জয়তু নেতাজী/স্বামীজী ও নেতাজী

স্বামীজী ও নেতাজী

 “If there were another Vivekananda he would have understood what Vivekananda has done. And yet―how many Vivekanandas shall be born in time!”

―স্বামী বিবেকানন্দ

 এই বাংলাদেশে, উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, এক মহাপুরুষের আবির্ভাব হইয়াছিল, তাঁহার মত সন্ন্যাসী অথচ দেশ-প্রেমিক ভারতবর্ষে পূর্ব্বে আর দেখা যায় নাই। এই মহাপুরুষ―বিবেকানন্দ। তিনি পৃথিবী ভ্রমণ করিয়াছিলেন, এবং দেশে দেশে তাঁহার গুরুর নব জীবব্রহ্ম-বাদ প্রচার করিয়াছিলেন; এক নব বেদান্তধর্ম্মের প্রচারক বলিয়া দেশ-বিদেশে তাঁহার খ্যাতি হইয়াছিল। তিনি জ্ঞানমার্গী সন্ন্যাসী হইয়াও এক নূতন কর্ম্মমন্ত্রের সাধক ছিলেন, এবং বহুকাল পরে এই ভারতবর্ষে বুদ্ধের আদর্শে এক সন্ন্যাসী-সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। ইহা সকলেই জানে, কিন্তু তাঁহার সেই কর্ম্ম-জীবনের মূলে অধ্যাত্ম-পিপাসাকেও পরাভূত করিয়া কোন্ মানব-হৃদয়-বেদনা অনুক্ষণ জাগরূক ছিল, তাহা সেকালে কেহ বুঝিয়াও বুঝিতে পারে নাই; আজ আর একজনকে দেখিয়া আমরা তাহা বুঝিয়াছি―বিবেকানন্দ-জীবনের জীবন্ত ভাষ্যরূপে আজ আমরা নেতাজী সুভাষচন্দ্রকে দেখিতেছি। আগে স্বামীজীর কথাই বলি। স্বামীজীকে না বুঝিলে নেতাজীকে বুঝা যাইবে না; আবার নেতাজীকে না দেখিলে স্বামীজীর দর্শনলাভ হইবে না।

 আমি বলিয়াছি, সে যুগে স্বামীজীর জীবনের সেই অপর দিক, তাঁহার সেই মহান্ হৃদয়ের অতি-নিরুদ্ধ বেদনা কেহ বুঝে নাই, তাঁহার সে পরিচয় কেহ ভাল করিয়া পায় নাই। তাহার কারণ, তাঁহার যুগ তখনও আগামী,―আসে নাই। কেবল একজন―যিনি গুরুর হৃদয় আপন হৃদয়ে অনুভব করিয়াছিলেন―সেই পরম সৌভাগ্যবতী গুরুগতপ্রাণা স্বামীজীর মানস-কন্যা ভগিনী নিবেদিতা তাহা বুঝিয়াছিলেন। তাই তাঁহারই মুখে আমরা সে কথা শুনিয়াছি; তিনিই বলিয়াছেন―

 “বাগুরাবদ্ধ সিংহের মত―মুক্তিলাভের জন্য তাঁহার সেই দুরন্ত প্রয়াস, এবং নিরুপায় নিশ্চলতার সেই যে নিদারুণ যন্ত্রণা―ইহাই ছিল আমার গুরুদেবের ব্যক্তি-চরিত্রের বিশিষ্ট পরিচয়। যেদিন জাহাজঘাটে অবতরণ করিয়া আমি তাঁহাকে এ দেশের মাটিতে প্রথম দেখিয়াছিলাম, সেই প্রথম দেখার দিন হইতে―যে আর একদিন গোধুলি-সন্ধ্যায় তিনি তাঁহার দেহটাকে ভাঁজ-করা বসনের মত ত্যাগ করিয়া, এই জগৎ-পল্লীবাস হইতে নিরুদ্দেশ হইয়া গেলেন―সেই দিন পর্য্যন্ত, আমি সর্ব্বদা অনুভব করিতাম যে, তাঁহার জীবনে অপর একটির মত এইটিও ওতপ্রােত হইয়াছিল।”

 ইহাই যে বিবেকানন্দ-জীবনের মূলতত্ত্ব তাহা আমরা বুঝিয়াও বুঝি নাই। ইহার পূর্ব্বে আর একজনের মধ্যে, আর একরূপে ও আর এক মাত্রায় এই বেদনা জাগিয়াছিল, তাঁহার সেই বেদনাও কেহ বুঝে নাই। তিনি ছিলেন কবি, সেই বেদনাকে তিনি তাঁহার হৃদয়স্রুত শোণিতধারায় লেখনীমুখে মুক্তি দিয়াছিলেন। বাঙালী তাহার রস আস্বাদন করিয়াছিল―সে বেদনা বুঝে নাই। আমি বঙ্কিমচন্দ্রের কথা বলিতেছি; বঙ্কিমচন্দ্র ‘ধূঁয়ার ছলনা করিয়া’ কাঁদিয়াছিলেন, সে-কান্না তখন কেহ বিশ্বাস করে নাই। স্বামীজীর বেদনা আরও গভীর, আরও বাস্তব তাহার কারণ, তাঁহার দৃষ্টি―ঊর্দ্ধেও যতদূর, নিম্নেও ততদূর প্রসারিত ছিল; তিনি মানবাত্মার মুক্তিকেও যেমন, তাহার বন্ধনকেও তেমনি আত্মগোচর করিয়াছিলেন। এজন্য সেই বন্ধন তাঁহার যেমন অসহ্য হইয়াছিল এমন আর কাহারও হয় নাই। কোন্ দেশের কোন্ সমাজে তিনি মানুষের চরম দুর্গতিকে প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন? পৃথিবীর আর সকল দেশে তিনি মানবাত্মার মহিমা ঘোষণা করিতেন, কিন্তু নিজের দেশে আসিয়া তিনি নির্ব্বাক হইয়া যাইতেন, অশ্রুবাষ্পে কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া যাইত। যেন ভারতের অভিশপ্ত দেহে ভারতেরই সেই গর্ব্বোদ্ধত আত্মা―সেই “বেদান্তকৃৎ বেদবিদেব চাহম্”—আর্ত্তনাদ করিয়া উঠিত,সর্ব্বত্যাগী সন্ন্যাসী-ভারত যোগাসনে স্থির থাকিতে পারিত না! কিন্তু স্বামীজীর সে যাতনা রোদনরবে উচ্ছ্বসিত হয় নাই; সেই অশ্রুকেও নিরুদ্ধ করিয়া, সেই বিষকে কণ্ঠে ধারণ করিয়া, সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ এই মৃতকল্প জাতির শিয়রে জাগিয়া রহিলেন, এবং তাহার বক্ষে ও বাহুতে বলাধান করিবার জন্য, কর্ণে ক্রমাগত ‘শিবোঽহম্’ ‘শিবোঽহম্’ উচ্চারণ করিতে লাগিলেন। ব্যাধির নিদান তিনি ভালরূপই বুঝিয়াছিলেন, কিন্তু অবস্থা বুঝিয়া তিনি তখনই কোন উগ্র ঔষধের ব্যবস্থা করেন নাই। একবার হৃদ্‌পিণ্ডের ক্রিয়াটা স্বাভাবিক করিয়া তুলিতে পারিলেই সকল উপসর্গ অন্তর্হিত হইবে, এখন তাড়াতাড়ি হুড়াহুড়ি করিলে সকলই পণ্ড হইবে; এ রোগের চিকিৎসায় বড় ধৈর্য্যের প্রয়োজন; প্রাথমিক চিকিৎসাটাই আসল, সেইটি যদি ধরিয়া যায় তবে আর কোন ভাবনা নাই―রোগীর চেতনা হইবে, সে আপনি উঠিয়া বসিবে; তখন সকল দুর্ব্বলতা ও উপসর্গ আবশ্যকমত অঙ্গচালনার দ্বারা সে নিজেই দূর করিতে পারিবে। ইহাই ছিল তাঁহার আত্মগত বিশ্বাস। ভগিনী নিবেদিতাও তাহাই বলিয়াছেন―

 He felt that impatience was inexcusable. If in twelve years any result were visible, this fact would constitute a great success. The task was one that might well take seventy years to accomplish.”

 স্বামী বিবেকানন্দ স্বজাতির সেই ব্যাধিযন্ত্রণাও যেমন, তাহার হৃত-স্বাস্থ্যকেও তেমনি, নিজ দেহ ও আত্মায় যেরূপ অনুভব করিয়াছিলেন, এ যুগে তৎপূর্ব্বে আর কেহ তেমন করে নাই―এই সত্য সর্ব্বাগ্রে ও সর্ব্বদা স্মরণ রাখিতে হইবে। তাহার কারণও ছিল। প্রথমতঃ তিনি ছিলেন সন্ন্যাসী; সর্ব্বত্যাগী সন্ন্যাসীর যে প্রেম তাহার কি নাম দিব? ভারতবর্ষে প্রেমকে ভগবৎ-প্রেমের সর্বোচ্চ আদর্শে শোধন করিয়া মানুষের মুক্তি-সাধনার অনুকুল করা হইয়াছে; কিন্তু সেই ব্যক্তিগত মুক্তি-সাধনাকে তুচ্ছ করিয়া এই যে মানব-প্রেম, এবং বিশেষ করিয়া স্বদেশ ও স্বজাতি-প্রেম, ভারতবর্ষে ইহা নূতন; আবার এই প্রেমও যে অধ্যাত্ম-পিপাসারই একটা রূপ, তাহা একমাত্র ভারতবর্ষেই সম্ভব। সন্ন্যাসী না হইলে, বৈরাগ্যের দ্বারা সুরক্ষিত না হইলে, প্রেম এমন নির্ভীক ও বলীয়ান হইতে পারে না, প্রাণ এমন মুক্ত ও স্বাধীন হইতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ, সেই কারণেই কোন সমাজ-বন্ধন না থাকায়, তিনি দেশের সকল সমাজে মিশিয়া, সকল প্রকার জীবন-যাত্রা আপন চক্ষে দেখিবার ও আপন বক্ষে বুঝিবার সুযােগ পাইয়াছিলেন। দেশকে ভালবাসার মূলে ছিল―দেশের যাতনাক্লিষ্ট সর্ব্ব-অঙ্গের সহিত এই ঘনিষ্ঠ পরিচয়। ঐ পরিচয়ের কাহিনী মহাকাব্য অপেক্ষাও রােমাঞ্চকর; এখানে সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ উদ্ধৃত করা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। একদা, প্রায় দুই বৎসর তিনি সমগ্র ভারত পর্য্যটন করিয়াছিলেন―ইহা সেই সময়ের কথা। তাঁহার জীবনবৃত্তকার লিখিয়াছেন―

 সকল মানুষের সঙ্গে তিনি সমপদস্থের ন্যায় ব্যবহার করিতেন―ছােট-বড়-ভেদ ছিল না। অস্পৃশ্য পারিয়ার গৃহেও তিনি যেমন দরিদ্র-ভিক্ষুকের বেশে আশ্রয় লইতেন, তেমনি রাজা-জমিদারদিগের প্রাসাদে তাঁহাদের সমকক্ষ-রূপে আতিথ্য গ্রহণ করিতেন। গরীব-দুঃখীর ঘরে, কোথাও গােয়ালের মাচায়, কোথাও বা মাটিতে ছেঁড়া চাটাই-এর উপরে একত্র শয়ন করিয়া রাত্রি যাপন করিতেন,―সমাজে যাহারা পতিত ও উৎপীড়িত তাহাদের দুঃখ ও অপমান তিনি নিজেরই দুঃখ ও অপমান বলিয়া মনে করিতেন। মধ্যভারতে ভ্রমণকালে তিনি একদা এক মেথর-পরিবারে কয়েকদিন বাস করিয়াছিলেন। এইরূপ অতি-নিম্নশ্রেণীর মানুষের মধ্যেও―যাহারা সমাজের ভয়ে এমন ভীত ও সঙ্কুচিত―তাহাদের মধ্যেও, আত্মার অপূর্ব্ব শুচিতা দেখিয়া চমৎকৃত হইতেন―সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের সেই দুর্দ্দশা দেখিয়া তাঁহার যেন শ্বাসরোধ হইত।”


 ঐ যে দুর্গত, আত্মভ্রষ্ট, মহাদুঃখী ভারতের জনসাধারণ, উহাদের মধ্যেই তিনি মানব-মহত্ত্ব আবিষ্কার করিয়াছিলেন―জীবের ভিতরে শিবকে দেখিয়াছিলেন। ইহাই দেখিবার জন্য তিনি পরিব্রাজকবেশে ভারতের সর্ব্বত্র ভ্রমণ করিয়াছিলেন। হিন্দু-মুসলমান, শূদ্র ও অন্ত্যজ, গৃহী ও সন্ন্যাসী, পণ্ডিত-মূর্খ, পতিত ও পুণ্যবান, সকলের মধ্যে তিনি সেই এক ভারতীয় ভাবের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করিয়া একটা বড় আশায় আশান্বিত হইয়াছিলেন। একদা এক রাজার সভায় এক নর্ত্তকীর গান শুনিয়া তিনি যেন নিজেও তাহার দ্বারা ভর্ৎসিত হইয়াছিলেন। মানুষ যে কোন অবস্থাতেই আত্মার শুচিতা হারায় না, সকল মানুষই যে শ্রদ্ধার যোগ্য, এ বিশ্বাস সত্ত্বেও একবার তিনি ঠকিয়াছিলেন―রাজপ্রাসাদে বাইজীর গান শুনিতে তাঁহার প্রবৃত্তি হয় নাই। বাইজী তাহা বুঝিতে পারিয়া সাধক-কবি সুরদাসের একটি গান এমন তন্ময় হইয়া গাহিতে লাগিল যে, স্বামীজী একেবারে অভিভূত হইয়া গেলেন। সেই পতিতা নারী গাহিতেছিল―

 “ওগাে নাথ, ওগো প্রভু! তুমিও আমার কলঙ্কের দিকটাই দেখিও না, তোমার চক্ষে যে সব সমান! যে-লৌহ দেবমন্দিরে বিগ্রহের দেহে স্থান পায়―মাংসবিক্রেতা কসাইয়ের ছুরিতেও যে তাহাই রহিয়াছে। কিন্তু পরশমণির স্পর্শে দুই-ই ত’ শােনা হইয়া যায়! তবে কেন তুমি আমার পাপটাই দেখিতেছ? হে নাথ! হে প্রভু! তােমার চক্ষে যে সব সমান!

 একই বৃষ্টিবিন্দু যমুনার জলে বা পথিপার্শ্বের অপবিত্র পয়ঃপ্রণালীতে পড়ে, কিন্তু সেই জল গঙ্গায় মিশিলে উভয়ই সমান পবিত্র হইয়া যায়। ওগাে নাথ! ওগো প্রভু! তুমি আমার কলঙ্কটাই দেখিও না―তােমার চক্ষে যে সব সমান!”

 বাইজীর মুখে ঐ সুরে ঐ গান শুনিয়া স্বামীজীর মনে কি হইয়াছিল, তাহা অনুমান করা কঠিন নহে। আর কোন্ দেশে ঐ শ্রেণীর নারীর মুখে মুহূর্ত্তের জন্যও এমন দিব্যভাব ফুটিয়া উঠে? এমন সহজলব্ধ ভাবাবেশ এজাতির বহুকালাগত সাধনার পরিচায়ক নহে কি? স্বামীজীর মত মহাভাবের ভাবুক, অতিউচ্চ অধ্যাত্ম-পন্থী সাধককেও এই দেশ ও এই জাতি কেন যে এত মুগ্ধ করিয়াছিল―তাহার বর্ত্তমান দুর্দ্দশা তাঁহাকে কেন যে এমন অভিভূত করিয়াছিল, আমি সংক্ষেপে তাহার একটু আভাস দিলাম।

 একদিকে এই ভারত―ভারতের হীনতম দীনতম নরনারীর মধ্যে প্রাণ ও প্রতিভার ঐ ভস্মাচ্ছন্ন বহ্নি, এবং সে সম্বন্ধে সকল সংশয়ের তিরােধান; অপরদিকে সেকালের একমাত্র ভরসা― সেই নবযুগের নবভাবোন্মুখ শিক্ষিত যুব-সম্প্রদায়; একটি হইল ক্ষেত্র, আর একটি হইল কর্ষণ-যন্ত্র, এবং মন্ত্র হইল জীবশিববাদ। ইহাই হইল স্বামীজীর কর্ম্মপন্থা; অতঃপর তিনি ঐ যুবকদল হইতেই―জাতির উদ্ধারকল্পে―ত্যাগমন্ত্রে দীক্ষিত একটি সন্ন্যাসী-সম্প্রদায় গড়িয়া লইতে মনস্থ করিলেন।

 স্বামীজীর দেশপ্রেমের কথা বলিয়াছি, সেই প্রেমের মূল কোথায় তাহাও বলিয়াছি। এক্ষণে, তাঁহার সেই আদর্শ বা নীতি যে ভ্রান্ত নয়, এবং তাহাই যে আপন নিয়মে যথাকালে নেতাজী সুভাষচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণ ও নিঃসংশয়রূপে প্রকাশমান হইয়াছে, তাহা বুঝিতে হইলে স্বামীজীর সেই মন্ত্রটিকে আর একটু ভাল করিয়া অবধারণ করিতে হইবে। আমাদের ধর্ম্মশাস্ত্রে পতিতআত্মার উদ্ধার নানা উপায়ে হওয়ার বিধি ও উপদেশ আছে―ভক্তি-শাস্ত্রে তাহা একরূপ, শক্তি-শাস্ত্রে তাহা অন্যরূপ। শেষে পৌরাণিক ভাগবত-ধর্ম্মই প্রবল ও লােকায়ত হইয়া উঠিয়াছিল; উহা মূলে ভক্তিমার্গ; ভগবানে আত্মসমর্পণ, আত্মার দৈন্য বা পাপ-স্বীকারই উহার মুক্তিতত্ত্ব। স্বামীজী প্রথম হইতেই ইহার প্রতি শ্রদ্ধান্বিত ছিলেন না, তাঁহার অধ্যাত্ম-পিপাসা ও অন্তর-প্রকৃতি ছিল ইহার বিপরীত। পরে, দেশের ঐ দারুণ দুরবস্থাদর্শনে, তাঁহার সেই স্বকীয় অধ্যাত্ম-দৃষ্টিই আরও নিঃসংশয় হইয়া উঠিল; জাতির উদ্ধারকল্পে, ভক্তি নয়―শক্তিকেই তিনি একমাত্র সাধন-পন্থা বলিয়া দৃঢ়-নিশ্চয় করিলেন। তত্ত্ব বা সাধনমার্গ হিসাবে ভক্তির মূল্য যেমনই হৌক, উহা যে এ যুগের ঐ সঙ্কটে শুধুই নিরর্থক নয়―বরং ক্ষতিকর, এবং শক্তিই যে একমাত্র সত্য-মন্ত্র, তাই তিনি যে-দৃষ্টির দ্বারা উপলব্ধি করিয়াছিলেন, এবং যেভাবে ও যেরূপে সেই আধ্যাত্মিক শক্তিবাদকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন, তাহাও তাঁহার প্রতিভারই নিদর্শন। তিনি যে-শক্তিমন্ত্রের সাধক ও প্রচারক ছিলেন তাহাতে আত্মার জাগরণ আগে, পরে আর সব। তিনি পুনঃ পুনঃ এই কথাই বলিতেন যে, ‘man-making’ বা মানুষ-গড়াই তাঁহার একমাত্র কাজ; তিনি আর কিছুই করিবেন না,―অন্ততঃ সেইকালে আর কিছু করিবার প্রয়োজন নাই। এই মন্ত্রও তিনি পাইয়াছিলেন উপনিষৎ হইতে; তিনি বলিয়াছেন, “I have never quoted anything but the Upanishads, and of the Upanishads it is that one idea, Strength”। উপনিষৎ বটে; কিন্তু তাহা হইতে ঐ মন্ত্রটি এমন করিয়া আর কে উদ্ধার করিয়াছিল? এই বাংলাদেশে উপনিষৎ লইয়া, তাহার সেই ব্রহ্মবাদ লইয়া কত গর্ব্ব কত অভিমানই শুরু হইয়াছিল―সেই অতি দুর্ব্বল ও সংকীর্ণ মনোভাব, প্রেমকে আত্ম-প্রেম এবং শক্তিকে একরূপ মানসিক লীলা-বিলাসে পরিণত করিয়াছিল। স্বামীজীর সেই মন্ত্রও ঐএক উপনিষদের মন্ত্র বটে, কিন্তু মন্ত্র যদি উপযুক্ত আধার না পায় তবে মন্ত্র ও জড়, প্রাণহীন শব্দসমষ্টি মাত্র। মানুষকে আশ্রয় করিয়াই মৃত-মন্ত্র সঞ্জীবিত হয়। স্বামীজী নিজে সেই আধার হইয়া মন্ত্রের নির্ব্বাণ-বহ্নিকে সন্ধুক্ষিত করিয়াছিলেন; উপনিষৎ নয়, বেদান্ত নয়, কোন পুঁথির শ্লোক নয়―সেই মন্ত্র তাঁহারই নিজ-শক্তির বাঙ্ময় মূর্ত্তি। সেই সত্যকে তিনিই অপরোক্ষ করিয়াছিলেন, তাঁহার নিজের সেই প্রতীতিই সেই মন্ত্রকে এমন শক্তিশালী করিয়াছিল। তিনি যখন বলিলেন―“তোমরা কেহই ক্ষুদ্র নও; ঐ কু-সংস্কার, ঐ কু-বিশ্বাসই সকল ভয় ও সকল দৌর্ব্বল্যের কারণ। Man has never lost his empire. The soul has never been bound. Believe that you are free, and you will be.”―তখন সেই বাণী বাণীহিসাবে নূতন নহে, অতি পুরাতন; কিন্তু তাহার সহিত বক্তার নিজেরই যে অসীম বিশ্বাস যুক্ত ছিল―“আমি বলিতেছি, ইহার মত সত্য আর কিছু নাই”―সেই “Verily I say unto you”―তাহাই সেই বাণীর মন্ত্রশক্তি। তখন সে শুধুই কথামাত্র নয়; তাহা যুক্তি-তর্ক-প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না, একেবারে সোজা প্রাণের গভীরে প্রবেশ করে―দীপ হইতে দীপের মত, শক্তির স্পর্শে শক্তির উদ্দীপন হয়। স্বামীজী শুধু ইহাই করিয়াছিলেন, আর কিছুই করিতে চাহেন নাই―নিজ আত্মার সকল শক্তি দিয়া তিনি নব্যভারতের কানে এই মন্ত্রটি মাত্র উচ্চারণ করিয়াছিলেন। মন্ত্রই বটে! কারণ ইহার ত শুধুই অর্থ নয়―একটা অদ্ভুত চেতন-শক্তি―চমকিত করে; বুদ্ধি নয়―একরূপ বোধির উদ্রেক করে! স্বামীজীর সেই বাণী একই; যত ভঙ্গিতেই উচ্চারিত হউক তাহার অন্তর্গত সত্য যে এক, কিছুতেই তাহা হইতে যে নিষ্কৃতি নাই―ইহাও সেই সত্যেরই একটা বড় প্রমাণ। আমি এখানে কয়েকটি মাত্র উদ্ধৃত করিতেছি, যথা―“He who does not believe in himself is an atheist” (যাহার আত্ম-বিশ্বাস নাই সে-ই প্রকৃত নাস্তিক); “Believe first in yourselves, then in God” (আগে নিজেকে বিশ্বাস কর, পরে ভগবানকে বিশ্বাস করিও); “The history of the world is the history of a few men who had faith in themselves” (পৃথিবীর ইতিহাস বলিতে অল্প কয়েকজন মানুষের কাহিনীই বুঝায়―ইহাদের অসীম আত্ম-প্রত্যয় ছিল)।

 এই বাণীর অর্থ তখন কি সকলে সম্যক বুঝিয়াছিল? হয়ত অনেকে পরােক্ষ করিয়াছিল, কিন্তু অপরােক্ষ করিয়াছিল কয়জন? সাধারণে বিশ্বাস করিবার কথা ইহা নয়―বিশ্বাস করিবার প্রয়ােজনও নাই; কারণ, “The history of the world is the history of a few men”। এক একটা যুগে এক একটা মানুষই জাগে; সেই একের পূর্ণ-জাগরণে আর সকলের যেটুকু জাগরণ ঘটে তাহাতেই যুগ-প্রয়ােজন সিদ্ধ হয়। আজ আবার সেই ‘একজন’ই জাগিয়াছে―উপরের ঐ বাণীকে আমরা তাহারই রূপে মূর্ত্তি ধরিতে দেখিয়াছি! বিবেকানন্দের ঐ বাণী যেন এই আবির্ভাবের আবাহন-মন্ত্র―“আবিরাবিম এধি!” সেই বাণীই মূর্ত্তি ধারণ করিয়া নেতাজীরূপে আবির্ভূত হইয়াছে। এইবার সেই কথাই বলিব, তথাপি স্বামীজী হইতে নেতাজীতে পৌঁছিতে হইলে, আরও দুই একটি কথা বলিয়া রাখিলে ভাল হয়।

 বিবেকানন্দের দেশপ্রেম যে একটা আধ্যাত্মিক কিছু ছিল, তিনি যে দেশকে ভালবাসিয়া কেবল তাহার আত্মার মােক্ষ বা মুক্তির উপায় চিন্তা করিয়াছিলেন―ইহা তাঁহার ঐ নব-গঠিত সন্ন্যাসীর দলও যেমন বিশ্বাস করিত না, তেমনই, তাঁহার সেই বাণী সেকালের তরুণদের প্রাণে কোন্ ভাবের উদ্দীপনা করিয়াছিল তাহার প্রমাণ বাংলার আধুনিক ইতিহাসের এক অধ্যায়ে চির-উজ্জ্বল হইয়া আছে। তথাপি স্বামীজীর এই প্রেম, এবং তজ্জনিত সেই যাতনার সম্বন্ধে পুনরায় দুইজনের দুইটি উক্তি স্মরণ করাইতেছি; একজনের উক্তি পূর্ব্বে উদ্ধৃত করিয়াছি, আর একজন (মঃ রোলাঁ) বলিয়াছেন―

 “মাতৃভূমি ভারতের সেই সর্ব্বাঙ্গ-নগ্ন মূর্ত্তি―তাহার যত-কিছু শোচনীয়তা―তাঁহার আর অজ্ঞাত রহিল না; অতিশয় হীন শয্যায় শায়িত, সর্ব্বাভরণরিক্ত সেই রাজেন্দ্রাণীর দেহ তিনি স্বচক্ষে দেখিয়াছিলেন, স্বহস্তে স্পর্শ করিয়াছিলেন।”

ভগিনী নিবেদিতার আর একটি কথা এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়―

 “কিন্তু তিনি ছিলেন আজন্ম-প্রেমিক―প্রেম ছিল তাঁহার জন্মগত সংস্কার; সেই প্রেম-পূজার দেবী ছিল তাঁহার মাতৃভূমি। তাহার কোন দোষ যে তিনি ক্ষমা করিতে পারিতেন না―তাহার সংসার-বৈরাগ্যকেও একটা গুরুতর অপরাধ বলিয়াই গণ্য করিতেন―তাহার কারণ, তিনি তাহার (স্বজাতির) সেই সকল দোষকে তাঁহার নিজের দোষরূপেই দেখিতেন।”

 মাতৃভূমির এই যে দুর্দ্দশা―ইহার প্রত্যক্ষ বাস্তব কারণ কি, তাহা কি তিনি জানিতেন না? সে কি তাঁহার সেই অসাধারণ জ্ঞান ও প্রেমের অগোচর ছিল? কিন্তু তাঁহার সেই দৃষ্টি অতিশয় ধীর ও গভীর ছিল বলিয়াই তিনি সেই বাস্তব কারণটির উচ্ছেদ-চিন্তা তখন স্থগিত রাখিয়াছিলেন, সে কথা পূর্ব্বে বলিয়াছি। তথাপি আমি তাঁহার সেই অন্তর-নিরুদ্ধ দহনজ্বালা, এবং একদা সেই জ্বালা তাঁহারও কিরূপ অসহ্য হইয়াছিল, তাহার প্রমাণস্বরূপ একটি কাহিনী উদ্ধৃত করিব। ভগিনী নিবেদিতা তাঁহার গুরুর সহিত হিমালয়ভ্রমণ-কালে, একটি ঘটনায় স্বামীজীর অন্তরে হঠাৎ যে অগ্ন্যুৎপাত দেখিয়াছিলেন, তাহার গভীরতর কারণ তিনিও চিন্তা করেন নাই―কেবল, সেই ঘটনার ফলে তাঁহার গুরুর অধ্যাত্ম-জীবনে কিরূপ বিপ্লবের সূচনা হইয়াছিল, তাহাই বলিয়াছেন। ঘটনাটি এই। স্বামীজীর বড় ইচ্ছা ছিল কাশ্মীর-রাজ্যে একটি মঠ ও একটি সংস্কৃত বিদ্যালয় স্থাপন করেন; মহারাজার নিকট হইতে একটু জমি যে তিনি পাইবেন তাহাতে কোন সন্দেহ ছিল না, রাজমন্ত্রী তাঁহাকে অতিশয় শ্রদ্ধা করিতেন। কিন্তু এই সামান্য বিষয়েও, তৎকালীন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট Sir Adalbert Talbot বিরুদ্ধতাচরণ করিলেন, মহারাজার সম্মতিও তুচ্ছ হইয়া গেল। এই ঘটনায় স্বামীজী দারুণ আঘাত পাইয়াছিলেন, সে আঘাত যে কিসের আঘাত, তাহা বোধ হয় আজ আর কাহাকেও বুঝাইয়া দিতে হইবে না। ভগিনী নিবেদিতা লিখিয়াছেন, ইহার পর কয়েক সপ্তাহ স্বামীজীর ভিতরে এক তুমুল ঝড় বহিয়াছিল, সেই অবস্থায় তিনি ইংরেজীতে যে ‘কালী-স্তোত্র’ লিখিয়াছিলেন, তাহা শেষ করিবার সঙ্গে সঙ্গে সংজ্ঞাহীন হইয়া পড়েন। সেই স্তোত্রের শেষ কয় পংক্তি এইরূপ―

“এসো মহাকালী! প্রলয়ঙ্করী এসো মা!
যে জন ডরে না দুঃখেরে ভালবাসিতে,
নাচিতে যে পারে সর্ব্ব জগৎ নাশিতে,
মৃত্যুরে ধরি’ খায় তার মুখে চুমা,―
তারি কাছে আসে সর্ব্বনাশিনী মা!”

বোধ হয় এই সময়েই তিনি বলিয়াছিলেন―

 Worship Death! All else is vain. Yet this is not the coward's love of death; it is the welcome of the strong who has sounded everything to its depths, and knows there is no other alternative”

 ―এই বাণী কোন্ অবস্থায় কাহার মুখের বাণী? ইহা কি অতিশয় বর্ত্তমানে সারা ভারতের তথা বাংলার―আত্মত্রাণের মন্ত্র-বাণী নয়? কিন্তু সে সময়ের সেই দারুণ যন্ত্রণার উপশমের জন্য স্বামীজী যে সান্ত্বনাবাক্য খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন, তাহার মত উদাস অথচ করুণ আর কি হইতে পারে? ইহার কয়েকদিন পরে হঠাৎ একদিন সন্ধ্যাকালে কতকগুলি ফুল হাতে লইয়া তিনি আবার দেখা দিলেন (স্বামীজী একখানি পৃথক হাউস-বোটে থাকিতেন; কোথায় কখন যাইতেন তাহাও কেহ জানিত না); কোন কথা না বলিয়া সেই ফুলগুলি সকলের মাথায় স্পর্শ করাইয়া শেষে এই বলিয়া মৌন ভঙ্গ করিলেন―“আমি এই ফুলগুলি মার পায়ে দিয়াছিলাম”। কিছুক্ষণ আর কিছু কহিতে পারিলেন না, আর সকলেও স্তব্ধ হইয়া রহিল। অবশেষে অতি ধীরে শান্ত কণ্ঠে বলিলেন, “দেশকে ভালবাসা, দেশের জন্য সর্ব্বপ্রকার ভাবনা-চিন্তা―আজ হইতে ত্যাগ করিলাম। এখন হইতে আর কিছু নয়, কেবল―মা! মা! আমি বড় ভুল করিয়াছিলাম, তাই মা আমাকে ভর্ৎসনা করিয়া বলিলেন, ‘বিধর্ম্মীরা যদি আমার মন্দিরে প্রবেশ করে, আমার বিগ্রহগুলাকে অপবিত্র করে, তাহাতে তোর কি? তোর ত’ আস্পর্দ্ধা কম নয়! তুই আমার রক্ষাকর্ত্তা, না আমিই সকলকে রক্ষা করি?’—তাই আর নয়, আমি সব ভাবনা ত্যাগ করিয়াছি।” স্বামীজীর কথা বোধহয় আর অধিক বলিতে হইবে না; ঐ ঘটনা, এবং ঐ কথাগুলির ভিতরে স্বামীজীর যে পরিচয় অসংশয় হইয়া উঠিয়াছে, তাহার পর নেতাজীর আবির্ভাবকে আর অসম্ভব বা অপ্রত্যাশিত বলিয়া মনে হইবে না। স্বামীজী সেদিন যে জ্বালাকে জোর করিয়া রুদ্ধ করিয়াছিলেন, তাহাই যথাকালে অগ্নিশিখায় বিস্ফুরিত হইয়াছে।

 আমি এ পর্য্যন্ত স্বামীজীর কথাই বলিয়াছি―কিন্তু নেতাজীর কথা কই? পাঠকপাঠিকারা বোধ হয় একটু অধীর হইয়া উঠিয়াছেন। কিন্তু আমি ত এতক্ষণ আর একজনের জবানিতে নেতাজীর চরিত-কথাই বুঝাইতেছিলাম―আপনারা কি তাহা বুঝিতে পারেন নাই? যদি না পারিয়া থাকেন তবে নেতাজীকে আপনারা কিরূপ চিনিয়াছেন? নেতাজীর চরিত্রের একটু ভিতরে দৃষ্টিপাত করিলে আপনারা কি দেখিতে পান? স্বামীজীর মতই তিনি কি আকুমার ব্রহ্মচারী নহেন? স্বামীজীকে বিদেশীরাও ‘Warrior-Saint’ আখ্যা দিয়াছে, তাঁহার চরিত্রেও ক্ষত্রিয়স্বভাবের প্রাধান্য ছিল―ইহা সকলেই লক্ষ্য করিয়াছেন। স্বামীজীও ঠিক যে কারণে দেশ-প্রেমিক, নেতাজীও কি ঠিক তাহাই নহেন? নেতাজীর দেশপ্রেমে জাতি-ধর্ম্ম-নির্বিশেষে যে এক অপূর্ব্ব “ভারতীয়তা”-বোধ আমরা দেখিয়াছি―দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছি, স্বামীজীর মধ্যে ঠিক তাহাই ছিল, বরং ইহাই বলিলে আরও যথার্থ হইবে যে, স্বামীজীর সেই দেশপ্রেম-মন্ত্রই নেতাজীর সাধনায় বাস্তবে পরিণত হইয়াছে; সে মন্ত্র আর কাহারও নয়―স্বামীজীর। ভগিনী নিবেদিতার গ্রন্থে ইহার সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে। তিনি লিখিয়াছেন, স্বামীজীও মোগলসাম্রাজ্যের গৌরবকে ভারতের গৌরব বলিয়া মনে করিতেন; শেরশাহ, আকবরের নামে তাঁহার বক্ষ যেমন স্ফীত হইত, মুসলমান সাধু ও সাধকের পুণ্যকাহিনীও তেমনই তাঁহার প্রিয় ছিল। যে ভারতকে স্বামীজী ধ্যানে লাভ করিয়াছিলেম, নেতাজী তাহাকেই মূর্ত্তিতে গড়িয়া তুলিয়াছেন। স্বামীজী ভারতীয় সমাজে নারীকে যে গৌরবে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করিতে চাহিয়াছিলেন―নেতাজীর মনােভাবও কি তাহাই নয়? স্বামীজী বলিতেন―

 “With five hundred men the conquest of India might take fifty years, with as many women not more than a few weeks.”

 ইহার পর, নেতাজীর “ঝান্সীর রাণী”-বাহিনী স্বামীজীর কীর্ত্তি বলিয়াই মনে হয় না? আমি অবশ্য সেই মনােভাবের কথাই বলিতেছি। আর কত বলিব? নেতাজীর প্রেম নেতাজীর ত্যাগ, নেতাজীর জ্বলন্ত আত্ম-বিশ্বাস―একদিকে অসুরের মত কর্ম্মশক্তি বা রাজসিক উদ্যমশীলতা, অপরদিকে যােগযুক্তের মত “সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ”―আত্মার সেই অবিক্ষুব্ধ প্রশান্তি, একদিকে অতি তীক্ষ্ণ বাস্তববােধ ও কার্য্যকুশলতা বা ‘দক্ষতা’, অপরদিকে কবির মত উচ্ছাসপ্রবণ হৃদয়― এ সকলই দুই চরিত্রের এক লক্ষণ। বোধ হয়, নেতাজীর আকৃতিতেও কোথাও স্বামীজীর সহিত সাদৃশ্য আছে―ঠিক বলিতে পারি না, প্রবীণ রূপদক্ষেরাই তাহা স্থির করিবেন।

 কিন্তু নেতাজীর জীবন-চরিত, তাঁহার শৈশব, বাল্য ও যৌবনের শিক্ষা-দীক্ষা ও কার্য্যকলাপ যাঁহারা অবগত আছেন তাঁহারা হয় ত’ ইহাও বলিবেন যে, নেতাজীর জীবনে স্বামীজীর প্রভাব অতি অল্প বয়সেই পড়িয়াছিল। এই প্রভাবের কথা আমি মানি, ইহাতে আশ্চর্য্য হইবার কিছুই নাই। স্বামীজী বলিতেন, তিনি বুদ্ধের দ্বারা বড় বেশি আকৃষ্ট ও প্রভাবিত হইয়াছিলেন। ইহা সত্য হইলে বুঝিতে হইবে, দুই-জনই এক বংশীয়, অর্থাৎ একই জাতের আত্মা। তাই প্রভাব বলিতে শুধুই শিষ্যত্ব বুঝায় না, সমগোত্রতাও বুঝায়। আধার যদি একই শক্তি বা সমান আয়তনের না হয়, তবে মন্ত্র এক হইবে কেমন করিয়া? স্বামীজীর ধর্ম্মের মূলমন্ত্র ছিল―“Believe first in yourself then in God”, সেই অদম্য আত্মবিশ্বাস নেতাজীর জীবনে যেন প্রত্যক্ষ-গোচর হইয়া উঠিয়াছে! আবার স্বামীজীর সেই বাণী―“Fight always, fight and fight on, though always in defeat―that's the ideal! (কেবল যুদ্ধ, অবিরাম যুদ্ধ! প্রতিবার পরাজয় হইবে জানিয়াও যে যুদ্ধ―তাহাই ত শ্রেষ্ঠ বীর-ধর্ম্ম!―ইহাও কে এমন করিয়া অন্তরে বরণ করিয়া লইতে পারিয়াছে?[১] স্বামীজীর সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণ যে ভবিষ্যৎ-বাণী করিয়াছিলেন―“তাহার নিজের জ্বলন্ত আত্ম-বিশ্বাসই আর সকলের অবসন্ন চিত্তে নষ্ট-বিশ্বাস ও সাহস ফিরাইয়া আনিবে”―ইহাও যেন নেতাজীর সম্বন্ধে আরও সত্য হইয়াছে।

 তথাপি দুই চরিত্র কি এক? দুইয়ের মধ্যে কি কোন প্রভেদ নাই? প্রভেদ কিছু না থাকিয়া পারে না, কারণ ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব-ভেদ যে থাকিবেই। একেবারে ব্রহ্মভূত না হইলে দুই আত্মা সম্পূর্ণ এক হয় না। আমি বলিয়াছি, উভয়ের ধাতু এক, আকার বা গঠনও এক; তবু একই মেডালের দুই পার্শ্বের মত দুইয়ের মুখ কিছু পৃথক, কিন্তু মেডেল একই। আমি বলিতে পারিতাম―একই বীজের ফুল, জলমাটিও এক, কিন্তু এমনই যে, ঋতুভেদে তাহার রঙের পরিবর্ত্তন হইয়াছে। যাঁহারা আরও ভিতরে দৃষ্টি করিবেন, তাঁহারা কোন ভেদই মানিবেন না। কিন্তু ভেদ একটু মানিলে বুঝিবার সুবিধা হয়। স্বামীজীর দৃষ্টি যেখানে নিবদ্ধ ছিল নেতাজীকে তাঁহার দৃষ্টি তথা হইতে একটু নিম্নে নিবদ্ধ করিতে হইয়াছে, তার কারণ, নেতাজীর লক্ষ্য আরও নিকট। স্বামীজী ছিলেন আদৌ বৈদান্তিক সন্ন্যাসী―পরে দেশপ্রেমিক, দেশ-হিতব্রতী; নেতাজী আদৌ দেশ-প্রেমিক, পরে দেশের সেবার জন্যই সন্ন্যাসী। স্বামীজীর প্রতিভা প্রেমের দ্বারা রঞ্জিত হইলেও, জ্ঞানই তাহার প্রধান লক্ষণ; নেতাজীর প্রতিভায় বিশুদ্ধ জ্ঞানের প্রাধান্য নাই―তাহার শক্তি প্রেমের শক্তি; জ্ঞান―সেই শক্তির অনুমাত্রিক। নেতাজী মুখ্যত কর্ম্মবীর, তাঁহার প্রতিভার চরম নিদর্শন তাঁহার সেই আশ্চর্য্য কর্ম্মকুশলতা। স্বামীজীর প্রতিভা মুখ্যতঃ এইরূপ নহে, সে প্রতিভা মানুষকে জাগাইবার প্রতিভা; তাই একজনের নাম “স্বামীজী”, অপরের নাম “নেতাজী”,―দুইটিই সার্থক হইয়াছে। স্বামীজীর স্বপ্ন মানুষের আত্মার মতই বিরাট, তাহার গৌরবও স্বতন্ত্র; নেতাজীর স্বপ্ন মানুষের দেহ-প্রাণের পরিধিতেই সীমাবদ্ধ। এই সীমাবদ্ধ করার শক্তিও একটা বড় শক্তি, ইহাই প্রকৃত কর্ম্মবীরের প্রতিভা; স্বামীজীর সে প্রয়োজন ছিল না, তিনি তখন সাক্ষাৎ কর্ম্ম অপেক্ষা কর্ম্মের প্রেরণাটাকেই মহৎ ও বিশুদ্ধ রাখিতে চাহিয়াছিলেন; তাঁহার সেই বৈদান্তিক আদর্শকে ক্ষুণ্ণ করিতে পারেন নাই বলিয়া কাশ্মীরের সেই ঘটনার পর তিনি আত্মসংহরণ বা আত্ম-সমর্পণ করিতে বাধ্য হইয়াছেন―পুনরায় সেই বিরাটের স্বপ্নে মগ্ন হইয়া হৃদয়ের জ্বালা ভুলিবার উপায় করিয়াছিলেন। নেতাজী যেন ঠিক তাহার পরেই, ঠিক সেইখানেই উঠিয়া দাঁড়াইলেন―একজন যেন পাণ্ডবজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির, আর একজন গাণ্ডীবধন্বা সব্যসাচী!

 কিন্তু স্বামীজী ও নেতাজীর মধ্যে যেখানে গভীরতর একাত্মীয়তা আছে সেইখানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিতে না পারিলে উভয়ের কাহাকেও আমরা সম্পূর্ণ বুঝিতে পারিব না। নেতাজী যে এক অর্থে স্বামীজীর মানস-পুত্র তাহাতে সন্দেহ নাই; একজনের হৃদয়ে যাহা বীজরূপে ছিল আরেক জনের জীবনে তাহাই বৃক্ষরূপ ধারণ করিয়াছে। তত্ত্বজ্ঞান বা মুক্তিতত্ত্বকেও গৌণ করিয়া যে সাক্ষাৎ-মুক্তি স্বামীজীর অন্তরে একটি প্রবল শক্তিরূপে বিরাজ করিত, নেতাজীও সেই মুক্তিকে অন্তরে লাভ করিয়াছিলেন―দুইজনের প্রেমও সেই মুক্ত-প্রাণের পরার্থ-প্রীতি। স্বামীজীর যে-হৃদয়―সঙ্কুচিত নয়―আপনাকে দমন করিয়া, যে-কামনাকে চরিতার্থ করিতে চায় নাই, সেই বিশাল হৃদয়ের নিপীড়িত কামনাই নেতাজীর মধ্যে অকুণ্ঠিত আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। স্বামীজী যদি গেরুয়া ত্যাগ করিতেন তবে সে আর কিছুর জন্য নয়―ঐ আজাদ্-হিন্দ ফৌজের ‘নেতাজী’ হইবার জন্য। সেই প্রেম তাঁহারও ছিল, কেবল সেজন্য জ্ঞানের তপস্যাকে সংবরণ করিয়া কিছুকাল প্রেমের সমাধিতে সংজ্ঞাহারা হইতে হইত। অতএব স্বামীজীর মধ্যে আমরা যেমন নেতাজীর ঐ প্রেমের মূল দেখিতে পাই, তেমনই নেতাজীর মধ্যে স্বামীজীর সেই বাণীকেই মূর্ত্তিমান হইতে দেখি ―সেই এক মন্ত্র―“Believe that you are free, and you will be”।

 সর্ব্বশেষে, আমি এই প্রবন্ধের শিরোদেশে স্বামীজীর যে উক্তিটি উদ্ধৃত করিয়াছি, তাহাও স্মরণ করিতে বলি, দেশের সম্বন্ধে স্বামীজীর ইহাই শেষ উক্তি―মহানির্ব্বাণে প্রবেশ করিবার কয়েক ঘণ্টা পূর্ব্বে এই কয়টি কথা তাঁহাকে আপন মনে অনুচ্চ স্বরে বলিতে শোনা গিয়াছিল। “বিবেকানন্দ কি করিয়া গেল তাহা বুঝিবার জন্য আর একজন বিবেকানন্দ চাই―তেমন অনেক বিবেকানন্দ সময় হইলেই আসিবে।”―ইহা যে কত সত্য তাহা আজ আমরা নেতাজীকে দেখিয়া বুঝিয়াছি। এতদিন স্বামীজীর এত পরিচয়―তাঁহার জীবন, কর্ম্ম ও বাণীর এত আলোচনা সত্ত্বেও যাহা বুঝি নাই,―কতকটা পরোক্ষ করিতে পারিলেও অপরোক্ষ করিতে পারি নাই―আজ তাহা চিত্তগোচর নয়, চক্ষুগোচর করিতেছি। বিবেকানন্দের সেই বাণী ও কর্ম্ম কি? প্রথমটি এই যে, শত জাতি, শত সমাজ ও শত সম্প্রদায় সত্ত্বেও ভারতবর্ষের আত্মা এক; সেই আধ্যাত্মিক ঐক্যের উপরেই তিনি এ যুগে এক নূতন মহাভারতের ভিত্তি স্থাপনা করিয়াছিলেন; ঐ বাণী তাঁহারই বাণী, উহাই জাতীয়তার মন্ত্রবাণী। এই বাণীই নেতাজীকে অনুপ্রাণিত করিয়া তাঁহার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্ত্তিকে সম্ভব করিয়াছে। স্বামীজীর সেই অধ্যাত্মদৃষ্টিই নেতাজীর বাস্তব দৃষ্টি হইয়া উঠিয়াছে, তিনিও সর্ব্বজাতি ও সর্ব্বসম্প্রদায়ের ভেদ ঘুচাইয়া, স্বামীজীর সেই ধ্যানলব্ধ ‘মহাভারত’কে সাকার করিয়া তুলিয়াছেন। স্বামীজীর অপর শ্রেষ্ঠ কীর্ত্তি কর্ম্মের প্রাথমিক প্রেরণাটি ধরাইয়া দেওয়া। ভারতের মুক্তি-সংগ্রামের সেই প্রত্যক্ষ প্রয়োজনটি এমন করিয়া আর কেহ উপলব্ধি করে নাই। এ বস্তুটি তিনি, ধ্যানে নয়—প্রাণে লাভ করিয়াছিলেন। সে কথা পূর্ব্বে বলিয়াছি, আর একবার বলি। তিনি তখন পরিব্রাজকের বেশে সারা ভারত পর্য্যটন করিতেছিলেন―কপর্দ্দকহীন সন্ন্যাসী, নাম পর্য্যন্ত ত্যাগ করিয়া তিনি সেই বিশাল জনসমুদ্রে যেন আপনাকে আপনি হারাইয়া গিয়াছিলেন। কলিকাতার গুরুভাইগণ কোন সংবাদই জানিতেন না, তথাপি এ বিশ্বাস তাঁহাদের ছিল যে, তিনি হিমালয়ের কোন নিভৃত প্রদেশে আত্মসাধনায় রত আছেন। হঠাৎ, প্রায় দুই বৎসর পরে, দক্ষিণ ভারতের এক রেল-ষ্টেশনে দুইজন গুরুভাই তাঁহার দেখা পাইয়া আশ্চর্য্য হইয়া গেলেন। কিন্তু এ মূর্ত্তি ত’ নিবাত-নিষ্কম্প জ্যোতিঃশিখার মত নয়! ইহার ভিতরে যে ঝড় বহিতেছে―দুই চক্ষে রুদ্ধবর্ষণ অশ্রুমেঘ! অতঃপর সেই সন্ন্যাসীর কণ্ঠে উচ্চারিত হইল―“আমি সারা ভারত ভ্রমণ করিয়াছি―আমার বুক ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। জনগণের কি ভীষণ দারিদ্র্য, কি শোচনীয় দুর্দ্দশা দুই চক্ষে দেখিলাম! আমার কান্না থামিতেছে না। এখন বুঝিয়াছি, ধর্ম্মপ্রচার করিবার সময় এ নহে। এই দারিদ্র্য ও দুর্গতি আগে নিবাবণ করিতে হইবে। ইহার একটা উপায় চিন্তা করিয়া আমি আমেরিকায় যাইতে মনস্থ করিয়াছি।” ইহার পর স্বামী তুরীয়ানন্দকে সম্বোধন করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “হরি-ভাই! আমি তোমাদের ঐ ধর্ম্মকর্ম্মের কোন মর্ম্মই বুঝিতেছি না। আমি আমার বুকে মধ্যে একটা বড় জিনিস পাইয়াছি―আমি মানুষের দুঃখ অনুভব করিতে শিখিয়াছি।” স্বামী তুরীয়ানন্দ বলিয়াছেন, “এ যেন ঠিক সেই বুদ্ধের মত―সেই ভাব, সেই কথা।”

 নেতাজীর অন্তরে কেহ প্রবেশ করিয়াছে? যদি করিয়া থাকে তবে বলিয়া দিতে হইবে না, তাঁহার হৃদয়েও ঠিক এই ঘটনাই ঘটিয়াছিল। সেদিন আজাদ-হিন্দ-ফৌজের ইতিহাসে―দুইজন পৃথক লেখকের পৃথক কাহিনীতে―দুইবার দুই উপলক্ষ্যে নেতাজীর যে অদ্ভুত ভাব-সমাধির উল্লেখ দেখিলাম, তাহার সম্বন্ধে অন্যত্র বলিব; কিন্তু বর্ত্তমান প্রসঙ্গে উহার একটি বড়ই অর্থপূর্ণ। লেখক বলিতেছেন, আজাদ-হিন্দ-গভর্ণমেন্টের সর্ব্বময় কর্ত্তৃত্ব-ভার গ্রহণ করার উপলক্ষ্যে, বিপুল জন-মণ্ডলীর সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া নেতাজী যখন মাতৃভূমির উদ্ধার সাধনের সংকল্প বা শপথ-বাণী পাঠ করিতেছিলেন, তখন সেই পাঠের মধ্যে যেস্থানে ত্রিশকোটী ভারতবাসীর শৃঙ্খল-মােচন ও অবর্ণনীয় দুর্দ্দশা ও দারিদ্র্য নিবারণের কথা ছিল, সেইখানে আসিয়া তাঁহার কন্ঠ সহসা রুদ্ধ হইয়া গেল এবং সারাদেহ পাথরের মত কঠিন ও নিস্পন্দ হইয়া উঠিল―একেবারে বাহ্যজ্ঞানহীন অবস্থা! প্রায় অর্দ্ধঘণ্টাকাল তিনি এই অবস্থায় দাঁড়াইয়া রহিলেন! এই যে অলৌকিক অবস্থা―ইহার মূলে ছিল কোন্ অনুভূতি? স্বামীজীর সেই অনুভূতির তীব্রতম রূপ ইহাই। আরও প্রমাণ আছে। আমেরিকা হইতে প্রত্যাগমনের পর স্বামীজী মাদ্রাজের বক্তৃতায় দেশবাসীকে সম্বােধন করিয়া যাহা বলিয়াছিলেন তাহাতে এই কথাগুলি ছিল―


 “তোমাদের প্রাণে কি একবারও ইহা জাগে যে, এই দেশের কোটি কোটি নর-নারী কতকাল ধরিয়া, ঘৃণিত পশুর মত চরম দারিদ্র্য ও চরম দুর্দ্দশা ভােগ করিতেছে? সে চিন্তা কি তােমাদিগকে অস্থির করিয়া তােলে―আহার-নিদ্রা ত্যাগ করায়? দেশের এই দুর্গতি-মােচনের জন্য তােমরা কেহ কি নাম-ধাম, ধন-জন, পুত্র-পরিবার, এমন কি, নিজের দেহের প্রতিও মমতা ত্যাগ করিতে পার?•••এই জীবন্মৃত অভাগাদিগকে উদ্ধার করিবার কোন উপায়, কোন পন্থা কি তােমরা স্থির করিয়াছ? সেই বজ্র-কঠিন সংকল্প কি তোমাদের আছে―যাহার বলে পর্ব্বতপ্রমাণ বাধাও নিমেষে অপসারিত হয়? সমগ্র জগৎ যদি তরবারি হস্তে তোমার পথরোধ করিয়া দাঁড়ায় তথাপি তুমি যাহা সত্য মনে করিয়াছ, তাহা সাধন করিতে কিছুমাত্র ভীত হইবে না―মনের এই বল ও প্রাণের সেই প্রেম যদি থাকে, তবে তোমাদের যে-কেহ অতিশয় অলৌকিক ঘটনা ঘটাইতে পারিবে।”

 এই বাণী কোন অনাগত পুরুষের উদ্দেশে উচ্চারিত হইয়াছিল? সেদিন স্বামীজীর মানস-নেত্রে, তাঁহার তৎকালীন সেই উদ্দীপ্ত হৃদয়ের যজ্ঞানল হইতে, কোন বীরমৃত্তির আবির্ভাব হইয়াছিল? তাঁহার অন্তরের সেই মূর্তিই কি আজ বাহিরে আসিয়া দাঁড়ায় নাই? স্বামীজী তাঁহার মৃত্যুদিনে এই বলিয়া নিঃশ্বাস ফেলিয়াছিলেন যে, তখনও আর একটা বিবেকানন্দ দেখা দেয় নাই,―তথাপি তাঁহার দৃঢ়বিশ্বাস ছিল― আসিবে, সময় হইলেই আসিবে; না আসিলে তাঁহাকে কে বুঝিবে―কে তাঁহার কাজ সম্পূর্ণ করিবে? সেই ভবিষ্যৎ-বাণী যে এত শীঘ্র ফলিবে তাহা কে জানিত? আবার সেই সন্ন্যাসী! সেই ত্যাগ, সেই প্রেম! সেই কৌপীনমাত্র সম্বল করিয়া আবার তেমনই―দেশের জন্য দেশত্যাগ! সেবার জগৎ-ধর্ম্ম-মহামণ্ডলীতে জয় জয়-রব, এবার জগৎ-মহকুরুক্ষেত্রে ‘জয়-হিন্দ্’―রব; সেবার সশরীরে প্রত্যাগমন, এবার প্রত্যাগমন অশরীরে।

  1. বিবেকানন্দের আরেকটি বাণীও নেতাজীর চরিত্র ও জীবনে প্রতক্ষ্য সত্য হইয়া উঠিয়াছে। কথিত আছে, নেতাজী মৃত্যুভয়কে সম্পূর্ণ জয় করিয়াছিলেন, শত্রু যখন আকাশ হইতে গুলিবর্ষণ (বোমা) করিতেছে তখন তিনি তাহারই তলে দাঁড়াইয়া বলিয়াছিলেন, আমাকে মারিবে এমন বোমা এখনও তৈয়ারী হয় নাই।; ইহাকেই বলে আত্মার অকুতোভয়, ইহাও স্বামীজীর একটা বড় মন্ত্র―
     “Your country requires heroes. Be heroes! There must be no fear. The true devotees of the Mother are as hard as adamant and as fearless as lions. They are not least upset if the whole universe suddenly crumbles into dust at their feet”.