প্রধান মেনু খুলুন


:) இந்த ѣ চোখের বালি কোনো আশঙ্কাকে কোনো কর্তব্যকে মনে স্থান দিতে চায় না, তাই সে মাতার কষ্টকে পীড়াকে এতই লঘু করিয়া দেখিয়াছে— পাছে জননীর রোগশয্যায় তাহাকে আবদ্ধ হইয়া পড়িতে হয়, তাই সে এমন নির্লজের মতো একটু অবকাশ পাইতেই বিনোদিনীর কাছে পলায়ন করিয়াছে। রোগ-আরোগ্যের প্রতি রাজলক্ষ্মীর আর লেশমাত্র উৎসাহ রহিল না— মহেক্সের অমুদবেগ যে অমূলক, দারুণ অভিমানে ইহাই তিনি প্রমাণ করিতে চাহিলেন । বেলা দুটার সময় আশা কহিল, “ম, তোমার ওষুধ খাইবার সময় হইয়াছে.।” রাজলক্ষ্মী উত্তর না দিয়া চুপ করিয়া রহিলেন। আশা ওষুধ আনিবার জন্ত উঠিলে তিনি বলিলেন, “ওষুধ দিতে হবে না বউমা, তুমি যাও।” আশা মাতার অভিমান বুঝিতে পারিল— সেই অভিমান সংক্রামক হইয়। তাহার হৃদয়ের আন্দোলনে দ্বিগুণ দোলা দিতেই আশা আর থাকিতে পারিল না, কান্না চাপিতে চাপিতে গুমরিয়া কাদিয়া উঠিল । রাজলক্ষ্মী ধীরে ধীরে আশার দিকে পাশ ফিরিয়া তাহার হাতের উপরে সকরুণ স্নেহে আস্তে আস্তে হাত বুলাইতে লাগিলেন ; কহিলেন, “বউমা, তোমার বয়স অল্প, এখনো তোমার স্বখের মুখ দেখিবার সময় আছে । আমার জন্য তুমি আর বৃথা চেষ্টা করিয়ো না বাছা— আমি তো অনেক দিন বাচিয়াছি— আর কী হইবে।” শুনিয়া আশার রোদন আরো উচ্ছসিত হইয়া উঠিল, সে মুখের উপর আঁচল চাপিয়া ধরিল । এইরূপে রোগীর গৃহে নিরানন্দ দিন মন্দ গতিতে কাটিয়া গেল । অভিমানের মধ্যেও এই দুই নারীর ভিতরে ভিতরে আশা ছিল, এখনই মহেন্দ্ৰ আসিৰে । শামাত্রেই উভয়ের দেহে যে-একটি চমক-সঞ্চার হইতেছিল, তাহ উভয়েই বুঝিতে পারিতেছিলেন । ক্রমে দিবাবসানের আলোক অস্পষ্ট হইয়া আসিল ; কলিকাতার অন্তঃপুরের মধ্যে সেই গোধুলির যে আভা তাহাতে আলোকের প্রফুল্লতাও নাই, অন্ধকারের আবরণও নাই— তাহা বিষাদকে গুরুভার এবং নৈরাশুকে অশ্রুহীন করিয়া তোলে, তাহ কর্ম ও আশ্বাসের বল হরণ করে, অথচ বিশ্রাম ও বৈরাগ্যের শাস্তি আনয়ন করে না। রুগ,ণগৃহের সেই শুষ্ক শ্ৰীহীন সন্ধ্যায় আশা নিঃশবপদে উঠিয়া একটি প্রদীপ জালিয়া ঘরে জানিয়া দিল। রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “বউমা, আলো ভালো লাগিতেছে না, প্রদীপ বাহিরে রাখিয়া দাও।” আশা প্রদীপ বাহিরে রাখিয়া আসিয়া বসিল । অন্ধকার যখন ঘনতর হইয়। এই ক্ষুদ্র কক্ষের মধ্যে বাহিরের অনন্ত রাত্রিকে আনিয়া দিল তখন আশা চোখের বালি эъ» बाजणौक प्रश्चन्द्र जिख्गना कब्रिज, *মা, তাহাকে কি একবার খবর দিব ।” রাজলক্ষ্মী দৃঢ়স্বরে কছিলেন, “না বউমা, তোমার প্রতি আমার শপথ রহিল, মহেন্দ্রকে খবর দিয়ে না।” শুনিয়া আশা স্তন্ধ হইয়া রহিল ; তাহার আর কাদিবার বল ছিল না। বাহিরে দাড়াইয়া বেহার কহিল, “বাবুর কাছ হইতে চিটুঠি আসিয়াছে।” শুনিয়া মুহূর্তের মধ্যে রাজলক্ষ্মীর মনে হইল, মহেঞ্জের হয়তে হঠাৎ একটা কিছু ব্যামো হইয়াছে, তাই সে কোনোমতেই আসিতে না পারিয়া চিঠি পাঠাইয়াছে। অমৃতপ্ত ও ব্যস্ত হইয়া কহিলেন, “দেখো তো বউমা, মহিন কী লিখিয়াছে।” আশা বাহিরে প্রদীপের আলোকে কম্পিতহন্তে মহেঞ্জের চিঠি পড়িল । মহেন্দ্র লিখিয়াছে, কিছুদিন হইতে সে ভালো বোধ করিতেছিল না, তাই সে পশ্চিমে বেড়াইতে যাইতেছে । মাতার অমুখের জন্ত বিশেষ চিন্তার কারণ কিছুই নাই । তাহাকে নিয়মিত দেখিবার জন্য সে নবীন-ভাক্তারকে বলিয়া দিয়াছে। রাত্রে ঘুম না হইলে বা মাথা ধরিলে কখন কী করিতে হইবে, তাহাও চিঠির মধ্যে লেখা আছে, এবং দুই টিন লঘু ও পুষ্টিকর পথ্য মহেন্দ্র ডাক্তারখানা হইতে জানাইয়া চিঠির সঙ্গে পাঠাইয়াছে । আপাতত গিরিধির ঠিকানায় মাতার সংবাদ অবশুঅবগু জানাইবার জন্য চিঠিতে পুনশ্চের মধ্যে অনুরোধ আছে। এই চিঠি পড়িয়া আশা স্তম্ভিত হইয়া গেল— প্রবল ধিক্কার তাহার দুঃখকে অতিক্রম করিয়া উঠিল। এই নিষ্ঠুর বার্তা মাকে কেমন করিয়া শুনাইবে। আশার বিলম্বে রাজলক্ষ্মী অধিকতর উদবিগ্ন হইয়া উঠিলেন। কহিলেন, “বউমা, মহিন কী লিখিয়াছে শীঘ্র আমাকে শুনাইয়া যাও।” বলিতে বলিতে তিনি আগ্রহে বিছানায় উঠিয়া বসিলেন । আশা তখন ঘরে আসিয়া ধীরে ধীরে সমস্ত চিঠি পড়িয়া শুনাইল । রাজলক্ষ্মী জিজ্ঞাসা করিলেন, “শরীরের কথা মহিন কী লিখিয়াছে, ঐখানটা আর-এক বার পড়ো তো ।” আশা পুনরায় পড়িল, “কিছুদিন হইতে আমি তেমন ভালো বোধ করিতেছিলাম না, তাই আমি—” রাজলক্ষ্মী । থাক থাক, আর পড়িতে হইবে না। ভালো বোধ হইবে কী করিয়া । বুড়ো মা মরেও না, অথচ কেবল ব্যামো লইয়া তাহাকে জালায় । কেন তুমি মহিনকে আমার অমুখের কথা খবর দিতে গেলে । বাড়িতে ছিল, ঘরের 3 е е চোখের বালি কোণে বসিয়া পড়াশুনা করিতেছিল, কাহারো কোনো এলাকায় ছিল না— মাঝে হইতে মার ব্যামোর কথা পাড়িয়া তাহাকে ঘরছাড়া করিয়া তোমার কী স্বখ হইল। আমি এখানে মরিয়া থাকিলে তাহাতে কাহার কী ক্ষতি হইত। এত দুঃখেও তোমার ঘটে এইটুকু বুদ্ধি আসিল না ! বলিয়া বিছানার উপর শুইয়া পড়িলেন । বাহিরে মসমস্ শব্দ শোনা গেল। বেহার কহিল, “ডাক্তারবাৰু আয়া।” ডাক্তার কাশিয়া ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। আশা তাড়াতাড়ি ঘোমটা টানিয়া থাটের অন্তরালে গিয়া দাড়াইল । ডাক্তার জিজ্ঞাসা করিল, “আপনার কী হইয়াছে বলুন তো।” রাজলক্ষ্মী ক্রোধের স্বরে কহিলেন, “হইবে আর কী । মানুষকে কি মরিতে দিবে না। " তোমার ওষুধ খাইলেই কি অমর হইয়া থাকিব ।” ডাক্তার সান্ধনার স্বরে কহিল, “অমর করিতে না পারি, কষ্ট যাহাতে কমে সে চেষ্টা—” রাজলক্ষ্মী বলিয়া উঠিলেন, “কষ্টের ভালো চিকিৎসা ছিল যখন বিধবার। পুড়িয়া মরিত— এখন এ তো কেবল বাধিয়া মারা । যাও ডাক্তারবাবু, তুমি যাও— আমাকে আর বিরক্ত করিয়ো না, আমি একলা থাকিতে চাই ।” ডাক্তার ভয়ে ভয়ে কহিল, “আপনার নাড়িটা একবার—" রাজলক্ষ্মী অত্যন্ত বিরক্তির স্বরে কহিলেন, “আমি বলিতেছি তুমি যাও । আমার নাড়ি বেশ আছে– এ নাড়ি শীঘ্ৰ ছাড়িবে এমন ভরসা নাই।" ডাক্তার অগত্যা ঘরের বাহিরে গিয়া আশাকে ডাকিয়া পাঠাইল । আশাকে নবীন-ডাক্তার রোগের সমস্ত বিবরণ জিজ্ঞাসা করিল। উত্তরে সমস্ত শুনিয়া গম্ভীরভাবে ঘরের মধ্যে পুনরায় প্রবেশ করিল। কহিল, “দেখুন, মহেন্দ্র আমার উপর বিশেধ করিয়া ভার দিয়া গেছে। আমাকে যদি আপনার চিকিৎসা করিতে না দেন, তবে সে মনে কষ্ট পাইবে ।" মহেন্দ্র কষ্ট পাইবে, এ কথাটা রাজলক্ষ্মীর কাছে উপহাসের মতো শুনাইল । তিনি কহিলেন, “মহিনের জন্য বেশি ভাবিয়ো না । কষ্ট সংসারে সকলকেই পাইতে হয়। এ কষ্টে মহেন্দ্রকে অত্যন্ত বেশি কাতর করিবে না। তুমি এখন যাও ডাঞ্জার । আমাকে একটু ঘুমাইতে দাও।” 1নবীন-ডাক্তার বুঝিল, রোগীকে উত্ত্যক্ত করিলে ভালো হইবে না। ধীরে ধীরে বাহিরে আসিয়া যাহা কর্তব্য আশাকে উপদেশ দিয়া গেল । চোখের বালি ૨ ૦ છે আশা ঘরে ঢুকিতেই রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “যাও বাছা, তুমি একটু বিশ্রাম করে। গে। সমস্ত দিন রোগীর কাছে বসিয়া আছ । হারুর মাকে পাঠাইয়া দাও— পাশের ঘরে বসিয়া থাকৃ।” আশা রাজলক্ষ্মীকে বুঝিত । ইহা তাহার স্নেহের অনুরোধ নহে, ইহ। তাহার আদেশ– পালন করা ছাড়া আর উপায় নাই । হারুর মাকে পাঠাইয়া দিয়া অন্ধকারে সে নিজের ঘরে গিয়া শীতল ভূমিশয্যায় শুইয়া পড়িল । সমস্ত দিনের উপবাসে ও কষ্টে তাহার শরীর-মন শ্রান্ত ও অবপন্ন। পাড়ার বাড়িতে সেদিন থাকিয়া থাকিয়া বিবাহের বাদ্য বাজিতেছিল । এই সময়ে সানাইয়ে আবার সুর ধরিল । সেই রাগিণীর আঘাতে রাত্রির সমস্ত অন্ধকার যেন স্পন্দিত হইয়া আশাকে বারংবার অভিঘাত করিতে লাগিল । তাহার বিবাহরাত্রির প্রত্যেক ক্ষুদ্র ঘটনাটিও সজীব হইয়া রাত্রির আকাশকে স্বপ্লচ্ছবিতে পূর্ণ করিয়া তুলিল ; সেদিনকার আলোক, কোলাহল, জনতা ; সেদিনকার মাল্যচন্দন, নববস্ত্র ও হোমধুমের গন্ধ ; নববধূর শঙ্কিত লজ্জিত আনন্দিত হৃদয়ের নিগৃঢ় কম্পন— সমস্তই স্মৃতির আকারে যতই তাহাকে চারি দিকে আবিষ্ট করিয়া ধরল, ততই তাহার হৃদয়ের ব্যথা প্রাণ পাইয়। বল করিতে লাগিল । দারুণ দুর্ভিক্ষে ক্ষুধিত বালক যেমন খাদ্যের জন্য মাতাকে আঘাত করিতে থাকে, তেমনি জাগ্রত সুখের স্মৃতি আপনার খাদ্য চাহিয়া আশার বক্ষে বারংবার সরোদনে করাঘাত করিতে লাগিল । অবসন্ন আশাকে আর পড়িয়া থাকিতে দিল না । দুই হাত জোড় করিয়া দেবতার কাছে প্রার্থনা করিতে গিয়া সংসারে তাহার একমাত্র প্রত্যক্ষ দেবতা মাসিমার পবিত্র স্নিগ্ধ মৃতি আশার অশ্রুবাম্পাচ্ছন্ন হৃদয়ের মধ্যে আবিভূত হইল । পুনরায় সংসারে দুঃখঝঞ্চাটে সেই তাপসীকে আহবান করিয়া আনিবে না, এতদিন ইহাই তাহার প্রতিজ্ঞা ছিল । কিন্তু আজ সে আর কোথাও কোনো উপায় দেখিতে পাইল না— আজ তাহার চতুদিকে ঘনায়িত নিবিড় দুঃখের মধ্যে আর রন্ধমাত্র ছিল না। তাই আজ সে ঘরের মধ্যে আলো জালিয়া কোলের উপর একখানা খাতায় চিঠির কাগজ রাখিয়া ঘনঘন চোখের জল মুছিতে মুছিতে চিঠি লিখিতে লাগিল— শ্ৰীচরণকমলেষু— মাসিম, তুমি ছাড়া আজ আমার আর কেহ নাই ; একবার আসিয়া তোমার কোলের মধ্যে এই দুঃখিনীকে টানিয়া লও— নহিলে আমি কেমন করিয়া বাচিব । আর কী লিখিব, জানি না । তোমার চরণে আমার শতসহস্রকোটি প্রণাম | তোমার মেহের চুনি