে নিয়ে যেতে হবে ? একাদশী মুখে একটা শব্দ করিয়া মাথা নাড়িয়া নাড়িয়া বলিতে লাগিল, দেখলেন ত অবস্থা, ছ’টা পয়স হকের সুদ আদায় করতে ব্যাটাদের কাছে কি ছ্যাচড়াপনাই না করতে হয় ? তা এ পাট-টা বিক্রী না হয়ে গেলে আর চাদী দেবার সুবিধে— অপূৰ্ব্বর রাগে ঠোঁট কঁাপিতে লাগিল ; বলিল, সুবিধে হবে এখানেও ধোপানাপিত বন্ধ হলে । ব্যাট পিশাচ সৰ্ব্বাঙ্গে ছিটে-ফোটা কেটে জাত হারিয়ে বোষ্টম হয়েচেন, আচ্ছা ! বিপিন উঠিয় দাড়াইয়া একটি আঙ্গুল তুলিয়া শাসাইয়া কহিল, বারুইপুরের রাখালদাসবাবু আমাদের কুটুম্ব, মনে থাকে যেন বৈরাগী ! বুড় বৈরাগী এই অভাবনীয় কাণ্ডে হতবুদ্ধি হইয়া চাহিয়া রহিল। বিদেশী ছেলেদের অকস্মাৎ এত ক্রোধের হেতু সে কিছুতেই বুঝিতে পারিল না। অপূৰ্ব্ব বলিল, গরীবের রক্ত শুষে সুদ থাওয়া তোমার বার করব তবে ছাড়ব । নফর তখনও বসিয়াছিল ; তাহার কাছায় বাধা পয়সা দুটো আদায় করার রাগে মনে মনে ফুলিতেছিল ; সে কহিল, যা কইলেন কৰ্ত্ত, তা ঠিক । বৈরাগী ত নয়, পিচেশ ! চোখে দেখলেন ত কি করে মোর পয়সা দুটো আদায় নিলে । Uరిన్చ একাদশী বৈরাগী বুড়ার লাঞ্ছনীয় উপস্থিত সকলেই মনে মনে নিৰ্ম্মল আনন্দ উপভোগ করিতে লাগিল। তাহদের মুখের ভাব লক্ষ্য করিয়া বিপিন উৎসাহিত হইয়া চোখ টিপিয়া বলিয়া উঠিল, তোমরা ত ভেতরের কথা জানো না, কিন্তু আমাদের গায়ের লোক, আমরা সব জানি। কি গো বুড়ো, আমাদের গায়ে কেন তোমার ধোপানাপতে বন্ধ হয়েছিল বলব ? খবরটা পুরাতন । সবাই জানিত। একাদশী সদগোপের ছেলে, জাত-বৈষ্ণব নহে। তাহার একমাত্র বৈমাত্রেয় ভগিনী প্রলোভনে পড়িয়া কুলের বাহির হইয় গেলে, একাদশী অনেক দুঃখে অনেক অনুসন্ধানে তাহাকে ঘরে ফিরাইয়া আনে। কিন্তু এই কদাচারে গ্রামের লোক বিস্মিত ও অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয় উঠে। তথাপি একাদশী মা-বাপ-মরা এই বৈমাত্র ছোটবোনটিকে কিছুতেই পরিত্যাগ করিতে পারে নাই। সংসারে তাহার আর কেহ ছিল না ; ইহাকেই সে শিশুকাল হইতে কোলে-পিঠে করিয়া মানুষ করিয়াছিল, তাহার ঘটা করিয়া বিবাহ দিয়াছিল ; আবার অল্প বয়সে বিধবা হইয়া গেলে, দাদার ঘরেই সে আদর-যত্নে ফিরিয়া আসিয়াছিল। বয়স এবং বুদ্ধির দোষে এই ভগিনীর এতবড় পদস্খলনে বৃদ্ধ কাদিয়া ভাসাইয়া দিল ; আহার-নিদ্রা ত্যাগ করিয়া গ্রামে গ্রামে সহরে সহরে ঘুরিয়া অবশেষে যখন তাহার সন্ধান পাইয় তাহাকে ঘরে ফিরাইয়া আনিল, তখন গ্রামের লোকের নিষ্ঠুর অনুশাসন মাথায় তুলিয়া লইয়া, তাহার এই লজ্জিত, একান্ত অমৃতপ্ত, দুর্ভাগিনী ভগিনীটিকে আবার গৃহের বাহির করিয়া দিয়া নিজে প্রায়শ্চিত্ত করিয়া জাতে উঠিতে একাদশী কোনমতেই রাজী হইতে পারিল না । অতঃপর গ্রামে তাহার ধোপানাপিত-মুদী প্রভৃতি বন্ধ হইয়া গেল। একাদশী নিরুপায় হইয়া ভেক লইয়া বৈষ্ণব হইয়৷ এই বারুইপুরে পলাইয়া আসিল । কথাটা সবাই জানিত ; তথাপি আর একজনের মুখ হইতে আর একজনের কলঙ্ক-কাহিনীর মাধুর্য্যটা উপভোগ করিবার জন্য সবাই উদ্‌গ্ৰীব হইয়া উঠিল। কিন্তু একাদশী লজ্জায় ভয়ে একেবারে জড়সড় হইয় গেল। তাহার নিজের জন্য নয়, ছোট বোনটির জন্য। প্রথম-যৌবনের অপরাধ গৌরীর বুকের মধ্যে যে গভীর ক্ষতের স্বষ্টি করিয়াছিল, আজিও যে তাহা তেমনি আছে, তিলাৰ্দ্ধও শুষ্ক হয় নাই, বৃদ্ধ তাহ ভালরূপেই জানিত। পাছে বিন্দুমাত্র ইঙ্গিতও তাহার কানে গিয়া সেই ব্যথা আলোড়িত হইয় উঠে, এই আশঙ্কায় একাদশী বিবর্ণ-মুখে নিঃশব্দে চাহিয়া রহিল। তাহার এই সকরুণ দৃষ্টির নীরব মিনতি আর কাহারও চক্ষে পড়িল না, কিন্তু অপূৰ্ব্ব হঠাৎ অনুভব করিয়া বিস্ময়ে অবাক হইয় গেল । VGAL শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ বিপিন বলিতে লাগিল, আমরা কি ভিখারী যে দু'কোশ পশ হেঁটে এই রৌদ্রে চারগও পয়সা ভিক্ষে চাইতে এসেচি ? তাও আবার আজ নয়, কবে ওঁর কোন খাতকের পাট বিক্রী হবে, সেই খবর নিয়ে আমাদের আর একদিন হাটতে হবে— তবে যদি বাবুর দয়া হয়! কিন্তু লোকের রক্ত গুযে মদ খাও বুড়ে, মনে করেচ জোকের গায়ে জোক বসে না ? আমি এখানেও না তোমার হাড়ির হাল করি ত আমার নাম বিপিন ভট্চায্যিই নয়। ছোট-জাতের পয়সা হয়েচে বলে চোখে কানে আর দেখতে পাও না ? চল হে অপূৰ্ব্ব, আমরা যাই, তার পরে যা জানি করা যাবে। বলিয়া সে অপুর্বর হাত ধরিয়া টান দিল। বেলা এগারটা বাজিয়া গিয়াছিল। বিশেষতঃ এতটা পথ হাটিয়া আসিয়া অপূৰ্ব্বর অত্যন্ত পিপাসা বোধ হওয়ায় কিছুক্ষণ পূৰ্ব্বে চাকরটাকে সে জল আনিতে বলিয়া দিয়াছিল। তাহার পর কলহ-বিবাদে সে-কথা মনে ছিল না। কিন্তু তাহার তৃষ্ণার জল এক হাতে এবং অন্ত হাতে রেকবীতে গুটি-কয়েক বাতাসা লইয়া একটি সাতাশ-আটাশ বছরের বিধবা মেয়ে পাশের দরজা ঠেলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিতে তাহার জল চাওয়ার কথা স্মরণ হইল। গৌরীকে ছোটজাতের মেয়ে বলিয়া কিছুতে মনে হয় না। পরণে গরদের কাপড় ; স্বানের পর বোধ করি এইমাত্র আহ্নিক করিতে বসিয়াছিল, ব্রাহ্মণ জল চাহিয়াছে, চাকরের কাছে শুনিয়া সে আহ্নিক ফেলিয়া ছুটিয়া আসিয়াছে। কহিল, আপনাদের কে জল চেয়েছিলেন যে ? বিপিন কহিল, পাটের শাড়ী পরে এলেই বুঝি তোমার হাতে জল খাব আমরা ? অপূৰ্ব্ব, ইনিই সে বিপ্তেধর হে! চক্ষের নিমিৰে মেয়েটির হাত হইতে বাতাসার রেকর্ণবট ঝনৎ করিয়া নীচে পড়িয়া গেল এবং সেই অসীম লজ্জা চোখে দেখিয়া অপূৰ্ব্ব নিজেই লজ্জায় মরিয়া গেল। সক্রোধে বিপিনকে একটা কচুয়ের গুতো মারিয়া কহিল, এ-সব কি বাদরামি হচ্ছে ? কাণ্ডজ্ঞান নেই ? বিপিন পাড়াগায়ের মানুষ, কলহের মুখে অপমান করিতে নর-নারী ভেদাভেদজ্ঞান-বিবর্জিত নিরপেক্ষ বীরপুরুষ। সে অপূৰ্বর খোচ খাইয়া আরও নিষ্ঠুর হইয়া উঠিল। চোখ রাঙাইয়া হাকিয়া কহিল, কেন, মিছে কথা বলচি নাকি ? ওর এতবড় সাহস যে, বামুনের ছেলের জন্য জল আনে? আমি হাটে হাড়ি ভেঙে দিতে পারি জানো ? অপূৰ্ব্ব বুঝিল আর তর্ক নয়। অপমানের মাত্র তাহাতে বাড়িবে বই কমিবে না। কহিল, আমি আনতে বলেছিলুম বিপিন, তুমি না জেনে অনর্থক ঝগড়া ক’রে না। চল, আমরা এখন যাই । SN28 একাদশী বৈরাগী গৌরী রেকবীটি কুড়াইয়া লইয়া, কাহারও প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া নিঃশব্দে দরজার আড়ালে গিয়া দাড়াইল । তথা হইতে কহিল, দাদা, এরা যে কিসের চাদ নিতে এসেছিলেন, তুমি দিয়েচ ? একাদশী এতক্ষণ পৰ্য্যন্ত বিহালের ন্যায় বসিয়াছিল, তগিনীর আহবানে চকিত হইয়া বলিল, ন, এই যে দিই দিদি ! অপূৰ্বর প্রতি চাহিয়া হাতজোড় করিয়া কহিল, বাবুমশাই, আমি গরীব-মানুষ। চার আনাই আমার.পক্ষে ঢের, দয়া করে নিন । বিপিন পুনরায় কি একটা কড়া জবাব দিতে উদ্যত হইয়াছিল, অপূর্ব ইঙ্গিতে তাহাকে নিষেধ করিল ; কিন্তু এত কাণ্ডের পর সেই চার আনার প্রস্তাবে তাহার নিজেরও অত্যন্ত ঘৃণাবোধ হইল। আত্মসংবরণ করিয়া কহিল, থাক্ বৈরাগী, তোমায় কিছু দিতে হবে না। একাদশী বুঝিল, ইহা রাগের কথা ; একটা নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, কলিকাল । বাগে পেলে কেউ কি কারও ঘাড় ভাঙতে ছাড়ে ! দাও ঘোষালমশাই, পাচ গণ্ড৷ পয়সাই খাতায় খরচ লেখ । কি আর করব বল। বলিয়া বৈরাগী পুনরায় একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করিল। তাগর মুখ দেখিয়া অপূৰ্ব্বর এবার হাসি পাইল। এই কুসীদজীবী বৃদ্ধের পক্ষে চার আনার এবং পাচ আনার মধ্যে কতবড় যে প্রকাও প্রভেদ, তাহ সে মনে মনে বুবিল ; মৃদু হাসিয়া কহিল, থাক্ বৈরাগী, তোমায় দিতে হবে না। আমরা চার-পাচ আন পয়সা চাদ নিইনে। আমরা চললুম। কি জানি কেন, অপূৰ্ব্ব একান্ত আশা করিয়াছিল, এই পাচ আনার বিরুদ্ধে দ্বারের অন্তরাল হইতে অন্ততঃ একটা প্রতিবাদ আসিবে। তাহার অঞ্চলের প্রান্তটুকু তখনও দেখা যাইতেছিল, কিন্তু সে কোন কথা কছিল না। যাইবার পূৰ্ব্বে অপূৰ্ব্ব যথার্থ-ই ক্ষোভের সহিত মনে মনে কহিল, ইহারা বাস্তবিকই অত্যন্ত ক্ষুদ্র। দান করা সম্বন্ধে পাচ আনা পয়সার অধিক ইহাদের ধারণা নাই। পয়সাই ইহাদের প্রাণ, পয়সাই ইহাদের অস্থি-মাংস, পয়সার জন্য ইহার করিতে পারে না এমন কাজ সংসারে নাই । অপূৰ্ব্ব সদলবলে উঠিয়া দাড়াইতেই একটি বছর-দশেকের ছেলের প্রতি অনাথের দৃষ্টি পড়িল। ছেলেটির গলায় উত্তরীয়, বোধ করি পিতৃবিয়োগ কিংবা এমনি কিছু একটা ঘটিয়া থাকিবে। তাহার বিধবা জননী বারনায় খুটির আড়ালে বলিয়াছিল। অনাথ আশ্চৰ্য্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, পুটে, তুই যে এখানে ? «Ļo পুটে আঙ্গুল দেখাইয়া কহিল, আমার মা বসে আছেন। মা বললেন, আমাদের অনেক টাকা ওঁর কাছে জমা আছে। বলিয়া সে একাদশীকে দেখাইয়া দিল। . HHN # শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ কথাটা শুনিয়া সকলেই বিশ্বিত ও কৌতুহলী হইয়া উঠিল। ইহার শেষ পৰ্য্যন্ত কি দাড়ায়, দেখিবার জন্য অপূৰ্ব্ব নিজের আকণ্ঠ পিপাসা সত্বেও বিপিনের হাত ধরিয়া বসিয়া পড়িল । একাদশী প্রশ্ন করিল, তোমার নামটি কি বাবা ? বাড়ি কোথায় ? ছেলেটি কহিল, আমার নাম শশধর ; বাড়ি ওঁদের গায়ে—কালীদহে । তোমার বাবার নামটি কি ? ছেলেটির হইয়৷ এবার অনাথ জবাব দিল ; কহিল, এর বাপ অনেকদিন মারা গেছে। পিতামহ রামলোচন চাটুয্যে ছেলের মৃত্যুর পর সংসার ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন ; সাত বৎসর পরে মাস-খানেক হ’ল ফিরে এসেছিলেন। পরশু এদের ঘরে আগুন লাগে, আগুন নিবোতে গিয়ে বৃদ্ধ মারা পড়েচেন । আর কেউ নেই, এই নাতিটিই শ্রদ্ধাধিকারী। কাহিনী শুনিয়া সকলে দুঃখ প্রকাশ করিল, শুধু একাদশী চুপ করিয়া রহিল। একটু পরেই প্রশ্ন করিল, টাকার হাতচিঠা আছে ? যাও তোমার মাকে জিজ্ঞাসা করে এস । \ ছেলেটি জিজ্ঞাসা করিয়া আসিয়া কহিল, কাগজ-পত্র কিছু নেই, সব পুড়ে গেছে। একাদশী প্রশ্ন করিল, কত টাকা ? এবার বিধবা অগ্রসর হইয়া আসিয়া মাথার কাপড়টা সরাইয়া জবাব দিল, ঠাকুর মরবার আগে বলে গেছেন, পাচশ টাকা তিনি জমা রেখে তীর্থ-যাত্র করেন। বাবা, আমরা বড় গরীব ; সব টাকা ন দাও, কিছু আমাদের ভিক্ষে দাও, বলিয়া বিধবা টিপিয়া টিপিয়া কাদিতে লাগিল । ঘোষালমশাই এতক্ষণ খাতা লেখা ছাড়িয়া একাগ্রচিত্তে শুনিতেছিলেন, তিনিই অগ্রসর হইয় প্রশ্ন করিলেন, বলি কেউ সাক্ষী-টাক্ষী আছে ? বিধবা ঘাড় নাড়িয়া বলিল, না। আমরাও জানতুম না। ঠাকুর গোপনে টাকা জমা রেখে বেরিয়ে গিয়েছিলেন । ঘোষাল মৃদু হাস্ত করিয়া বলিলেন, শুধু কঁদিলেই ত হয় না বাপু ! এ-সব মবলগ টাকাকড়ির কাও যে ! সাক্ষী নেই, হাতচিঠা নেই, তা হলে কি-রকম হবে বল দেখি ? বিধবা ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতে লাগিল ; কিন্তু কান্নার ফল যে কি হইবে তাহ কাহারও বুঝিতে বাকি রহিল না। "একাদশী এবার কথা কহিল ; ঘোষালের প্রতি চাহিয়া কহিল, আমার মনে হচ্চে, যেন পাচশ টাকা কে জমা রেখে আর নেয়নি। তুমি একবার পুরোনো খাতাগুলো খুজে দেখ দিকি, কিছু লেখা-টেখা আছে না কি ? vවIV একাদশী বৈরাগী ঘোষাল ঝঙ্কার দিয়া কহিল, কে এতবেলায় ভূতের ব্যাগার খাটতে যাবে বাপু ? সাক্ষী নেই, রসিদ-পত্তর নেই— * কথাটা শেষ হইবার পূৰ্ব্বেই দ্বারের অন্তরাল হইতে জবাব আলি, রসিদ-পত্তর নেই বলে কি ব্রাহ্মণের টাকাটা ডুবে যাবে না কি ? পুরানে থাত দেখুন, আপনি না পারেন আমাকে দিন, দেখে দিচ্চি । সকলেই বিস্মিত হইয়া দ্বারের প্রতি চোখ তুলিল, কিন্তু যে হুকুম দিল তাহাকে দেখা গেল না । ঘোষাল নরম হইয়া কহিল, কত বছর হয়ে গেল মা ! এতদিনের খাতা খুজে বার করা ত সোজা নয় । খাতা-পত্তরের আণ্ডিল । তা জমা থাকে, পাওয়া যাবে বৈ কি। বিধবাকে উদ্দেশ করিয়া কহিল, তুমি বাছ কেঁদে না, হকের টাকা হয় ত পাবে বৈ কি। আচ্ছ, কাল এক বার আমার বাড়ি যেয়ে ; সব কথা জিজ্ঞেস করে থাত দেখে বার করে দেব । আজিPএতবেলায় ত আর হবে না । বিধবা তৎক্ষণাৎ সন্মত হইয়া কহিল, আচ্ছা বাবা, কাল সকালেই আপনার ওখানে যাব । যেয়ো, বলিয়া ঘোষাল ঘাড় নাড়িয়া সম্মুখের খোলা খাতা সেদিনের মত বন্ধ করিয়া ফেলিল । কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের ছলে বিধবাকে বাড়িতে আহবান করার অর্থ অত্যন্ত সুস্পষ্ট। অন্তরাল হইতে গৌরী কহিল, আট বছর আগের—তা হলে ১৩০১ সালের খাতটি একবার খুলে দেখুন ত, টাকা জমা আছে কি না ? ঘোষাল কহিলেন, এত তাড়াতাড়ি কিসের মা ! গৌরী কহিল, আমাকে দিন, আমি দেখে দিচ্চি। ব্রাহ্মণের মেয়ে দু'কোশ হেঁটে এলেচেন—দু’কেশি এই রৌদ্রে হেঁটে যাবেন, আবার কাল আপনার কাছে আসবেন ; এত হাঙ্গামায় কাজ কি ঘোষালকাক ? একাদশী কহিল, সত্যিই ত ঘোষালমশাই ; ব্রাহ্মণের মেয়েকে মিছামিছি হাটান কি ভাল ? বাপ রে ; দাও, দাও, চটুপটু দেখে দাও। ক্রুদ্ধ ঘোষাল রুষ্টকণ্ঠে উঠিয়া গিয়া পাশের ঘর হইতে ১৩০১ সালের খাত বাহির করিয়া আনিলেন। মিনিট-দশেক পাতা উণ্টাইয়া হঠাৎ ভয়ানক খুশী হইয়া বলিয়৷ উঠিলেন, বাঃ! আমার গৌরীমায়ের কি স্বক্ষ বুদ্ধি ! ঠিক এক সালের খাতাতেই জমা পাওয়া গেল। এই যে রামলোচন চাটুয্যের জমা পাঁচশ'— একাদশী কহিল, দাও, চটুপটু সুদটা কবে দাও ধোযালমশাই। ○○中 শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ ঘোষাল বিস্মিত হইয়া কহিল, আবার সুদ ? একাদশী কহিল, বেশ, দিতে হবে না ! টাকা এতদিন খেটেচে ত, বসে ত থাকেনি! আট বছরের সুদ, এই ক’মাস সুদ বাদ পড়বে। তখন স্বদে-আসলে প্রায় সাড়ে-সাতশ’ টাকা হইল। একাদশী ভগিনীকে লক্ষ্য করিয়া কহিল, দিদি, টাকাটা তবে সিন্দুক থেকে বার করে আনে । ই বাছ, সব টাকাটাই একসঙ্গে নিয়ে যাবে ত ? বিধবার অন্তরের কথা অন্তর্যামী, শুনিলেন ; চোখ মুছিয়া প্রকাতে কহিল, ন বাবা, অত টাকার আমার কাজ নেই ; আমাকে পঞ্চাশটি টাকা এখন শুধু দাও। তাই নিয়ে যাও মা । ঘোষালমশাই, খাতাটা একবার দাও, সই করে নেই ; আর বাকি টাকার তুমি একটা চিঠি করে দাও। ঘোষাল কহিল, আমি সই করে নিচ্চি। তুমি আবার— একাদশী কহিল, না না, আমাকেই দাও না ঠাকুর, নিজের চোখে দেখে দিই। বলিয়া খাতা লইয়া অৰ্দ্ধ-মিনিট চোখ বুলাইয়া হাসিয়া কহিল, ঘোষালমশাই, এই যে একজোড়া আসল মুক্ত ব্রাহ্মণের নামে জমা আছে । আমি জানি কি না, ঠাকুরমশাই আমাদের সব সময়ে চোখে দেখতে পায় না, বলিয়া একাদশী দরজার দিকে চাহিয়া একটু হাসিল । এতগুলি লোকের স্বমুখে মনিবের সেই ব্যঙ্গোক্তিতে ঘোষালের মুখ কালি হইয়া গেল । সেদিনের সমস্ত কৰ্ম্ম নিৰ্বাহ হইলে, অপূৰ্ব্ব সঙ্গীদের লইয়া যখন উত্তপ্ত পথের মধ্যে বাহির হইয়া পড়িল, তখন তাহার মনের মধ্যে একটা বিপ্লব চলিতেছিল। ঘোষাল সঙ্গে ছিল, সে সবিনয়ে আহবান করিয়া কহিল, আসুন, গরীবের ঘরে অন্ততঃ একটু গুড় দিয়েও জল খেয়ে যেতে হবে। অপূৰ্ব্ব কোন কথা না কহিয়া নীরবে অমুসরণ করিল। ঘোষালের গা জলিয়া যাইতেছিল ; সে একাদশীকে উদ্দেশ করিয়া কহিল, দেখলেন, ছোটলোক ব্যাটার আস্পদ্ধা ? আপনাদের মত ব্রাহ্মণ-সন্তানের পায়ের ধূলো পড়েচে, হারামজাদার ষোলপুরুষের ভাগ্যি; ব্যাটা পিশেচ কি না পাচ গগু পয়সা দিয়ে ভিখারী বিদেয় করতে চায় ! বিপিন কহিল, দু’দিন সবুর করুন না ; হারামজাদা মহাপাপীর ধোপা-নাপতে বন্ধ করে পাচ-গণ্ড পয়সা দেওয়া বার করে দিচ্চি। রাখালবাবু আমাদের কুটুম, সে মনে রাখবেন ঘোষালমশাই । VENE,’ একাদশী বৈরাগী ঘোষাল কহিল, আমি ব্রাহ্মণ । দু’বেল সন্ধ্যা-আহ্নিক না করে জল-গ্ৰহণ করিনে, দুটো মুক্তোর জন্যে কি-রকম অপমানটা দুপুরবেলায় আমাকে করলে * চোখে দেখলেন ত। ব্যাটার ভাল হবে ? মনেও করবেন না। সে-বেটী—যারে ছু লে নাইতে হয়, কিনা বামুনের ছেলের তেষ্টার জল নিয়ে আসে, টাকার ওমরটা কি-রকম হয়েচে, একবার ভেবে দেখুন দেখি ! অপূৰ্ব্ব এতক্ষণ একটা কথাতেও কথা যোগ করে নাই ; সে হঠাৎ পথের মাঝখানে দাড়াইয় পড়িয়া কহিল, অনাথ, আমি ফিরে চললুম ভাই, আমার ভারি তেষ্টা পেয়েচে । ঘোষাল আশ্চৰ্য্য হইয কহিল, ফিরে কোথায় যাবেন ? ঐ ত আমার বাড়ি দেখা যাচ্ছে । অপূৰ্ব্ব মাথা নাড়িয়া বলিল, আপনি এদের নিয়ে যান, আমি যাচ্ছি ঐ একাদশীর বাড়িতেই জল খেতে । একাদশীর বাড়িতে জল খেতে ! সকলেই চোখ কপালে তুলিয়া দাড়াইয়া পড়িল । বিপিন তাহার হাত ধরিয়া একটা টান দিয়া বলিল, চল, চল—দুপুররোদ্দূরে রাস্তার মাঝখানে আর ঢঙ, করতে হবে না। তুমি সেই পাত্রই বটে ! তুমি খাবে একাদশীর বোনের ছোয় জল ! অপূৰ্ব্ব হাত টানিয়া দৃঢ়স্বরে কহিল, সত্যিই আমি তার দেওয সেই জলটুকু খাবার জন্য ফিরে যাচ্ছি। তোমরা ঘোষালমশায়ের ওখান থেকে খেয়ে এস, ঐ গাছতলায় আমি অপেক্ষা করে থাকব। তাহার শাস্ত স্থির কণ্ঠস্বরে হতবুদ্ধি হইয়া ঘোষাল কহিল, এর প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় তা জানেন ? অনাথ কহিল, ক্ষেপে গেলে নাকি ? অপূৰ্ব্ব কহিল, তা জানিনে ! কিন্তু প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় সে তখন ধীরে-সুস্থে করা যাবে। কিন্তু এখন ত পারলাম না, বলিয়া সে এই খর-রৌদ্রের মধ্যে দ্রুতপদে একাদশীর বাড়ির উদ্দেশে প্রস্থান করিল। ○○。 a =8్సరి वाद्गीत शृल, মণি-মাণিক্য মহামূল্য বস্তু, কেন না, তাহা দুষ্প্রাপ্য। এই হিসাবে নারীর মূল্য বেশী নয়, কারণ সংসারে ইনি দুষ্প্রাপ্য নহেন। জল জিনিসটি নিত্য-প্রয়োজনীয়, অথচ ইহার দাম নাই । কিন্তু যদি কখন ঐটির একান্ত অভাব হয়, তখন রাজাধিরাজও বোধ করি একফোটার জন্ত মুকুটের শ্রেষ্ঠ রয়ট খুলিয়া দিতে ইতস্তত করেন না। তেমনি—ঈশ্বর না করুন, যদি কোনদিন সংসারে নারী বিরল হইয়া উঠেন, সেই দিনই ইহার যথার্থ মূল্য কত, সে তর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হইয়া যাইবে—আজি নহে। আজ ইনি সুলভ । কিন্তু দাম যাচাই করিবারও একটা পথ পাওয়া গেল। অর্থাৎ পুরুষের কাছে নারী কখন, কি অবস্থায়, কোন সম্পর্কে কতখানি প্রয়োজনীয়, তাহ স্থির করিতে পারিলে নগদ আদায় হৌক আর না হোক, অন্ততঃ কাগজে-কলমে হিসাব-নিকাশ করিয়া ভবিষ্যতে একটা নালিশ-মোকদ্দমারও দুরাশ পোষণ করিতে পারা যায়। একটা উদাহরণ দিয়া বলি। সাধারণতঃ বাটীর মধ্যে বিধবা ভগিনীর অপেক্ষা স্ত্রীর প্রয়োজন অধিক বলিয়া স্ত্রীটি বেশী দামী। আবার এই বিধবা ভগিনীর দাম কতকটা চড়িয়া যায় স্ত্রী যখন আসন্ন-প্রসবা ; যখন রাধা-বাড়ার লোকাভাব, যখন কচি ছেলেটাকে কাক দেখাইয়া বক দেখাইয়া দুধটা খাওয়ান চাই। তাহা হইলে পাওয়া ধাইতেছে—নার ভগিনী-সম্পর্কে বিধবা অবস্থায়, নারী ভাৰ্য্যসম্পৰ্কীয়ার অপেক্ষ অল্প মূল্যের। ইহা সরল স্পষ্ট কথা । ইহার বিরূদ্ধে তর্ক চলে না। একটা প্লেট-পেন্সিল লইয়া বসিলে নারীর বিশেষ অবস্থার বিশেষ মূল্য বোধ করি আঁক কষিয়া কড়া-ক্ৰান্তি পৰ্য্যন্ত বাহির করা যায়। কিন্তু কথা যদি উঠে, ইহার অবস্থা-বিশেষের মূল্য না হয় একরকম বোঝা গেল, কিন্তু নারীত্বের সাধারণ মূল্য ধাৰ্য্য করিবে কি করিয়া, যখন ইহার জন্ত সোনার লঙ্কা নিপাত হইয়াছিল, ট্রয়-রাজ্য ধ্বংস হইয়া গিয়াছিল ; আরও ছোট-বড় কত রাজ্য হয়ত ইতিপূৰ্ব্বে নষ্ট হইয়া গিয়াছে, ইতিহাস সে-কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়া রাখে নাই। এখানে এতবড় প্রয়োজন নারীতে কি ছিল যে সাম্রাজ্য 鴨 ৩৪৩ শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ ভাসাইয়া দিতেও মানুষ পরায়ুখ হয় নাই, প্রাণ দিতেও দ্বিধা করে নাই। তোমার শ্নেটখানিতে জায়গা কত যে ইহার দাম তুমি কষিয়া বাহির করিয়া দিবে ? কথাটা বাহিরের দিক হইতে অস্বীকার করি না, কিন্তু ভিতরের দিকে চাহিয়া আমি যদি প্রশ্ন করি, মানুষ রাজ্যের দিকে চাহিয়া দেখে নাই সত্য, কিন্তু তাহা কতটা যে নারীর দিকে চাহিয়, আর কতটা যে নিজের অসংযত উচ্ছঙ্খল প্রবৃত্তির দিকে চাহিয়া—সে জবাব আমাকে কে দিবে ? নারীত্বের মূল্য কি ? অর্থাৎ, কি পরিমাণে তিনি সেবাপরায়ণ, স্নেহশীল, সতী এবং দুঃখে কষ্টে মোনা। অর্থাৎ, তাহাকে লইয়া কি পরিমাণে মানুষের মুখ ও সুবিধা ঘটিবে। এবং কি পরিমাণে তিনি রূপসী । অর্থাৎ পুরুষের লালসা ও প্রবৃত্তিকে কতটা পরিমাণে তিনি নিবদ্ধ ও তৃপ্ত রাখিতে পরিবেন। দাম কষিবার এ-ছাড়া যে আর কোন পথ নাই, সে-কথা আমি পৃথিবীর ইতিহাস খুলিয়া প্রমাণ করিয়া দিতে পারি। ইয়োরোপ এ-দেশীয়কে চোখ রাঙাইয়া বলে, “তোমরা নারীর মুল্য জানো না, মৰ্য্যাদা বোঝ না, আমোদ-আহলাদে তাহাকে যোগ দিতে দাও না, ঘরের কোণে আবদ্ধ করিয়া রাখ–তোমরা বৰ্ব্বর।” মন্ত্র প্রভৃতি হইতে ‘পূজাৰ্ছ’ ইত্যাদি শ্লোক তুলিয়া পাণ্ট জবাব দিয়া আমরা বলি, “ন, আমরা মা-বোনের মুখে রঙ মাখাইয়া, শু্যাম্পেন-ক্লারেট পান করাইয়া উত্তেজিত করিয়া সভা-সমিতিতে নাচাইয়া লইয়া ফিরি না, আমরা ঘরের কোণে পূজা করি । তোমাদের ঐ বল-ডান্সের পোষাক দেখিয়া লজ্জায় আধোবদন হই, নাচ দেখিয়া চোখ বুজি। আমরা বরং বর্বর হইয়া চিরদিন মা-বোনকে ঘরের কোণে বদ্ধ করিয়া রাখিব, কিন্তু তাহাদের মৰ্য্যাদা বাড়াইবার জন্য প্রকাশ্যে ভিড়ের মধ্যে নাচাইতে পারিব না।” সাহেবের অবশ্য এ তিরস্কার গ্রাহ করে না । প্রসিদ্ধ আচাৰ্য্য Prof. Maspero সাহেব প্রাচীন মিশরে নারীর সভ্যতা-প্রসঙ্গে তাহার Dawn of Civilisation গ্রন্থে এক স্থানে লিখিয়াছেন, মিশরীয় মহিলারা বক্ষ প্রায় অনাবৃত করিয়া রাজপথে বাহির হইতেন—সুতরাং, নিশ্চয়ই র্তাহারা যথেষ্ট উন্নত হইয়াছিলেন। যেহেতু “like Europeans they must have coveted public admiration." ফন্দিটা অব্যর্থ, তাহ অস্বীকার করা চলে না । নিজেদের মহিলা-সম্বন্ধে তিনি অসঙ্কোচে একথা বলিয়া গেলেন, কিন্তু এই admiration কথাটার ঠিক বাঙলা তর্জমা করিতেও আমাদের লজ্জায় মাথা কাটা যায়। যাহা, হোক, আমাদের উত্তরটাও নেহাৎ মন্দ শুনাইল না । “ভিড়ের মধ্যে নাচাইতে পারিব না” ; এবং “ঘরের কোণে \O88 * নারীর মূল্য পূজা করি” । সুতরাং কথার লড়াইয়ে তখনকার মত একরকম জিতিয়া যাই এবং মহু-পরাশর মাথায় করিয়া পরস্পরের পিঠ ঠুকিয়া দিয়া ঘরে ফিরিয়া আসি। অবশু সাহেবদের কাছে আমি হঠিতে বলি না, কিন্তু ঘরে ফিরিয়া দুই ভায়ে যদি বলাবলি করি, “ভায়া, পূজা ত করি, কিন্তু কিভাবে করি বল ত ?” তখন কিন্তু এমন অনেক কথাই বাহির হইয়া পড়িবার সম্ভাবনা যাহা বাহিরের লোকের কানে কিছুতেই তোলা চলে না। অতএব, আমাদের এটা নিভৃত আলোচনা । প্রথম, সতীত্বের বাড়া নারীর আর গুণ নাই। সব দেশের পুরুষই এ-কথা বোঝে, কেন না, এটা পুরুষের কাছে সবচেয়ে উপাদেয় সামগ্রী। এবং, স্বামীর অবাধ্য হওয়া,—তিনি অতি পাষণ্ড হইলেও—তাহাকে মনে মনে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার মত দোষ আর নাই। একটা অপরটার corollary ; এই সতীত্ব যে নারীর কতবড় ধৰ্ম্ম হওয়া উচিত, রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণাদিতে সে-কথার পুনঃপুনঃ আলোচনা হইয়া গিয়াছে। এ-দেশে এ তর্ক এত অধিক হইয়াছে যে, এ-সম্বন্ধে আর বলিবার কিছু নাই। এখানে স্বয়ং ভগবান পৰ্য্যন্ত সতীত্বের দাপটে কতবার অস্থির হইয়া গিয়াছেন । কিন্তু সমস্ত তর্কই একতরফা—এক নারীরই জন্ত । পুরুষের এ-সম্বন্ধে যে বিশেষ কোন বাধ্য-বাধকতা ছিল, তাহ কোথাও খুজিয়া মেলে না, এবং এতবড় একটা প্রাচীন দেশে পুরুষের সম্বন্ধে একটা শব্দ পর্য্যন্ত যে নাই এ-কথা খুলিয়া বলিলে হাতহাতি বাধিবে, না হইলে বলিতাম। ইংরাজ বলে, chastity, তবুও ইহার দ্বারা তাহারা নরনারী উভয়কেই নির্দেশ করে, কিন্তু এ-দেশে ও-কথাটার বাঙলা করিলে “সতীত্ব’ দাড়ায় ; সেট নিছক নারীরই জন্ত । শাস্ত্রকারের বনে জঙ্গলে বাস করিতেন বটে, কিন্তু তাহারা সমাজ চিনিতেন। তাই একটা শব্দ তৈরি করিয়াও র্তার জাত-ভাইকে অর্থাৎ পুরুষকে inconvenient করিয়া যান নাই। তাহার প্রবৃত্তি নারী-সম্বন্ধে যত-রকমে হাত-পা ছড়াইয়া খেলিতে পারে, তাহার জায়গা রাখিয়া গিয়াছেন। পৈশাচ বিবাহটাও বিবাহ। এমনি সহানুভূতি। এতই দয়া । আর এত দয়া না থাকিলে কি পুরুষ শাস্ত্রকারকে মানিত, না, আজ বিংশ শতাব্দীতেও বিধবা-বিবাহ উচিত কি না, জিজ্ঞাসা করিতে র্তাহার কাছে ছুটিয়া যাইত। কবে কোন যুগে সে-সব পুথিপত্র দরিয়ায় ভাসাইয়া দিয়া মনের মত শাস্ত্র বানাইয়া লইয়া ছাড়িত। যাহাই হোক, নারীর জন্ত সতীত্ব, পুরুষের জন্ত নয়। এ সতীত্বের চরম দাড়াইয়াছিল—সহমরণে। কবে এবং কি হইতে ইহার স্বত্রপাত, সে-কথা ইতিহাস লেখে না। রামায়ণে স্বামীর মৃত্যুতে কৌশল্য বোধ করি একবার রাগ করিয়া সহমরণে যাইবেন বলিয়া ভয় \O86. শরৎসাহিত্য-সংগ্ৰহ দেখাইয়াছিলেন। কিন্তু শেষে তাহার রাগ পড়িয়া গিয়াছিল। দশরথকে একাই দগ্ধ হইতে হইয়াছিল। এ গ্রন্থে এ-সম্বন্ধে আর কোন উচ্চবাচ্য শোনা যায় না। তাই অকুমান হয়, ব্যাপারটা লোকের জানা থাকিলেও কাজটা তেমন প্রচলিত হইয়া পড়ে নাই । মহাভারতে মাত্রী ভিন্ন আর যে কেহ এ-কাজ করিয়াছিল তাহ বলিতে পারি না। কুরুক্ষেত্রের লড়াইয়ের পর কতক কতক ঘটিয়া থাকিলেও তাহা কম। অন্তত:, পুরুষ যে তখনও উঠিয়া পড়িয়া লাগে নাই তাহ নিশ্চিত ; অথচ দেখা যায়, অসভ্য জাতির মধ্যে এ-প্রথার বেশ প্রচলন। দক্ষিণাত্যে সতীর কীৰ্ত্তিস্তম্ভ যথেষ্ট, এবং আফ্রিকায় ও ফিজি দ্বীপে ভাগ্যে কীৰ্ত্তিস্তম্ভের বালাই নাই, না হইলে ওদেশগুলায় বোধ করি এতদিনে পা ফেলিবার স্থানটুকুও থাকিত না। এক একটা ডাহোমি সর্দারের মৃত্যু-উপলক্ষে তাহার শতাবধি বিধবাকে সমাধিস্থানের আশপাশে গাছের ডালে গলায় দড়ি দিয়া ঝুলাইয়া দেওয়া হইত ; অর্থাৎ পরলোকে সঙ্গে পাঠাইবার ব্যবস্থা করা হইত। পরলোকের ব্যাপারটা তেমন স্পষ্ট নয়, বলা যায় কি, যদি লোকাভাবে সেখানে কষ্ট হয় । সাবধানের বিনাশ নাই, তাই সময় থাকিতে একটু হসিয়ার হওয়া। আমাদের এ-দেশেও মূল কারণ বোধ করি ইহাই। যাহার অশোক রাজার রাজত্ব দেখিয়াছিল, তাহারা বলে, সে সময় বিধবাকে দগ্ধ করার প্রথাটা আৰ্য্যাবৰ্ত্তে ছিল না, দক্ষিণাত্যে ছিল। কিন্তু আৰ্য্যাবর্তের আর্ঘ্যের যেই খবর পাইলেন, অসভ্যেরা অসভ্য হোক, যাই হৌক, বড় মন্দ মতলব বাহির করে নাই —ঠিক তা পরলোক যদি সত্যই কিছু থাকে ত সেখানে সেবা করে কে ? আমনি উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া গেলেন, এবং এত বিধবা দগ্ধ করিলেন যে, স্পেনের ফিলিপেরও বোধ করি লোভ হইত। এমনি করিয়া মহাভাগার পূজার উপকরণ সজ্জিত হইয়া উঠিতে লাগিল। কিন্তু একদিন যাহাকে বংশের হিতকামনায় ঘরের মধ্যে আহবান করিয়া আনিয়াছি, যাহার জন্ত হয়ত যুদ্ধ করিয়াছি, ছলনা, মিথ্যা কথা, এমন কি চুরি পর্য্যস্ত করিয়াছি, এমন এতবড় উপকারী জীবটাকে এখন হত্যা করি কেন ? কারণ আছে। প্রথম, পরলোকে সেবা করে কে, দ্বিতীয়, ভাগ্যদোষে যে স্ত্রী বিধবা হইয়া গেল, তাহার দ্বারা আর কি বিশেষ কাজ পাওয়া যাইবে ? বরং, ভবিষ্যতে অশান্তি-উপদ্রবের সম্ভাবনা, অতএব সময়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এখানে যদি মনে রাখা যায়, নারী ব্যক্তি-বিশেষের নিকটে সম্বন্ধ-বিশেষেই দামী, অন্যথা নহে, তাহা হইলে অনেক কথা আপনিই পরিষ্কার হইয়া যাইবে। তবে, আর একটা সম্বন্ধের কথা উঠিয়া আপত্তি হইতে পারে, তাহা জননীর সম্বন্ধ। সে আলোচনা পরে হইবে। ○8W。 नांद्रौव्र भूला র্যাহারা ইতিহাস পড়িয়াছেন, তাহারা জানেন বিধবা-বিবাহ জগতের কোন দেশে কোনদিন সমাদর পায় নাই । কম-বেশী ইহাকে সকলেই অগ্রদ্ধার চোখে দেখিয়া * আসিয়াছে। এ অবস্থায় যেদেশে এ-প্রথা একেবারেই নিষিদ্ধ, সেদেশে পুড়াইয় মারা যে বিশেষ হিতকর অনুষ্ঠান বলিয়াই বিবেচিত হইবে, তাহা আশ্চৰ্য্য নয়। অবশ্য এ-কথা স্বীকার করিতে অনেকেরই লজ্জ হইবে, কিন্তু পতিহীন নারীর এখানে যখন আর তত আবশ্যক নাই, তখন কোনমতে ও-পারে রওনা করাইয়াদিতে পারিলে স্বামী মহাশয়ের কাজে লাগিবার সম্ভাবনা, এই ইচ্ছাই যে এ-প্রথার মূলে এ-কথা অস্বীকার করা এক গায়ের জোর ভিন্ন আর কিছুতেই পারা যায় না । তা ছাড়া দেখা যায়, যে-সমস্ত অসভ্য দেশে স্বামীর মৃত্যুর সহিত স্ত্রী বধ হইত, তাহাদের ঐ বিশ্বাস একান্ত দৃঢ়। তাহারা মনে করে, মৃতের আত্মা কাছাকাছি, ঝোপে-ঝাড়ে, গাছ-পালায় বসিয়া থাকে, সুতরাং সঙ্গিনীকে পাঠাইয়া দিলে উপকার হইবে। কিন্তু আমাদের সুসভ্য এই প্রাচীন দেশ, যেদেশে আত্মার স্বরূপ পৰ্য্যন্ত নির্ণীত হইয়া গিয়াছিল, ঈশ্বরের দীর্ঘ-প্রস্থ মাপিয়া শেষ করা হইয়াছিল, সেদেশের পণ্ডিতেরাও যে বিশ্বাস করিতেন, বধ করিয়া সঙ্গে পাঠান হয়, ইহাই আশ্চৰ্য্য ! তবে এ যদি নারী-পূজার একটা বিশেষ পদ্ধতি হইয়া থাকে ত সে আলাদা কথা । পুরুষ বুঝাইয়াছে সহমৃতা হওয়া সতীর পরম ধৰ্ম্ম । মন্থও বলিয়াছেন, এক পতি-স্বে ব্যতীত স্ত্রীলোকের আর কোন কাজ নাই। সে ইহকালে পুরুষের সেবা করিয়াছে, পরকালে গিয়াও করিবে। কিন্তু কখন করিবে, কতদিন পরে করিবে, এত ঝঞ্জাটে সে যাইতে চাহে নাই। তাহার বিলম্ব সহে না, তাই মরণ-সম্বন্ধে একটু সত্বর ও সতর্ক হওয়াই সে আবশ্যক মনে করিয়াছে। শাস্ত্র বলিয়াছেন, এক মাতৃত্বের কারণেই সে পূজাহ, সুতরাং সে সুযোগ না থাকিলে তাঁহাকে লইয়া আর কি হইবে ? তার পর ছোট-বড় কীৰ্ত্তি-স্তম্ভ উঠিয়াছে, গল্পের মধ্যে, দৃষ্টান্তের মধ্যে তখন সে স্ত্রীর দাম চড়িয়া গিয়াছে। পুরুষ যে কেবলমাত্র নিজের মুখ ও সুবিধা ব্যতীত—সেটা সত্যই হৌক আর কাল্পনিক হোঁক—আর কোনদিকে দৃষ্টিপাত করে নাই, সে-কথা চাপা দিয়া গৰ্ব্ব করিয়া প্রচার করিয়াছে, যেদেশে নারী হাসিতে হাসিতে চিতায় গিয়া বসিত, স্বামীর পাদপদ্ম ক্রোড়ে লইয়া প্রফুল্ল-মুখে নিজেকে ভস্মসাৎ করিত। ইত্যাদি ইত্যাদি— কিন্তু তাই যদি হয়, তবে স্বামীর মৃত্যুর পরই তাহার বিধবাকে একবাটি সিদ্ধি ও ধুতুরা পান করাইয়া মাতাল করিয়া দেওয়া হইত কেন ? শ্মশানের পথে কথন-ব সে হালিত, কখন কাদিত, কখন বা পথের মধ্যেই চুলিয়া ঘুমাইয়া পড়িতে চাহিত । . ©8ፃ

  • -88