চোখের বালি \రిet লইলে তাহা কেবল আপনার রসে আপনাকে সজীব রাখিতে পারে না, তাহা ক্রমেই বিমর্ষ ও বিকৃত হইয়া আসে । আশাও মনে মনে দেখিতে লাগিল, তাহদেয় অবিশ্রাম মিলনের মধ্যে একটা শ্রান্তি ও দুর্বলতা আছে । সে মিলন যেন থাকিয়া থাকিয়া কেবলই মুম্বড়িয়া পড়ে—- সংসারের দৃঢ় ও প্রশস্ত আশ্রয়ের অভাবে তাহাকে টানিয়া খাড়া রাখাই কঠিন হয়। কাজের মধ্যেই প্রেমের মূল না থাকিলে ভোগের বিকাশ পরিপূর্ণ এবং স্থায়ী হয় না। মহেন্দ্রও আপনার বিমুখ সংসারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া আপন প্রেমোৎসবের সকল বাতিগুলাই একসঙ্গে জালাইয়া খুব সমারোহের সহিত শূন্তগুহের অকল্যাণের মধ্যে মিলনের আনন্দ সমাধা করিতে চেষ্টা করিল। আশার মনে সে একটুখানি খোচা দিয়াই কহিল, "চুনি, তোমার আজকাল কী হইয়াছে বলে দেখি । মাসি গেছেন, তা লইয়া অমন মন ভার করিয়া আছ কেন । আমাদের দুজনার ভালোবাসাতেই কি সকল ভালোবাসার অবসান নয় !" আশা দুঃখিত হইয়া ভাবিত, তবে তো আমার ভালোবাসায় একটা কী অসম্পূর্ণতা আছে। আমি তো মাসির কথা প্রায়ই ভাবি , শাশুড়ি চলিয়া গেছেন বলিয়া তো আমার ভয় হয় ।” তখন সে প্রাণপণে এই-সকল প্রেমের অপরাধ ক্ষালন করিতে চেষ্টা করে । এখন গৃহকর্ম ভালো করিয়া চলে না— চাকর-বাকরেরা ফাকি দিতে আরম্ভ করিয়াছে। একদিন ঝি অমুখ করিয়াছে বলিয়া আসিল না, বামুনঠাকুর মদ খাইয়া নিরুদেশ হইয়া রহিল। মহেন্দ্র আশাকে কহিল, “বেশ মজা হইয়াছে, আজ আমরা নিজের রন্ধনের কাজ সারিয়া লইব ।” মহেন্দ্র গাড়ি করিয়া নিউ মার্কেটে বাজার করিতে গেল। কোন জিনিসটা কী পরিমাণে দরকার, তাহা তাহার কিছুমাত্র জানা ছিল না— কতকগুলা বোঝা লইয়া আনন্দে ঘরে ফিরিয়া আসিল । সেগুলা লইয়া যে কী করিতে হইবে, আশাও তাহা ভালোরূপ জানে না। পরীক্ষায় বেলা দুটা-তিনটা হইয়া গেল এবং নানাবিধ অভূতপূর্ব অখাদ্য উদ্ভাবন করিয়া মহেন্দ্র অত্যন্ত আমোদ বোধ করিল। আশা মহেন্দ্রের আমোদে যোগ দিতে পারিল না, আপন অজ্ঞতা ও অক্ষমতায় মনে মনে অত্যন্ত লজ্জা ও ক্ষোভ পাইল । ঘরে ঘরে জিনিসপত্রের এমনি বিশৃঙ্খলা ঘটিয়াছে যে, আবশ্বকের সময়ে কোনো জিনিস খুজিয়া পাওয়াই কঠিন । মহেন্দ্রের চিকিৎসার অস্ত্র একদিন তরকারি কুটিবার কার্যে নিযুক্ত হইয়া আবর্জনার মধ্যে অজ্ঞাতবাস গ্রহণ করিল এবং তাহার চোখের বালি ولاني নোটের খাত হাতপাখার অ্যাক্টনি করিয়া রান্নাঘরের ভস্মশয্যায় বিশ্রাম করিতে লাগিল । * এইসকল অভাবনীয় ব্যবস্থাবিপর্যয়ে মহেঞ্জের কৌতুকের সীমা রহিল না, কিন্তু আশা ব্যথিত হইতে থাকিল। উচ্ছ,খল যথেচ্ছাচারের স্রোতে সমস্ত ঘরকন্ন ভাসাইয়া হাতমুখে ভাসিয়া চলা বালিকার কাছে বিভীষিকাজনক বলিয়া বোধ হইতে লাগিল । একদিন সন্ধ্যার সময় দুইজনে ঢাকা-বারান্দায় বিছানা করিয়া বসিয়াছে । সম্মুখে খোলা ছাদ । বৃষ্টির পরে কলিকাতার দিগন্তব্যাপী সোঁধশিখরশ্রেণী জ্যোৎস্নায় প্লাবিত। বাগান হইতে রাশীকৃত ভিজা বকুল সংগ্ৰহ করিয়া আশা নতশিরে মালা গাঁথিতেছে । মহেন্দ্র তাহা লইয়া টানাটানি করিয়া, বাধা ঘটাইয়া প্রতিকুল সমালোচনা করিয়া অনর্থক একটা কলহ স্বষ্টি করিবার উদযোগ করিতেছিল। আশা এই-সকল অকারণ উৎপীড়ন লইয়া তাহাকে ভৎসনা করিবার উপক্রম করিব মাত্র মহেন্দ্র কোনো একটি কৃত্রিম উপায়ে আশার মুখ বন্ধ করিয়া শাসনবাক্য অস্কুরেই বিনাশ করিতেছিল । এমন সময় প্রতিবেশীর বাড়ির পিঞ্জরের মধ্য হইতে পোষা কোকিল কুহু কুহু করিয়া ডাকিয়া উঠিল । তখনই মহেন্দ্র এবং আশা তাহাদের মাথার উপরে দোদুল্যমান খাচার দিকে দৃষ্টিপাত করিল। তাহদের কোকিল প্রতিবেশী কোকিলের কুছধবনি কখনো নীরবে সহ করে নাই, আজ সে জবাব দেয় না কেন । আশা উৎকণ্ঠিত হইয়া কহিল, “পাখির আজ কী হইল।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “তোমার কণ্ঠ শুনিয়া লজ্জাবোধ করিতেছে।” আশা সামুনয় স্বরে কহিল, “না, ঠাট্ট নয়, দেখো-না উহার কী হইয়াছে।” মহেন্দ্র খাচী পাড়িয়া নামাইল । খাচার উপরের আবরণ খুলিয়া দেখিল, পাখি মরিয়া গেছে। অন্নপূর্ণ যাওয়ার পর বেহার ছুটি লইয়া গিয়াছিল, পাখিকে কেহ দেখে নাই । দেখিতে দেখিতে আশার মুখ মান হইয়া গেল। তাহার আঙল চলিল না— ফুল পডিয়া রহিল। মহেন্দ্রের মনে আঘাত লাগিলেও, অকালে রসভঙ্গের আশঙ্কায় ব্যাপারটা সে হাসিয়া উড়াইবার চেষ্টা করিল। কহিল, “ভালোই হইয়াছে ; আমি ডাক্তারি করিতে যাইতাম আর শুটা কুহুস্বরে তোমাকে জালাইয়া মারিত।” এই বলিয়া মহেন্দ্র আশাকে বাহুপাশে বেষ্টন করিয়া কাছে টানিয়া লইবার চেষ্টা করিল। চোখের বালি \ר ס আশা আস্তে আস্তে আপনাকে ছাড়াইয়া লইয়া আঁচল শূন্ত করিয়া বকুলগুলা ফেলিয়া দিল। কহিল, “আর কেন। ছিছি! তুমি শীঘ্ৰ যাও, মাকে ফিরাইয়া আনো গে।” మ এমন সময় দোতলা হইতে “মহিনদা মহিনদা” রব উঠিল । “আরে কে হে, এসো এসো” বলিয়া মহেন্দ্র জবাব দিল। বিহারীর সাড়া পাইয়া মহেন্দ্রের চিত্ত উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। বিবাহের পর বিহারী মাঝে মাঝে তাহাদের স্বখের বাধাস্বরূপ আসিয়াছে— আজ সেই বাধাই মুখের পক্ষে একান্ত প্রয়োজনীয় বলিয়া বোধ হইল। আশাও বিহারীর আগমনে আরাম বোধ করিল। মাথায় কাপড় দিয়া সে তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িল দেখিয়া মহেন্দ্ৰ কহিল, “যাও কোথায় । আর তো কেহ নয়, বিহারী আসিতেছে।” আশা কহিল, “ঠাকুরপোর জলখাবারের বন্দোবস্ত করিয়া দিই গে।” একটা-কিছু কর্ম করিবার উপলক্ষ আসিয়া উপস্থিত হওয়াতে আশার অবসাদ কতকটা লঘু হইয়া গেল । আশা শাশুড়ির সংবাদ জানিবার জন্য মাথায় কাপড় দিয়া দাড়াইয়া রহিল । বিহারীর সহিত এখনো সে কথা কয় না । । বিহারী প্রবেশ করিয়াই কহিল, “আ সর্বনাশ ! কী কবিত্বের মাঝখানেই পা ফেলিলাম। ভয় নাই বোঠান, তুমি বোসো, আমি পালাই।” আশা মহেন্দ্রের মুখে চাহিল। মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “বিহারী, মার কী খবর।” বিহারী কহিল, "মা-খুড়ির কথা আজ কেন ভাই। সে ঢের সময় আছে। Such a night was not made for sleep, nor for mothers and aunts t” বলিয়া বিহারী ফিরিতে উদ্যত হইলে মহেন্দ্র তাহাকে জোর করিয়া টানিয়া আনিয়া বসাইল। বিহারী কহিল, “বোঠান, দেখো, আমার অপরাধ নাই— আমাকে জোর করিয়া আনিল— পাপ করিল মহিনদা, তাহার অভিশাপটা আমার উপরে যেন না পড়ে।” কোনো জবাব দিতে পারে না বলিয়াই এই-সব কথায় আশা অত্যন্ত বিরক্ত হয় ; বিহারী ইচ্ছা করিয়া তাহাকে জালাতন করে । বিহারী কহিল, “বাড়ির শ্ৰী তো দেখিতেছি— মাকে এখনো আনাইবার কি সময় হয় নাই।”