চরিতাবলী/জেঙ্কিন্স

জেঙ্কন্স

 

কাফরিজাতি অতি নির্বোধ, কিছুই লেখা পড়া জানে না। অনেকে মনে করেন, এই জাতির বুদ্ধি এত অল্প যে, এতজ্জাতীয় কেহ কখন লেখা পড়া শিখিতে পারিবেক না। কিন্তু, এক্ষণে যে বৃত্তান্ত লিখিত হইতেছে, তাহা পাঠ করিলে, এই ভ্রম দূর হইতে পারিবেক।

 এক কাফরিরাজের রাজ্যে ইঙ্গরেজেরা বাণিজ্য করিতে যাইতেন। ইয়ুরোপীয় লোকেরা, লেখা পড়া জানেন বলিয়া, কাফরিজাতি অপেক্ষা সকল অংশে উৎকৃষ্ট, ইহা দেখিয়া, কাফরিরাজ আপন পুত্রকে লেখা পড়া শিখাইবার নিমিত্ত অত্যন্ত ব্যগ্র হইলেন, এবং স্কট্‌ল‌ণ্ডনিবাসী স্বানষ্টননামক এক জাহাজী কাপ্তেনের নিকট প্রস্তাব করিলেন, যদি আপনি আমার পুত্ত্রকে, স্বদেশে লইয়া গিয়া সুশিক্ষিত করিয়া আনিয়া দেন, তাহা হইলে, আমি আপনকার সবিশেষ পুরস্কার করিব। স্বানষ্টন রাজার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন।

 তিনি, কাফরিরাজের পুত্ত্র কে স্বদেশে লইয়া গিয়া, তাঁহার লেখা পড়া শিখিবার বন্দোবস্ত করিবার চেষ্টা দেখিতেছেন, এমন সময় হঠাৎ তাঁহার মৃত্যু হইল। কাফরিরাজের পুত্ত্র বিষম বিপদে পড়িলেন। যাঁহার সঙ্গে গিয়াছিলেন, তাঁহার মৃত্যু হইল; এখন তাঁহাকে খাওয়ায় পরায়, অথবা লেখা পড়া শিখায়, এমন আর কেহ নাই; তিনি কোথায় যাইবেন, কি করিবেন, কিছুই ভাবিয়া স্থির করিতে পারেন না।

 এক পান্থনিবাসে স্বানষ্টনের মৃত্যু হয়। কাফরিরাজের পুত্ত্র সেই স্থানেই কিছু দিন থাকিলেন। সেই পান্থনিবাসের কর্ত্রী, এক বিবি, তাঁহাকে নিতান্ত নিরাশ্রম দেখিয়া, দয়া করিয়া, কয়েক দিন আহার দিয়াছিলেন।

 কিছু দিন পরে, স্বানষ্টনের নিকটকুটুম্ব এক কৃষক, সেই পান্থনিবাসে আসিয়া, কাফরিরাজের পুত্ত্রকে আপন আলয়ে লইয়া গেলেন। এই স্থানে তিনি প্রথমতঃ কিছু কাল রাখালের কর্ম্ম করিলেন।  রাজা নিজ পুত্রের কি নাম রাখিয়াছিলেন, তাহা পরিজ্ঞাত নহে। স্বানষ্টন তাঁহার নাম জেঙ্কিন্স রাখিয়াছিলেন; তদনুসারে, কাফরিরাজের পুত্ত্র জেঙ্কিন্স নামেই প্রসিদ্ধ হইয়াছেন। জেঙ্কিন্স দৃঢ়কায় হইলে পর, লেডলানামক এক ব্যক্তি, তাঁহার প্রতি সদয় হইয়া, তাঁহাকে আপন বাটতে লইয়া রাখিলেন। এই স্থানে তিনি সকল কর্ম্মই করিতে লাগিলেন; কখন রাখালের কর্ম্ম করিতেন, কখন কৃষকের কর্ম্ম করিতেন, কখন সইসের কর্ম্ম করিতেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন বলিয়া, তাঁহার বিশেষ কর্ম্ম এই নির্দিষ্ট ছিল, সর্ব্বপ্রকার সংবাদ লইয়া, হাউইকনামক স্থানে যাইতে হইত।

 এই সময়েই, বিদ্যাশিক্ষাবিষয়ে তাঁহার প্রথম অনুরাগ জন্মে। তাঁহার বিলক্ষণ স্মরণ ছিল, পিতা তাঁহাকে বিদ্যাশিক্ষা করিবার নিমিত্ত পাঠাইয়াছিলেন। কিন্তু, বিদেশে আসিয়া, বিষম দুরবস্থায় পড়িয়া, তাঁহাকে বিদ্যাশিক্ষার আশা এক বারেই অরিত্যাগ করিতে হইয়াছিল। তথাপি, তিনি মনোমধ্যে স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন, যদি কখন সুযোগ পাই; ষত দূর পারি, পিতার মানস পূর্ণ করিব। এক্ষণে, লেডলার পুত্ত্রদিগকে লেখা পড়া করিতে দেখিয়া, তাঁহারও লেখাপড়া শিখিতে অত্যন্ত ইচ্ছা হইল। তিনি সুযোগক্রমে ঐ বালকদিগের নিকট, উপদেশ লইতে আরম্ভ করিলেন। কিন্তু, দিনের বেলায়, তাঁহার কিছুমাত্র অবসর ছিল না; এ নিমিত্ত, নিয়মিত কর্ম্ম সমাপন করিয়া, যখন শয়ন করিতে যাইতেন, সেই সময়ে অধিক রাত্রি পর্য্যন্ত, পাঠ অভ্যাস করিতেন, এবং লিখিতে শিখিতেন।

 এই রূপে, বিদ্যাশিক্ষাবিষয়ে তাঁহার অনুরাগ প্রকাশ হইলে, লেডলা তাঁহাকে এক বৈকালিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিতে দিলেন। জেঙ্কিন্স, সমস্ত দিন কর্ম্ম করিয়া, বিকালে ঐ বিদ্যালয়ে পড়িতে যাইতেন। তিনি, অল্প দিনের মধ্যেই, এমন লেখা পড়া শিখিলেন যে, সকল লোক দেখিয়া শুনিয়া, চমৎকৃত হইল। এই সময়ে, এক সমবয়স্ক বালকের সহিত তাঁহার বন্ধুতা জন্মে। এই বালক বন্ধু তাঁহার লেখা পড়া শিখিবার বিষয়ে বিস্তর আনুকূল্য করিয়াছিলেন।

 কিছু দিন পরে, জেঙ্কিন্স মনক্রিফনামক এক ব্যক্তির নিকট পরিচিত হইলেন। এই ব্যক্তি অতিশয় দয়ালু ও অতি সৎস্বভাব ছিলেন। ইনি, পরিচয়দিবস অবধি, জেঙ্কিসকে ষথেষ্ট স্নেহ এবং তাঁহার বিদ্যাশিক্ষাবিষয়ে বিস্তর আনুকূল্য করিতেন। এই রূপে, পূর্ব্বোক্ত বালক বন্ধুর ও এই দয়ালু ব্যক্তির সাহায্য পাইয়া, এবং ষৎপরোনাস্তি পরিশ্রম করিয়া, তিনি একপ্রকার কৃতবিদ্য হইয়া উঠিলেন।

 এই সময়ে, কোন নিকটবর্ত্তী বিদ্যালয়ে, এক শিক্ষকের পদ শূন্য হইল। যাঁহাদের উপর শিক্ষক নিযুক্ত করিবার ভার ছিল, তাঁহারা, কর্ম্মাকাঙ্ক্ষীদিগের পরীক্ষার দিন নিরূপণপূর্বক, ঘোষণা করিয়া দিলেন। পরীক্ষাদিবসে, জেঙ্কিন্সও কর্ম্মাকাঙ্ক্ষায় পরীক্ষা দিতে উপস্থিত হইলেন। যত জন পরীক্ষা দিতে আসিয়াছিলেন, পরীক্ষকদিগের বিবেচনায়, তিনি সর্ব্বাপেক্ষায় উৎকৃষ্ট হইলেন। তখন তিনি, কর্ম্মে নিযুক্ত হইলাম স্থির করিয়া, প্রফুল্ল মনে গৃহ গমন করিলেন।

 জেঙ্কিন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেও, অধ্যক্ষেরা তাহাকে কর্ম্ম দিলেন না। তাঁহারা, কাফরিকে শিক্ষকের কর্ম্মে নিযুক্ত করা অযুক্ত বিবেচনা করিয়া, অন্য এক ব্যক্তিকে ঐ কর্ম্মে নিযুক্ত করিলেন। জেঙ্কিন্স মনস্তাপে ত্রিয়মাণ হইলেন। তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেন, তথাপি কর্ম্ম পাইলেন না, ইহা দেখিয়া, সেই স্থানের সম্ভ্রান্ত লোকেরা অতিশয় বিরক্ত হইলেন, এবং জেঙ্কিন্সের মনস্তাপনিবারণার্থে, সেই বিদ্যালয়ের নিকটেই আর এক বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া, তাঁহাকে শিক্ষক নিযুক্ত করিলেন। জেঙ্কিন্স এই বিদ্যালয়ে এমন সুন্দর শিক্ষা দিতে লাগিলেন যে, অল্প দিনের মধ্যেই সমুদয় ছাত্র, পূর্ব্ব বিদ্যালয় পরিত্যাগ করিয়া, তাহার নিকটে অধ্যয়ন করিতে আসিল।  এই রূপে শিক্ষকের কর্ম্মে নিযুক্ত হইয়াও, তিনি স্বয়ং শিক্ষা করিতে বিরত হইলেন না। কিঞ্চিৎ দূরে অন্য এক বিদ্যালয় ছিল; তথাকার অধ্যাপক অতিশয় পণ্ডিত ছিলেন। জেঙ্কিন্স যাহা শিক্ষা করিতেন, প্রতিশনিবার অবাধে সেই বিদ্যালয়ে গিয়া তথাকার অধ্যাপকের নিকট পরীক্ষা দিয়া আসিতেন। দুই এক বৎসর কর্ম্ম করিয়া, তিনি কিঞ্চিৎ সংস্থান করিলেন।

 এ পর্য্যন্ত জেঙ্কিন্স যাহা শিক্ষা করিয়াছিলেন, তাহাতেই তাহাকে পণ্ডিত বলা যাইতে পারে। কিন্তু তিনি তাহাতে সন্তুষ্ট হইলেন না। তাঁহার আরও অধিক বিদ্যা শিখিবার বাসনা হইল। তিনি মনে মনে স্থির করিলেন, কিছু দিনের জন্যে প্রতিনিধি দিয়া ছুটী লইব, এবং কোন প্রধান বিদ্যালয়ে থাকিয়া, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিথিব।

 অনন্তর, তিনি বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষদিগের নিকট আপন প্রার্থনা জানাইলেন। অধ্যক্ষেরা তাঁহাকে অতিশয় আদর ও সম্মান করিতেন। তাঁহারা সন্তুষ্ট চিত্তে তাঁহাকে বিদায় দিলেন। পরে, তাঁহার প্রধান সহায় পরম দয়ালু মনক্রিফ মহাশয়ের সহিত পরামর্শ করিয়া, তিনি এডিনবরা নগরে গমন করিলেন, এবং তথাকার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া, শীত কয়েক মাস, তথায় অবস্থিতিপূর্ব্বক, উত্তম রূপে নানা বিদ্যা শিক্ষা করিলেন।

 বসন্তকাল উপস্থিত হইলে, তিনি তথা হইতে প্রত্যাগমন করিলেন, এবং পুনর্বার, পূর্ববৎ যথানিয়মে ও যথোপযুক্ত মনোযোগ সহকারে, বিদ্যালয়ের কর্ম্ম করিতে আরম্ভ করিলেন।

 জেঙ্কিন্স স্বভাবতঃ অতি সুশীল ও সচ্চরিত্র, নম্র ও নিরহঙ্কার, এবং ধর্ম্মপরায়ণ ছিলেন। আপন কর্তব্য কর্ম্মে তাঁহার সম্পূর্ণ মনোযোগ ছিল। কি রাখাল, কি কৃষক, কি শিক্ষক, যখন যে কর্ম্মে নিযুক্ত হইয়াছেন, তিনি সেই কর্ম্মই যথোচিত যত্ন ও মনোযোগ পূর্ব্বক নির্বাহ করিয়াছেন; কখনই কিঞ্চিম্মাত্র আলস্য বা ঔদাস্য করেন নাই। এজন্য সকল লোকেই তাঁহাকে ভাল বাসিত।

 সমুদয় বিবেচনা করিয়া দেখিলে, জেঙ্কিন্স অতি আশ্চর্য্য লোক। দেখ! লেখা পড়া শিথিবার নিমিত্ত পিতা তাহাকে বিদেশে পঠাইয়া দেন। যে ব্যক্তি তাঁহার ভার লইয়াছিলেন, সহসা সেই ব্যক্তির মৃত্যু হওয়াতে, তিনি এক বারে নিতান্ত নিরাশ্রয় হইয় পড়িলেন; কাহার সহিত পরিচয় নাই; কাহার কথা বুঝিতে পারেন না; অন্ন বস্ত্র দেয় এমন কেহ নাই; কোথায় যাইবেন, কি করিবেন, কিছুই বুঝিতে পারেন না। যাঁহারা দয়া করিয়া অন্ন বস্ত্র দিয়াছিলেন, তাঁহাদের বাটীতে রাখালের কর্ম্ম করেন ও চাসের কর্ম্ম করেন। ফলতঃ, রাজপুত্ত্র হইয়া কেহ কখন এমন দুঃখে পড়ে নাই; কিন্তু ইচ্ছা ও যত্ব ছিল বলিয়া, কেমন লেখা পড়া শিখিয়াছেন।

 যাহারা মনে করে, দুঃখে পড়িলে লেখা পড়া হয় না, অথবা যাহারা দুঃখে পড়িয়া লেখা পড়া ছাড়িয়া দেয়, তাহাদের মন দিয়া জেঙ্কিন্সের বৃত্তান্ত পাঠ করা আবশ্যক।