চিদ্বিলাস/পাতঞ্জল দর্শন




পাতঞ্জল দর্শন।

 মহর্ষি পতঞ্জলি অন্যান্য দর্শনকারদিগের ন্যায় পদার্থ নিরূপণ করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই। ইনি সমগ্র জীবের মঙ্গল হেতু অমূল্য যোগরত্ন সকলকে দান করিয়াছেন। ইহাতে তর্ক নাই, যুক্তি নাই; কেবল সাধন ও সিদ্ধির কথা। তুমি কাজে কর তাহা হইলেই বুঝিবে; হাজার কথা বা তর্ক বিতর্ক দ্বারা এই যোগ তত্ত্বের কিছুই বুঝিতে পরিবে না।

 ইনি সাংখ্য দর্শনের মত অবলম্বন করিয়া যোগের উপদেশ দিয়াছেন। ইনি সাংখ্যোক্ত সমস্ত তত্ত্বের উপর একটি ঈশ্বর তত্ত্ব স্বীকার করেন। এই নিমিত্ত পাতঞ্জল দর্শনকে সেশ্বর সাংখ্য দর্শন কহে।

 মহর্ষি কপিলের মতে প্রকৃতিতে সৃষ্টির প্রবৃত্তি ও ভোগের উপাদান আছে; প্রকৃতি জড় ও পুরুষ চৈতন্য; এতদুভয়ের সান্নিধ্য হেতু জীব জগতের সৃষ্টি; অদৃষ্ট বশতঃই প্রকৃতি ও পুরুষের সান্নিধ্য হয়। কিন্তু মহর্ষি পতঞ্জলির মত এই যে, প্রকৃতি ও অদৃষ্ট উভয়ই জড়; জড় কখনও জড়কে চালিত করিতে পারে না; অতএব অদৃষ্ট প্রকৃতিকে চালিত করিতে পারে না; যে পুরুষ অদৃষ্টের পরিচালক তিনিই ঈশ্বর।

 যেমন স্ফটিক জবা পুষ্পের সান্নিধ্যহেতু রক্তাভাস ধারণ করে তদ্রূপ নিঃসঙ্গ পুরুষ অদৃষ্টবশতঃ প্রকৃতি সান্নিধ্যহেতু কর্ম্মী ও ভোক্তারূপে প্রতীয়মান হন। অদৃষ্ট শান্ত; ঈশ্বরই সেই অদৃষ্টের নাশ করেন এবং তদ্দ্বারা পুরুষ ও প্রকৃতি স্ব স্বরূপে বর্ত্তমান হয়। আমরা সর্ব্বদা বৃহৎ হইতে বৃহত্তর, উৎকৃষ্ট হইতে উৎকৃষ্টতর, জ্ঞানী হইতে জ্ঞানবত্তর, শক্তিমান হইতে শক্তিমত্তর ইত্যাদি দেখিতে পাই। যাঁহাতে সর্ব্বতত্ত্ব বীজ নিত্যই চরমোৎকর্ষ বা পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত হইয়া রহিয়াছে তাঁহাকেই পতঞ্জলি ঈশ্বর নামে অভিহিত করেন।

 “ক্লেশকর্ম্মবিপাকাশয়ৈরপরামৃষ্টঃ পুরুষ বিশেষঃ ঈশ্বরঃ” “তত্র নিরতিশয়ং সর্ব্বজ্ঞত্ববীজম্‌” “সঃ পূর্ব্বেষামপি গুরু; কালেনানবচ্ছেদাৎ” পতঞ্জলি কহেন যে প্রণব অর্থাৎ ওঁকার তাঁহার প্রকাশক।

 পতঞ্জলি চিত্তবৃত্তির নিরোধদ্বারা সমাধিসিদ্ধির নামই যোগ কহিয়া থাকেন। তিনি কহেন যে যখন জীবাত্মা ও পরমাত্মা উভয়েই নির্লেপ ও নিঃসঙ্গ তখন এতদুভয়ের যোগ হইতে পারে না।

 এক্ষণে প্রশ্ন হইতে পারে যে যখন চিত্তবৃত্তির নিরোধ হয়, তখন জ্ঞানের ও নিরোধ হয়, কারণ সমস্ত চিত্তবৃত্তিই জ্ঞান স্বরূপ; এবং যখন জ্ঞানের নিরোধ হয় তখন আত্মার নিত্যত্বের ব্যাঘাত হয়, কারণ আত্মা জ্ঞানস্বরূপ। ইহার উত্তর এই যে, চিত্ত বৃত্তির নিরোধের সহিত যে জ্ঞানের নিরোধ হয় তাহা খণ্ড জ্ঞান, প্রাকৃতিক জ্ঞান; কিন্তু আত্মার স্বরূপ যে জ্ঞান তাহা নিত্য এবং প্রকৃতিদুষ্ট নহে; চিত্তবৃত্তির নিরোধদ্বারা প্রকৃতি ও পুরুষের স্বরূপ বোধ হয়; সেই স্বরূপ জ্ঞানই আত্মা।

 যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি এই আটটি যোগের অঙ্গ স্বরূপ। ইহার মধ্যে প্রথম পাঁচটি যোগের বহিরঙ্গ ও শেষ তিনটি যোগের অন্তরঙ্গ সাধন। অহিংসা, সত্য, অচৌর্য্য, ব্রহ্মচর্য্য ও অপরিগ্রহ এই গুলিকে যম কহে। বাহ্য ও অন্তঃশৌচ, সন্তোষ, তপস্যা, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরোপাসনা এই গুলি নিয়ম। যে ভাবে অধিকক্ষণ স্থিরভাবে সুখে বসিয়া থাকা যায় তাহার নাম আসন। এই আসন জয়ের পর শ্বাস ও প্রশ্বাস উভয়ের গতি সংযত হইয়া যায়, ইহাকে প্রাণায়াম কহে। ইন্দ্রিয়গণ যখন বিষয় পরিত্যাগ পূর্ব্বক চিত্তের স্বরূপ গ্রহণ করে তখন তাহাকে প্রত্যাহার বলে। চিত্তকে কোন বিশেষস্থানে বদ্ধ করিয়া রাখার নাম ধারণা। সেই বস্তুবিষয়ক জ্ঞান নিরন্তর একভাবে প্রবাহিত হইলে তাহাকে ধ্যান কহে। ধ্যান যখন বাহ্যোপাধি পরিহার পূর্ব্বক কেবল মাত্র অর্থকেই প্রকাশ করে তখন তাহাকে সমাধি বলা যায়।

 সমাধি দুই প্রকার—সম্প্রজ্ঞাত ও অসম্প্রজ্ঞাত। একাগ্রচিত্তের যোগের নাম সম্প্রজ্ঞাত, কারণ ধ্যেয় বস্তু তৎকালে সম্যক্‌রূপে প্রজ্ঞাত হয়। নিরুদ্ধচিত্তের যোগের নাম অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি, কারণ তৎকালে ধ্যেয় বিষয়ক বৃত্তিও নিরুদ্ধ হয় বলিয়া কিছুই প্রজ্ঞাত হয় না।

 বাহ্য বিষয় হইতে মনকে আকৃষ্ট করিয়া ভাবনীয় পরমার্থ বিষয়ে তাহাকে নিবেশ করিবার জন্য পুনঃ পুনঃ চেষ্টাকেই যোগাভ্যাস কহে। ভাবনীয় বস্তু দুই প্রকার, যথা ঈশ্বর ও অন্যান্য তত্ত্ব। ঈশ্বরই চৈতন্য ও অপরিণামী এবং অন্যান্য তত্ত্ব জড় ও পরিণামী। পরিণামী তত্ত্বকে অপরিণামী এবং অনাত্মাকে আত্মা মনে করাই বন্ধন। সমাধি দ্বারা যখন চিত্তের স্থৈর্য্য হয় তখনই পরিণামী ও আত্মার স্বরূপ বোধ হয়। এই স্বরূপ দৃষ্টির নাম মুক্তি বা কৈবল্য। কৈবল্যপ্রাপ্তি হইলে অদৃষ্টের নাশ হয়; অদৃষ্ট নষ্ট হইলে আর সৃষ্টিও হয় না, যেমন দগ্ধ বীজ হইতে আর বৃক্ষোৎপত্তি হয় না।

ওঁ তৎ সৎ ওঁ।