কাদম্বরী/কথারম্ভ-৫


 দেবলোকে অপ্সরাগণ বাস করে শুনিয়া থাকিবেন। ইহাদিগের চতুর্দ্দশ কুল। ভগবান্ কমলযোনির মানস হইতে এক কুল উৎপন্ন হয়। দেব, অনল, জল, ভূতল, পবন, সূর্য্যরশ্মি, চন্দ্রকিরণ, সৌদামিনী, মৃত্যু ও মকরকেতু এই একাদশ হইতে একাদশ কুল। দক্ষপ্রজাপতির কন্যা মুনি ও অরিষ্টার সহিত গন্ধর্ব্বদিগের সমাগমে আর দুই কুল উৎপন্ন হয়। এই সমুদায়ে চতুর্দ্দশ কুল। মুনির গর্ভে চিত্ররথ জন্মগ্রহণ করেন। দেবরাজ ইন্দ্র আপন সুহৃন্মধ্যে পরিগণিত করিয়া প্রভাব ও কীর্ত্তিবর্দ্ধন পূর্ব্বক তাঁহাকে গন্ধর্ব্বলোকের অধিপতি করিয়া দেন। ভারতবর্ষের উত্তরে কিম্পুরুষবর্ষে হেমকূট নামে বর্ষপর্ব্বত তাঁহার বাসস্থান। তথায় তাঁহার অধীনে সহস্র সহস্র গন্ধর্ব্বলোক বাস করে। তিনিই চৈত্ররথ নামে এই রমণীয় কানন, অচ্ছোদনামক ঐ সরোবর ও ভবানীপতির এই প্রতিমূর্ত্তি প্রস্তুত করিয়াছেন। অরিষ্টার গর্ভে হংস নামে জগদ্বিখ্যাত গন্ধর্ব্ব জন্মগ্রহণ করেন। গন্ধর্ব্বরাজ চৈত্ররথ ঔদার্য্য ও মহত্ত্ব প্রকাশ পূর্ব্বক আপন রাজ্যের কিঞ্চিৎ অংশ প্রদান করিয়া তাঁহাকে রাজ্যাভিষিক্ত করেন। তাঁহার বাসস্থান হেমকূট। গৌরী নামে এক পরম সুন্দরী অপ্সরা তাঁহার সহধর্ম্মিণী! এই হতভাগিনী ও চিরদুঃখিনী তাঁহাদিগের একমাত্র কন্যা। আমার নাম মহাশ্বেতা। পিতা মাতার অন্য সন্তান সন্ততি ছিল না। আমিই একমাত্র অবলম্বন ছিলাম। শৈশবকালে বীণার ন্যায় এক অঙ্ক হইতে অঙ্কান্তরে যাইতাম ও অপরিস্ফুট মধুর বচনে সকলের মন হরণ করিতাম। সকলের স্নেহপাত্র হইয়া পরমপবিত্র বাল্যকাল বাল্যক্রীড়ায় অতিক্রান্ত হইল। যেরূপ বসন্তকালে নব পল্লবের ও নব পল্লবে কুসুমের উদয় হয় সেইরূপ আমার শরীরে যৌবনের উদয় হইল।

 একদা মধুমাসের সমাগমে কমলবন বিকসিত হইলে, চূতকলিকা অঙ্কুরিত হইলে, মলয়মারুতের মন্দ মন্দ হিল্লোলে আহ্লাদিত হইয়া কোকিল সহকারশাখায় উপবেশন পূর্ব্বক সুস্বরে কুহুরব করিলে, অশোক কিংশুক প্রস্ফুটিত হইলে, আমি মাতার সহিত এই আচ্ছোদ সরোবরে স্নান করিতে আসিয়াছিলাম! এখানে আসিয়া মনোহর তীর, বিচিত্র তরু ও রমণীয় লতাকুঞ্জ অবলোকন করিয়া ভ্রমণ করিতে ছিলাম। ভ্রমণ করিতে করিতে সহসা বনানিলের সহিত সমাগত অতি সুরভি পরিমল আঘ্রাণ করিলাম; মধুকরের ন্যায় সেই সুরভি গন্ধে অন্ধ হইয়া তদনুসরণ ক্রমে কিঞ্চিৎ দূর গমন করিয়া দেখিলাম, অতি তেজস্বী, পরমরূপবান, সুকুমার, এক মুনিকুমার সরোবরে স্নান করিতে আসিতেছেন। তাঁহার সমভিব্যাহারে আর এক জন তাপসকুমার আছেন। উভয়েরই এরূপ সৌন্দর্য্য ও সৌকুমার্য্য বোধ হইল যেন, রতিপতি প্রিয় সহচর বসন্তের সহিত মিলিত হইয়া ক্রোধান্ধ চন্দ্রশেখরকে প্রসন্ন করিবার নিমিত্ত তপস্বিবেশ ধারণ করিয়াছেন। প্রথম মুনিকুমারের কর্ণে অমৃতনিস্যন্দিনী ও পরিমলবাহিনী এক কুসুমমঞ্জরী ছিল। ঐরূপ আশ্চর্য্য কুসুমমঞ্জরী কেহ কখন দেখে নাই। উহার গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া স্থির করিলাম, উহার গন্ধে বন আমোদিত হইয়াছে। অনন্তর অনিমিষ লোচনে মুনিকুমারের মোহিনী মূর্ত্তি নেত্রগোচর করিয়া বিস্মিত হইলাম। ভাবিলাম, বিধাতা বুঝি কমল ও চন্দ্রমণ্ডল সৃষ্টি করিয়া ইঁহার বদনারবিন্দ নির্ম্মাণের কৌশল অভ্যাস করিয়া থাকিবেন। ঊরু ও বাহুযুগ সৃষ্টি করিবার পূর্ব্বে রম্ভাতরু ও মৃণালের সৃষ্টি করিয়া নির্ম্মাণকৌশল শিখিয়া থাকিবেন। নতুবা সমানাকার দুই তিন বস্তু সৃষ্টি করিবার প্রয়োজন কি? ফলতঃ মুনিকুমারের রূপ যতবার দেখি তত বারই অভিনব বোধ হয়। এইরূপ তাঁহার রমণীয় রূপের পক্ষপাতিনী হইয়া ক্রমে ক্রমে কুসুমশরের শরসন্ধানের পথবর্ত্তিনী হইলাম। কি মুনিকুমারের রূপসম্পত্তি, কি যৌবনকাল, কি বসন্তকাল, কি সেই সেই প্রদেশ, কি অনুরাগ, জানি না কে আমাকে উন্মাদিনী করিল। বারংবার মুনিকুমারকে সস্পৃহ লোচনে দেখিতে লাগিলাম। বোধ হইল যেন, আমার হৃদয়কে রজ্জুবদ্ধ করিয়া কেহ আকর্ষণ করিতেছে।

 অনন্তর স্বেদসলিলের সহিত লজ্জা গলিত হইল। মকরধ্বজের নিশিত শরপাতভয়ে ভীত হইয়াই যেন, কলেবর কম্পিত হইল। মুনিকুমারকে আলিঙ্গন করিবার আশয়েই যেন, শরীর রোমাঞ্চরূপ কর প্রসারণ করিল। তখন মনে মনে চিন্তা করিলাম, শান্তপ্রকৃতি তাপসজনের প্রতি আমাকে অনুরাগিণী করিয়া দুরাত্মা মন্মথ কি বিসদৃশ কর্ম্ম করিল। অঙ্গনাজনের অন্তঃকরণ কি বিমূঢ়! অনুরাগের পাত্রাপাত্র কিছুই বিবেচনা করিতে পারে না। তেজঃপুঞ্জ তপোরাশি, মুনিকুমারই বা কোথায়? সামান্য জনসুলভ চিত্তবিকারই বা কোথায়? বোধ হয় ইনি আমার ভাবভঙ্গি দেখিয়া মনে মনে কত উপহাস করিয়াছেন। কি আশ্চর্য্য! চিত্ত বিকৃত হইয়াছে বুঝিতে পারিয়াও বিকার নিবারণ করিতে সমর্থ হইতেছি না। দুরাত্মা কন্দর্পের কি প্রভাব! ইহার প্রভাবে কত শত কন্যা লজ্জা ও কুলে জলাঞ্জলি দিয়া স্বয়ং প্রিয়তমের অনুগামিনী হয়। অনঙ্গ কেবল আমাকেই এইরূপ করিতেছে এমন নহে, কত শত কুলবালাকে এইরূপ অপথে পদার্পণ করায়। যাহা হউক, মদনদুশ্চেষ্টিত পরিস্ফুটরূপে প্রকাশ না হইতে হইতে এখান হইতে প্রস্থান করাই শ্রেয়ঃ। কি জানি পাছে ইনি কুপিত হইয়া শাপ দেন। শুনিয়াছি মুনিজনের প্রকৃতি অতিশয় রোষপরবশ। সামান্য অপরাধেও তাঁহারা ক্রোধান্বিত হইয়া উঠেন ও অভিসম্পাত করেন। অতএব এখানে আর আমার থাকা বিধেয় নয়। এই স্থির করিয়া তথা হইতে প্রস্থান করিবার অভিপ্রায় করিলাম। মুনিজনেরা সকলের পূজনীয় ও নমস্য বিবেচনা করিয়া প্রণাম করিলাম। আমি প্রণাম করিলে পর কুসুমশরশাসনের অলঙ্ঘ্যতা, বসন্ত কালের ও সেই সেই প্রদেশের রমণীয়তা, ইন্দ্রিয়গণের অবাধ্যতা, সেই সেই ঘটনার ভবিতব্যতা এবং আমার ঈদৃশ ক্লেশ ও দৌর্ভাগ্যের অবশ্যম্ভাবিতা প্রযুক্ত আমার ন্যায় সেই মুনিকুমারও মোহিত ও অভিভূত হইলেন। স্তম্ভ, স্বেদ, রোমাঞ্চ, বেপথু প্রভৃতি সাত্ত্বিক ভাবের লক্ষণ সকল তাঁহার শরীরে স্পষ্ট রূপে প্রকাশ পাইল। তাঁহার অন্তঃকরণের তদানীন্তন ভাব বুঝিতে পারিয়া তাঁহার সহচর দ্বিতীয় ঋষিকুমারের নিকট গমন ও ভক্তিভাবে প্রণাম করিয়া জিজ্ঞাসিলাম, ভগবন! ইঁহার নাম কি? ইনি কোন্ তপোধনের পুত্ত্র? ইঁহার কর্ণে যে কুসুমমঞ্জরী দেখিতেছি উহা কোন্ তরুর সম্পত্তি। আহা উহার কি সৌরভ! আমি কখন ঐরূপ সৌরভ আঘ্রাণ করি নাই। আমার কথায় তিনি ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, বালে! তোমার উহা জিজ্ঞাসা করিবার প্রয়োজন কি? যদি শুনিতে নিতান্ত কৌতুক জন্মিয়া থাকে শ্রবণ কর।

 শ্বেতকেতু নামে মহাতপা মহর্ষি দিব্য লোকে বাস করেন। তাঁহার রূপ জগদ্বিখ্যাত। তিনি একদা দেবার্চ্চনার নিমিত্ত কমল কুসুম তুলিতে মন্দাকিনীপ্রবাহে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। কমলাসনা লক্ষ্মী তাঁহার রূপ লাবণ্য দেখিয়া মোহিত হন। তথায় পরস্পর সমাগমে এক কুমার জন্মে। ইনি তোমার পুত্ত্র হইলেন গ্রহণ কর বলিয়া লক্ষ্মী শ্বেতকেতুকে সেই পুত্ত্র সন্তান সমর্পণ করেন। মহর্ষি পুত্ত্রের সমুদায় সংস্কার সম্পন্ন করিয়া পুণ্ডরীকে জন্মিয়াছিলেন বলিয়া পুণ্ডরীক নাম রাখেন। যাঁহার কথা জিজ্ঞাসা করিতেছ, ইনি সেই পুণ্ডরীক। পূর্ব্বে অসুর ও সুরগণ যখন ক্ষীরসাগর মন্থন করেন, তৎকালে পারিজাত বৃক্ষ তথা হইতে উদ্গত হয়। এই কুসুমমঞ্জরী সেই পারিজাত বৃক্ষের সম্পত্তি। ইহা যেরূপে ইঁহার শ্রবণগত হইয়াছে তাহাও শ্রবণ কর। অদ্য চতুর্দ্দশী, ইনি ও আমি ভগবান্ ভবানীপতির অর্চ্চনার নিমিত্ত নন্দনবনের নিকট দিয়া কৈলাসপর্ব্বতে আসিতেছিলাম। পথিমধ্যে নন্দনবনের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা এই পারিজাতকুসুমমঞ্জরী হস্তে লইয়া আমাদের নিকটবর্ত্তিনী হইলেন; প্রণাম করিয়া ইঁহাকে বিনীত বচনে কহিলেন, ভগবন্! আপনার যেরূপ আকার তাহার সদৃশ এই অলঙ্কার, আপনি এই কুসুমমঞ্জরীকে শ্রবণমণ্ডলে স্থান দান করিলে আমি চরিতার্থ হই। বনদেবতার কথায় অনাদর করিয়া ইনি চলিয়া যাইতেছিলেন, আমি তাঁহার হস্ত হইতে মঞ্জরী লইয়া কহিলাম, সখে! দোষ কি! বনদেবতার প্রণয় পরিগ্রহ করা উচিত, এই বলিয়া ইঁহার কর্ণে পরাইয়া দিলাম।

 তিনি এইরূপ পরিচয় দিতেছিলেন এমন সময়ে সেই তপোধনযুবা কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, অয়ি কুতূহলাক্রান্তে! তোমার এত অনুসন্ধানে প্রয়োজন কি? যদি কুসুমমঞ্জরী লইবার বাসনা হইয়া থাকে, গ্রহণ কর এই বলিয়া আমার নিকটবর্ত্তী হইলেন এবং আপনার কর্ণদেশ হইতে উন্মোচন করিয়া আমার শ্রবণপুটে পরাইয়া দিলেন। আমার গণ্ডস্থলে তাঁহার হস্তস্পর্শ হইবামাত্র অন্তঃকরণে কোন অনির্ব্বচনীয় ভাবোদয় হওয়াতে তিনি অবশেন্দ্রিয় হইলেন। করতলস্থিত অক্ষমালা হৃদয়স্থিত লজ্জার সহিত গলিত হইল জানিতে পারিলেন না। অক্ষমালা তাঁহার পাণিতল হইতে ভূতলে পড়িতে না পড়িতেই আমি ধরিলাম ও আপন কণ্ঠের আভরণ করিলাম। এই সময়ে ছত্রধারিণী আসিয়া বলিল, ভর্ত্তৃদারিকে! দেবী স্নান করিয়া তোমার অপেক্ষা করিতেছেন, তোমার আর বিলম্ব করা বিধেয় নয়। নবধৃতা করিণী অঙ্কুশের আঘাতে যেরূপ কুপিত ও বিরক্ত হয়, আমি সেই দাসীর বাক্যে বিরক্ত হইয়া, কি করি, মাতা অপেক্ষা করিতেছেন শুনিয়া, সেই যুবা পুরুষের মুখমণ্ডল হইতে অতিকষ্টে আপনার অনুরাগাকৃষ্ট নেত্রযুগল আকর্ষণ করিয়া স্নানার্থ গমন করিলাম।

 কিঞ্চিৎ দূর গমন করিলে দ্বিতীয় ঋষিকুমার সেই তপোধনযুবার এরূপ চিত্তবিকার দেখিয়া প্রণয়কোপ প্রকাশ পূর্ব্বক কহিলেন, সখে পুণ্ডরীক! এ কি! তোমার অন্তঃকরণ এরূপ বিকৃত হইল কেন? ইন্দ্রিয়পরতন্ত্র লোকেরাই অপথে পদার্পণ করে। নির্ব্বোধেরাই সদসদ্বিবেচনা করিতে পারে না। মূঢ় ব্যক্তিরাই চঞ্চল চিত্তকে স্থির করিতে অসমর্থ। তুমি কি তাহাদিগের ন্যায় বিবেচনাশূন্য হইয়া দুষ্কর্ম্মে অনুরক্ত হইলে? তোমার আজি অভূতপূর্ব্ব এরূপ ইন্দ্রিয়বিকার কেন হইল? ধৈর্য্য, গাম্ভীর্য্য, বিনয়, লজ্জা, জিতেন্দ্রিয়তা প্রভৃতি তোমার স্বাভাবিক সদ্‌গুণ সকল কোথায় গেল? কুলক্রমাগত ব্রহ্মচর্য্য, বিষয়বৈরাগ্য, গুরুদিগের উপদেশ, তপস্যায় অভিনিবেশ, শাস্ত্রের আলোচনা, যৌবনের শাসন, মনের বশীকরণ, সমুদায় একেবারে বিস্মৃত হইলে? তোমার বুদ্ধি কি এইরূপে পরিণত হইল? ধর্ম্মশাস্ত্রাভ্যাসের কি এই গুণ দর্শিল? গুরুজনের উপদেশে কি উপকার হইল? এত দিনে বুঝিলাম বিবেকশক্তি ও নীতিশিক্ষা নিষ্ফল, জ্ঞানাভ্যাস ও সদুপদেশে কোন ফল নাই, জিতেন্দ্রিয়তা কেবল কথামাত্র, যেহেতুক ভবাদৃশ ব্যক্তিকেও অনুরাগে কলুষিত ও অজ্ঞানে অভিভূত দেখিতেছি। তোমার অক্ষমালা কোথায়? উহা করতল হইতে গলিত ও অপহৃত হইয়াছে দেখিতে পাও নাই? কি আশ্চর্য্য! একেবারে জ্ঞানশূন্য ও চৈতন্যশূন্য হইয়াছ! ঐ অনার্য্যা বালা অক্ষমালা হরণ করিয়া পলায়ন করিতেছে এবং মন হরণ করিবার উদ্যোগে আছে এই বেলা সাবধান হও। তপোধনযুবা কিঞ্চিৎ লজ্জিত হইয়া, সখে! কি হেতু আমাকে অন্যরূপ সম্ভাবনা করিতেছ? আমি ঐ দুর্ব্বিনীত কন্যার অক্ষমালাহরণাপরাধ ক্ষমা করিব না বলিয়া ভ্রূকুটিভঙ্গি দ্বারা অলীক কোপ প্রকাশ পূর্ব্বক আমাকে কহিলেন, চপলে! আমার অক্ষমালা না দিয়া এখান হইতে যাইতে পাইবে না। আমি তাঁহার নিরূপম রূপলাবণ্যের অনুরাগিণী ও ভাবভঙ্গির পক্ষপাতিনী হইয়া এরূপ শূন্যহৃদয় হইয়াছিলাম যে, অক্ষমালা ভ্রমে কণ্ঠ হইতে উন্মোচন করিয়া আমার একাবলীমালা তাঁহার করে প্রদান করিলাম। তিনিও এরূপ অন্যমনস্ক হইয়া আমার মুখপানে চাহিয়াছিলেন যে উহা অক্ষমালা বলিয়াই গ্রহণ করিলেন। মুনিকুমারের সন্নিধানে স্বেদজলে বারংবার স্নান করিয়া পরে সরোবরে স্নান করিতে গেলাম। স্নানানন্তর মুনিকুমারের মনোহারিণী মূর্ত্তি মনে মনে চিন্তা করিতে করিতে বাটী গমন করিলাম।

 অন্তঃপুরে প্রবেশিয়া যে দিকে নেত্রপাত করি, পুণ্ডরীকের মুখপুণ্ডরীক ভিন্ন আর কিছুই দেখিতে পাই না। মুনিকুমারের অদর্শনে এরূপ অধীর হইলাম যে, তৎকালে জাগরিত কি নিদ্রিত, একাকিনী কি অনেকের নিকটবর্ত্তিনী ছিলাম, সুখের অবস্থা কি দুঃখের দশা ঘটিয়াছিল, উৎকণ্ঠা কি ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হইয়াছিলাম, কিছুই বুঝিতে পারি নাই। ফলতঃ কোন জ্ঞান ছিল না। একবারে চৈতন্যশূন্য হইয়াছিলাম। তৎকালে কি কর্ত্তব্য কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া, কেহ যেন আমার নিকট না যায়, পরিচারিকাদিগকে এইমাত্র আদেশ দিয়া, প্রাসাদের উপরিভাগে উঠিলাম। যে স্থানে সেই ঋষিকুমারের সহিত সাক্ষাৎ হইয়াছিল সেই প্রদেশকে মহারত্নাধিষ্ঠিত, অমৃতরসাভিষিক্ত, চন্দ্রোদয়ালঙ্কৃত বোধ করিয়া বারংবার দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলাম। দেখিতে দেখিতে এরূপ উন্মত্ত ও ভ্রান্ত হইলাম যে, সেই দিক্ হইতে যে অনিল ও পক্ষী সকল আসিতেছিল তাহাদিগকেও প্রিয়তমের সংবাদ জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা জন্মিল। আমার অন্তঃকরণ তাঁহার প্রতি এরূপ অনুরক্ত হইল যে, তিনি যে যে কর্ম্ম করিতেন, তাহাতেও পক্ষপাতী হইয়া উঠিল। তিনি তপস্বী ছিলেন বলিয়া তপস্যায় আর বিদ্বেষ থাকিল না। তিনি মুনিবেশ ধারণ করিতেন সুতরাং মুনিবেশে আর গ্রাম্যতা রহিল না। পারিজাতকুসুম তাঁহার কর্ণে ছিল বলিয়াই মনোহর হইল। সুরলোক তাঁহার বাসস্থান বলিয়াই রমণীয় বোধ হইতে লাগিল। ফলতঃ নলিনী যেরূপ রবির পক্ষপাতিনী, আমিও সেইরূপ ঋষিকুমারের পক্ষপাতিনী হইয়া নিমেষশূন্য দৃষ্টিতে সেই দিক্ দেখিতে লাগিলাম।

 আমার তাম্বূলকরঙ্কবাহিনী তরলিকাও স্নান করিতে গিয়াছিল। সে অনেক ক্ষণের পর বাটী আসিয়া আমাকে কহিল, ভর্ত্তৃদারিকে! আমরা সরোবরের তীরে যে দুই জন তাপসকুমার দেখিয়াছিলাম, তাঁহাদিগের এক জন, যিনি তোমার কর্ণে কল্পপাদপের কুসুমমঞ্জরী পরাইয়া দেন, তিনি গুপ্ত ভাবে আমার নিকটে আসিয়া সুমধুর বচনে জিজ্ঞাসা করিলেন, বালে! যাঁহার কর্ণে আমি পুষ্প মঞ্জরী পরাইয়া দিলাম ইনি কে? ইঁহার নাম কি? কাহার অপত্য? কোথায় বা গমন করিলেন? আমি বিনীত বচনে কহিলাম, ভগবন্! ইনি গন্ধর্ব্বের অধিপতি হংসের দুহিতা, নাম মহাশ্বেতা। হেমকূট পর্ব্বতে গন্ধর্ব্বলোকে বাস করেন, তথায় গমন করিলেন। অনন্তর অনিমিষ লোচনে ক্ষণ কাল অনুধ্যান করিয়া পুনর্ব্বার বলিলেন, ভদ্রে! তুমি বালিকা বট; কিন্তু তোমার আকৃতি দেখিয়া বোধ হইতেছে চঞ্চলপ্রকৃতি নও। একটী কথা বলি শুন। আমি কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডায়মান হইয়া সমাদর প্রদর্শন পূর্ব্বক সবিনয়ে নিবেদন করিলাম, মহাভাগ! আদেশ দ্বারা এই ক্ষুদ্র জনের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করিবেন ইহার পর আর সৌভাগ্য কি? ভবাদৃশ মহাত্মারা মদ্বিধ ক্ষুদ্র জনের প্রতি কটাক্ষপাত করিলেই তাহারা চরিতার্থ হয়। আপনি বিশ্বাস পূর্ব্বক কোন বিষয়ে আদেশ করিলে আমি চিরক্রীত ও অনুগৃহীত হইব, সন্দেহ নাই। আমার বিনয়গর্ভ বাক্য শুনিয়া সখীর ন্যায়, উপকারিণীর ন্যায় ও প্রাণদায়িনীর ন্যায় আমাকে জ্ঞান করিলেন। স্নিগ্ধ দৃষ্টি দ্বারা প্রসন্নতা প্রকাশ পূর্ব্বক নিকটবর্ত্তী এক তমালতরুর পল্লব গ্রহণ করিয়া পল্লবের রসে আপন পরিধেয় বল্কলের এক খণ্ডে নখ দ্বারা এই পত্রিকা লিখিয়া আমাকে দিলেন। কহিলেন, আর কেহ যেন জানিতে না পারে, মহাশ্বেতা যখন একাকিনী থাকিবেন তাঁহার করে সমর্পণ করিও।

 আমি হর্ষোৎফুল্ল লোচনে তরলিকার হস্ত হইতে পত্রিকা গ্রহণ করিলাম। তাহাতে লিখিত ছিল, হংস যেমন মুক্তামালায় মৃণালভ্রমে প্রতারিত হয়, তেমনি আমার মন মুক্তাময় একাবলীমালায় প্রতারিত হইয়া তোমার প্রতি সাতিশয় অনুরক্ত হইয়াছে। পথভ্রান্ত পথিকের দিগ্‌ভ্রম, মূকের জিহ্বাচ্ছেদ, অসম্বদ্ধভাষীর জ্বরপ্রলাপ, নাস্তিকের চার্ব্বাকশাস্ত্র, উন্মত্তের সুরাপান যেরূপ ভয়ঙ্কর, পত্রিকাও আমার পক্ষে সেইরূপ ভয়ঙ্কর বোধ হইল। পত্রিকা পাঠ করিয়া উন্মত্ত ও অবশেন্দ্রিয় হইলাম। পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলাম, তরলিকে! তুমি তাঁহাকে কোথায় কি রূপে দেখিলে? তিনি কি কহিলেন? তুমি তথায় কতক্ষণ ছিলে? তিনি আমাদের অনুসরণে প্রবৃত্ত হইয়া কত দূর পর্য্যন্ত আসিয়াছিলেন? প্রিয়জনসম্বদ্ধ এক কথাও বারংবার বলিতে ও শুনিতে ভাল লাগে। আমি পরিজনদিগকে তথা হইতে বিদায় করিয়া কেবল তরলিকার সহিত মুনিকুমারসম্বদ্ধ কথায় দিবসক্ষেপ করিলাম।