প্রধান মেনু খুলুন

গ্রহ-নক্ষত্র/সূর্য্য-জগতের উৎপত্তি


সূর্য্য-জগতের উৎপত্তি

সূর্য্য ও আকাশের অসংখ্য নক্ষত্রেরা যে, একই রকমের জ্যোতিষ্ক, তাহা আগে অনেক বার তোমাদিগকে বলিয়াছি। সূর্য্য আমাদের কাছের জিনিস, তাই ইহার এত বড় আকার, এত তাপ ও আলো। নক্ষত্রেরা দূরে আছে, তাই তাহাদের তাপ বুঝা যায় না এবং আলো এত অল্প হয়।

 তাহা হইলে তোমরা বুঝিতে পারিতেছ, নক্ষত্রেরা যেমন এক-একটা নীহারিকা হইতে জন্মিয়াছে, সূর্য্য ও তাহার উপগ্রহেরা ঠিক্ সেই প্রকার একটা নীহারিকা হইতে জন্মিয়াছে। তাহা হইলে দেখ,—যে পৃথিবীতে আমরা এখন বাস করিতেছি, তাহার মাটি-পাথর এমন কি তোমার আমার দেহের অণুপরমাণু এক দিন প্রকাণ্ড নীহারিকার আকারে আকাশে জ্বলিয়া জ্বলিয়া ঘুরপাক্ খাইত। কত দিন এই রকম জ্বলা-পোড়া চলিয়াছিল জানি না,—হয় ত কোটি কোটি বৎসর চলিয়াছিল এবং তার পরে ঠাণ্ডা হইয়া, সূর্য্য, বুধ, শুক্র, পৃথিবী, চন্দ্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি প্রভৃতি গ্রহ-উপগ্রহদের সৃষ্টি করিয়াছিল।

 তোমরা হয় ত ভাবিতেছ, একটা প্রকাণ্ড নীহারিকা ঠাণ্ডা হইলে, একটা জিনিদেরই সৃষ্টি করিতে পারে; সূর্য্যের চারিদিকে যে ছোট-বড় আটটি গ্রহ এবং যে-সব উপগ্রহ আছে, তাহাদের উৎপত্তি কি রকমে হইল? জ্যোতিষীরা এই প্রশ্নের উত্তর দিয়াছেন এবং উত্তর দিতে গিয়া যে-সকল কথা বলিয়াছেন, তাহা বড়ই আশ্চর্য্য।

 সূর্য্য এখন আকাশের যে জায়গায় গ্রহ-উপগ্রহদের লইয়া আছে, তাহা কত বড় আগেই তোমাদিগকে বলিয়াছি। জ্যোতিষীরা বলেন, এই প্রকাণ্ড জায়গা জুড়িয়া সৃষ্টির পূর্ব্বে একটি বড় নীহারিকা জ্বলিত এবং তাহার বাষ্পরাশি ঝড়ের বাতাসের মত পাক্ খাইত। তোমরা বুঝিতেই পারিতেছ, যে বাষ্পরাশি আকাশের এতটা জায়গা জুড়িয়া থাকে, তাহা কখনই খুব ঘন হইতে পারে না। ঐ নীহারিকার বাষ্প প্রথমে ঘন ছিল না; হয় ত তাহা আমাদের বাতাসের চেয়েও হাল্‌কা ছিল।

 এখানে একটি নীহারিকার ছবি দিলাম। এটি উত্তর আকাশের ভেনেটিস মণ্ডলের নীহারিকা একটি নক্ষত্রমণ্ডলে (Canes Venetice) আছে, আকৃতি দেখিলেই বুঝিবে ইহার দেহের বাষ্পরাশি কি রকম বেগে পাক্ খাইতেছে। সূর্য্যের নীহারিকা হইতে সূর্য্য ও গ্রহাদির জন্ম জ্যোতিষীরা অনুমান করেন, সূর্য্যের নীহারিকার হাল্‌কা বাষ্পরাশি এই রকমেই জ্বলিয়া জ্বলিয়া ঘুরিত।

 কোনো গরম জিনিসকে ঠাণ্ডা করিলে কি হয় তোমরা তাহা আগে শুনিয়াছ;—ঠাণ্ডা করিলে পূর্ব্বের আকার আর থাকে না, তাহা ছোট হইয়া আসে। লক্ষ লক্ষ বৎসর তাপ ছাড়িয়া সূর্য্যের নীহারিকার অবস্থাও তাহাই হইয়াছিল,—সেটি আকারে ছোট হইয়া আগেকার চেয়ে অনেক জোরে বন্ বন্ করিয়া ঘুরিতে আরম্ভ করিয়াছিল।

 তোমরা হয় ত জিজ্ঞাসা করিবে, আকারে ছোট হইল বলিয়া আগের চেয়ে কেন জোরে ঘুরিবে? তোমাদের এই প্রশ্নের উত্তর এখন দিতে পারিব না। তোমরা বড় হইয়া যখন অনেক শক্ত শক্ত অঙ্ক কষিতে পারিবে, তখন এই প্রশ্নের উত্তর জানিতে পারিবে।

 মনে কর, তোমরা একটু শক্ত কাদা দিয়া যেন একটি ভাঁটা বা বল্ প্রস্তুত করিলে এবং ভিতরে একটা কাঠি চালাইয়া ভাঁটাকে জোরে ঘুরাইতে লাগিলে। এই অবস্থায় নরম ভাঁটার আকৃতি কিরকম হইবে একবার মনে ভাবিয়া দেখ দেখি। ঘুরপাক্ খাইয়া সেটি কখনই আগেকার মত গোলাকার থাকিবে না, জিনিসটার উপর ও নীচের দিক্ চেপ্‌টা হইয়া যাইবে। জ্যোতিষীরা বলেন, সূর্য্যের নীহারিকা খুব জোরে ঘুরিতে আরম্ভ করিলে, তাহার ঠিক্ ঐ দশাই হইয়াছিল;—উহার উপর ও নীচের দিক্ চেপ্‌টা হইয়াছিল এবং শেষে চেপ্‌টার পরিমাণ এতই বাড়িয়া গিয়াছিল যে, সমস্ত নীহারিকার খানিকটা অংশ গাড়ীর চাকার মত আকৃতি লইয়া খসিয়া পড়িয়াছিল।

 তোমরা হয় ত মনে করিতেছ, সূর্য্যের নীহারিকা হইতে চাকার মত একটা অংশ একবারই খসিয়াছিল। কিন্তু জ্যোতিষীরা তাহা বলেন না। পুষ্করিণীর জলে ঢিল ফেলিলে, ঢিলের জায়গা হইতে কিরকম বার বার গোলাকার ঢেউ উৎপন্ন হয়, তোমরা কি তাহা দেখ নাই? মূল নীহারিকা হইতে এই রকমেই বারে বারে চাকার মত অংশ খসিয়া পড়িয়াছিল এবং সেই সব চাকার বাষ্প ক্রমে ক্রমে জমাট বাঁধিয়া, নেপ্‌চুন্ ইউরেনস্ শনি বৃহস্পতি মঙ্গল প্রভৃতি আটটি গ্রহের সৃষ্টি করিয়াছিল। এই রকমে গ্রহদের সৃষ্টি হইলে মূল নীহারিকার যে অংশ মাঝে অবশিষ্ট ছিল, এখন তাহাই সূর্য্যের আকৃতি লইয়া গ্রহদের মাঝে দাঁড়াইয়া আছে। গ্রহেরা আসল নীহারিকার যে-সকল অংশ পাইয়াছিল, তাহা অতি অল্প, তাই বুধ শুক্র পৃথিবী মঙ্গল প্রভৃতি ছোট গ্রহেরা তাপ ত্যাগ করিয়া শীঘ্রই ঠাণ্ডা হইতে পারিয়াছে; বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনস্, নেপ্‌চুনের দেহ বড় হইলেও তাহারাও প্রায় ঠাণ্ডা হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু সূর্য্যের ভাগে আসল নীহারিকার যে অংশ পড়িয়াছিল, তাহা গ্রহদের ভাগের মত অল্প ছিল না, তাই সূর্য্য এথনো ঠাণ্ডা হইতে পারে নাই।

 কোনো অখণ্ড নীহারিকা হইতে সূর্য্য ও গ্রহদের সৃষ্টির যে কথা বলিলাম, তোমরা তাহা বুঝিতে পারিলে কি না জানি না। এখানে যে দু’খানি ছবি দিলাম তাহা দেখিলে কতকটা বুঝিবে বলিয়া মনে করিতেছি।

 ক্রমাগত ঘুরপাক দেওয়াতে কি রকমে নীহারিকা হইতে এক একটা চাকার মত অংশ খসিয়াছিল, ২২৭ পৃষ্ঠার ছবিটি হইতে তোমরা তাহা বুঝিবে।

 ছবির মাঝখানে সূর্য্যকে দেখিতে পাইবে। ইহা ঘুরপাক্ খাইতে খাইতে প্রায় গোল হইয়া পড়িয়াছে। নীহারিকা হইতে সকলের আগে যে চাকাটি বাহির হইয়াছিল, তাহার বাষ্প প্রায় সম্পূর্ণ জমাট বাঁধিয়া একটি গ্রহের সৃষ্টি করিয়াছে। ইহা নেপচুন্। তার পরে যে চাকাটি আছে, তাহার সকল অংশ এখনো জমাট হয় নাই,—জমাট বাঁধা সুরু হইয়াছে মাত্র। ইহা ইউরেনস্। এই সব ছাড়া সূর্য্যের গায়ে-লাগা আরো কতকগুলি চাকা ছবিতে দেখিবে,—এগুলি শনি বৃহস্পতি নীহারিকারাশি হইতে সূর্য্য পৃথিবী ইত্যাদি গ্রহ-উপগ্রহের জন্ম মঙ্গল ইত্যাদির চাকা; জমাট বাঁধিতে পারে নাই বলিয়া, তাহাদের বাষ্পরাশি এখনো ছড়াইয়া আছে।

 দ্বিতীয় ছবিটি দেখিলে নীহারিকা হইতে সূর্য্য-জগতের সৃষ্টির কথা তোমরা আরো ভালো করিয়া বুঝিবে। বইয়ের পাতার ক্ষুদ্র জায়গাটুকু আকাশের দু’হাত দশহাত জায়গা নয়, ইহার প্রসার কোটি কোটি মাইল। সৃষ্টির আগে সেখানে জ্বলন্ত নীহারিকার বাষ্প ছুটাছুটি করিত;—ছবিটিকে ভাল করিয়া দেখিলে তাহা বুঝিতে পারিবে। এই আগুনের ঝড়ের মধ্য দিয়াই যে, আমাদের এমন সুন্দর পৃথিবীখানি জন্মিয়াছিল, একথা যেন মনে করিতেই ইচ্ছা হয় না। কিন্তু জ্যোতিষীরা ইহাই শত শত বৎসর দেখিয়া শুনিয়া চিন্তা করিয়া স্থির করিয়াছেন, কাজেই তাহাতে আর অবিশ্বাস করা যায় না।

 ছবিতে দেখ, ইউরেনস্ ও নেপচুনের জন্ম হইয়া গিয়াছে, তাহারা এখন নীহারিকার ঘূর্ণিপাক্ হইতে যেন দূরে পড়িয়া আছে। শনি ও বৃহস্পতিও প্রায় তাহাদের নিজের মূর্ত্তি পাইয়াছে। কিন্তু মঙ্গল, পৃথিবী, শুক্র ও বুধ এখনো নীহারিকার ঝড়ের মধ্যে ডুব দিয়া আছে।

 একটি অবয়বহীন জ্বলন্ত নীহারিকা হইতে এই রকম সূর্য্য ও গ্রহদের উৎপত্তি আশ্চর্য্য ব্যাপার নয় কি?