প্রধান মেনু খুলুন


শুক্র

বুধ-গ্রহের কথা বলা হইল, এখন শুক্রের কথা বলিতে হইবে। শুক্রকে ইংরাজিতে ভিনাস্ (Venus) বলা হয়। বুধগ্রহের পরেই শুক্রের ভ্রমণ পথ এবং শুক্রের পরেই আমাদের পৃথিবীর ভ্রমণ-পথ।

 তাহা হইলে বুঝা যাইতেছে, শুক্র আমাদের পৃথিবীর খুব কাছে আছে। কত কাছে আছে জান কি? হিসাব করিয়া দেখিয়াছি—শুক্র ঘুরিতে ঘুরিতে এক এক সময়ে পৃথিবী হইতে আড়াই কোটি মাইল তফাতে আসিয়া দাঁড়ায়। পৃথিবী হইতে চাঁদ যত দূরে আছে, শুক্র তখন তাহারি এক শত গুণ দূরে আসে। তোমরা হয় ত ভাবিতেছ, যাহা এত দূরে তাহাকে কেমন করিয়া কাছের জিনিস বলা যায়। কিন্তু তোমাদিগকে আগেই বলিয়াছি, এই মহাকাশটি নিতান্ত ছোট জায়গা নয়, তাই তাহাতে যে-সব গ্রহ-নক্ষত্র বাস করে তাহারা খুবই দূরে দূরে থাকে। এই কারণে দু-মাইল দশ মাইল লইয়া ইহাদের দূরত্বের হিসাব করা যায় না, কোটি কোটি লক্ষ লক্ষ মাইল লইয়া হিসাবে বসিতে হয়। সেই হিসাবে শুক্রকে পৃথিবীর কাছের বস্তুই বলিতে হয়।

 পৃথিবীর এত কাছে থাকে বলিয়া শুক্র-সম্বন্ধে অনেক খবর আমাদের জানা আছে। আমাদের দেশের প্রাচীন জ্যোতিষীরা ইহাকে খুব ভাল করিয়া জানিতেন। এজন্য আমাদের পুরাণে এবং অন্যান্য ধর্ম্ম পুস্তকে ইহার অনেক উল্লেখ দেখা যায়। কোনো পুস্তকে শুক্রকে পুরুষ বলিয়া লেখা হইয়াছে, এবং কোনো পুস্তকে তাহাকে স্ত্রীলোক বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। উড়িষ্যায় কণারকের ভাঙা মন্দিরে শুক্রগ্রহের একটা চেহারা পাথরে খোদা আছে। সেখানে শুক্রকে স্ত্রীলোকের আকারই দেওয়া হইয়াছে।

 শুক্রের জন্ম-সম্বন্ধে আমাদের পুরাণে একটি মজার গল্প আছে। শ্রীকৃষ্ণের পুত্র প্রদ্যুম্নের নাম তোমরা হয় ত শুনিয়াছ। ইনি জন্মগ্রহণ করিয়া সম্বর নামে এক অসুরকে বধ করিবেন বলিয়া স্থির ছিল। এই অসুরটি ভয়ানক অত্যাচারী ছিল, স্বর্গ মর্ত্ত্য পাতালের সকলেই ইহাকে ভয় করিয়া চলিত! প্রদ্যুম্নের হাতে মৃত্যু হইবে শুনিয়া সম্বর ভয়ানক চিন্তিত হইয়া পড়িল এবং অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া স্থির করিল, প্রদ্যুম্নের জন্ম হইবামাত্র তাহাকে হত্যা করা ব্যতীত নিজেকে বাঁচাইবার আর উপায় নাই। শ্রীকৃষ্ণের ঘরে প্রদ্যুম্ন জন্মগ্রহণ করিলেন। শ্রীকৃষ্ণ জানিতেন যে, তাঁহার শিশু পুত্রটিকে হত্যা করিবার জন্য সম্বর খুব চেষ্টা করিবে। তাই তিনি ঘরের চারিদিকে কড়া পাহারা বসাইয়া দিলেন। কিন্তু সম্বরের হাত হইতে শিশু প্রদ্যুম্নকে রক্ষা করা হইল না। কোন্ এক সুযোগে ছয় দিনের শিশু প্রদ্যুম্নকে সম্বর চুরি করিয়া একেবারে সমুদ্রের জলে ফেলিয়া দিল। সে ভাবিল, প্রদ্যুম্ন বুঝি মরিয়া গেলেন, কিন্তু সমুদ্রের জলে ডুবিয়াও প্রদ্যুম্নের মৃত্যু হইল না। সমুদ্রের একটা বড় মাছ তাহাকে গিলিয়া ফেলিল। তোমরা হয়ত ভাবিতেছ, মাছটা প্রদ্যুম্নকে খাইয়া হজম করিয়া ফেলিল; কিন্তু তাহা হইল না। ছয় দিনের শিশু প্রদ্যুম্ন মাছের পেটের ভিতরকার গরমে বেশ আরাম বোধ করিতে লাগিলেন এবং দিনে দিনে সেখানে বড় হইতে লাগিলেন।

 এদিকে এক দিন ঐ মাছটি একজন জেলের জালে ধরা পড়িয়া গেল। প্রকাণ্ড মাছটিকে পাইয়া জেলের মনে খুব আনন্দ হইল। কিন্তু এত বড় মাছটিকে খাইবে কে? ইহার দামও অনেক। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া চারিটা মুটের মাথায় বোঝাই দিয়া জেলে মাছ বিক্রয় করিবার জন্য সম্বর অসুরের বাড়ী গিয়া উপস্থিত হইল। সম্বর তখন বাড়ী ছিল না,—হয় ত স্বর্গে গিয়া সে তখন দেবতাদিগকে জ্বালাতন করিতেছিল, না হয় পাতালে গিয়া নাগরাজের লেজ ধরিয়া টানাটানি করিতেছিল। সম্বরের বাড়ীতে কেবল তাহার পালিতা কন্যা মায়াবতী ছিলেন। মায়াবতী পরমাসুন্দরী ছিলেন। বোধ হয় মেয়েটিকে এমন সুন্দরী দেখিয়াই সম্বর তাহাকে খাইয়া ফেলে নাই। সম্বর যে প্রদ্যুম্নকে চুরি করিয়া সমুদ্রে ফেলিয়া দিয়াছে এবং তার পরে তিনি যে মাছের পেটের ভিতরে আছেন, এই সব কথা মায়াবতী আগেই জানিতেন। যখন জেলে একটা প্রকাণ্ড মাছ বিক্রয় করিতে আসিল, তখন মায়াবতী মাছের চেহারা দেখিয়াই বুঝিলেন, প্রদ্যুম্ন এই মাছের পেটের ভিতরে আছেন। জেলে মাছের দাম খুবই বেশি চাহিল, কিন্তু মায়াবতী দরদস্তুর না করিয়া সেই দাম দিয়াই সেই মাছটিকে কিনিয়া লইলেন। তিনি তাঁহাকেও কিছু বলিলেন না এবং নিজেই বঁটি লইয়া মাছ কুটিতে বসিলেন। যাহা ভাবিয়াছিলেন তাহাই হইল,—প্রদ্যুম্ন মাছের ভিতর হইতে বাহির হইয়া পড়িলেন।

 এই ঘটনার পরে কি হইল তাহা বোধ হয় তোমরা জানিতে চাহিতেছ, কিন্তু সে গল্প তোমাদিগকে বলিতে গেলে, আর জ্যোতিষের কথা বলা হইবে না। তোমরা কেবল এইটকু জানিয়া রাখ যে, ষোলো বৎসর বয়সে প্রদ্যুম্ন সম্বরকে মারিয়া ফেলিলে, ঐ মায়াবতীই শুক্রগ্রহের আকার লইয়া আকাশে বাস করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। ইহাই আমাদের পুরাণের মতে শুক্রের জন্মবৃত্তান্ত।

 যাহা হউক শুক্র পৃথিবীর কাছে রহিয়াছে বলিয়া আকাশের ছোট বড় নক্ষত্রদের মধ্যে কোন্‌টি শুক্র তাহা চিনিয়া লইতে কষ্ট হয় না। আকাশের কোন নক্ষত্রটিকে শুক্র বলিতেছি, তাহা বোধ হয় তোমরা বুঝিতে পার নাই। যে নক্ষত্রটি প্রতি বৎসরে কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া সন্ধ্যার সময়ে পশ্চিম আকাশে ধক্ ধক্ করিয়া জ্বলিতে থাকে সেইটি শুক্র। ইহাকে লোকে “সন্ধ্যা তারা” বা “সাঁজের তারা” বলে। তাহা হইলে বুঝা যাইতেছে, শুক্রকে চিনিয়া লইবার জন্য দূরবীণের দরকার হয় না, বা রাত জাগিয়াও বসিয়া থাকিতে হয় না।

 তোমরা “শুক তারা” বা “পোয়াতে তারাকে” দেখিয়াছ কি? সূর্য্য উঠিবার আগে পূর্ব্বের আকাশে ইহাকে দেখা যায়। ইহাও “সাঁজের তারা”র মত ধক্ ধক্ করিয়া জ্বলে। এই নক্ষত্রটাও শুক্র গ্রহ।

 তোমরা বোধ হয় ভাবিতেছ,—এ আবার কি? তাহা হইলে শুক্রগ্রহ কি দুটা? শুক্র দুটা নয়,—একটাই। একটি শুক্রই একসময়ে পশ্চিমে উঠিয়া “সাঁজের তারা” হয় এবং আর এক সময়ে পূবে উঠিয়া “পোয়াতে তারা” হয়। তোমরা যদি পরীক্ষা করিতে পার, তবে দেখিবে বৎসরের যে সময়ে “সাঁজের তারা” পশ্চিমে উঠে, তখন পূবে “পোয়াতে তারা” উঠে না। আবার যখন “পোয়াতে তারা” পূবে উঠিতে আরম্ভ করে, তখন “সাঁজের তারার” সন্ধান পাওয়া যায় না। একই রাত্রিতে সন্ধ্যায় “সাঁজের তারা” উঠিতেছে এবং শেষ রাত্রিতে “পোয়াতে তারা” উঠিতেছে এমন একটি রাত্রিও তোমরা বৎসরের মধ্যে খুঁজিয়া পাইবে না।

 শুক্র আকারে কত বড় বোধ হয় ইহাই তোমরা এখন জানিতে চাহিতেছ। কিন্তু এ-সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলিবার নাই। কেবল জানিয়া রাখ যে, পৃথিবী ও শুক্র যেন দুটি যমজ ভগিনী,—দুটি প্রায় একই রকমের, পৃথিবী কেবল সামান্য একটু বড়। কিন্তু ইহা ছাড়া দুইয়ের মধ্যে আর বেশি মিল দেখা যায় না। পৃথিবীর একটা উপগ্রহ অর্থাৎ চাঁদ

গ্রহ-নক্ষত্র 146a.jpg
শুক্রের কলা

 

গ্রহ-নক্ষত্র 146b.jpg
অর্দ্ধচন্দ্রাকার শুক্র

আছে, কিন্তু শুক্রের একটা ছোট চাঁদও এপর্য্যন্ত খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। পৃথিবী সূর্য্যকে একবার ঘুরিয়া আসিতে তিনশত পঁইষট্টি দিন সময় লয়, কিন্তু শুক্র সূর্য্যকে ঘুরে কেবল মাত্র সাড়ে সাত মাসে। অর্থাৎ শুক্রের বৎসরগুলি আমাদের সাড়ে সাত মাসের সমান। তার পরে পৃথিবী তাহার মেরুদণ্ডের চারিদিকে চব্বিশ ঘণ্টায় ঘুরিয়া এখানে দিনের পর রাত, এবং রাতের পর দিন দেখাইতে থাকে কিন্তু বুধ গ্রহের মত শুক্রের একটা দিকই চিরকালের জন্য সূর্য্যের পানে তাকাইয়া থাকে, তাহার পিছনের আধখানায় কখনো সূর্য্যের আলো পড়ে না। তাহা হইলে দেখ, শুক্রে রাত-দিন হয় না। যে আধখানায় দিন আছে সেখানে চিরকালের জন্যই দিন এবং যে আধখানায় এখন রাত আছে সেখানে চিরকালের জন্যই রাত থাকে।

 তাহা হইলে বুঝা যাইতেছে, পৃথিবী ও শুক্র চেহারায় ঠিক্ দু’টি যমজ বোনের মত হইলেও তাহাদের রকম-সকম সব উল্‌টা।

 এখানে শুক্রের দু’খানা ছবি দিলাম। এগুলি দেখিতে ঠিক্ চাঁদের ছবির মত। চাঁদের মত বুধগ্রহের হ্রাসবৃদ্ধি আছে, ইহা তোমাদিগকে আগে বলিয়াছি। বুধের ভ্রমণ-পথের মত শুক্রের ভ্রমণ-পথ পৃথিবী ও সূর্য্যের মধ্যে আছে; এজন্য বুধের মত শুক্রেরও ক্ষয়বৃদ্ধি হয়। দূরবীণ দিয়া যদি তোমরা শুক্রের ক্ষয়বৃদ্ধি দেখিতে পার, তাহা হইলে অবাক্ হইয়া যাইবে। খালি চোখে যে শুক্রকে একটা আলোকবিন্দুর মত জ্বল্ জ্বল্ করিয়া জ্বলিতে দেখা যায়, তাহাকেই দূরবীণের মধ্যে একটি ছোট চাঁদের মত দেখায়। যদি সুবিধা পাও, তবে একবার দূরবীণ দিয়া শুক্রকে দেখিয়া লইও।

 শুক্রের মত উজ্জ্বল নক্ষত্র সমস্ত আকাশটাতে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। জ্যোতিষীরা হিসাব করিয়া দেখিয়াছেন, আকাশের যে-সব নক্ষত্র খুব উজ্জ্বল তাহাদের কুড়ি পঁচিশটা একত্র না করিলে উজ্জ্বলতা শুক্রের সমান হয় না। কিন্তু শুক্রের এত আলো কোথা হইতে আসে? সে পৃথিবীর চেয়ে সূর্য্যের কাছে আছে, এজন্য আমরা সূর্য্য হইতে যে তাপ ও আলো পাই, শুক্র তাহারি দ্বিগুণ তাপ-আলো পায়। কিন্তু তাহাতেই কি শুক্র এত উজ্জ্বল? বুধগ্রহটি শুক্রের চেয়ে সূর্য্যের কাছে আছে, তবে তাহাকে কেন এত উজ্জ্বল দেখায় না?

 আমি যে-সব প্রশ্ন করিলাম, অনেক দিন আগে জ্যোতিষীরা পরস্পরকে এই সব প্রশ্নই জিজ্ঞাসা করিতেন, কিন্তু ভাল উত্তর তাঁহাদের কাছে পাওয়া যাইত না। কেহ বলিতেন, সূর্য্য যেমন নিজে তাপ ও আলো দেয়, শুক্রও তেমনি নিজে তাপ-আলো দেয়। কিন্তু আজকালকার জ্যোতিষীরা বুড়ো জ্যোতিষীদের এই রকম কথায় বিশ্বাস করেন না। তাঁহারা দেখিয়াছেন, শুক্রগ্রহটি আমাদের পৃথিবী ও চাঁদেরই মত জিনিস, সুতরাং তাহার নিজের আলো নাই! সূর্য্যের আলো গায়ে লাগিলেই সে আলোকিত হয়।

 সকল গ্রহ-নক্ষত্রদের চেয়ে কেন শুক্রকে বেশি উজ্জ্বল দেখায় তাহা আধুনিক জ্যোতিষীরাই স্থির করিয়াছেন। তাঁহারা বলেন, শুক্রের আকাশে বাতাস আছে এবং সেই বাতাসে মেঘ ভাসে। সূর্য্যের আলো এই সব শাদা মেঘের উপরে পড়িয়া এত উজ্জ্বল দেখায়। কেহ কেহ আবার একথাতেও বিশ্বাস করেন না। তাঁহারা বলেন, শুক্রের আকাশে খুব ঘন বাতাস বা ঐরকমের স্বচ্ছ বাষ্প আছে, এবং তাহাতে ধূলার কণা ইত্যাদি খুব ছোট ছোট জিনিস ভাসিয়া বেড়াইতেছে। সূর্য্যের আলো ঐসব কণার উপরে পড়িয়াই শুক্রকে এত উজ্জ্বল করিয়াছে।

 শুক্রের ছবিটা দেখ, তাহাতে মেঘের মত অনেকগুলি কালো কালো দাগ দেখিতে পাইবে। এইগুলিকেই এক দল পণ্ডিত মেঘের চিহ্ন বলিতেন। এখন সেগুলিকে শুক্রের উপরকার উঁচুনীচু মাটির চিহ্ন বলা হইয়া থাকে।

 শুক্রগ্রহের অনেক কথা বলিলাম। তাহাতে মানুষ বা অপর কোনো জীবজন্তু বাস করে কি না, এখন সেই কথা বলিব। শুক্রের একদিকে চিরকালের জন্য দিন এবং আর একদিকে চিরকালের জন্য ঘোর রাত্রি আছে, একথা তোমাদিগকে আগেই বলিয়াছি। সুতরাং ইহার অন্ধকার দিক্‌টা যে বরফের চেয়ে ঠাণ্ডা এবং আলোর দিক্‌টা যে, মরুভূমির মত গরম, একথা তোমরা বোধ হয় অনায়াসে বুঝিতে পারিতেছ। এইজন্যই জ্যোতিষীরা আন্দাজ করেন, শুক্রে যদি জল থাকে, তবে তাহার সকলই বরফ হইয়া অন্ধকারের দিকে জমা হইয়া আছে। আলোর দিক্‌টা গরম, কাজেই সেখানে জলের লেশমাত্র থাকিতে পারে না।

 আমাদের পৃথিবীতে যেমন গরম দেশের বাতাস আকাশের উপর দিয়া ঠাণ্ডা দেশে যায় এবং ঠাণ্ডা দেশের বাতাস গরম দেশে আসে, শুক্রেও ঠিক্ তাহাই হয়। ঠাণ্ডা ও গরম বাতাস তাহার দুই পিঠে চিরদিন ছুটাছুটি করিতে থাকে। চিরকাল ধরিয়া যেন শুক্রের উপর দিয়া প্রকাণ্ড ঝড় বহিয়া যায়।

 খুব গরম মরুভূমির মধ্যে মানুষ বাঁচিয়া থাকে এবং মেরু-প্রদেশের বরফের উপরেও মানুষ ও জীবজন্তুরা বাস করে। তা-ছাড়া খুব প্রবল ঝড়ের মধ্যেও তাহারা নিজেদের রক্ষা করিয়া চলে। কাজেই শুক্রের গরমে, ঠাণ্ডায় এবং জড়ে যে জীবজন্তু বাস করিতে পারে না, একথা কখনই বলা যায় না। জল ও বাতাসই জীবের প্রাণ, সেগুলি যখন শুক্রগ্রহে আছে তখন সেখানে জীবজন্তু থাকারই সম্ভাবনা বেশি নয় কি?

 কিন্তু তাই বলিয়া তোমরা মনে করিও না যে, শুক্রে ঠিক্ তোমার আমার মত মানুষ বা আমাদের গোয়াল ঘরের গরুর মত গরু আছে। পৃথিবীর সহিত শুক্রের কত অমিল রহিয়াছে তাহা আগে বলিয়াছি। কাজেই বিধাতা যদি শুক্র গ্রহে জীব সৃষ্টি করিয়া থাকেন, তবে তাহাদিগকে তিনি কখনই পৃথিবীর অবস্থার সহিত মিলাইয়া সৃষ্টি করেন নাই;—শুক্রের অবস্থার সহিত মিলাইয়াই জীবের সৃষ্টি করিতে হইয়াছে। সেই জন্যই বলিতেছিলাম, যদি তোমরা শুক্রে কি রকম জীব আছে দেখিবার জন্য সেখানে গিয়া উপস্থিত হও, তাহা হইলে সেখানকার জীবজন্তুর আকৃতি-প্রকৃতির সহিত পৃথিবীর জীবজন্তুর হয় ত একটুও মিল দেখিবে না। এক অদ্ভুত সৃষ্টি তোমাদের চোখে পড়িবে। জল তাপ ও আলো না পাইলে গাছপালারা বাঁচে না। শুক্রের অন্ধকার দিক্‌টাতেই কেবল জল, বরফের আকারে থাকে এবং আলো থাকে তাহার অপর অর্দ্ধেকে। কাজেই বিধাতা যদি শুক্রের গাছপালাকে পৃথিবীর গাছপালার মত শিকড় দিয়া মাটিতে বাঁধিয়া রাখেন, তবে তাহারা কখনই বাঁচিয়া থাকিতে পারে না; সুতরাং তোমরা যদি শুক্রগ্রহে গিয়া দেখ যে, সেখানকার গাছপালা পাখীর মত ঝাঁকে ঝাঁকে আকাশে উড়িয়া শুক্রের অন্ধকার দিক্ হইতে জল শুষিয়া লইতেছে এবং তার পরে আলোর দিকে আসিয়া রৌদ্র পোহাইতেছে, তাহা হইলে উহা দেখিয়া তোমাদের আশ্চর্য্য হইবার কারণ থাকে না। শুক্রগ্রহ পৃথিবী নয়, এজন্য সেখানকার কোনো অবস্থার সহিত পৃথিবীর অবস্থার একটুও মিল নাই। কাজেই সেখানকার সৃষ্টির সহিত পৃথিবীর সৃষ্টির মিল না থাকারই কথা। সেই অজানা সৃষ্টি যে কি রকম আমরা তাহা ভাবিয়া চিন্তিয়াও স্থির করিতে পারি না।