প্রধান মেনু খুলুন

4总3 . গল্পগুচ্ছ সংস্কার চিত্রগুপ্ত এমন অনেক পাপের হিসাব বড়ো অক্ষরে তাঁর খাতায় জমা করেন যা থাকে পাপীর নিজের অগোচরে । তেমনি এমন পাপও ঘটে যাকে আমিই চিনি পাপ বলে, আর কেউ না। যেটার কথা লিখতে বসেছি সেটা সেই জাতের। চিত্রগুপ্তের কাছে জবাবদিহি করবার পবে আগে-ভাগে কবল করলে অপরাধের মাত্রাটা হালকা হবে। ব্যাপারটা ঘটেছিল কাল শনিবার দিনে। সেদিন আমাদের পাড়ায় জৈনদের মহলে কী-একটা পরব ছিল। আমার সন্ত্ৰী কলিকাকে নিয়ে মোটরে করে বেরিয়েছিলম— চায়ের নিমন্ত্রণ ছিল বন্ধ নয়নমোহনের বাড়িতে। সন্ত্রীর কলিকা নামটি শবশর-দত্ত, আমি ওর জন্য দায়ী নই। নামের উপযুক্ত তাঁর স্বভাব নয়, মতামত খুবই পরিসফট। বড়োবাজারে বিলিতি কাপড়ের বিপক্ষে যখন পিকেট করতে বেরিয়েছিলেন, তখন দলের লোক ভক্তি করে তাঁর নাম দিয়েছিল ধ্ৰুবৱতা। আমার নাম গিরীন্দ্র; দলের লোক আমাকে আমার পত্নীর পতি বলেই জানে, স্বনামের সাথকতার প্রতি লক্ষ করে না। বিধাতার কৃপায় পৈতৃক উপাজনের গণে আমারও কিঞ্চিৎ সাথকতা আছে। তার প্রতি দলের লোকের দটি পড়ে চাঁদাআদায়ের সময় { সন্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর সবভাবের অমিল থাকলেই মিল ভালো হয়, শুকনো মাটির সঙ্গে জলধারার মতো। আমার প্রকৃতি অত্যন্ত ঢিলে, কিছুই বেশি করে চেপে ধরি নে। আমার স্ত্রীর প্রকৃতি অত্যন্ত অটি, যা ধরেন তা কিছুতেই ছাড়েন না। আমাদের এই বৈষম্যের গুণেই সংসারে শান্তিরক্ষা হয়। কেবল একটা জায়গায় আমাদের মধ্যে যে অসামঞ্জস্য ঘটেছে তার আর মিটমাট হতে পারল না। কলিকার বিশ্ববাস, আমি স্বদেশকে ভালোবাসি নে । নিজের বিশবাসের উপর তাঁর বিশ্ববাস অটল— তাই আমার আন্তরিক দেশ-ভালোবাসার যতই প্রমাণ দিয়েছি, তাঁদের নিদিষ্ট বাহ্য লক্ষণের সঙ্গে মেলে না বলে কিছুতেই তাকে দেশভালোবাসা বলে স্বীকার করাতে পারি নে। ছেলেবেলা থেকে আমি গ্রন্থবিলাসী, নতুন বইয়ের খবর পেলেই কিনে আনি । আমার শত্ররাও কবলে করবে যে, সে বই পড়েও থাকি ; বন্ধুরা খুবই জানেন যে, পড়ে তা নিয়ে তক-বিতক করতেও ছাড়ি নে – সেই আলোচনার চোটে বন্ধরা পাশ কাটিয়ে চলাতে অবশেষে একটিমাত্র মানুষে এসে ঠেকেছে, বনবিহারী, যাকে নিয়ে আমি রবিবারে আসর জমাই। আমি তার নাম দিয়েছি কোণ-বিহারী । ছাদে বসে তার সঙ্গে আলাপ করতে করতে এক-একদিন রাত্তির দটো হয়ে যায়। আমরা যখন এই নেশায় ভোর তখন আমাদের পক্ষে সদিন ছিল না। তখনকার পলিস কারও বাড়িতে গীতা দেখলেই সিডিশনের প্রমাণ পেত। তখনকার দেশভক্ত যদি দেখত কারও ঘরে বিলিতি বইয়ের পাতা কাটা তবে তাকে জানত দেশবিদ্রোহী। আমাকে ওরা শ্যামবণের প্রলেপ দেওয়া বেত-দ্বৈপায়ন ব'লেই গণ্য করত। সরস্বতীর বর্ণ সাদা বলেই সেদিন দেশভক্তদের কাছ থেকে তাঁর পজা মেলা শক্ত হয়েছিল। যে সরোবরে তাঁর শেবতপদ্ম ফোটে সেই সরোবরের জলে দেশের কপাল-পোড়ানো আগন নেবে সংস্কার 《 না, বরঞ্চ বাড়ে, এমনি একটা রব উঠেছিল। সহধর্মিণীর সদদষ্টান্ত ও নিরন্তর তাগিদ সত্ত্বেও আমি খন্দর পরি নে; তার কারণ এ নয় যে, খন্দরে কোনো দোষ আছে বা গণ নেই, বা বেশভূষায় আমি শৌখিন । একেবারে উলেট-সবাদেশিক চাল-চলনের বিরদ্ধে অনেক অপরাধ আমার আছে, কিন্তু পরিচ্ছন্নতা তার অন্তগত নয়। ময়লা মোটা রকমের সাজ, আল-থাল রকমে ব্যবহার করাটাই আমার অভ্যাস। কলিকার ভাবান্তর ঘটবার পববতী যাগে চীনেবাজারের আগা-চওড়া জাতো পরতুম, সে জাতোয় প্রতিদিন কালিমা-লেপন করিয়ে নিতে ভুলতুম, মোজা পরতে আপদ বোধ হত, শাট না পরে পাঞ্জাবি পরতে আরাম পেতুম, আর সেই পাঞ্জাবিতে দটো-একটা বোতামের অভাব ঘটলেও খেয়াল করতুম না— ইত্যাদি কারণে কলিকার সঙ্গে আমার সম্পণে বিচ্ছেদ হবার আশঙ্কা ঘটেছিল। সে বলত, “দেখো, তোমার সঙ্গে কোথাও বেরোতে আমার লক্ষজা করে।” আমি বলতুম, “আমার অন্যগত হবার দরকার নেই, আমাকে বাদ দিয়েই তুমি বেরিয়ো ।” আজ যাগের পরিবতন হয়েছে, আমার ভাগ্যের পরিবতন হয় নি। আজও কলিকা । বলে, “তোমার সঙ্গে বেরোতে আমার লজ্জা করে।” তখন কলিকা যে দলে ছিল । তাদের উদি আমি ব্যবহার করি নি, আজ যে দলে ভিড়েছে তাদের উদিও গ্রহণ করতে পারলাম না। আমাকে নিয়ে আমার স্ত্রীর লজ্জা সমানই রয়ে গেল। এটা আমারই স্বভাবের দোষ। যে-কোনো দলেরই হোক, ভেক ধারণ করতে আমার সংকোচ লাগে। কিছুতেই এটা কাটাতে পারলাম না। অপর পক্ষে মতান্তর জিনিসটা কলিকা খতম করে মেনে নিতে পারে না। ঝনার ধারা যেমন মোটা পাথরটাকে বারে বারে দিনে রাত্রে ঠেলা না দিয়ে কলিকা থাকতে পারে না; পথক মত নামক পদার্থের সংপশমাত্র ওর নায়তে যেন দনিবারভাবে সড়সুড়ি লাগায়, ওকে একেবারে ছটফটিয়ে তোলে। কাল চায়ের নিমন্মণে যাবার পবেই আমার নিষখন্দর বেশ নিয়ে একসহস্ৰএকতম বার কলিকা যে আলোচনা উত্থাপিত করেছিল তাতে তার কণ্ঠস্বরে মাধবেমাত্র ছিল না। বধির অভিমান থাকাতে বিনা তকে তার ভৎসনা শিরোধাষ করে নিতে পারি নি—সবভাবের প্রবতনায় মানুষকে এত ব্যর্থ চেষ্টাতেও উৎসাহিত করে । তাই আমিও একসহস্র-একতম বার কলিকাকে খোঁটা দিয়ে বললাম, “মেয়েরা বিধিদত্ত চোখটার উপর কালাপেড়ে মোটা ঘোমটা টেনে আচারের সঙ্গে অাঁচলের গটি বোধে চলে। মননের চেয়ে মাননেই তাদের আরাম। জীবনের সকল ব্যবহারকেই রচি ও পারলে তারা বাঁচে । আমাদের এই আচারজীণ দেশে খন্দর-পরাটা সেইরকম মালাতিলকধারী ধামিকতার মতোই একটা সংস্কারে পরিণত হতে চলেছে বলেই মেয়েদের ওতে এত আনন্দ * কলিকা রেগে অস্থির হয়ে উঠল। তার আওয়াজ শনে পাশের ঘর থেকে দাসীটা মনে করলে, ভাষাকে পরো ওজনের গয়না দিতে ভতা বাকি ফাঁকি দিয়েছে। কলিকা *もも গল্পগুচ্ছ বললে, “দেখো, খন্দর-পরার শাচিতা যেদিন গঙ্গানানের মতোই দেশের লোকের সংস্কারে বাঁধা পড়ে যাবে সেদিন দেশ বাঁচবে। বিচার যখন স্বভাবের সঙ্গে এক হরে যায় তখনি সেটা হয় আচার। চিন্তা যখন আকারে দঢ়বন্ধ হয় তখনি সেটা হয় সংস্কার; তখন মানুষ চোখ বীজে কাজ করে যায়, চোখ খুলে বিধা করে না।” এই কথাগুলো অধ্যাপক নয়নমোহনের আস্ত বাক্য; তার থেকে কোটেশনমাকা ক্ষরে গিয়েছে, কলিকা ওগুলোকে নিজের সবচিন্তিত বলেই জানে। বোবার শত্র নেই যে পরষ বলেছিল সে নিশ্চয় ছিল অবিবাহিত। কোনো জবাব দিলম না দেখে কলিকা বিগণ ঝোঁকে উঠে বললে, “বৰ্ণভেদ তুমি মুখে অগ্রাহ্য কর অথচ কাজে তার প্রতিকারের জন্য কিছই কর না। আমরা খন্দর পরে পরে সেই ভেদটার উপর অখণ্ড সাদা রঙ বিছিয়ে দিয়েছি, আবরণভেদ তুলে দিয়ে বর্ণভেদটার ছাল ছাড়িয়ে ফেলেছি।” বলতে যাচ্ছিলাম, বর্ণভেদকে মুখেই অগ্রাহ্য করেছিলাম বটে যখন থেকে মসলমানের রান্না মগির ঝোল গ্রাহ্য করেছিলাম। সেটা কিন্তু মুখস্থ বাক্য নয়, মখস্থ কায — তার গতিটা অন্তরের দিকে। কাপড় দিয়ে বর্ণ-বৈষম্য ঢাকা দেওয়াটা বাহ্যিক; ওতে ঢাকা দেওয়াই হয়, মাছে দেওয়া হয় না। তকটাকে প্রকাশ করে বলবার যোগ্য সাহস কিন্তু হল না। আমি ভীর পরষমানুষ মাত্র, চুপ করে রইলাম। জানি আপসে আমরা দুজনে যে-সব তক শরে করি কলিকা সেগুলিকে নিয়ে ধোবার বাড়ির কাপড়ের মতো আছড়িয়ে কচলিয়ে আনে তার বাহিরের বন্ধ মহল থেকে। দর্শনের প্রোফেসর নয়নমোহনের কাছ থেকে প্রতিবাদ সংগ্রহ করে তার দীপ্ত চক্ষ নয়নের ওখানে নিমন্ত্রণে যাবার ইচ্ছা আমার একটও ছিল না। নিশ্চয় জানি, হিন্দ-কালচারে সংস্কার ও স্বাধীন বন্ধি, আচার ও বিচারের আপেক্ষিক স্থানটা কী, এবং সেই আপেক্ষিকতায় আমাদের দেশকে অন্য-সকল দেশের চেয়ে উৎকর্ষ কেন দিয়েছে, এই নিয়ে চায়ের টেবিলে তপ্ত চায়ের ধোঁয়ার মতোই সক্ষম আলোচনায় বাতাস আদ্র ও আচ্ছন্ন হবার আশর সম্ভাবনা আছে। এ দিকে সোনালি পত্ৰলেখায় মণ্ডিত অখণ্ডিতপরবতী নবীন বহিগুলি সদ্য দোকান থেকে আমার তাকিয়ার পাশে প্রতীক্ষা করছে; শুভদটিমাত্র হয়েছে, কিন্তু এখনো তাদের ব্রাউন মোড়কের অবগঠিন মোচন হয় নি; তাদের সম্বন্ধে আমার পবরাগ প্রতি মহতে অন্তরে অন্তরে প্রবল হয়ে উঠছে। তব বেরোতে হল; কারণ, ধবেত্রতার ইচ্ছাবেগ প্রতিহত হলে সেটা তার বাক্যে ও অবাক্যে এমন-সকল ঘণিরপ ধারণ করে, যেটা আমার পক্ষে বাস্থ্যকর নয়। বাড়ি থেকে অলপ একটা বেরিয়েছি। যেখানে রাস্তার ধারে কলতলা পেরিয়ে খোলার চালের ধারে পথলোদর হিন্দুস্থানি ময়রার দোকানে তেলে-ভাঙ্গা নানা-প্রকার অপথ্য সন্টি হচ্ছে তার সামনে এসে দেখি বিষম একটা হাল্লা। আমাদের প্রতিবেশী মাড়োয়ারিরা নানা বহমাল্য পুজোপচার নিয়ে যাত্রা করে সবে-মার বেরিয়েছে। এমন সময় এই জায়গাটাতে এসে ঠেকে গেল। শনতে পেলেম মার-মার ধবনি। মনে ভাবলাম, কোনো গাঁটকাটাকে শাসন চলছে। মোটরের শিঙা ফুকতে ফুকতে উত্তেজিত জনতার কেন্দুের কাছে গিয়ে দেখি আমাদের পাড়ার বড়ো সরকারি মেথরটাকে বেদম মারছে। একট আগেই রাস্তার সংস্কার কলতলায় স্নান সেরে সাফ কাপড় পরে ডান হাতে এক বালতি জল ও বগলে কাঁটা নিয়ে রাস্তা দিয়ে সে যাচ্ছিল। গায়ে চেক কাটা মেরজাই, আঁচড়ানো চুল ভিজে; বা হাত ধরে সঙ্গে চলেছিল আট-নয় বছরের এক নাতি। দজনকেই দেখতে সশ্রী, সঠোম দেহ। সেই ভিড়ে কারও সঙ্গে বা কিছর সঙ্গে তাদের ঠেকাঠেকি হয়ে থাকবে। তার থেকে এই নিরন্তর মারের সন্টি। নাতিটা কাঁদছে আর সকলকে অননয় করছে, "দাদাকে মেরো না।” বড়োটা হাত জোড় করে বলছে, “দেখতে পাই নি, বাঝতে পারি নি, কসর মাফ করো।” অহিংসারত পণ্যাথীদের রাগ চড়ে উঠছে। বড়োর ভীত চোখ দিয়ে জল পড়ছে, দাড়ি দিয়ে রক্ত। আমার আর সহ্য হয় না। ওদের সঙ্গে কলহ করতে নামা আমার পক্ষে অসম্ভব । স্থির করলাম, মেথরকে আমার নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে দেখাব আমি ধামিকদের দলে নই। চঞ্চলতা দেখে কলিকা আমার মনের ভাব বুঝতে পারলে । জোর করে আমার হাত চেপে ধরে বললে, “করছ কাঁ। ও যে মেথর!” আমি বললাম, “হোক-না মেথর, তাই বলে ওকে অন্যায় মারবে?" কলিকা বললে, “ওরই তো দোষ। রাস্তার মাঝখান দিয়ে যায় কেন। পাশ কাটিরে গেলে কি ওর মানহানি হত।" আমি বললাম, “সে আমি বকি নে, ওকে আমি গাড়িতে তুলে নেবই।” কলিকা বললে, “তা হলে এখনি এখানে রাস্তায় নেমে যাব । মেথরকে গাড়িতে নিতে পারব না—হাড়িডোম হলেও বকতুম, কিন্তু মেথর!” আমি বললাম, "দেখছ না স্নান করে ধোপ দেওয়া কাপড় পরেছে ? এদের অনেকের চেয়ে ও পরিকার।" “তা হোক-না, ও যে মেথর!” শোফারকে বললে, "গঙ্গাব্দীন, হাঁকিয়ে চলে যাও।” আমারই হার হল। আমি কাপরাষ। নয়নমোহন সমাজতত্ত্বঘটিত গভীর ব্যক্তি বের করেছিল—সে আমার কানে পেছিল না, তার জবাবও দিই নি। মাদাজ २ अष्ठे ०००6