চোখের বালি R. ) মহেন্দ্র উত্তেজিত ভাবেই বলিল, “পরামর্শ কিছু নয় মা, বউকে ঘরের কাজে আমি দাসীর মতো অত খাটিতে দিতে পারিব না ।” মা তাহার উদ্দীপ্ত জালা দমন করিয়া অত্যন্ত তীক্ষু ধীরভাবে কহিলেন,"র্তাহাকে লইয়া কী করিতে হইবে।” মহেন্দ্র কহিল, “তাহাকে আমি লেখাপড়া শেখাইব ।” রাজলক্ষ্মী কিছু না কহিয়া দ্রুতপদে চলিয়া গেলেন ও মুহূর্ত পরে বধুর হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া মহেন্দ্রের সম্মুখে স্থাপিত করিয়া কহিলেন, “এই লও, তোমার বধূকে লেখাপড়া শেখাও।” এই বলিয়া অন্নপূর্ণার দিকে ফিরিয়া গলবস্ত্র জোড়করে কহিলেন, “মাপ করে। মেজোগিনি, মাপ করো। তোমার বোনকির মর্যাদা আমি বুঝিতে পারি নাই ; উহার কোমল হাতে আমি হলুদের দাগ লাগাইয়াছি, এখন তুমি উহাকে ধুইয়ামুছিয়া বিবি সাজাইয়া মহিনের হাতে দাও— উনি পায়ের উপর পা দিয়া লেখাপড় শিখুন, দাসীবৃত্তি আমি করিব।” এই বলিয়া রাজলক্ষ্মী নিজের ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া সশব্দে অর্গল বন্ধ করিলেন। অন্নপূর্ণ ক্ষোভে মাটির উপরে বসিয়া পড়িলেন। আশা এই আকস্মিক গৃহবিপ্লবের কোনো তাৎপর্য না বুঝিয়া লজ্জায় ভয়ে দুঃখে বিবর্ণ হইয়া গেল। মহেন্দ্র অত্যন্ত রাগিয়া মনে মনে কহিল, ‘আর নয়, নিজের স্ত্রীর ভার নিজের হাতে লইতেই হইবে, নহিলে অন্যায় হইবে ।’ ইচ্ছার সহিত কর্তবাবুদ্ধি মিলিত হইতেই, হাওয়ার সঙ্গে আগুন লাগিয়া গেল। কোথায় গেল কালেজ, এক্জামিন, বন্ধুকৃত্য, সামাজিকতা ; স্ত্রীর উন্নতি সাধন করিতে মহেন্দ্র তাহাকে লইয়া ঘরে ঢুকিল— কাজের প্রতি দৃকপাত বালোকের প্রতি ভ্ৰক্ষেপমাত্রও করিল না । অভিমানিনী রাজলক্ষ্মী মনে মনে কহিলেন, মহেন্দ্র যদি এখন তার বউকে লইয়া আমার দ্বারে হত্যা দিয়া পড়ে, তবু আমি তাকাইব না, দেখি সে তার মাকে বাদ দিয়া স্ত্রীকে লইয়া কেমন করিয়া কাটায় ।” দিন যায়— দ্বারের কাছে কোনো অমৃতপ্তের পদশব্দ শুনা গেল না । রাজলক্ষ্মী স্থির করিলেন, ক্ষমা চাইতে আসিলে. ক্ষমা করিবেন— নহিলে মহেন্দ্রকে অত্যন্ত ব্যথা দেওয়া হইবে । ক্ষমার আবেদন আসিয়া পৌছিল না। তখন রাজলক্ষ্মী স্থির করিলেন, তিনি নিজে গিয়াই ক্ষমা করিয়া আসিবেন । ছেলে অভিমান করিয়া আছে বলিয়া কি २२ চোখের বালি মাও অভিমান করিয়া থাকিবে । তেতলার ছাদের এক কোণে একটি ক্ষুদ্র গৃহে মহেন্দ্রের শয়ন এবং অধ্যয়নের স্থান। এ কয়দিন মা তাহার কাপড় গোছানো, বিছানা তৈরি, ঘরদুয়ার পরিষ্কার করায় সম্পূর্ণ অবহেলা করিয়াছিলেন । কয়দিন মাতৃ-স্নেহের চিরাভ্যস্ত কর্তব্যগুলি পালন না করিয়া তাহার হৃদয় স্তন্যভারাতুর স্তনের ন্যায় অন্তরে অন্তরে ব্যথিত হইয়া উঠিয়াছিল। সেদিন দ্বিপ্রহরে ভাবিলেন, ‘মহেন্দ্র এতক্ষণে কলেজে গেছে, এই অবকাশে তাহার ঘর ঠিক করিয়া আসি— কলেজ হইতে ফিরিয়া আসিলেই সে অবিলম্বে বুঝিতে পারিবে, তাহার ঘরে মাতৃহস্ত পড়িয়াছে।’ রাজলক্ষ্মী সিড়ি বাহিয়া উপরে উঠিলেন। মহেন্দ্রের শয়নগৃহের একটা দ্বার খোল ছিল, তাহার সম্মুখে আসিতেই যেন হঠাৎ কাটা বিধিল, চমকিয়া দাড়াইলেন । দেখিলেন নীচের বিছানায় মহেন্দ্র নিদ্রিত এবং দ্বারের দিকে পশ্চাৎ করিয়া বধু ধীরে ধীরে তাহার পায়ে হাত বুলাইয়া দিতেছে। মধ্যাহের প্রখর আলোকে উন্মুক্ত দ্বারে দাম্পত্যলীলার এই অভিনয় দেখিয়া রাজলক্ষ্মী লজ্জায় ধিক্কারে সংকুচিত হইয়া নিঃশব্দে নীচে নামিয়া আসিলেন । (t কিছুকাল অনাবৃষ্টিতে যে শস্যদল শুষ্ক পীতবর্ণ হইয়া আসে, বৃষ্টি পাইবামাত্র সে আর বিলম্ব করে না ; হঠাৎ বাড়িয়া উঠিয়া দীর্ঘকালের উপবাসদৈন্য দূর করিয়া দেয়, দুর্বল নত ভাব ত্যাগ করিয়া শস্তক্ষেত্রের মধ্যে অসংকোচে অসংশয়ে আপনার অধিকার উন্নত ও উজ্জল করিয়া তোলে— আশার সেইরূপ হইল । যেখানে তাহার রক্তের সম্বন্ধ ছিল, সেখানে সে কখনো আত্মীয় তার দাবি করিতে পায় নাই ; আজ পরের ঘরে আসিয়া সে যখন বিনা প্রার্থনায় এক নিকটতম সম্বন্ধ এবং নিঃসন্দিগ্ধ অধিকার প্রাপ্ত হইল, যখন সেই অযত্বলালিতা অনাথার মস্তকে স্বামী স্বহস্তে লক্ষ্মীর মুকুট পরাইয়া দিলেন, তখন সে আপন গৌরবপদ গ্রহণ করিতে লেশমাত্র বিলম্ব করিল না ; নববধূযোগ্য লজ্জাভয় দূর করিয়া দিয়া সৌভাগ্যবতী স্ত্রীর মহিমায় মুহূর্তের মধ্যেই স্বামীর পদপ্রান্তে অসংকোচে আপন সিংহাসন অধিকার করিল। রাজলক্ষ্মী সেদিন মধ্যাহ্নে সেই সিংহাসনে এই নুতন আগত পরের মেয়েকে এমন চিরাভ্যস্তবং স্পর্ধার সহিত বসিয়া থাকিতে দেখিয়া দুঃসহ বিস্ময়ে নীচে নামিয়া আসিলেন। নিজের চিত্তদাহে অন্নপূর্ণাকে দগ্ধ করিতে গেলেন । কহিলেন, “ওগো,