প্রধান মেনু খুলুন


গল্পগুচ্ছ ৭২৯ পয়লা নম্বর আমি তামাকটা পৰ্যন্ত খাই নে। আমার এক অভ্ৰভেদী নেশা আছে, তারই আওতায় অন্য-সকল নেশা একেবারে শিকড় পর্যন্ত শুকিয়ে মরে গেছে। সে সামার বই-পড়ার নেশা । আমার জীবনের মন্ত্রটা ছিল এই— যাবজীবেং নাই-বা জীবেং ঋণং কৃত্বা বহিং পঠেৎ । যাদের বেড়াবার শখ বেশি অথচ পথেয়ের অভাব, তারা যেমন করে টাইমটেবল পড়ে, অলপ বয়সে আর্থিক অসদ্ভাবের দিনে আমি তেমনি ক'রে বইয়ের ক্যাটালগ পড়তুম। আমার দাদার এক খড়শবশরে বাংলা বই বেরবা মাত্র নিবিচারে কিনতেন এবং তাঁর প্রধান অহংকার এই যে, সে বইয়ের একখানাও তাঁর আজ পয'ত খোওয়া যায় নি। বোধ হয় বাংলাদেশে এমন সৌভাগ্য আর-কারও ঘটে না । কারণ ধন বল, আয় বল, অন্যমনস্ক ব্যক্তির ছাতা বল, সংসারে যতকিছল সরণশীল পদাৰ্থ আছে বাংলা বই হচ্ছে সকলের চেয়ে সেরা। এর থেকে বোঝা যাবে, দাদার খড়শবশরের বইয়ের আলমারির চাবি দাদার খড়েশাশুড়ির পক্ষেও দলভ ছিল । দীন যথা রাজেন্দ্রসংগমে আমি যখন ছেলেবেলায় দাদার সঙ্গে তাঁর শবশুরবাড়ি যেতুম ঐ রন্ধন্বার আলমারিগুলোর দিকে তাকিয়ে সময় কাটিয়েছি। তখন আমার চক্ষর জিভে জল এসেছে। এই বললেই যথেস্ট হবে, ছেলেবেলা থেকেই এত অসম্ভব-রকম বেশি পড়েছি যে পাস করতে পারি নি। যতখানি কম পড়া পাস করার পক্ষে অত্যাবশ্যক তার সময় আমার ছিল না। আমি ফেল-করা ছেলে বলে আমার একটা মস্ত সবিধে এই যে, বিশববিদ্যালয়ের ঘড়ায় বিদ্যার তোলা জলে আমার স্নান নয়— স্রোতের জলে অবগাহনই আমার অভ্যাস । আজকাল আমার কাছে অনেক বি. এ. এম. এ. এসে থাকে ; তারা যতই আধুনিক হোক, আজও তারা ভিক্টোরীয় যাগের নজরবন্দী হয়ে বসে আছে। তাদের বিদ্যার জগৎ টলেমির পথিবীর মতো আঠারো-উনিশ শতাব্দীর সঙ্গে একেবারে যেন ইস্কু দিয়ে অাঁটা ; বাংলাদেশের ছাত্রের দল পত্রপৌত্রাদিক্ৰমে তাকেই যেন চিরকাল প্রদক্ষিণ করতে থাকবে। তাদের মানস-রথযাত্রার গাড়িখানা বহন কটে মিল-বেন্থাম পেরিয়ে কালাইল-রাসিকনে এসে কাত হয়ে পড়েছে। মাস্টার-মশায়ের বলির বেড়ার বাইরে তারা সাহস করে হাওয়া খেতে বেরোয় না । কিন্তু, আমরা যে-দেশের সাহিত্যকে খোঁটার মতো করে মনটাকে বেধে রেখে জাওর কাটাচ্ছি সে-দেশে সাহিত্যটা তো প্ৰাণ নয়— সেটা সেখানকার প্রাণের সঙ্গে সঙ্গে চলছে। সেই প্রাণটা আমার না থাকতে পারে কিন্তু সেই চলাটা আমি অনুসরণ করতে চেষ্টা করেছি। আমি নিজের চেন্টায় ফরাসি জমান ইটালিয়ান শিখে নিলাম; অলপদিন হল রাশিয়ান শিখতে শরে করেছিলাম। আধুনিকতার যে একসপ্রেস গাড়িটা ঘণ্টায় ষাট মাইলের চেয়ে বেগে ছুটে চলেছে, আমি তারই টিকিট কিনেছি। তাই আমি হাক্সলি-ডারায়নে এসেও ঠেকে যাই নি, টেনিসনকেও বিচার করতে ডরাই নে, এমন-কি, ইবসেন-মেটারলিকের নামের নৌকা ধরে আমাদের মাসিক a○○ গল্পগুচ্ছ সাহিত্যে সঙ্গতা খ্যাতির বাঁধা কারবার চালাতে আমার সংকোচ বোধ হয়। আমাকেও কোনোদিন একদল মানষে সন্ধান করে চিনে নেবে, এ আমার আশার অতীত ছিল। আমি দেখছি, বাংলাদেশে এমন ছেলেও দু-চারটে মেলে যারা কলেজও ছাড়ে না, অথচ কলেজের বাইরে সরস্বতীর যে বীণা বাজে তার ডাকেও উতলা হয়ে ওঠে। তারাই ক্ৰমে ক্ৰমে দটি-একটি করে আমার ঘরে এসে জটতে লাগল। এই আমার এক দ্বিতীয় নেশা ধরল—বকুনি। ভদ্রভাষায় তাকে আলোচনা বলা ষেতে পারে। দেশের চারি দিকে সাময়িক ও অসাময়িক সাহিত্যে যে-সমস্ত কথাবাতা শনি তা এক দিকে এত কাঁচা, অন্য দিকে এত পরোনো যে মাঝে মাঝে তার হাফধরানো ভাপসা গমোটটাকে উদার চিন্তার খোলা হাওয়ায় কাটিয়ে দিতে ইচ্ছা করে। অথচ লিখতে কুড়েমি আসে। তাই মন দিয়ে কথা শোনে এমন লোকের নাগাল পেলে বেচে যাই । দল আমার বাড়তে লাগল। আমি থাকতুম আমাদের গলির দ্বিতীয় নম্বর বাড়িতে, এ দিকে আমার নাম হচ্ছে অদ্বৈতচরণ, তাই আমাদের দলের নাম হয়ে গিয়েছিল দ্বৈতাদ্বৈতসম্প্রদায় । আমাদের এই সম্প্রদায়ের কারও সময়-অসময়ের জ্ঞান ছিল না। কেউ-বা পাঞ্চ-করা ট্রামের টিকিট দিয়ে পত্র-চিহ্নিত একখানা নতন-প্রকাশিত ইংরেজি বই হাতে করে সকালে এসে উপস্থিত—তক করতে করতে একটা বেজে যায়, তব তক শেষ হয় না। কেউ-বা সদ্য কলেজের নোট-নেওয়া খাতাখানা নিয়ে বিকেলে এসে হাজির, রাত যখন দুটো তখনো ওঠবার নাম করে না। আমি প্রায় তাদের খেতে বলি । কারণ, দেখেছি, সাহিত্যচৰ্চা যারা করে তাদের রসজ্ঞতার শক্তি 'কেবল মস্তিকে নয়, রসনাতেও খাব প্রবল। কিন্তু, যাঁর ভরসায় এই-সমস্ত ক্ষধিতদের যখন-তখন খেতে বলি তাঁর অবস্থা যে কী হয় সেটাকে আমি তুচ্ছ বলেই বরাবর মনে করে আসতুম। সংসারে ভাবের ও জ্ঞানের যে-সকল বড়ো বড়ো কুলালচক্র ঘরেছে, যাতে মানবসভ্যতা কতক-বা তৈরি হয়ে আগমনের পোড় খেয়ে শক্ত হয়ে উঠছে, কতক-বা কাঁচা থাকতে থাকতেই ভেঙে ভেঙে পড়ছে, তার কাছে ঘরকন্নার নড়াচড়া এবং রান্নাঘরের চুলোর আগন কি চোখে পড়ে। ভবানীর ভ্রাকৃটিভঙ্গী ভবই জানেন, এমন কথা কাব্যে পড়েছি। কিন্তু, ভবের তিন চক্ষু; আমার একজোড়া মাত্র, তারও দটিশক্তি বই পড়ে পড়ে ক্ষীণ হয়ে গেছে । সতরাং, অসময়ে ভোজের আয়োজন করতে বললে আমার সীর প্রচাপে কিরকম চাপল্য উপস্থিত হত তা আমার নজরে পড়ত না। ক্লমে তিনি বঝে নিয়েছিলেন, আমার ঘরে অসময়ই সময় এবং অনিয়মই নিয়ম। আমার সংসারের ঘড়ি তাল-কানা এবং আমার গহপথালির কোটরে কোটরে উনপঞ্চাশ পবনের বাসা। আমার যা-কিছ অথ সামথ্য তার একটিমাত্র খোলা ড্রেন ছিল, সে হচ্ছে বই-কেনার দিকে; সংসারের অন্য প্রয়োজন হ্যাংলা কুকুরের মতো এই আমার শখের বিলিতি কুকুরের উচ্ছিল্ট চেটে ও শীকে কেমন করে ষে বেচে ছিল তার রহস্য আমার চেয়ে আমার পল্লী বেশি জানতেন । নানা জ্ঞানের বিষয়ে কথা কওয়া আমার মতো লোকের পক্ষে নিতান্ত দরকার। বিদ্যা জাহির করবার জন্যে নয়, পরের উপকার করবার জন্যেও নয়; ওটা হচ্ছে কথা কয়ে কয়ে চিন্তা করা, জ্ঞান হজম করবার একটা ব্যায়ামপ্রণালী। আমি যদি লেখক হতুম, পয়লা নম্বর ৭৩১ কিবা অধ্যাপক হতুম, তা হলে বকুনি আমার পক্ষে বাহুল্য হত। যাদের বাঁধা খাটনি আছে খাওয়া হজম করবার জন্যে তাদের উপায় খুজতে হয় না—যারা ঘরে বসে খায় তাদের অন্তত ছাতের উপর হন হন করে পায়চারি করা দরকার। আমার সেই দশা । তাই যখন আমার দ্বৈতদলটি জমে নি তখন আমার একমাত্র দ্বৈত ছিলেন আমার সন্ত্রী। তিনি আমার এই মানসিক পরিপাকের সশব্দ প্রক্লিয়া দীঘকাল নিঃশব্দে বহন করেছেন। যদিচ তিনি পরতেন মিলের শাড়ি এবং তাঁর গয়নার সোনা খটি এবং নিরেট ছিল না, কিন্তু স্বামীর কাছ থেকে যে আলাপ শনতেন, সৌজাত্য-বিদ্যাই (Eugenics) বল, মেডেল-তত্ত্বই বল, আর গাণিতিক যুক্তিশাস্ত্রই বল, তার মধ্যে । সন্তা কিবা ভেজাল-দেওয়া কিছই ছিল না। আমার দলবন্ধির পর হতে এই আলাপ থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছিলেন, কিন্তু সেজন্যে তাঁর কোনো নালিশ কোনোদিন *ानि नि । আমার সন্ত্রীর নাম অনিলা। ঐ শব্দটার মানে কী তা আমি জানি নে, আমার শবশরেও যে জানতেন তা নয়। শব্দটা শুনতে মিন্ট এবং হঠাৎ মনে হয়, ওর একটা-কোনো মানে আছে। অভিধানে যাই বলক, নামটার আসল মানে— আমার সত্ৰী তাঁর বাপের আদরের মেয়ে। আমার শাশুড়ি যখন আড়াই বছরের একটি ছেলে রেখে মারা যান তখন সেই ছোটো ছেলেকে যত্ন করবার মনোরম উপায়স্বরপে আমার বশর আর-একটি বিবাহ করেন । তাঁর উদ্দেশ্য যে কিরকম সফল হয়েছিল তা এই বললেই বোঝা যাবে যে, তাঁর মৃত্যুর দুদিন আগে তিনি অনিলার হাত ধরে বললেন, “মা, আমি তো যাচ্ছি, এখন সরোজের কথা ভাববার জন্যে তুমি ছাড়া আর কেউ রইল না।” তাঁর সন্ত্রী ও দ্বিতীয় পক্ষের ছেলেদের জন্যে কী ব্যবস্থা করলেন তা আমি ঠিক জানি নে । কিন্তু, অনিলার হাতে গোপনে তিনি তাঁর জমানো টাকা প্রায় সাড়ে সাত হাজার দিয়ে গেলেন। বললেন, “এ টাকা সদে খাটাবার দরকার নেই—নগদ খরচ করে এর থেকে তুমি সরোজের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দিয়ো ।” আমি এই ঘটনায় কিছ আশ্চযা হয়েছিলাম। আমার বশর কেবল বৃদ্ধিমান ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন যাকে বলে বিজ্ঞ। অর্থাৎ, ঝোঁকের মাথায় কিছুই করতেন না, হিসেব করে চলতেন। তাই তাঁর ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করে তোলার ভার যদি কারও উপর তাঁর দেওয়া উচিত ছিল সেটা আমার উপর, এ বিষয়ে আমার সন্দেই ছিল না। কিন্তু, তাঁর মেয়ে তাঁর জামাইয়ের চেয়ে যোগ্য, এমন ধারণা যে তাঁর কী করে হল তা তো বলতে পারি নে। অথচ টাকাকড়ি সম্বন্ধে তিনি যদি আমাকে খুব খাঁটি বলে না জানতেন তা হলে আমার মন্ত্রীর হাতে এত টাকা নগদ দিতে পারতেন না। আসল, তিনি ছিলেন ভিক্টোরীয় যাগের ফিলিসটাইন, আমাকে শেষ পর্যন্ত চিনতে পারেন নি। মনে মনে রাগ করে আমি প্রথমটা ভেবেছিলাম, এ সম্বন্ধে কোনো কথাই কব না। কথা কইও নি। বিশ্বাস ছিল, কথা অনিলাকেই প্রথম কইতে হবে, এ সম্ভবন্ধে আমার শরণাপন্ন না হয়ে তার উপায় নেই। কিন্তু অনিলা যখন আমার কাছে কোনো পরামর্শ নিতে এল না তখন মনে করলাম, ও বঝি সাহস করছে না। শেষে একদিন কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলাম, “সরোজের পড়াশুনোর কী করছ।” অনিলা বললে, “মাস্টার রেখেছি, ইস্কুলেও যাচ্ছে।" আমি আভাস দিলাম, সরোজকে শেখাবার ভার আমি Q లిపి গল্পগুচ্ছ নিজেই নিতে রাজি আছি। আজকাল বিদ্যাশিক্ষার যে-সকল নতুন প্রণালী বেরিয়েছে তার কতক কতক ওকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম। অনিলা হাঁও বললে না, নাও বললে না। এতদিন পরে আমার প্রথম সন্দেহ হল, অনিলা আমাকে শ্রদ্ধা করে না। আমি কলেজে পাস করি নি, সেইজন্য সভবত ও মনে করে, পড়াশুনো সম্পবন্ধে পরামশ* দেবার ক্ষমতা এবং অধিকার আমার নেই। এতদিন ওকে সৌজাত্য অভিব্যক্তিবাদ এবং রেডিয়ো-চাঞ্চল্য সম্বন্ধে যা-কিছু বলেছি নিশ্চয়ই অনিলা তার মল্যে কিছুই বোঝে নি। ও হয়তো মনে করেছে, সেকেন্ড ক্লাসের ছেলেও এর চেয়ে বেশি জানে। কেননা, মাসটারের হাতের কান-মলার প্যাঁচে প্যাঁচে বিদ্যেগুলো অটি হয়ে তাদের মনের মধ্যে বসে গেছে। রাগ করে মনে মনে বললাম, মেয়েদের কাছে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবার আশা সে যেন ছাড়ে বিদ্যাবধিই যার প্রধান সম্পদ। সংসারে অধিকাংশ বড়ো বড়ো জীবননাট্য যবনিকার আড়ালেই জমতে থাকে, পঞ্চমাঙ্কের শেষে সেই যবনিকা হঠাৎ উঠে যায়। আমি যখন আমার দৈবতদের নিয়ে বেগস’র তত্ত্বজ্ঞান ও ইবসেনের মনস্তত্ত্ব আলোচনা করছি তখন মনে করেছিলাম, অনিলার জীবনষজ্ঞবেদীতে কোনো আগনই বুঝি জলে নি। কিন্তু, আজকে যখন সেই অতীতের দিকে পিছন ফিরে দেখি তখন সপটে দেখতে পাই, যে সন্টিকতা মম স্থলে তিনি খুবই সজাগ ছিলেন। সেখানে একটি ছোটো ভাই একটি দিদি এবং একটি বিমাতার সমাবেশে নিয়তই একটা ঘাতপ্রতিঘাতের লীলা চলছিল । পুরাণের বাসুকি যে পৌরাণিক পথিবীকে ধরে আছে সে পথিবী সিথর। কিন্তু, সংসারে ষে মেয়েকে বেদনার পথিবী বহন করতে হয় তার সে পথিবী মহোতে মহেতে নতেন নতেন আঘাতে তৈরি হয়ে উঠছে। সেই চলতি ব্যথার ভার বকে নিয়ে যাকে ঘরকন্নার খ:টিনাটির মধ্যে দিয়ে প্রতিদিন চলতে হয় তার অন্তরের কথা অন্তষামী ছাড়া কে সম্পণে বঝেবে । অন্তত, আমি তো কিছুই বুঝি নি। কত উদবেগ, কত অপমানিত প্রয়াস, পীড়িত স্নেহের কত অন্তগড় ব্যাকুলতা, আমার এত কাছে নিঃশব্দতার অন্তরালে মথিত হয়ে উঠছিল আমি তা জানিই নি। আমি জানতুম, যেদিন দ্বৈতদলের ভোজের বার উপস্থিত হত সেইদিনকার উদ্যোগপব’ই আনিলার জীবনের প্রধান পব । আজ বেশ বঝেতে পারছি, পরম ব্যথার ভিতর দিয়েই এ সংসারে এই ছোটো ভাইটিই দিদির সব চেয়ে অন্তরতম হয়ে উঠেছিল। সরোজকে মানুষ করে তোলা সম্বন্ধে আমার পরামর্শ ও সহায়তা এরা সম্পণে অনাবশ্যক বলে উপেক্ষা করাতে আমি ও দিকটাতে একেবারে তাকাই নি, তার যে কিরকম চলছে সে কথা কোনোদিন জিজ্ঞাসাও করি নি। ইতিমধ্যে আমাদের গলির পয়লা-নম্বর বাড়িতে লোক এল। এ বাড়িটি সেকালের বিখ্যাত ধনী মহাজন উদ্ধব বড়ালের আমলে তৈরি। তার পরে দই পরষের মধ্যে সে বংশের ধন জন প্রায় নিঃশেষ হয়ে এসেছে, দটি-একটি বিধবা বাকি আছে। তারা এখানে থাকে না, তাই বাড়িটা পোড়ো অবস্থাতেই আছে। মাঝে মাঝে বিবাহ প্রভৃতি ক্রিয়াকাণ্ডে এ বাড়ি কেউ কেউ অলপ দিনের জন্যে ভাড়া নিয়ে থাকে, বাকি সময়টা এত বড়ো বাড়ির ভাড়াটে প্রায় জোটে না। এবারে এলেন, মনে করো, তাঁর নাম রাজা সিতাংশমৌলি, এবং ধরে নেওয়া যাক তিনি নরোত্তমপুরের জমিদার। , পয়লা নক্ষবর දෘඑළු আমার বাড়ির ঠিক পাশেই অকস্মাৎ এত বড়ো একটা আবিভাব আমি হয়তো জানতেই পারতুম না। কারণ, কণ যেমন একটি সহজ কবচ গায়ে দিয়েই পথিবীতে এসেছিলেন আমারও তেমনি একটি বিধিদত্ত সহজ কবচ ছিল। সেটি হচ্ছে আমার স্বাভাবিক অন্যমনস্কতা। আমার এ বমটি খুব মজবুত ও মোটা। অতএব, সচরাচর পৃথিবীতে চারি দিকে যে-সকল ঠেলাঠেলি গোলমাল গালমন্দ চলতে থাকে তার থেকে আত্মরক্ষা করবার উপকরণ আমার ছিল। কিন্তু, আধুনিক কালের বড়োমানষেরা স্বাভাবিক উৎপাতের চেয়ে বেশি, তারা অস্বাভাবিক উৎপাত। দ্য হাত, দ পা, এক মণ্ডে যাদের আছে তারা হল মানুষ; যাদের হঠাৎ কতকগুলো হাত পা মাথা মণ্ডে বেড়ে গেছে তারা হল দৈত্য। অহরহ দদাড় শব্দে তারা আপনার সীমাকে ভাঙতে থাকে এবং আপন বাহুল্য দিয়ে সবগমতকে অতিষ্ঠ করে তোলে। তাদের প্রতি মনোযোগ না দেওয়া অসম্পভব ; যাদের পরে মন দেবার কোনোই প্রয়োজন নেই অথচ মন না দিয়ে থাকবারও জো নেই তারাই হচ্ছে জগতের অস্বাস্থ্য, স্বয়ং ইন্দ্র পর্যন্ত তাদের ভয় করেন। মনে বুঝলাম, সিতাংশ মৌলি সেই দলের মানুষ । একা একজন লোক যে এত বেজায় অতিরিক্ত হতে পারে তা আমি পাবে জানতুম না। গাড়ি-ঘোড়া লোক-লস্কর নিয়ে সে যেন দশ-মণ্ড বিশ-হাতের পালা জমিয়েছে। কাজেই তার জালায় আমার সারস্বত সবগ লোকটির বেড়া রোজ ভাঙতে লাগল। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় আমাদের গলির মোড়ে। এ গলিটার প্রধান গণে ছিল এই যে, আমার মতো আনমনা লোক সামনের দিকে না তাকিয়ে, পিঠের দিকে মন না দিয়ে, ডাইনে বাঁয়ে প্ৰক্ষেপমাত্র না করেও এখানে নিরাপদে বিচরণ করতে পারে। এমন-কি, এখানে সেই পথ-চলতি অবস্থায় মেরেডিথের গল্প, ব্রাউনিঙের কাব্য অথবা আমাদের কোনো আধুনিক বাঙালি কবির রচনা সম্বন্ধে মনে মনে বিতক করেও অপঘাত-মাতু বাঁচিয়ে চলা যায়। কিন্তু, সেদিন খামকা একটা প্রচন্ড হেইয়ো গজন শনে পিঠের দিকে তাকিয়ে দেখি, একটা খোলা রহোম গাড়ির প্রকান্ড একজোড়া লাল ঘোড়া আমার পিঠের উপর পড়ে আর-কি ! ষাঁর গাড়ি তিনি স্বয়ং হাঁকাচ্ছেন, পাশে তাঁর কোচমান বসে। বাব সবলে দুই হাতে রাশ টেনে ধরেছেন। আমি কোনোমতে সেই সংকীর্ণ গলির পাশ্ববতী একটা তামাকের দোকানের হটি অাঁকড়ে ধরে আত্মরক্ষা করলাম। দেখলাম আমার উপর বাব ক্লখ । কেননা, যিনি অসতকভাবে রথ হাঁকান অসতক পদাতিককে তিনি কোনোমতেই ক্ষমা করতে পারেন না। এর কারণটা পাবেই উল্লেখ করেছি। পদাতিকের দটি মাত্র পা, সে হচ্ছে সবাভাবিক মানুষ । আর, যে ব্যক্তি জড়ি হাঁকিয়ে ছোটে তার আট পা; সে হল দৈত্য। তার এই অস্বাভাবিক বহিল্যের বারা জগতে সে উৎপাতের সস্টি করে। দই-পা-ওয়ালা মানুষের বিধাতা এই আট-পা-ওয়ালা আকস্মিকটার জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না। সবভাবের স্বাস্থ্যকর নিয়মে এই অশ্ববরথ ও সারথি সবাইকেই যথাসময়ে ভুলে যেত্যুম। কারণ, এই পরমাশচষী জগতে এরা বিশেষ করে মনে রাখবার জিনিস নয় । কিন্তু, প্রত্যেক মানুষের ষে পরিমাণ গোলমাল করবার স্বাভাবিক বরাদ্দ আছে এরা তার চেয়ে ঢের বেশি জবরদখল করে বসে আছেন। এইজন্যে যদিচ ইচ্ছা করলেই *●8 গল্পগুচ্ছ আমার তিন-নম্বর প্রতিবেশীকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ভুলে থাকতে পারি, কিন্তু আমার এই পয়লা-নম্বরের প্রতিবেশীকে এক মহত আমার ভুলে থাকা শক্ত। রাত্রে তার আট-দশটা ঘোড়া আস্তাবলের কাঠের মেঝের উপর বিনা সংগীতের যে তাল দিতে থাকে তাতে আমার ঘমে সবাঙ্গে টোল খেয়ে তুবড়ে যায়। তার উপর তখন সৌজন্য রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় । তার পরে তাঁর উড়ে বেহারা, ভোজপুরি বেহারা, তাঁর পাঁড়ে তেওয়ারি দরোয়ানের দল কেউই সবরসংযম কিবা মিতভাষিতার পক্ষপাতী নয়। তাই বলছিলাম, ব্যক্তিটি একটিমাত্র কিন্তু তার গোলমাল করবার যন্ত্র বিস্তর। এইটেই হচ্ছে দৈত্যের লক্ষণ । সেটা তার নিজের পক্ষে অশান্তিকর না হতে পারে। নিজের কুড়িটা নাসারন্ধুে নাক ডাকবার সময় রাবণের হয়তো ঘমের ব্যাঘাত হত না, কিন্তু তার প্রতিবেশীর কথাটা চিন্তা করে দেখো। স্বগের প্রধান লক্ষণ হচ্ছে পরিমাণসষমা, অপর পক্ষে একদা যে দানবের বারা সবগের নন্দনশোভা নট হয়েছিল তাদের প্রধান লক্ষণ ছিল অপরিমিতি। আজ সেই অপরিমিতি দানবটাই টাকার থলিকে বাহন করে মানবের লোকালয়কে আক্রমণ করেছে। তাকে যদি-বা পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে যেতে চাই সে চার ঘোড়া হাঁকিয়ে ঘাড়ের উপর এসে পড়ে— এবং উপরন্তু চোখ রাঙায়। সেদিন বিকেলে আমার দ্বৈতগুলি তখনো কেউ আসে নি। আমি বসে বসে জোয়ার-ভাঁটার তত্ত্ব সম্বন্ধে একখানা বই পড়ছিলাম, এমন সময়ে আমাদের বাড়ির প্রাচীর ডিঙিয়ে দরজা পেরিয়ে আমার প্রতিবেশীর একটা স্মারকলিপি ঝন ঝন শব্দে আমার শাসির উপর এসে পড়ল। সেটা একটি টেনিসের গোলা। চন্দ্রমার আকষণ, পথিবীর নাড়ীর চাঞ্চল্য, বিশবগীতিকাব্যের চিরন্তন ছন্দতত্ত্ব প্রভৃতি সমস্তকে ছাড়িয়ে মনে পড়ল আমার একজন প্রতিবেশী আছেন এবং অত্যন্ত বেশি করে আছেন, আমার পক্ষে তিনি সম্পণে অনাবশ্যক অথচ নিরতিশয় অবশ্যম্ভাবী। পরক্ষণেই দেখি, আমার বড়ো অযোধ্যা বেহারাটা দৌড়তে দৌড়তে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে উপস্থিত। এই আমার একমাত্র অনুচর। একে ডেকে পাই নে, হে’কে বিচলিত করতে পারি নে— দলভিতার কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলে, একা মানুষ কিন্তু কাজ বিস্তর। আজ দেখি, বিনা তাগিদেই গোলা কুড়িয়ে সে পাশের বাড়ির দিকে ছটছে। খবর পেলাম, প্রত্যেকবার গোলা কুড়িয়ে দেবার জন্যে সে চার পয়সা করে মজরি পায় ! দেখলাম, কেবল য়ে আমার শাসি ভাঙছে, আমার শান্তি ভাঙছে, তা নয়, আমার অনচর-পরিচরদের মন ভাঙতে লাগল। আমার অকিঞ্চিৎকরতা সম্বন্ধে অযোধ্যা বেহারার অবজ্ঞা প্রত্যহ বেড়ে উঠছে সেটা তেমন আশ্চর্য নয়, কিন্তু আমার দ্বৈতসম্প্রদায়ের প্রধান সদার কানাইলালের মনটাও দেখছি পাশের বাড়ির প্রতি উৎসক হয়ে উঠল। আমার উপর তার যে নিষ্ঠা ছিল সেটা উপকরণমলক নয়, অন্তঃকরণমলেক, এই জেনে আমি নিশ্চিত ছিলাম; এমন সময় একদিন লক্ষ করে দেখলাম, সে আমার অযোধ্যাকে অতিক্রম করে টেনিসের পলাতক গোলাটা কুড়িয়ে নিয়ে পাশের বাড়ির দিকে ছটছে। বকেলম, এই উপলক্ষে প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ করতে চায়। সন্দেহ হল, ওর মনের ভাবটা ঠিক ব্রহ্মবাদিনী মৈত্রেয়ীর মতো নয়—শধ্যে অমতে ওর পয়লা নম্বর * a○○ পেট ভরবে না। আমি পয়লা-নম্বরের বাবগিরিকে খুব তীক্ষা বিদ্রুপ করবার চেষ্টা করতুম। বলতুম, সাজসজা দিয়ে মনের শন্যতা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা ঠিক যেন রঙিন মেঘ দিয়ে আকাশ মুড়ি দেবার দরোশা। একটা হাওয়াতেই মেঘ যায় সরে, আকাশের ফাঁকা বেরিয়ে পড়ে। কানাইলাল একদিন প্রতিবাদ করে বললে, মানুষটা একেবারে নিছক ফাঁপা নয়, বি.এ. পাস করেছে। কানাইলাল স্বয়ং বি.এ. পাস-করা, এজন্য ঐ ডিগ্রিটা সম্বন্ধে কিছু বলতে পারলাম না। পয়লা-নম্বরের প্রধান গণগুলি সশব্দ। তিনি তিনটে যন্ম বাজাতে পারেন— কনেট, এসরাজ এবং চেলো। যখন-তখন তার পরিচয় পাই। সংগীতের সরে সম্বন্ধে আমি নিজেকে সরাচার্য বলে অভিমান করি নে। কিন্তু আমার মতে গানটা উচ্চঅঙ্গের বিদ্যা নয়। ভাষার অভাবে মানুষ যখন বোবা ছিল তখনই গানের উৎপত্তি— তখন মানুষ চিন্তা করতে পারত না বলে চীৎকার করত। আজও যে-সব মানুষ আদিম অবস্থায় আছে তারা শুধ শুধ শব্দ করতে ভালোবাসে। কিন্তু দেখতে পেলাম, আমার দ্বৈতদলের মধ্যে অন্তত চারজন ছেলে আছে, পয়লা-নম্বরের চেলো বেজে উঠলেই যারা গাণিতিক ন্যায়শাস্ত্রের নব্যতম অধ্যায়েও মন দিতে পারে না। আমার দলের মধ্যে অনেক ছেলে যখন পয়লা-নম্বরের দিকে হেলছে এমন সময়ে অনিলা একদিন আমাকে বললে, “পাশের বাড়িতে একটা উৎপাত জটেছে, এখন আমরা এখান থেকে অন্য-কোনো বাসায় গেলেই তো ভালো হয়।” বড়ো খুশি হলাম। আমার দলের লোকদের বললাম, “দেখেছ মেয়েদের কেমন একটা সহজ বোধ আছে ? তাই যে-সব জিনিস প্রমাণযোগে বোঝা যায় তা ওরা বাঝতেই পারে না, কিন্তু যে-সব জিনিসের কোনো প্রমাণ নেই তা বঝেতে ওদের একটও দেরি হয় না।” কানাইলাল হেসে বললে, “যেমন পেচো, ব্রহ্মদৈত্য, ব্রাহ্মণের পায়ের ধলোর মাহাত্ম্য, পতিদেবতা-পাজার পণ্যফল ইত্যাদি ইত্যদি।" আমি বললাম, “না হে, এই দেখো-না, আমরা এই পয়লা-নম্বরের জাঁকজমক দেখে তম্ভিত হয়ে গেছি, কিন্তু অনিলা ওর সাজসজায় ভোলে নি।” অনিলা দু-তিনবার বাড়ি-বদলের কথা বললে। আমার ইচ্ছাও ছিল, কিন্তু কলকাতার গলিতে গলিতে বাসা খুজে বেড়াবার মতো অধ্যবসায় আমার ছিল না। অবশেষে একদিন বিকেলবেলায় দেখা গেল, কানাইলাল এবং সতীশ পয়লা-নম্বরে টেনিস খেলছে। তার পরে জনশ্রুতি শোনা গেল, যতি আর হরেন পয়লা-নম্বরে সংগীতের মজলিসে একজন বক্স-হামোনিয়ম বাজায় এবং একজন বাঁয়া-তবলায় সংগত করে, আর অরণে নাকি সেখানে কমিক গান করে খাব প্রতিপত্তি লাভ করেছে। এদের আমি পাঁচ-ছ বছর ধরে জানি, কিন্তু এদের যে এ-সব গণ ছিল তা আমি সন্দেহও করি নি। বিশেষত আমি জানতুম, অরণের প্রধান শখের বিষয় হচ্ছে তুলনামলক ধমতত্ত্ব। সে যে কমিক গানে ওস্তাদ তা কী করে বঝেব। সত্য কথা বলি, আমি এই পয়লা-নম্বরকে মুখে যতই অবজ্ঞা করি মনে মনে ঈষা করেছিলাম। আমি চিন্তা করতে পারি, বিচার করতে পারি, সকল জিনিসের সার গ্রহণ করতে পারি, বড়ো বড়ো সমস্যার সমাধান করতে পারি-মানসিক সম্পদে ●●● গল্পগুচ্ছ সিতাংশ মৌলিকে আমার সমকক্ষ বলে কল্পনা করা অসম্ভব। কিন্তু, তব ঐ মানুষটিকে আমি ঈষা করেছি। কেন সে কথা যদি খালে বলি তো লোকে হাসবে । সকালবেলায় সিতাংশ একটা দুরন্ত ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে বোরোত— কী আশ্চর্য নৈপণ্যের সঙ্গে রাশ বাগিয়ে এই জন্তুটাকে সে সংযত করত। এই দশ্যটি রোজই আমি দেখতুম আর ভাবতুম, আহা, আমি যদি এইরকম অনায়াসে ঘোড়া হাঁকিয়ে যেতে পারতুম ! পটন্তু বলে যে জিনিসটি আমার একেবারেই নেই সেইটের পরে আমার ভারি একটা গোপন লোভ ছিল। আমি গানের সরে ভালো বুঝি নে, কিন্তু জানলা থেকে কতদিন গোপনে দেখেছি সিতাংশ এসরাজ বাজাচ্ছে— ঐ যন্ত্রটার পরে তার একটি বাধাহীন সৌন্দর্যময় প্রভাব আমার কাছে আশ্চৰ্য মনোহর বোধ হত । আমার মনে হত, যন্ত্রটা যেন প্রেয়সী-নারীর মতো ওকে ভালোবাসে—সে আপনার সমস্ত সরে ওকে ইচ্ছা করে বিকিয়ে দিয়েছে। জিনিস-পত্র বাড়ি-ঘর জন্তু-মানষে সকলের পরেই সিতাংশর এই সহজ প্রভাব ভারি একটি শ্ৰী বিস্তার করত। এই জিনিসটি অনিবাচনীয়, আমি একে নিতান্ত দলেভ না মনে করে থাকতে পারতুম না। আমি মনে করতুম, পথিবীতে কোনো-কিছু প্রার্থনা করা এ লোকটির পক্ষে অনাবশ্যক, সবই আপনি এর কাছে এসে পড়বে, এ ইচ্ছা করে যেখানে গিয়ে বসবে সেইখানেই এর আসন পাতা। তাই যখন একে একে আমার দ্বৈতগুলির অনেকেই পয়লা-নম্বরে টেনিস খেলতে, কন্সট বাজাতে লাগল, তখন পথনিত্যাগের বারা এই লব্ধেদের উদ্ধার করা ছাড়া আর-কোনো উপায় খুজে পেলাম না। দালাল এসে খবর দিলে, মনের মতো অন্য বাসা বরানগর-কাশীপুরের কাছাকাছি এক জায়গায় পাওয়া যাবে। আমি তাতে রাজি । সকাল তখন সাড়ে ন’টা। সন্ত্রীকে প্রস্তুত হতে বলতে গেলাম। তাঁকে ভাড়ারঘরেও পেলাম না, রান্নাঘরেও না। দেখি, শোবার ঘরে জানলার গরাদের উপর মাথা রেখে চুপ করে বসে আছেন। আমাকে দেখেই উঠে পড়লেন। আমি বললাম, "পরশনই নতুন বাসায় যাওয়া যাবে।" অনিলা বললেন, “সরোজের পরীক্ষার ফল শীঘ্ৰ বেরোবে— তার জন্য মনটা উদবিগ্ন আছে, এ কয়দিন আর নড়াচড়া করতে ভালো লাগছে না।” অন্যান্য অসংখ্য বিষয়ের মধ্যে এই একটি বিষয় আছে যা নিয়ে আমার মন্ত্রীর সঙ্গে আমি কখনো আলোচনা করি নে। সুতরাং আপাতত কিছুদিন বাড়িবদল মলতবি রইল। ইতিমধ্যে খবর পেলাম, সিতাংশ শীঘ্রই দক্ষিণ-ভারতে বেড়াতে বেরোবে, সতরাং দুই-নম্বরের উপর থেকে মন্সত ছায়াটা সরে যাবে। অদ্যটি নাট্যের পঞ্চমাঙ্কের শেষ দিকটা হঠাৎ দন্ট হয়ে ওঠে। কাল আমার সন্ত্রী তাঁর বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন ; আজ ফিরে এসে তাঁর ঘরে দরজা বন্ধ করলেন । তিনি জানেন, আজ রাত্রে আমাদের দ্বৈতদলের পণিমার ভোজ। তাই নিয়ে তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করবার অভিপ্রায়ে দরজায় ঘা দিলাম। প্রথমে সাড়া পাওয়া গেল না : ডাক দিলাম, "অন্য!" খানিক বাদে অনিলা এসে দরজা খালে দিলে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আজ রাত্রে রান্নার জোগাড় সব ঠিক আছে তো?" পয়লা নম্বর ● সে কোনো জবাব না দিয়ে মাথা হেলিয়ে জানালে যে, আছে। ওদের খুব ভালো লাগে, সেটা ভুলো না।” এই বলে বাইরে এসেই দেখি কানাইলাল বসে আছে। আমি বললাম, “কানাই, আজ তোমরা একট সকাল-সকাল এসো।” কানাই আশচয হয়ে বললে, “সে কী কথা। আজ আমাদের সভা হবে নাকি।” আমি বললাম, “হবে বই-কি। সমস্ত তৈরি আছে—ম্যাক্সিম গকির নতুন গল্পের বই, বেগস'র উপর রাসেলের সমালোচনা, মাছের কচুরি, এমন-কি আমড়ার চাটনি পষরত।” কানাই অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল। খানিক বাদে বললে, অবশেষে প্রশন করে জানতে পারলাম, আমার শ্যালক সরোজ কাল বিকেলবেলায় আত্মহত্যা করে মরেছে। পরীক্ষায় সে পাস হতে পারে নি, তাই নিয়ে বিমাতার কাছ থেকে খুব গঞ্জনা পেয়েছিল—সইতে না পেরে গলায় চাদর বেধে মরেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কোথা থেকে শনলে।” সে বললে, "পয়লা-নম্বর থেকে।” পয়লা-নম্বর থেকে ! বিবরণটা এই— সন্ধ্যার দিকে অনিলার কাছে যখন খবর এল তখন সে গাড়ি ডাকার অপেক্ষা না করে অযোধ্যাকে সঙ্গে নিয়ে পথের মধ্যে থেকে গাড়ি ভাড়া করে বাপের বাড়িতে গিয়েছিল। অযোধ্যার কাছ থেকে রাত্রে সিতাংশ মৌলি এই খবর পেয়েই তখনি সেখানে গিয়ে পলিসকে ঠাণ্ডা করে নিজে শমশানে উপস্থিত থেকে মতদেহের সৎকার করিয়ে দেন। ব্যতিব্যস্ত হয়ে তখনি অন্তঃপরে গেলাম। মনে করছিলাম, অনিলা বুঝি দরজা বন্ধ করে আবার তার শোবার ঘরের আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু, এবারে গিয়ে দেখি, ভাঁড়ারের সামনের বারান্দায় বসে সে আমড়ার চাটনির আয়োজন করছে। যখন লক্ষ করে তার মুখ দেখলাম তখন বুঝলম, এক রাত্রে তার জীবনটা উলট-পালট হয়ে গেছে। আমি অভিষোগ করে বললাম, “আমাকে কিছু বল নি কেন।” সে তার বড়ো বড়ো দুই চোখ তুলে একবার আমার মাখের দিকে তাকালেকোনো কথা কইলে না। আমি লজ্জায় অত্যন্ত ছোটো হয়ে গেলাম। যদি অনিলা বলত তোমাকে বলে লাভ কী তা হলে আমার জবাব দেবার কিছুই থাকত না। জীবনের এই-সব বিপ্লব-সংসারের সুখ দুঃখ-নিয়ে কী করে যে ব্যবহার করতে হয়, আমি কি তার কিছুই জানি। আমি বললাম, “অনিল, এ-সব রাখো, আজ আমাদের সভা হবে না।” অনিলা আমড়ার খোসা ছাড়াবার দিকে দটি রেখে বললে, “কেন হবে না। খবে হবে। আমি এত করে সমস্ত আয়োজন করেছি, সে আমি নট হতে দিতে পারব না ।" আমি বললাম, "আজ আমাদের সভার কাজ হওয়া অসম্ভব।" সে বললে, “তোমাদের সভা না হয় না হবে, আজ আমার নিমন্ত্রণ।” আমি মনে একটা আরাম পেলাম। ভাবলাম, অনিলের শোকটা তত বেশি কিছ: ●●統 গল্পগুচ্ছ নয়। মনে করলাম, সেই-যে এক সময়ে ওর সঙ্গে বড়ো বড়ো বিষয়ে কথা কইতুম তারই ফলে ওর মনটা অনেকটা নিরাসক্ত হয়ে এসেছে। যদিচ সব কথা বোঝবার মতো শিক্ষা এবং শক্তি ওর ছিল না, কিন্তু তব পাসোনাল ম্যাগনেটিজম বলে একটা জিনিস আছে তো । সন্ধ্যার সময় আমার দ্বৈতদলের দই-চারজন কম পড়ে গেল। কানাই তো এলই না । পয়লা-নম্বরে যারা টেনিসের দলে যোগ দিয়েছিল তারাও কেউ আসে নি । শনলাম, কাল ভোরের গাড়িতে সিতাংশ মেলি চলে যাচ্ছে, তাই এরা সেখানে বিদায়ভোজ খেতে গেছে। এ দিকে অনিলা আজ যেরকম ভোজের আয়োজন করেছিল এমন আর কোনোদিনই করে নি। এমন-কি, আমার মতো বেহিসাবি লোকেও এ কথা না মনে করে থাকতে পারে নি যে, খরচটা অতিরিক্ত করা হয়েছে। সেদিন খাওয়াদাওয়া করে সভাভগ হতে রাত্রি একটা-দেড়টা হয়ে গেল। আমি ক্লান্ত হয়ে তখনি শতে গেলাম। অনিলাকে জিজ্ঞাসা করলাম, "শোবে না ?” সে বললে, “বাসনগুলো তুলতে হবে।" পরের দিন যখন উঠলাম তখন বেলা প্রায় আটটা হবে । শোবার ঘরে টিপাইয়ের উপর যেখানে আমার চশমাটা খালে রাখি সেখানে দেখি, আমার-চশমা-চাপা-দেওয়া এক-টুকরো কাগজ, তাতে অনিলের হাতের লেখাটি আছে— ‘আমি চললাম। আমাকে খজতে চেষ্টা কোরো না। করলেও খুজে পাবে না।’ কিছু বঝেতে পারলাম না। টিপাইয়ের উপরে একটা টিনের বাক্স–সেটা খালে দেখি, তার মধ্যে অনিলার সমস্ত গয়না—এমন-কি, তার হাতের চুড়ি বালা পর্যন্ত, কেবল তার শাঁখা এবং হাতের লোহা ছাড়া। একটা খোপের মধ্যে চাবির গোছা, অন্য অন্য খোপে কাগজের-মোড়কে-করা কিছু টাকা সিকি দয়ানি। অথাৎ, মাসের খরচ বাঁচিয়ে অনিলের হাতে যা-কিছল জমেছিল তার শেষ পয়সাটি পর্যন্ত রেখে গেছে । একটি খাতায় বাসন-কোসন জিনিসপত্রের ফদ, এবং ধোবার বাড়িতে যে-সব কাপড় গেছে তার সব হিসাব। এই সঙ্গে গরলাবাড়ির এবং মদির দোকানের দেনার হিসাবও টোকা আছে, কেবল তার নিজের ঠিকানা নেই। এইটুকু বৰতে পারলাম, অনিল চলে গেছে। সমস্ত ঘর তন্ন তন্ন করে দেখলাম— আমার শবশুরবাড়িতে খোঁজ নিলম—কোথাও সে নেই। কোনো একটা বিশেষ ঘটনা ঘটলে সে সম্বন্ধে কিরকম বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়, কোনোদিন আমি তার কিছুই ভেবে পাই নে। বকের ভিতরটা হা-হা করতে লাগল। হঠাৎ পয়লা-নম্বরের দিকে তাকিয়ে দেখি, সে বাড়ির দরজা জানলা বন্ধ। দেউড়ির কাছে দরোরানজি গড়গড়ায় তামাক টানছে। রাজাবাব ভোররাত্রে চলে গেছেন। মনটার মধ্যে ছ্যাঁক করে উঠল। হঠাৎ বৰতে পারলাম, আমি যখন একমনে নৰ্যতম ন্যায়ের আলোচনা করছিলাম তখন মানবসমাজের পরোতনতম একটি অন্যায় আমার ঘরে জাল বিস্তার করছিল । ফ্লোৰেয়ার, টলস্টয় টগেনিন্ড প্রভৃতি বড়ো ৰড়ো গল্পলিখিয়েদের বইয়ে ৰখুন এই রকমের ঘটনার কথা পড়েছি তখন বড়ো আনন্দে সাক্ষাতিসক্ষম করে তার তত্ত্বকথা বিশেলষণ করে দেখেছি। কিন্তু, নিজের ঘরেই ৰে এটা এমন সুনিশ্চিত কয়ে ঘটতে পারে তা কোনোদিন সবপেলও কয়পনা করি নি। প্রথম ধাক্কাটাকে সামলে নিয়ে আমি প্রৰীণ তত্ত্বজ্ঞানীর মতো সমস্ত ব্যাপারটাকে পয়লা নম্বর ●●。 যথোচিত হালকা করে দেখবার চেষ্টা করলাম। যেদিন আমার বিবাহ হয়েছিল সেইদিনকার কথাটা মনে করে শাক হাসি হাসলম। মনে করলাম, মানুষ কত আকাঙ্ক্ষা, কত আয়োজন, কত আবেগের অপব্যয় করে থাকে। কত দিন, কত রাত্রি, কত বৎসর নিশ্চিন্ত মনে কেটে গেল; সন্ত্রী বলে একটা সজীব পদার্থ নিশ্চয় আছে বলে চোখ বাজে ছিলাম; এমন সময় আজ হঠাৎ চোখ থলে দেখি, বন্দবদ ফেটে গিয়েছে। গেছে যাক গে—কিন্তু, জগতে সবই তো বন্দবদ নয়। যাগযুগান্তরের জন্মমৃত্যুকে অতিক্রম করে টিকে রয়েছে এমন-সব জিনিসকে আমি কি চিনতে শিখি নি। কিন্তু দেখলাম, হঠাৎ এই আঘাতে আমার মধ্যে নব্যকালের জ্ঞানীটা মাছিত হয়ে পড়ল, আর কোন আদিকালের প্রাণীটা জেগে উঠে ক্ষুধায় কে’দে বেড়াতে লাগল। বারান্দায় ছাতে পায়চারি করতে করতে, শান্য বাড়িতে ঘরেতে ঘরতে, শেষকালে, যেখানে জানালার কাছে কতদিন আমার মন্ত্রীকে একলা চুপ করে বসে থাকতে দেখেছি, একদিন আমার সেই শোবার ঘরে গিয়ে পাগলের মতো সমস্ত জিনিসপত্র ঘাঁটতে লাগলম। অনিলের চুল বাঁধবার আয়নার দেরাজটা হঠাৎ টেনে খলতেই রেশমের লাল ফিতেয় বাঁধা এক-তাড়া চিঠি বেরিয়ে পড়ল চিঠিগুলি পয়লা-নম্বর থেকে এসেছে। বকেটা জনলে উঠল। একবার মনে হল, সবগুলো পড়িয়ে ফেলি। কিন্তু, যেখানে বড়ো বেদনা সেইখানেই ভয়ংকর টান। এ চিঠিগুলো সমস্ত মা পড়ে আমার থাকবার জো নেই। এই চিঠিগুলি পঞ্চাশবার পড়েছি! প্রথম চিঠিখানা তিন-চার টুকরো করে ছোড়া। মনে হল পাঠিকা পড়েই সেটি ছিাড়ে ফেলে তার পরে আবার যত্ন করে একখানা কাগজের উপরে গ’দ দিয়ে জড়ে রেখেছে। সে চিঠিখানা এই— আমার এ চিঠি না পড়েই যদি তুমি ছিড়ে ফেলো তব আমার দুঃখ নেই। আমার যা বলবার কথা তা আমাকে বলতেই হবে। ‘আমি তোমাকে দেখেছি। এতদিন এই পথিবীতে চোখ মেলে বেড়াচ্ছি, কিন্তু, দেখবার মতো দেখা আমার জীবনে এই বত্রিশ বছর বয়সে প্রথম ঘটল । চোখের, উপরে ঘুমের পদা টানা ছিল; তুমি সোনার কাঠি ছাঁইয়ে দিয়েছ—আজ আমি নবজাগরণের ভিতর দিয়ে তোমাকে দেখলাম, যে তুমি স্বয়ং তোমার সন্টিকতার পরম বিস্ময়ের ধন সেই অনিবাচনীয় তোমাকে । আমার ষা পাবার তা পেয়েছি, আর কিছ চাই নে, কেবল তোমার স্তব তোমাকে শোনাতে চাই । যদি আমি কবি হতুম তা হলে আমার এই স্তব চিঠিতে তোমাকে লেখবার দরকার হত না, ছন্দের ভিতর দিয়ে সমস্ত জগতের কণ্ঠে তাকে প্রতিষ্ঠিত করে যে তুম। আমার এ চিঠির কোনো উত্তর দেবে না জানি–কিন্তু, আমাকে ভুল বঝো না। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারি, এমন সন্দেহমাত্র মনে না রেখে আমার পজা নীরবে গ্রহণ কোরো। আমার এই শ্রদ্ধাকে যদি তুমি শ্রদ্ধা করতে পার তাতে তোমারও ভালো হবে। আমি কে সে কথা লেখবার দরকার নেই, কিন্তু নিশ্চয়ই তা তোমার মনের কাছে গোপনে থাকবে না।’ এমন পাঁচশখানি চিঠি । এর কোনো চিঠির উত্তর যে অনিলের কাছ থেকে গিয়েছিল, এ চিঠিগুলির মধ্যে তার কোনো নিদর্শন নেই। যদি যেত তা হলে তখনি జ-ళా గా గా కాజా గా శా হত । 舜·建。 -q80 গল্পগুচ্ছ কিন্তু, এ কী আশ্চষ। সিতাংশ যাকে ক্ষণকালের ফাঁক দিয়ে দেখেছে আজ আট বছরের ঘনিষ্ঠতার পর এই পরের চিঠিগুলির ভিতর দিয়ে তাকে প্রথম দেখলাম। আমার চোখের উপরকার ঘমের পদা কত মোটা পদৰ্ণ না জানি! পরোহিতের হাত থেকে অনিলাকে আমি পেয়েছিলাম, কিন্তু তার বিধাতার হাত থেকে তাকে গ্রহণ করবার মাল্য আমি কিছুই দিই নি। আমি আমার দ্বৈতদলকে এবং নব্যন্যায়কে তার চেয়ে অনেক বড়ো করে দেখেছি। সুতরাং, যাকে আমি কোনোদিনই দেখি নি, এক নিমেষের জন্যও পাই নি, তাকে আর-কেউ যদি আপনার জীবন উৎসগ করে পেয়ে থাকে তবে কী বলে কার কাছে আমার ক্ষতির নালিশ করব । শেষ চিঠিখানা এই— দেখেছি তোমার বেদনা। এইখানে বড়ো কঠিন আমার পরীক্ষা। আমার এই পর্যুষের বাহ নিশ্চেন্ট থাকতে চায় না। ইচ্ছা করে, সবগামতের সমস্ত শাসন বিদীর্ণ করে তোমাকে তোমার জীবনের ব্যথতা থেকে উদ্ধার করে আনি । তার পরে এও মনে হয়, তোমার দঃখই তোমার অন্তযমিীর আসন। সেটি হরণ করবার অধিকার আমার নেই। কাল ভোরবেলা পর্যন্ত মেয়াদ নিয়েছি। এর মধ্যে যদি কোনো দৈববাণী আমার এই বিধা মিটিয়ে দেয় তা হলে যা হয় একটা কিছু হবে। বাসনার প্রবল হাওয়ায় আমাদের পথ চলবার প্রদীপকে নিবিয়ে দেয়। তাই আমি মনকে শান্ত রাখব—একমনে এই মন্ত্র জপ করব যে, তোমার কল্যাণ হোক।’ বোঝা যাচ্ছে, বিধা দর হয়ে গেছে—দজনার পথ এক হয়ে মিলেছে। মাঝের থেকে সিতাংশর লেখা এই চিঠিগুলি আমারই চিঠি হয়ে উঠল— ওগুলি আজ আমারই প্রাণের স্তবমন্ত্র । কতকাল চলে গেল, বই পড়তে আর ভালো লাগে না । অনিলকে একবার কোনোমতে দেখবার জন্যে মনের মধ্যে এমন বেদনা উপস্থিত হল, কিছুতেই সিথর থাকতে পারলাম না। খবর নিয়ে জানলাম, সিতাংশ তখন মসরি-পাহাড়ে। সেখানে গিয়ে সিতাংশকে অনেকবার পথে বেড়াতে দেখেছি, কিন্তু তার সঙ্গে তো অনিলকে দেখি নি। ভয় হল, পাছে তাকে অপমান করে ত্যাগ করে থাকে। আমি থাকতে না পেরে একেবারে তার সঙ্গে গিয়ে দেখা করলাম। সব কথা বিস্তারিত করে লেখবার দরকার নেই। সিতাংশ বললে, “আমি তাঁর কাছ থেকে জীবনে কেবল একটিমাত্র চিঠি পেয়েছি—সেটি এই দেখন।" এই বলে সিতাংশ তার পকেট থেকে একটি ছোটো এনামেল-করা সোনার কাড়ী-কেস খালে তার ভিতর থেকে এক-টুকরো কাগজ বের করে দিলে। তাতে লেখা আছে, “আমি চললাম, আমাকে খুজতে চেটা কোরো না। করলেও খোঁজ পাবে না।’ সেই অক্ষর, সেই লেখা, সেই তারিখ, এবং যে নীলরঙের চিঠির কাগজের অধোঁকখানা আমার কাছে এই টুকরোটি তারই বাকি অধোঁক। আষাঢ় ১৩২৪