মঙ্গলের পর গ্রহ-কণিকাদের অধিকার, তার পরেই বৃহস্পতির রাজ্য। কাজেই এখন আমাদের বৃহস্পতির কথা বলিতে হইবে।

 জ্যোতিষীরা বৃহস্পতিকে (Jupiter) বলেন “গ্রহরাজ”। বাস্তবিক বৃহস্পতি গ্রহদের রাজা বটে। এত বড় গ্রহ, সূর্য্যের অধিকারের মধ্যে আর একটিও নাই। ইহার আয়তন এত বড় যে, আমাদের পৃথিবীর মত তেরো শত গ্রহ উহার পেটের ভিতরে অনায়াসে লুকাইয়া থাকিতে পারে। বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল প্রভৃতি বাকি সাতটা গ্রহকে ভাঙিয়া যদি একটি গ্রহ নির্ম্মাণ করা যায়, তাহা হইলে সেটিও বৃহস্পতির চেয়ে অনেক ছোট হইয়া দাঁড়ায়। ভাবিয়া দেখ বৃহস্পতি কত প্রকাণ্ড! একটা ছোটখাটো সূর্য্য বলিলেই হয়।

 মোটা মানুষ প্রায় দৌড়িতে পারে না; মোটা হইয়া পড়ায় বৃহস্পতিরও ঠিক্ সেই দশা হইয়াছে। পৃথিবী এক বৎসরে সূর্য্যকে ঘুরিয়া আসে, কিন্তু একবার সূর্য্য প্রদক্ষিণ করিতে বৃহস্পতি বারো বৎসর কাটাইয়া দেয়। অর্থাৎ বৃহস্পতির বারো বৎসর আমাদের এক বৎসরের সমান। তোমরা হয় ত বলিবে, যে লম্বা রাস্তা হাঁটিয়া বৃহস্পতি সূর্য্যকে ঘুরিয়া আসে, পৃথিবী সেই রকম লম্বা পথে ঘুরে না; তাই সে বৃহস্পতির চেয়ে শীঘ্র শীঘ্র সূর্য্যকে প্রদক্ষিণ করে। কথাটা ঠিক্ বটে; কিন্তু বৃহস্পতি যদি একটু জোরে দৌড়িতে পারিত, তাহা হইলে সে কখনই বারো বৎসর সময় লইত না। পৃথিবী প্রতি সেকেণ্ডে


বৃহস্পতি

ঊনিশ মাইল করিয়া দৌড়ায়, কিন্তু বৃহস্পতি দৌড়ায় কেবল আট মাইল করিয়া। এই জন্যই সূর্য্য-প্রদক্ষিণ করিতে তাহার এত দেরি হয়। কিন্তু আর এক দিকে বৃহস্পতির কাছে পৃথিবী হার মানিয়াছে। বৃহস্পতি তাহার মেরুদণ্ডের চারিদিকে খুব শীঘ্র শীঘ্র ঘুরিতে পারে। পৃথিবী এই রকমে ঘুরিতে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা সময় লয়, কিন্তু বৃহস্পতি দশ ঘণ্টার মধ্যে সেই কাজটি সারে। এই জন্য বৃহস্পতির দিনরাত্রির পরিমাণ বড় অল্প। মোটামুটি হিসাবে পাঁচ ঘণ্টা দিন, আর পাঁচ ঘণ্টা রাত্রি। কিন্তু উহার এক এক বৎসর আমাদের বারো বৎসরের সমান।

 আমরা এ-পর্য্যন্ত দেখিয়া আসিয়াছি গ্রহদের নিজের আলো নাই। সূর্য্যের আলো গায়ে পড়িলে তাহাদিগকে উজ্জ্বল দেখায়। কিন্তু বৃহস্পতি-সম্বন্ধে জ্যোতিষীরা একটা নূতন কথা বলেন। তাঁহারা বলেন, ইহার নিজেরি হয় ত একটু-আধ্‌টু আলো আছে। বৃহস্পতির উপরকার রৌদ্রের আলো পৃথিবীর রৌদ্রের আলোর পঁচিশ ভাগের এক ভাগ মাত্র। কিন্তু তথাপি ইহাকে খুবই উজ্জ্বল দেখায়। যদি নিজের আলো না থাকিত, তাহা হইলে কেবল সূর্য্যের আলোতে উহাকে এত উজ্জ্বল দেখাইত না।

 আকারে যতই বড় হউক না কেন, বৃহস্পতির ওজন কিন্তু বেশি নয়। আমরা আগে বলিয়াছি, তাহার আয়তন তেরো শত পৃথিবীর সমান। কিন্তু ওজনের হিসাব করিতে গেলে দেখা যায়, এত বড় জিনিসটা কেবলমাত্র তিন শত পৃথিবীর ওজনের সমান। তাহা হইলে নিশ্চয়ই বুঝিতে পারিতেছ, বৃহস্পতির দেহ পৃথিবীর মাটি-পাথরের মত ভারি জিনিস দিয়া প্রস্তুত নয়,—ইহাতে খুব হাল্‌কা জিনিসই আছে।

 তোমরা দূরবীণ দিয়া কখনো বৃহস্পতিকে দেখিয়াছ কি না জানি না। যদি না দেখিয়া থাক, একবার দেখিয়া লইয়ো। খালি চোখে দেখিলে ইহাকে একটা বড় নক্ষত্রের মত দেখায়। নক্ষত্রেরা যেমন একবার নিভিয়া একবার জ্বলিয়া মিট্-মিটে আলো দেয়, কোনো গ্রহই সে রকমে আলো দেয় না। গ্রহদের মূর্ত্তি স্থির, তাহাদের আলোও অচঞ্চল। নক্ষত্র হইতে গ্রহদিগকে বাছিয়া লইবার এই একটা উপায়। সুতরাং তোমরা যদি খালি চোখে বৃহস্পতিকে দেখ, তাহা হইলে কখনই তাহাকে নক্ষত্রের মত মিট্‌মিট্ করিতে দেখিবে না। কিন্তু খালি চোখে বৃহস্পতিকে দেখা না দেখারই সমান। তাহার প্রকাণ্ড দেহকে এবং সারি সারি চারিটি চাঁদকে খালি চোখে কখনই দেখা যায় না। যদি ছোটখাটো দূরবীণও হাতের গোড়ায় পাও, তাহা হইলে আগে বৃহস্পতিকে দেখিয়ো। তাহার মূর্ত্তি দেখিয়া অবাক্ হইয়া যাইবে।

 বৃহস্পতিকে দূরবীণে যে রকম দেখায়, এখানে তাহার একটি ছবি দিলাম। দেখ,—তারার মত ছোট বৃহস্পতিকে কত বড় দেখাইতেছে। ইহার বাহিরে যে চারিটি ছোট বিন্দু দেখিতেছ, সেগুলি বৃহস্পতির চাঁদ এবং তাহার গায়ে যে-সব কালো দাগ দেখিতেছ, তাহা বৃহস্পতির মেঘ।

 তোমরা মেঘের কথা শুনিয়া বোধ হয় ভাবিতেছ, বৃহস্পতিতে নদী সমুদ্র ও মানুষ আছে। কিন্তু উহাতে এ-সব কিছুই নাই। বৃহস্পতি এখনো ভয়ানক গরম রহিয়াছে;—এত গরম যে, তাহার দেহের খুব ভিতরকার অংশ ছাড়া বাকি সকলই আজও গরম বাষ্পের আকারে আছে এবং হয় ত ঐ বাষ্প এক-একটু জ্বলিতেছে। এই রকম জায়গায় কেমন করিয়া জীবজন্তু থাকিবে? যাহাকে আমরা মেঘ বলিলাম, তাহা ঐ গরম বাষ্প ছাড়া আর কিছুই নয়।

 ১৩২ পৃষ্ঠায় বৃহস্পতির একখানা বড় ছবি দিয়াছি। বড় দূরবীণ দিয়া উহাকে যেমন দেখায়, এটা তাহারি ছবি। ইহাতে মেঘগুলিকে তোমরা আরো ভাল করিয়া দেখিতে পাইবে। বৃহস্পতি দশ ঘণ্টায় তাহার মেরুদণ্ডের চারিদিকে ঘুরে,—তাই উপরকার মেঘগুলিকে উহার


বৃহস্পতি ও তাহার চারিটি চাঁদ

কোমরবন্ধের মত দেখা যাইতেছে। যদি দূরবীণ দিয়া তোমরা বৃহস্পতিকে দেখিতে পার, তাহা হইলে পৃথিবীর মেঘের মত ইহার মেঘগুলিকে চলিতে ফিরিতে দেখিবে।

 ছবির উপরের দিকে একটা বাদামি আকারের দাগ দেখিতে পাইতেছ কি? তোমরা হয় ত উহাকে মেঘ ভাবিতেছ,—কিন্তু মেঘ নয়। জিনিসটা যে কি, তাহা আমিও তোমাদিগকে ঠিক্ বলিতে পারিব না। জ্যোতিষীরাও উহার কথা ঠিক্ বলিতে পারেন নাই।

 প্রায় চল্লিশ বৎসর পূর্ব্বে হঠাৎ একদিন বৃহস্পতির গায়ে ঐ দাগটি দেখা গিয়াছিল। জ্যোতিষীরা ভাবিয়াছিলেন, হয় ত উহা একখানা বড় মেঘ। কিন্তু দুই তিন বৎসরেও যখন উহার আকারের কোনো বদল হইল না, তখন তাঁহারা চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। হিসাব করিয়া দেখা গেল, উহা বৃহস্পতির উপরে প্রায় ত্রিশ হাজার মাইল জায়গা জুড়িয়া আছে। কেহ বলিতে লাগিলেন, বৃহস্পতির বাষ্প জমাট হইয়া তরল হইয়া যাইতেছে, জিনিসটা তাহার উপরকার একটা দ্বীপ। কেহ বলিলেন, সূর্য্যের বাষ্প-মণ্ডলে যেমন ঝড় হয়, বৃহস্পতিতেও সেই রকম ঝড় হয়, ঐ প্রকাণ্ড দাগটি সেই ঝড়েরই চিহ্ন। এই প্রকারে অনেকে অনেক কথাই বলিতে লাগিলেন, কিন্তু সত্য ব্যাপারটি যে কি, তাহা জানা গেল না। আজও বৃহস্পতির গায়ে ঐ দাগ দেখা যায়, কিন্তু গত কয়েক বৎসরে উহার রঙ্ বদলাইয়া গিয়াছে। প্রথমে উহাকে লাল দেখা গিয়াছিল, এখন সাদা হইয়া পড়িয়াছে। এই পরিবর্ত্তন দেখিয়া মনে হয়, আর কয়েক বৎসর পরে হয় ত উহাকে আর দেখাই যাইবে না।

 বৃহস্পতি-সম্বন্ধে যাহা আমাদের জানা আছে, একে একে তাহার প্রায় সবগুলিই তোমাদিগকে বলিলাম। কিন্তু উহাতে অজানা বিষয় এখনো অনেক আছে। নিজের বৃহৎ দেহটিকে মেঘের আবরণে ঢাকিয়া রাখায় বৃহস্পতি বড়ই মুস্কিল করিয়াছে। কাজেই উহার ভিতরকার খবর আমরা জানিতে পারি নাই। লক্ষ লক্ষ বৎসর পরে যখন ইহার সমস্ত মেঘ জমাট বাঁধিয়া আকাশকে পরিষ্কার করিয়া দিবে, তথনি আমরা বৃহস্পতির উপরকার সব খবর জানিতে পারিব।