প্রধান মেনু খুলুন


Ş8 চোখের বালি মহেন্দ্ৰ কহিল, দরকার জাছে মা, তুমি দাও-না, আমি পরে বলিৰ ” মহেন্দ্র একটু সাজ না করিয়া থাকিতে পারিল না। পরের জন্ত হইলেও কস্তা দেখিবার প্রসঙ্গমাত্রেই যৌবনধর্ম আপনি চুলটা একটু ফিরাইয়া লয়, চারে কিছু গন্ধ ঢালে । দুই বন্ধু কন্যা দেখিতে বাহির হইল । কস্তার জেঠ তামবাজারের অমুকুলবাৰু নিজের উপার্জিত ধনের দ্বারায় তাহার বাগান-সমেত তিনতলা বাড়িটাকে পাড়ার মাথার উপর তুলিয়াছেন। দরিদ্র ভ্রাতার মৃত্যুর পর পিতৃমাতৃহীনা ভ্রাতুষ্পপুত্রীকে তিনি নিজের বাড়িতে জানিয়া রাখিয়াছেন। মাসি অন্নপূর্ণাবলিয়াছিলেন, ‘আমার কাছে থাক্‌ ; তাহাতে ব্যয়লাঘবের স্থবিধা ছিল বটে, কিন্তু গৌরবলাঘবের ভয়ে অমুকুল রাজি হইলেন না । এমন-কি, খোসাক্ষাৎ করিবার জন্তও কন্যাকে কখনো মাসির বাড়ি পাঠাইতেন না, নিজেদের মর্যাদা সম্বন্ধে তিনি এতই কড়া ছিলেন । কন্যাটির বিবাহ-ভাবনার সময় আসিল, কিন্তু আজকালকার দিনে কস্তার বিবাহ সম্বন্ধে যাদৃশী ভাবনা যন্ত সিদ্ধিৰ্ভবতি তাদৃশী’ কথাটা খাটে না । ভাবনার সঙ্গে খরচও চাই। কিন্তু পণের কথা উঠিলেই অমুকুল বলেন, ‘আমার তো নিজের মেয়ে আছে, আমি এক আর কতৃ পারিয়া উঠিব। এমনি করিয়া দিন বহিয়া যাইতেছিল । এমন সময় সাজিয়া-গুজিয়া গন্ধ মাখিয়া রঙ্গভূমিতে বন্ধুকে লইয়া মহেন্দ্র প্রবেশ করিলেন । তখন চৈত্রমাসের দিবসান্তে স্বর্য অস্তোন্মুখ । দোতলার দক্ষিণ-বারান্দায় চিত্রিত চিকণ চীনের টালি গাথা ; তাহারই প্রাস্তে দুই অভ্যাগতের জন্য রুপার রেকাবি ফলমূলমিটান্নে শোভমান এবং বরফ-জল পূর্ণ রুপার গ্লাস শীতল শিশিরবিন্দুজালে মণ্ডিত । মহেন্দ্র বিহারীকে লইয়া আলজ্জিতভাবে থাইতে বসিয়াছেন । নীচে বাগানে মালী তখন ঝারিতে করিয়া গাছে গাছে জল দিতেছিল ; সেই সিক্ত মৃত্তিকার স্নিগ্ধ গন্ধ বহন করিয়া চৈত্রের দক্ষিণবাতাস মহেন্দ্রের শুভ্র কুঞ্চিত স্থবাসিত চাদরের প্রাস্তকে দুর্দাম করিয়া তুলিতেছিল। আশপাশের দ্বার-জানালার ছিদ্রান্তরাল হইতে একটু-আধটু চাপা হাসি, ফিসফিস্ কথা, দুটা একটা গহনার টুংটাং যেন শুন। যায় ! আহারের পর অম্বকুলবাবু ভিতরের দিকে চাহিয়া কহিলেন, "চুনি, পান নিয়ে আয় তো রে ।” কিছুক্ষণ পরে সংকোচের ভাবে পশ্চাতে একটা দরজা খুলিয়া গেল এবং একটি চোখের বালি } & বালিকা কোথা হইতে সর্বাঙ্গে রাজ্যের লজ্জা জড়াইয়া আনিয়া পানের বাট হাতে অমুকুলবাবুর কাছে আসিয়া দাড়াইল । তিনি কহিলেন, “লজ্জা কী, মা ! বাটা ঐ ওঁদের সামনে রাখো ।” বালিকা নত হইয়া কম্পিত হস্তে পানের বাটা অতিথিদের আসন-পার্থে ভূমিতে রাখিয়া দিল । বারান্দার পশ্চিমপ্রান্ত হইতে স্বর্যাস্ত-আভা তাহার লজ্জিত মুখকে মণ্ডিত করিয়া গেল। সেই অবকাশে মহেন্দ্র সেই কম্পাম্বিতা বালিকার করুণ মুখচ্ছবি দেখিয়া লইল । বালিকা তখন চলিয়া যাইতে উষ্ঠত হইলে অমুকুলবাবু কহিলেন, “একটু দাড়া, চুনি। বিহারীবাৰু, এইটি আমার ছোটাে ভাই অপূর্বর কন্যা। সে তো চলিয়া গেছে, এখন আমি ছাড়া ইহার আর কেহ নাই ।” বলিয়া তিনি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন । মহেন্দ্রের হৃদয়ে দয়ার আঘাত লাগিল । অনাথার দিকে আর-একবার চাহিয়া দেখিল । কেহ তাহার বয়স স্পষ্ট করিয়া বলিত না। আত্মীয়েরা বলিত, "এই বারোতেরো হইবে ।’ অর্থাৎ চোদ-পনেরো হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক । কিন্তু অনুগ্রহপালিত বলিয়া একটি কুষ্ঠিত ভীরুভাবে তাহার নব-যৌবনারস্তকে সংযত সম্বৃত করিয়া রাখিয়াছে । আর্ডচিত্ত মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার নাম কী ।” অমুকুলবাবু উৎসাহ দিয়া কহিলেন, “বলো মা, তোমার নাম বলে ।” বালিকা তাহার অভ্যস্ত আদেশপালনের ভাবে নতমুখে বলিল, “আমার নাম আশালতা ।” আশা ! মহেন্দ্রের মনে হইল নামটি বড়ো করুণ এবং কণ্ঠটি বড়ো কোমল । অনাথ আশা ! দুই বন্ধু পথে বাহির হইয়া আসিয়া গাড়ি ছাড়িয়া দিল । মহেন্দ্ৰ কহিল, “বিহারী, এ মেয়েটিকে তুমি ছাড়িয়ে না।” বিহারী তাহার স্পষ্ট উত্তর না করিয়া কহিল, “মেয়েটিকে দেখিয়া উহার মাসিমাকে মনে পড়ে ; বোধ হয় আমনি লক্ষ্মী হইবে।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “তোমার স্বন্ধে যে বোঝা চাপাইলাম, এখন বোধ হয় তাহার তার তত গুরুতর বোধ হইতেছে না।” বিহারী কহিল, “না, বোধ হয় সহ করিতে পারিব।” 为也 চোখের বালি মহেন্দ্ৰ কহিল, “কাজ কী এত কষ্ট করিয়া । তোমার বোঝা নাহয় আমিই স্কন্ধে তুলিয়া লই । কী বল ।” বিহারী গম্ভীরভাবে মহেন্দ্রের মুখের দিকে চাহিল। কহিল, “মহিনদা, সত্য বলিতেছ? এখনো ঠিক করিয়া বলে । তুমি বিবাহ করিলে কাকী ঢের বেশি খুশি হইবেন— তাহা হইলে তিনি মেয়েটিকে সর্বদাই কাছে রাখিতে পারিবেন।” মহেন্দ্র কহিল, “তুমি পাগল হইয়াছ ? সে হইলে অনেক কাল আগে হইয়াযাইভ।” বিহারী অধিক আপত্তি না করিয়া চলিয়া গেল, মহেন্দ্রও সোজা পথ ছাড়িয়া দীর্ঘ পথ ধরিয়া বহু বিলম্বে ধীরে ধীরে বাড়ি গিয়া পৌছিল। মা তখন লুচি-ভাজ ব্যাপারে ব্যস্ত ছিলেন, কাকী তখনে তাহার বোনঝির নিকট হইতে ফেরেন নাই । মহেন্দ্র এক নির্জন ছাদের উপর গিয়া মাদুর পাতিয়া শুইল । কলিকাতার হর্মশিখরপুঞ্জের উপর গুরুসপ্তমীর অর্ধচন্দ্র নিঃশবে আপন অপরূপ মায়ামন্ত্র বিকীর্ণ করিতেছিল। মা যখন খাবার খবর দিলেন, মহেন্দ্র অলস স্বরে কহিল, “বেশ আছি, এখন আর উঠিতে পারি না।” মা কহিলেন, “এইখানেই আনিয়া দিই-না ?” মহেন্দ্ৰ কহিল, “আজ আর খাইব না, আমি খাইয়া আসিয়াছি।” মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথায় খাইতে গিয়াছিলি ।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “সে অনেক কথা, পরে বলিব ।” মহেক্সের এই অভূতপূর্ব ব্যবহারে অভিমানিনী মাতা কোনো উত্তর না করিয়া চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলেন । তখন মুহূর্তের মধ্যে আত্মসম্বরণ করিয়া অমৃতপ্ত মহেন্দ্ৰ কহিল, “মা, আমার থাবার এইখানেই আনে ৷” মা কহিলেন, “ক্ষুধা না থাকে তো দরকার কী ” এই লইয়া ছেলেতে মায়েতে কিয়ৎক্ষণ মান-অভিমানের পর মহেন্দ্রকে পুনশ্চ আহারে বসিতে হইল । \O রাত্রে মহেন্দ্রের ভালো নিত্রী হইল না। প্রত্যুষেই সে বিহারীর বাসায় আসিয়া উপস্থিত। কহিল, “ভাই, ভাবিয়া দেখিলাম, কাকীমার মনোগত ইচ্ছা, আমিই তাহার বোনঝিকে বিবাহ করি।”