গৌড়লেখমালা (প্রথম স্তবক)/নয়পালদেবের শাসন-সময়ের প্রস্তর-লিপি


 

নয়পালদেবের শাসনসময়ের প্রস্তর-লিপি।

[কৃষ্ণদ্বারিকা-মন্দিরলিপি]
প্ৰশস্তি-পরিচয়।

 গয়াধামের কৃষ্ণদ্বারিকা-মন্দিরটি প্ৰায় শতবর্ষ পূর্ব্বে দামোদর লাল ধোক্‌রী [গয়ালী] কর্ত্তৃক নির্ম্মিত হইয়াছিল। তৎপূর্ব্বেও ঐ স্থানে একটি পুরাতন মন্দির বিদ্যমান ছিল বলিয়াই আবিষ্কার-কাহিনী। বোধ হয়। আধুনিক মন্দিরের প্রবেশদ্বারে, একটি পুরাতন প্রস্তর-লিপি দেখিতে পাইয়া, কানিংহাম তাহার একটি প্রতিলিপি মুদ্রিত করিয়া গিয়াছিলেন।[১] লিপিটি অদ্যাপি বর্ত্তমান আছে, এবং তাহার সহিত নয়পালদেবের শাসন-সময়ের পরিচয় সংযুক্ত রহিয়াছে। এই লিপি বিশ্বাদিত্য নামক এক ব্যক্তির [বিষ্ণুমন্দির-নির্ম্মাণের] প্রশস্তি হইলেও, এক্ষণে যে মন্দিরের সহিত ইহার সম্বন্ধ দেখিতে পাওয়া যায়, তাহার নামানুসারে ইহা “কৃষ্ণদ্বারিকা-মন্দিরলিপি” নামেই পণ্ডিত-সমাজে সুপরিচিত হইয়াছে।

 কানিংহাম এই প্রস্তর-লিপির পাঠোদ্ধার করিতে অসমর্থ হইয়া, ইহাকে নয়পালদেবের বিজয়-রাজ্যের পঞ্চদশ সংবৎসরের প্রস্তর-লিপি বলিয়াই সংক্ষেপে পরিচয় প্রদান করিয়া গিয়াছেন। পাঠোদ্ধার-কাহিনী। ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল ইহার পাঠোদ্ধারের জন্য চেষ্টা করিয়াছিলেন; কিন্তু তিনিও কৃতকার্য্য হইতে না পারায়, তদ্বিবরণ সোসাইটির পত্রিকায় উল্লিখিত হইয়াছিল।[২] অবশেষে শ্রীযুক্ত মনোমোহন চক্ৰবর্ত্তী এম-এ এই প্রস্তর-লিপির পাঠোদ্ধার করিয়া, সোসাইটির পত্রিকায় প্রকাশিত করিয়াছেন।[৩] বঙ্গ-সাহিত্যে এই লিপি এখনও অপরিচিত বলিলে অত্যুক্তি হয় না। শ্রীযুক্ত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এম-এ এবং শ্রীযুক্ত প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বারিষ্টার মহোদয় অনুসন্ধান-সমিতিকে এই প্রস্তর-লিপির প্রতিলিপি প্রদান করিয়া ধন্যবাদের পাত্র হইয়াছেন।

 এ পর্য্যন্ত এই লিপির আদ্যন্তের অনুবাদ কোন ভাষায় প্রকাশিত হয় নাই। চক্ৰবর্ত্তি-মহাশয় ইহার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণমাত্রই প্রকাশিত করিয়া গিয়াছেন। কানিংহাম-প্রকাশিত ব্যাখ্যা-কাহিনী। প্রতিলিপি, চক্ৰবর্ত্তি-মহাশয় কর্ত্তৃক উদ্ধৃত পাঠ, এবং বন্দ্যোপাধ্যায় ও মুখোপাধ্যায় মহাশয়গণের প্রেরিত প্রতিলিপি অবলম্বন করিয়া, ইহার একটি বঙ্গানুবাদ সম্পাদনের চেষ্টা করা হইল। ইহাতে নয়পালদেবের শাসনসময়ের [গয়া-প্রদেশের] কিছু কিছু বিবরণ প্রাপ্ত হইবার সম্ভাবনা আছে।

 এই প্রস্তরলিপির অক্ষর-বিন্যাস লিপি-সৌন্দর্য্যের পরিচয় প্রদানের উপযুক্ত হইলেও, [৪র্থ এবং ৭ম হইতে ১৪শ পংক্তি পর্য্যন্ত] স্থানে স্থানে অক্ষরগুলি ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়াছে। প্ৰস্তর-ফলকের লিপি-পরিচয়। ২ ফুট ৪ ইঞ্চ × ১ ফুট স্থান এই লিপিতে পূর্ণ হইয়া রহিয়াছে। পংক্তিসংখ্যা ১৮। তাহাতে “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়” হইতে আরম্ভ করিয়া, সংস্কৃতভাষা-নিবদ্ধ ২১ শ্লোক উৎকীর্ণ হইয়াছিল। চক্ৰবর্ত্তি-মহাশয় বহু ক্লেশে তাহার পাঠোদ্ধার সাধিত করিয়াছেন।

 নয়পালদেবের শাসন-সময়ে গয়াধামে বেদাধ্যয়নের এরূপ আতিশয্য ছিল যে, বেদাভ্যাস-পরায়ণ দ্বিজগণের “উদ্গীর্ণোগ্র-পাঠক্রমে” লোকে পরস্পরের বাক্যালাপ শ্রবণ করিতেও অসুবিধা লিপি-বিবরণ। বোধ করিত। সেই গয়াধামে, তৎকালে বৈদিক যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হইত, [৩ শ্লোক] তথাকার মহাদ্বিজ-বংশোদ্ভব পরিতোষের পৌত্র, শূদ্রকের পুত্র, বিশ্বাদিত্য [৫-১৭ শ্লোক] জনার্দ্দনের মন্দির নির্ম্মাণ করিয়াছিলেন। ইহাই এই প্রস্তর-লিপির সংক্ষিপ্ত বিবরণ। সহদেব নামক কোনও “বাজিবৈদ্য” [অশ্ব-চিকিৎসক] এই প্রশস্তি রচনা করিয়াছিলেন, [১৯ শ্লোক] এবং শ্রীমদধিপসোমের পুত্র শ্রীমৎ সট্টসোম এই প্রশস্তি উৎকীর্ণ করিয়াছিলেন। [২০ শ্লোক] শ্রীযুক্ত চক্ৰবর্ত্তি-মহাশয় কবির নাম “সহদেব” বলিয়াই, লিখিয়াছেন।[৪]


 

প্রশস্তি-পাঠ।

ॐ नमो भगवते वासुदेवाय॥
उन्निद्र-नीलकमलाकर-काय-कान्तिः
स्वर्ण्णाभिराम-रुचिर-द्युति-पीतवासाः।
उद्भास्यमान इव चञ्चलया घनौघो
विष्णुः प्रियाद्वय-वरेण युनक्तु युष्मान्॥(১)

व्यानिर्म्माय समस्तवस्तु-सुखिनो विप्रान् प्रजानां पति-
र्या मध्यास्त इवात्मनैव परितो मूर्त्ति-प्रपञ्चं दधत्।
उत्तुङ्गैः शरदभ्र-शुभ्र-शुचिभिः सौधैः कृतालङ्कृति-
र्म्मोक्षद्वार मनर्ग्गलं ज-
गति सा श्रीमद्गया गीयते॥(২)
वेदाभ्यास-परायण-द्विजगणोद्गीर्ण्णोग्र-पाठक्रमा-
दुच्चै रुच्चरित-ध्वनिव्यतिकरै र्यत्नावधार्या गिरः।
किञ्चाजस्रित-होम-धूमपटल-ध्वान्तावृतौ साम्प्रतं
धर्म्मो
यत्र महाभयादिव कलेः कालस्य संतिष्ठते॥(৩)
अत्यादृतै र्ग्गुणनयै [रु रु]‑नी[लपद्मा-
निश्च्छद्म-सद्मनि सतां सुकृताभिमर्शे।
नीहार-हार-शरदिन्दु-विबुद्ध-कुन्द-
सन्दो]ह-सुन्दर-महाद्विजराज-वंशे(৪)
॥ अजातलक्ष्म-द्विजराज-शेखरः
समन्ततो भूरि-विभूति-भूषणः।
बभूव धन्यो गिरिराज-पुत्रिका-
प्रियोपमेयः परितोष-संज्ञकः॥(৫)
अनन्य-सामान्य-दिगन्त-मन्दिरैः
त्रिवर्ग्ग-संसर्ग्गि-गुणा-
श्रयै र्जगत्।
शरत्-सुधाधाम-गभस्ति-तस्करैः
समन्ततो यस्य यशोभि रावृतम्॥(৬)
द्विजवर-विनता-नन्दन-निरन्य-गतिकः समाश्रितो लक्ष्म्या।

तस्य तदनु तनु-जन्मा मुररिपु रिव शूद्रको भूतः॥(৭)
दूरोद्यात-शरत्-सुधानिधि-सुधा-कु[न्दाभिरामच्छवि-
च्छायै श्च्छन्न मभूद् यशो]भि रभितो यस्य [त्रिलोकी-तलम्]
कर्पूरै रिव पूरि[तं] मलय[ज]क्षो[दै] रिवालेपितं
क्षुब्ध-क्षीर-पयोधि-तुङ्गलहरी-लेहै रि[वा]प्ला-
वितं॥(৮)
सत्यं धर्म्म‑सुते स्थिरत्व मचले गाम्भीर्य्य मम्भोनिधौ
वह्वाश्चर्य्यगुणा मतिः सुरगुरौ तेजस्विता भास्वति।
[एते स]न्ति गुणाः पृथक् [पर]मु[द]ञ्चद्भि र्जिगीषा-रसै-
र्व्विश्वादित्य मजीजनत् सुत-
मसा वेभिः समस्तैः श्रितम्॥(৯)
य स्तापान्तकरः [सुधानिधि रिवापूर्णः कलानां गणै
र्य स्तुङ्गाभ्यु]दयाश्रितो रवि रिव प्रौढ़ प्रता[पो]दयः।
प्रत्यन्तःकरणाभिवाञ्छित-फलाजस्र-प्रदानश्रिभिः
श्लिष्टो
१० जङ्गम-कल्पवृक्ष इव यो जातः समस्तार्थिनाम्॥(১০)
[दोर्द्दण्डद्वय चण्डविक्रम-कशा-दिग्वाजि-शौर्य्याद्भुत-
क्रीड़ोन्मूलित-वारिवर्ग्ग-विपिनः प्रौढः प्रतापा(?)रुणः।
वार्य्यालीषु] यथाब्धि रापदि [त]था प्रव्य-
११ क्त-धैर्य्यक्रम:
किञ्च प्राकृत-सर्व्वगर्व्व-[विमुखः सम्पत्स्वनल्पास्वपि॥(১১)
श्रियान्यव्यासङ्गो विस]दृश-समाचार-विकलो
जनो मद्येनेव स्खलन सुपहासञ्च भजते।

इ[यं] सा यस्य श्रीः समुचित-वि-
१२ लासाभ्युदयिनी
यथार्थालङ्का[र]ः समधिक जनान[न्द]वि[षय]ः॥(১২)
[यस्याकृत्रिम-मेदुराश्रित-मही]पर्य्यन्त-सम्वासिभि-
[र्न्नृत्यारम्भ-विजृ[म्भनो]द्धत-[भु]जै रुद्गीयमाना जनैः।
सानन्दोत्पुलकं
१३ विमान म[स]कृ द्देवै र्विलम्व्याम्बरे
श्लाघा-घूर्णि[त-मूर्द्धभि-र्निपतितैः(?) कीर्त्तिः समाकर्ण्यते॥(১৩)
साभ्यसू]य-परितोष-लेशतो वीक्षितानि शनकैः सकटा[क्षं]।
[यस्य] विद्विड़नुकूल-कुलानि प्राप्नुवन्ति निध-
१४ नानि धना[नि]॥(১৪)
निनदन्ति दन्तिवरहन्ति(?) यानि कुचितानि[तानि च दुरुन्नयानि।
अति]मन्दमन्द-मतिगह्वरासु निवसन्ति सन्ति गिरि-कन्दरा[सु]।(১৫)
सन्त[ते]न ततेन तेजसा दुर्न्नयस्य नयस्य विद्वि-
१५ षां।
आकुलानि कुलानि दुर्ग्गमा द्दुर्ग्गतानि गतानि दुर्ग्गमम्॥(১৬)
सप्ताम्बु राशि-विस[रत्-श्लथमेख]लाया
अस्या [भूवः] कति न भूमि[भु]जा बभूवुः।
सिद्धिंं न कस्यचिदगाद्यदनल्प-कल्पै-
स्तेनात्र कीर्त्तनम-
१६ कारि जनार्द्दनस्य॥(১৭)
कैलासाचल‑श्रृङ्ग‑सम्भ्रम मधःकुर्व्वत् प्रोरूढ़ोदय-
प्रालेय-द्यु[ति-कुन्द-सु]न्दर-यशः-[पुञ्जो]पमेयाकृति।


यत्रोत्तुङ्ग-शिखाग्र-सङ्गत-शरच्चन्द्रांशु-शुभ्र-श्रिभि-
र्म्मु[ञ्च]न्नूतन-मञ्जरी रिव पता-
१७ काभि र्न्नभो राजते॥(১৮)
वाजिवैद्य-सहदेव-निरुक्तिः तत् प्रशस्ति रिय मस्तु नितान्तं
प्रेमसौहृद-सुखैकधरित्री सज्जनस्य हृदये रमनीव॥(১৯)
श्रीमतोऽधिपसोमस्यात्मजेनार्ज्जितं यशः।
उत्
१८ कीर्ण्ण-कर्म्मणि श्रीमत् सट्टसोमेन शिल्पिना॥(২০)
समस्त-भुमण्डलराज्यभार-
माविभ्रति श्रीनयपालदेवे
विलिख्यमाने दशपञ्च-संख्य-
सम्वत्सरे सिद्धि मगाच्छ की[र्त्तेि]ः॥(২১)


 

বঙ্গানুবাদ।

(১)

 প্রস্ফুটিত-নীলকমল-বনতুল্য[৫] দেহকান্তি-বিশিষ্ট, সুবর্ণবৎ নয়নাভিরাম রমণীয় দ্যুতি-খচিত পীতবসনধারী, [অতএব] বিদ্যুদামোদ্ভাসিত ঘনঘটাবৎ প্রতীয়মান, বিষ্ণু [লক্ষ্মী-সরস্বতী] প্রিয়তমা-যুগলের আশীর্ব্বাদের সহিত[৬] তোমাদিগকে সংযুক্ত করুন।

(২)

 সমস্ত-বিষয়-পরিতৃপ্ত বিপ্রগণকে সৃষ্টি করিবার পর, প্রজাপতি [ব্রহ্মা] যেন চতুর্দ্দিকে নিজের মূর্ত্তি-সমূহ[৭] ধারণ করিয়া, যেখানে নিজেই অবস্থিতি করিয়াছিলেন, সেই শারদীয়-মেঘমালার ন্যায় শুভ্র-শুদ্ধ সমুচ্চ সৌধমালায় সমলঙ্কৃত[৮] শ্রীমদ্‌গয়াধাম জগতে অর্গলশূন্য মোক্ষদ্বার [বলিয়া] গীত হইয়া থাকে।

(৩)

 তথায় বেদাভ্যাস-পরায়ণ দ্বিজগণের কণ্ঠ-নিঃসৃত[৯] [শিক্ষা-স্বর-সমাজুষ্ট] পাঠ-পদ্ধতিক্রমে[১০] উচ্চৈঃস্বরে উচ্চরিত পাঠধ্বনির সংমিশ্রণে [অন্য] বাক্যালাপ সযত্নে বোধগম্য হইয়া থাকে। [কিঞ্চ] সেখানে নিরন্তর যে হোম-ধূমরাশি উদ্গত হইতেছে, তাহার তিমিরাবরণের মধ্যেই ধর্ম্ম, কলিকালের মহাভয়ে, সম্প্রতি [আত্মগোপন করিয়া] অবস্থিতি করিতেছেন।

(৪—৫)

 যে বংশ, অতিশয় সমাদৃত গুণসংযুক্ত ব্যবহারনীতির প্রভাবে [উরুনীলপদ্মার] মহানীল-সরস্বতীর ছদ্মহীন গৃহতুল্য, সেই সজ্জন সম্পর্ক-সংযুক্ত নীহার-মনোহর[১১] শরচ্চন্দ্ৰ-[কিরণে] প্রস্ফুটিত কুন্দ-কুসুমরাশির ন্যায় পরম সুন্দর মহাদ্বিজরাজবংশে—গিরিরাজপুত্রিকা [উমার] প্রিয়তম [মহেশ্বরের] সহিত উপমালাভের যোগ্য, পরিতোষ-নামক ধন্য পুরুষ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। মহেশ্বর [অ-জাতলক্ষ্মা[১২]] অলক্ষ্য-জন্মা, [দ্বিজরাজ-শেখরঃ] চন্দ্ৰশেখর, এবং [সমন্ততো ভূরি-বিভূতি-ভূষণঃ[১৩]] চতুর্দ্দিকে প্রচুর ভস্ম-ভূষণে বা অষ্টবৈভবে অলঙ্কৃত; পরিতোষও তদ্বৎ [অজাতলক্ষ্মা] সমকক্ষ-শূন্য, [দ্বিজরাজ-শেখরঃ] ব্রাহ্মণাগ্রগণ্য, এবং [সমন্ততো ভূরি-বিভূতি-ভূষণঃ] সর্ব্বতোভাবে প্রচুর ঐশ্বর্য্য-ভূষণে অলঙ্কৃত।

(৬)

 তাঁহার অসাধারণ, দিগন্তব্যাপী, ধর্ম্মার্থকাম-[ত্রিবর্গ-][১৪] সংসৃষ্ট-গুণাবলীর আধার, শরচ্চন্দ্ৰ-কিরণাপহারী যশোরাশিতে এই জগৎ সর্ব্বত্র আবৃত হইয়া রহিয়াছে।

(৭)

 তাঁহার পর, মুরারির ন্যায় শূদ্রক নামক তাঁহার [এক] আত্মজ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। মুরারি যেমন [দ্বিজবর-বিনতানন্দন-নিরন্যগতিকঃ[১৫]] পক্ষিবর গরুড় ব্যতীত অন্য বাহনশূন্য, এবং [লক্ষ্ম্যা সমাশ্রিতঃ] লক্ষ্মীদেবীর সহিত চির-সংযুক্ত; তিনিও সেইরূপ [দ্বিজবর-বিনতা-নন্দন-নিরন্য-গতিকঃ] ব্রাহ্মণগণের এবং যাচকগণের আনন্দবর্দ্ধনার্থ অনন্যকর্ম্মা, এবং [লক্ষ্ম্যা সমাশ্রিতঃ] ঐশ্বর্য্য-সংযুক্ত ছিলেন।

(৮)

 শরচ্চন্দ্ৰ-সুধা [সমুদ্ভাসিত]-সুদূরপ্রস্থিত নয়নাভিরাম কুন্দ-কুসুমশোভার প্রতিবিম্ববিশিষ্ট[১৬] তাঁহার যশোরাশিতে ত্রিলোকীতল আচ্ছন্ন হইয়াছিল বলিয়া, তাহা যেন কর্পূর-পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল; শ্বেতচন্দন-চূর্ণ-চর্চ্চিত হইয়া গিয়াছিল, ক্ষুব্ধ-ক্ষীরসমুদ্রোত্থিত সমুচ্চ-লহরী-লেহে প্লাবিত হইয়া গিয়াছিল।

(৯)

 ধর্ম্মপুত্র [যুধিষ্ঠিরে] সত্যবাক্য, পর্ব্বতমালায় স্থিরত্ব, সমুদ্ৰে গাম্ভীর্য্য, সুরগুরু [বৃহস্পতিতে] বহু-আশ্চর্য্য-গুণশালিনী বুদ্ধি, ভাস্করে তেজস্বিতা;—এই সকল গুণ পৃথক্ পৃথক্ লক্ষিত হইয়া থাকে; কিন্তু [শূদ্রক] তদীয় উদ্বেলিত জিগীষা-রসে [এই ব্যবস্থাকে পরাভূত করিবার অভিপ্রায়ে] একাধারে এই সকল গুণান্বিত বিশ্বাদিত্য নামক পুত্রকে জন্মদান করিয়াছিলেন।

(১০)

এই পুত্ৰ, ষোড়শ-কলা-পরিপূর্ণ তাপান্তকর সুধানিধি [চন্দ্রের] ন্যায়,[১৭] চতুঃষষ্টিকলা-সম্পন্ন বলিয়া, [লোক-সমাজের] তাপান্তকর ছিলেন। সমুন্নত-শৈলশিখরারূঢ়, প্রখর-কিরণ-প্রকাশক মার্ত্তণ্ড-দেবের ন্যায়, তিনিও অত্যুচ্চ সমুন্নতি লাভ করিয়া, প্রবল প্রতাপান্বিত হইয়াছিলেন। তিনি অজস্রভাবে সমস্ত যাচকগণের প্রত্যেকের অন্তঃকরণের অভিলষিত ফল প্রদানের শোভায় সমন্বিত হইয়া, যেন [জঙ্গম] বিচরণ-শীল কল্পবৃক্ষরূপেই প্রতিভাত হইতেন।

(১১)

 তাঁহার বাহু-দণ্ড-যুগলের প্রচণ্ড বিক্রম-[রূপ]-কশার আঘাত প্রাপ্ত দিগ্বাজিসমূহের শৌর্য্য-সঞ্জাত অদ্ভুত ক্রীড়ায় তাঁহার অরাতি-কানন উৎপাটিত হইত; তিনি প্রবল প্রতাপে অরুণ-রাগ-রঞ্জিত ছিলেন। মহাসাগর যেমন[১৮] আলীর সমীপবর্ত্তী হইয়া [বাধাপ্রাপ্ত হইয়াও, তাহাতে বিক্ষুব্ধ না হইয়া] ধৈর্য্য প্রকাশ করিয়া থাকে;—তিনিও সেইরূপ আপৎকাল সন্নিহিত হইলে, ধৈর্য্য প্রকাশ করিতেন; [কিঞ্চ] প্রচুর সম্পদের অধিকারী হইয়াও, তিনি[১৯] প্রাকৃত জনগণের ন্যায় গর্ব্বপ্রকাশ করিতেন না।

(১২)

 যে ব্যক্তি, [অন্য-ব্যাসঙ্গঃ] অসদ্বিষয়ে দৃঢ়াসক্ত হইয়া, অসমুচিত ব্যবহারে [বিকলঃ] দুর্ব্বল হইয়া পড়িয়াছে, সে ধনলাভ করিলে, তাহা মদ্যের ন্যায় তাহাকে পদস্খালিত এবং উপহাসাস্পদ করিয়া থাকে। কিন্তু সেই ধন বিশ্বাদিত্যের পক্ষে সমুচিত বিলাসের অভ্যুদয় সাধন করিত, তাহা তাঁহার পক্ষে যথার্থই অলঙ্কার বলিয়া প্রতিভাত হইত, এবং তাহাতে জনসমাজেরও সমধিক আনন্দ উপস্থিত হইত।

(১৩)

 পৃথিবী যতদূর তাঁহার অকৃত্ৰিম স্নিগ্ধতার আশ্রয় লাভ করিয়াছিল, ততদূর পর্য্যন্ত পৃথিবী-নিবাসী লোকসমাজ নৃত্যারম্ভচেষ্টায় ঊর্দ্ধোত্থিত বাহুযুগলে তাঁহার কীর্ত্তি কীর্ত্তন করিতেছে দেখিয়া, আনন্দ-পুলকিত-কলেবরে দেবগণ অম্বরপথে বিমান অবনমিত (বিলম্বিত) করিয়া, শ্লাঘা-ঘূর্ণিত-মস্তকে নিপতিত (?) হইয়া, সেই কীর্ত্তি-কীর্ত্তন শ্রবণ করিতেন।

(১৪)

 তাঁহার পরিতোষের বা অসূয়ার লেশমাত্র উপস্থিত হইলে, তাঁহার সুধীর কটাক্ষপাতমাত্রে তদীয় অনুকূল জনগণ ধনলাভ করিতেন, প্ৰতিকূল জনগণ নিধন প্রাপ্ত হইতেন।

(১৫)

 নিনাদশীল দন্তিবরগামী যে তারশব্দ[২০] তাহা অতিমন্দমন্দভাবে অতিগভীর গিরি-গূহাতে দুরুন্নয় হইয়া বাস করিয়া থাকে।

(১৬)

 দুর্ব্বিজ্ঞেয়[২১] নীতির সর্ব্বত্র সন্নিবেশ-প্ৰভাবে, তাঁহার বিষমদশা-প্রাপ্ত ব্যাকুল অরাতিকুল দুর্গম হইতেও সুদুর্গম স্থান প্রাপ্ত হইয়া থাকে।

(১৭)

 সপ্তসমুদ্ররূপ (শ্লথ) চলনশীল-শিথিল-মেখলা-বিশিষ্ট এই বসুন্ধরার কত না ভূমিপতি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন; [কিন্তু] দীর্ঘকালেও কাহারও যে [মন্দির][২২] সমাধা লাভ করে নাই, তিনি [বিশ্বাদিত্য] এখানে জনার্দ্দনের সেই মন্দির নির্ম্মিত করাইয়াছেন।[২৩]

(১৮)

 এই মন্দির কৈলাস-শিখরের সম্ভ্রমকে পরাভূত করিয়া, হিমানী-দ্যুতিসম্পন্ন কুন্দ-সুন্দর যশোরাশির সমুন্নত পুঞ্জরূপে প্রতিভাত হইতেছে। তাহার অত্যুচ্চ শিখরাগ্র-নিবদ্ধ শরচ্চন্দ্ৰের শুভ্র শোভাবিশিষ্ট পতাকারাশিতে, নভঃস্থল যেন নূতন মঞ্জরী মুঞ্চন করিতে করিতে শোভা প্রাপ্ত হইতেছে।

(১৯)

 বাজিবৈদ্য-সহদেব-বিরচিত তদীয় এই প্রশস্তি সজ্জন-হৃদয়ে রমণীর ন্যায় প্রেম-সৌহৃদ-সুখের একমাত্র আধার হইয়া নিরতিশয়িত ভাবে বিরাজ করিতে থাকুক।

(২০)

 শ্রীমৎ অধিপসোমের পুত্র সট্টসোম নামক শিল্পী [এই প্রশস্তির] উৎকীর্ণ-কর্ম্মে যশঃ উপার্জ্জন করিয়াছেন।

(২১)

 সমস্ত-ভূমণ্ডল-রাজ্যভার-ধারণকারী শ্রীনয়পালদেবের বিলিখ্যমান-বিজয়রাজ্যের পঞ্চদশ সংবৎসরে এই মন্দির সমাপ্ত হইয়াছে।

 

 

মূলপাঠের টীকা

^(১)  বসন্ততিলক। প্রস্তরফলকে এবং কানিংহামের প্রতিলিপিতে “পীতবাসাঃ” পাঠই দেখিতে পাওয়া যায়। চক্রবর্ত্তি-মহাশয় “পীতবাসঃ” পাঠ উদ্ধৃত করিয়াছেন।

^(২-৩)  শার্দ্দূল-বিক্রীড়িত।

^(৪)  বসন্ততিলক। বন্ধনী-মধ্যস্থ অক্ষরাবলী অস্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। চক্রবর্ত্তি-মহাশয় “পদ্মা”কে ‘পদ্ম’ পাঠ করিয়াছেন।

^(৫-৬)  বংশস্থবিল।

^(৭)  আর্য্যা।

^(৮)  শার্দ্দূল-বিক্রীড়িত।

^(৯)  শার্দ্দূল-বিক্রীড়িত।

^(১০)  শার্দ্দূল-বিক্রীড়িত।

^(১১)  শার্দ্দূল-বিক্রীড়িত।

^(১২)  শিখরিণী।

^(১৩)  শার্দ্দূল-বিক্রীড়িত।

^(১৪)  রথোদ্ধতা—স্বাগতা।

^(১৫)  জগতী।

^(১৬)  অক্ষরাবতী।

^(১৬)  বসন্ততিলক।

^(১৮)  শার্দ্দূল-বিক্রীড়িত।

^(১৯)  স্বাগতা।

^(২০)  অনুষ্টুভ্।

^(২১)  উপজাতি। এই শ্লোকের “সংখ্য”-শব্দে একার দেখিতে পাওয়া যায না।

প্রশস্তি-পরিচয় ও অনুবাদ-অংশের টীকা

  1. Archæological Survey Report, Vol. III, pl. XXXII.
  2. Proceedings A. S. B., August 1879.
  3. J. A. S. B., 1900, pp. 190–195.
  4. “The praçasti was composed by one Sahadeva, who was also a Vāji-Vaidya or Veterinary Physician.”
  5. এই শ্লোকের “নীলকমলাকরে” সমূহার্থক “আকর”-শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে। যথা,—“शब्दाकरकरग्राममर्थमण्डलमण्डलम्” ইতি কবিকল্পদ্রুমঃ। এইরূপ প্রয়োগ ‘নীতিশতকেও’ দেখিতে পাওয়া যায়। যথা,—“पद्माकरं दिनकरो विकचीकरोति”। শ্রেষ্ঠার্থেও “আকর”-শব্দ ব্যবহৃত হইতে পারে।
  6. অর্থাৎ ‘তোমরা আঢ্য ও বিদ্বান্ হও’ বিষ্ণু তোমাদিগকে এই আশীর্ব্বাদ করুন্।
  7. এই শ্লোকে সমূহার্থে “প্রপঞ্চ”-শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে। “प्रपञ्चः सञ्चयेपि स्याद्विस्तरे च प्रतारणे” ইতি মেদিনী।
  8. অত্রস্থ এক এক জন বিপ্র যেন এক একটি ব্রহ্মা। গয়া-মাহাত্ম্যোক্ত ব্রহ্মার বচন হইতে এই শ্লোকের ভাব গৃহীত হইয়াছে। যথা,—

    “लोकाः पुण्यगयायां ये श्राद्धिनो ब्रह्मलोकगाः।
    युष्मान् ये पूजयिष्यन्ति तैरहं पूजितः सदा॥”

  9. ‘উদ্গীর্ণ’-শব্দে ‘কণ্ঠনিঃসৃত’ বুঝিতে হইবে। এখানে “উদ্গীর্ণ”-শব্দের ব্যবহারে [আলঙ্কারিকদিগের মতে] গ্রাম্যতা-দোষ হয় নাই। যথা দণ্ড্যাচার্য্যঃ।

    निष्ठूतोद्गीर्णवान्तादि गौणवृत्ति-व्यापाश्रयम्।
    अति सुन्दरमन्यत्र ग्राम्यकक्षां विगाहते॥”

  10. অগ্নিপুরাণে [৩৩৬ অধ্যায়ে] বেদপাঠক্রম যথা,—

    प्रातः पठेन्नित्यमुरःस्थितेन स्वरेण शार्द्दूलरुतोपमेन।
    मध्यंदिने कण्ठगतेन चैव चक्राह्व-संकूजित-सन्निभेन॥
    तारन्तु विद्यात् सवनं तृतीयां शिरोगतं तच्च सदा प्रयोज्यम्৷
    मयूर-हंसान्यभृतस्वराणां तुल्येन नादेन शिरः-स्थितेन॥”

  11. ভাগবতে [১০৷৭২] মনোহর-অর্থে “হার”-শব্দের ব্যবহার দেখিতে পাওয়া যায়। যথা,—“तदेव हारं वद मन्यसे चेत्।” শ্রীধর স্বামী তাহার এইরূপ ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যথা,—“तदेव हारं हरे श्चरितं मनोहरं वा।”
  12. লক্ষ্ম—“लक्ष्म चिह्न-प्रधानयोः” इत्यमरः। [१৷३৷१२४৷]
  13. বিভূতিঃ—(१) अणिमाद्यष्टप्रकारं वैभवम्, यथा—

    “अनिमा लघिमा प्राप्तिः प्राकाम्यं महिमा तथा।
    ईशित्वञ्च वशीत्वञ्च तथा कामावशायिता॥”

     (२) शिवभृतभस्म वा।

     (३) परात् परतरं तत्त्वं परं ब्रह्मैक मव्ययम्
     नित्यानन्दं स्वयं ज्योति रद्वयं तमसः परम्।
     एेश्वर्य्यं तस्य यन्नित्यं विभूतिरिति गीयते॥

    [কূর্ম্ম-পুরাণ, ১ অধ্যায়]

    অন্যপক্ষে, ‘বিভূতি’-শব্দে সম্পৎ বুঝাইবে। [রঘুবংশ, ৮৷৩৬] এইরূপ প্রয়োগ দেখা যায়। যথা,—

    “अभिभूय विभूति मार्त्तवीं मधुगन्धातिशयेन वीरुधाम्।”

  14. ত্রিবৰ্গ—“त्रिवर्गो धर्म्मकामार्थै श्चतुर्वर्गः समोक्षकैः” इत्यमरः। “सत्त्वरजलमासि” ইতি মেদিনী।
  15. দ্বিজঃ—“दन्त-विप्राण्डजाः द्विजाः” इत्यमरः। দ্বিজঃ = (১) পক্ষী। (২) ব্রাহ্মণ।
    বিনতানন্দনঃ—কশ্যপের অন্যতরা পত্নীর নাম বিনতা ছিল। তিনি অরুণ ও গরুড়ের জননী ছিলেন। অন্যপক্ষে ‘বিনত’-শব্দে আনত যাচক-জনকে বুঝায়।
  16. ছায়া—এই শব্দটিকে এখানে প্রতিবিম্ব কিম্বা সাদৃশ্য অর্থে গ্রহণ করা যাইতে পারে। “छाया सूर्य्यप्रिया कान्तिः प्रतिबिम्ब मनातपः” इत्यमरः। সাদৃশ্যার্থে প্রয়োগ যথা,—“पुत्रच्छायावहम्” इति दत्तकचन्द्रिकायाम्।
  17. কলানাং গণৈঃ—গীত-বাদ্য-নৃত্য-নাট্য প্ৰভৃতি শৈবতন্ত্রোক্ত চতুঃষষ্টি কলার নাম শ্রীধরস্বামি-কৃত শ্রীমদ্ভাগবত-টীকায় দ্রষ্টব্য।
  18. আলিঃ (অলী বা)—“सेतुरालौ स्त्रियाम् पुमान्” इत्यमरः। “আলী” শব্দে কূলককেও (dike) বুঝাইতে পারে।
  19. প্রাকৃতঃ = নীচঃ। “विवर्णः पामरो नीचः प्राकृतश्च पृथग्जनः” इत्यमरः।
  20. কূচিতানি = তারধ্বনিসমূহ। দুরুন্নয়ানি = যাহা দুঃখে অনুমিত হয়। এই শ্লোকের অর্থ সুগম বলিয়া প্রতিভাত হয় না।
  21. দুর্ন্নয়স্য = দুঃখেন নীয়তে জ্ঞায়তে যৎ তৎ। খল্‌প্রত্যয়ে সিদ্ধ পদ।
  22. কীর্ত্তনম্ = মন্দিরম্। “न कीर्त्तनैरलङ्कृता मेदिनी” इति कादम्बरी।
  23. সিদ্ধিম্ = সমাপ্তিঃ ‘Completion’—Apte.