দেশের কথা/বাঙ্গলার কথা

বাঙ্গলার কথা

আজ বাঙ্গালীর মগসভায় আমি বাঙ্গলার কথা বলিতে আসিয়াছি, আপনার আমাকে আহবান করিয়াছেন, আপনাদের আদেশ শিরোধার্য্য। আজ এই মিলনমন্দিরে আমার যোগ্যতা অযোগ্যতা লইয়া জটিল কুটিল অনেক প্রকারে বিচারের মধ্যে বিনাইয়া বিনাইয়া বিজয় প্রকাশ করিয়া আমার ও আপনাদের সময় অযথা নষ্ট করিব না। দেশের নায়ক হইবার অধিকারের যে। অহঙ্কার, তাছা আমার নাই, কিন্থ আমার বাজলাকে আমি আশৈশব সমস্ত প্রাণ দিয়া ভালবাসিয়াছি। যৌবনে সকল চেষ্টার মধ্যে অামার সকল দৈম্ব, সকল অযোগ্যতা অক্ষমতা সত্বেও অামার বাঙ্গালার যে মূৰ্ত্তি, তাহ) প্ৰাণে প্ৰাণে জাগাইয়! রাখিয়াছি, এবং আজ এই পরিণত বয়সে আমার মানসমন্দিরে সেই মোহিনী মুত্তি আরও জাগ্রত জীবস্ত হইয়া উঠিয়াছে। এই যে আশৈশব ও আজীবন অদ্ধা, ভক্তি, প্রেম ও ভালবাসা, তাহার অভিমান আমার আছে। সেই প্রেম জলস্ত প্রদীপের মত অামাকে পথ দেখাইয়া দিবে। আপনাদের সকলের সমবেত যে যোগ্যতা, তাহাই আমাকে আশ্ৰয় করিয়া আমাকে যোগ্য করিয়া তুলিবে।

সেই ভরসায় আজ আমি আপনাদের সম্মুখে বাঙ্গালীর কথা বলিতে আসিয়াছি। যে কথাগুলি অনেক দিন ধরিয়া আমার প্রাণে জাগিয়াছে, যে সব কথা জামার জৗবনের সকল রকমের চেষ্টা ও অভিজ্ঞতার মধ্যে অারও ডাল। করিয়া উপলব্ধি করিয়াছি, যে কথাগুলিকে সত্য বলিয়া জীবনের ধ্যান-ধারণার বিষয় করিয়াছি, সে সব কথাগুলি আপনাদের কাছে নিবেদন করিব। যাহা। সত্য বলির হৃদয়ঙ্গম করিয়াছি, তাহ প্রকাশ করিতে আমার কোন ভয় হয়। না। লজ্জা হয় না। হয় ত আমাদের শাসনকর্তাদের কাছে আমার অনেক কথা অপ্রিয় লাগবে, হয় ত আমার অনেক কথার সঙ্গে আপনাদের অনেকের মনের মিল হইবে না॥ কিন্তু “সত্যম্ ক্ৰয়াৎ প্রিয়ম ক্ৰয়াত ন ত্রয়া সত্যম অপ্ৰিয়ম” এই বচনের এমন অর্থ নহে যে, বাহা সত্য বলিয়া উপলব্ধি করিয়াছি, এবং . ঘাহ প্রকাশ করিবার জাবশ্যকতা আছেতাহ করিব না। সে ত কাপুরুষের কথা, দেশ-ভক্তের রীতি নহে। যে সত্য আমার হৃদয়েৰ মধ্যে জলিতেছে, যাহাকে চক্ষের সম্মুখে দেখিতে পাইতেছি, তাহাকে টাকিয়া ৰাখিতে হইলে যে পাটোয়ারী বুদ্ধির আাবহক, তাহ আমার নাই। আর নাই দেখের কথা ১৩ বলি তার জন্য কোনও অসুতাপও হয় না। তাই আজ যে কথাগুলি সত্য বলিয়া বিশ্বাস করি, সেই কথাগুলি প্ৰিয়ই হউক, কি অপ্ৰিয়ই হউক, অম্নান। বদনে অকুষ্টিতচিত্তে আপনাদের কাছে নিবেদন করিব। প্রথমেই হয় ত অনেকেরই মনে হইবে যে এই মহাসভা শুধু রাজনৈতিক আলোচনার জন্যএই সভায় বাঙ্গলার কথার আবখ্যক কি? এই প্রশ্নই আমাদের ব্যাধির একটি লক্ষণ। সমগ্র জীবনটাকে টুকরা টুকরা করিয়া ভাগ। করিয়া লওয়া আমাদের -দীক্ষা ও সাধনের স্বভাববিরুদ্ধ। আমরা ইউরোপ ইহঁতে ধার করিয়া এই প্রথা অবলম্বন করিয়াছি, এবং এই ধার-কর। জিনিস ভাল করিয়া বুঝি নাই বলিয়া। আমাদের অনেক পশ্ৰিম, অনেক চেষ্টাকে সার্থক করিতে পারি নাই। যে জিনিসটাকে আমরা রাজনীতি ব৷ politics বলিতে অভ্যস্ত হইয়াছি, সাহার সঙ্গে কি সমস্ত বাঙ্গলা দেশের সমগ্র বাঙ্গালী জাতির একটা সর্বাঙ্গীন সম্বন্ধ নাই? কেহ কি আমাকে বলিয়া দিতে পারে, আমাদের জাতীয় জীবনের কোন অংশটা রাজনীতির বিষয়, কোন্ অংশটা অর্থনীতির ভিত্তি, কোন অংশটা সমাজনীতির প্রাণ, আর কোন অংশটা ধৰ্মসাধনার বস্তু? জীবনটাকে মনে মনে খণ্ডবিখণ্ড করিয়াএই সব জনগড়া জীবন-খণ্ডের মধ্যে কি আমরা অলজঘ্য প্রাচীর তুলিয়া দিব? এই কাল্পনিক প্রাচীর-বেষ্টিত যে কাল্পনিক জীবন-খণ্ড, ইহারই মধ্যে কি অামাদের রাজনৈতিক আলোচনা বা সাধনা আরন্ধ থাকিবে? আমাদের রাজনৈতিক অালোচনা বা আন্দোলনের ধে বিষয়, তাহাকে কি বাঙ্গালী জাতির যে জীবন, সেই জীবনের সব দিক দিয়া দেখিতে চেষ্টা করিব না? যদি না দেখি, তবে কি সত্যের সন্ধান পাইব? কথাটা একটু তলাইয়া দেখিলে বেশ স্পষ্ট করিয়া বোঝা যায়। রাজনীতি কাহাকে বলেগ? এই বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য কি? আমাদের সাধনায় ইহার কোন বিশিষ্ট নাম নাই, আমাদের পূর্বপুরুষগণ ইহার নামকরণ করার আবশ্যকতা। মনে করেন নাই। ইউরোপীয় সাধনায় যাহাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, তার উদেশ্য সংক্ষেপে বলিতে গেলে রাজায় পুজায় যে সম্বদ্ধ, তাহা নির্ণয় করা এবং এই সম্বন্ধের মধ্যে যে একটা নিত্য সাৰ্বভৌমিক সত্য নিহিত আছে, তাহাকে প্রকাশ করা। ঐ মতে রাজনৈতিক আন্দোলন বা৷ অলোচনার বিষঙ্গ কোন জাতির ব দেশের পক্ষে রাজা প্রজায় কি রকম সম্বন্ধ হওয়া উচিত, তাহাই বিচার করা। বাঙ্গলার রাজনৈতিক আনোলনের অর্থ এই যে, আমাদের দেশে রাজা প্রজায় যে সম্বন্ধ, তাহ পরীক্ষা কর। ও কিরূপ হওয়া উচিত, তাহাই ১ঃ দেশবন্ধ রচনাসমগ্র বিচার করা। অর্থাৎ সমস্ত রাস্ক্যটা সম্ভাবে ও সৎপথে চালনা করিতে হইলে যে শক্তির প্রয়োজন, তাহ| কতট। প্লাজার হাতে থাকিবে, কতটা গুঙ্গার হাতে থাকিবে, তাহাই বিচার ও নির্ণয় করা। কিন্তু ঐ যে রাষ্ট্রীয় চিন্তা বা চে, ইহার সার্থকতা কোথায়? এক কথায় বলিতে হইলে, যে কথা অনেকবার গুনিয়াছি, তাগাই বলিতে হয়বাঙ্গালীকে মানুধ করিয়া তোলা। বাঙ্গালী যে অমান্থব, তাহা আমি কিছুতেই স্বীকার করি না। অাদি যে আপনাকে বাঙ্গালী বলিতে একটা অনির্বচনীয় গর্ব অমুভব কবি, বাঙ্গালীর যে একটা নিজের সাধন। অাছে, শান্ত আছে, দর্শন আছে, কৰ্ম্ম আাছে, ধৰ্ম্ম আছেবীরত্ব আছেইতিহাস আছে, ভবিষ্যৎ আছে! বাঙ্গালীকে যে অমাহুষ বলে, সে আমার বাঙ্গলাকে জানে ন৷। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ধরিয়া লওয়া যা’ক যে, বাঙ্গালীর কতক গুলা দোষ আছে, যাহার সংশোধন আবশ্যক এবং সেই ভাবে ধরিয়া লওয়া যা’ক যে বাঙ্গালী মানুষ। তাহাকে মানুষ করিয়া। তোলাই রাষ্ট্ৰীয় চেষ্টা বা চিন্তার উদেশ্য, এবং সেই ভাষাই আমাদের দেশে রাজ প্রগায় যে সম্বদ্ধ হওয়া উচিত, তাগ বিচার করা আাবশ্যক। কিন্ধ আমাদের দেশে রাজ প্রায় কি সম্বন্ধ হওয়া উচিত, তাহা বিচার করিতে গেলে, আমাদের যে এখন ঠিক কি অবস্থা, তাতার বিচার করিতেই হইবে। সেই বিচার করিতে হইলে, আমাদের আার্থিক অবস্থা কিরূপ তাহা বিচার করিতেই হইবে। সেই বিচার করিতে হইলে, আমাদের চাষাদের চাযের সন্ধান লইতে হইবে। আমাদের চাষের সন্ধান ভাল করিয়া লইতে হইলে, আমাদের চাষ বাড়িতেছে কি কমিতেছে, তাহার খোজ রাথিতে হইবে। সেই কারণ অঃসন্ধান করিতে করিতে দেখিতে হইবে, কেন আমাদের পল্লীগ্রাম ছাড়িয়া অনেক লোক সহরে . অ'সিয়া বাস করে, সেই কারণ অসুসন্ধান করিতে হইলে বিচার ক রতে হইবে ঘে, দে কি পল্লীগ্রামের অশ্বাস্থ্যের ভর, কি অত্য কোণ কারণে॥ সেই সঙ্গে সঙ্গে অস্বাস্থ্যের কারণ। অনুসন্ধান করা আবখ্যক হইবে। ইহাতেই দেখা। যাইতেছে যে, রাজনীতির সাধন করিতে হইলে আমাদের চাষাদের অবস্থা৷ চিন্তা করা আবভক এবং তাহার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের গ্রামের অশ্বাস্থ্যের কারণ অনুসন্ধান করাও আবশ্যক। সেই সঙ্গে সঙ্গে ইহাও বিচার করিতে হইবে, আমাদের দেশে যন্ত চাব যোগ্য জমি আছে, সব ভাল করিয়া চাষ করিলেও আমাদের অবস্থা সহজ সচ্ছল দেশের কথা হয় কি না॥ যদি না -হয়, তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা আালোচনা ও বিচার করিতে হইবে। এই সব কথা ভাল করিয়া বুঝিতে হইলে আমাদের চাষের প্রণালী কিপ ছিল, আমাদের ব্যবসাবাণিজ্যের অবস্থাপূর্বে কিন্নপ ছিল, কেমন করিয়া গ্রামের স্বাস্থ্য রক্ষা করিতাম, এ সব কথা তলাইয়া বুঝিতে হইবে। শুধু তাহাই নহে, আমাদের শিক্ষাদীক্ষার কথা আলোচনা করিতে হইবে। কেমন কৰিয়া শিক্ষা বিস্তার করিতাম, কেমন করিয়া আমরা আপনাকে শিক্ষিত করিয়| লই ত্যাম এবং এখন বর্তমান অবস্থায় আমাদের শিক্ষা-প্রণালী কি রকম হওয়া উচিৎ, রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে এই সব কথারই বিচার আবখ্যক। শুধু তাহাই নহে। আমাদের কৃষিকাৰ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাদীক্ষার সঙ্গে আমাদের সমাজের কি সম্বন্ধ ছিল এবং তাহাতে আমাদের কতট। উপকার, কতটা অপ কার সাধিত হইতেছে, এ কখকেও তাচ্ছিল্য করা যায় না। কি সম্বন্ধ ছিল, তাই ভাল করিয়। না বুঝিতে পারিশে আমাদের বর্তমান অবস্থায় কি সম্বন্ধ থা ক। উচিৎকিরূপে তাহার মীমাংসা হইবে? এই প্রশ্নের মীমাংসা ঘদি না করা যার, তবে রাষ্ট্রীয় শক্তির কতটা রাজার হাতে কতটা আমাদের হাতে থাকা উচিৎ এই প্রশ্নের বিচারই বা কেমন করিয়া হইবে? শুধু ইহাই নতে। আমাদের কৃষিকাৰ্য্য হইতে আরম্ভ করিয়। বড় বড় সামাজিক ব্যবহার পর্যন্ত আমাদের সকল ভাবনা, সকল চেলু ও সকল সাধনার -সঙ্গে আ যাদের ধম্ র কি সম্বন্ধ ছিল ও অাছে, তাগার বির অবৎ কৰ্ত্তব্য। সে দিকে চোখ না রাঘিলে সব দিকই যে অন্ধ কার দেখিব! সব প্রশ্নই যে অকারণে অস্বাভাবিকভাবে জটিল্প ও কঠিন হইয়া উঠবে। সেই দিকে দৃষ্টি না। রাখিলে কোন মীযাংসাই সম্ভবপর হইবে না। আমাদের অনেক বাধা, অনেক বিত্ত্ব। কিন্তু আমাদের সব চেয়ে বেশ্মী বিপৰ যে, আমরা ক্রমশাই আমাদের শিক্ষাদীক্ষাআচার-ব্যবহারে অনেকটা ইংরাজী ভাবাপন্ন হইয়া পড়িয়াছি। রাজনীতি বা Politcs শব্দটি শুনিবামার আমাদের দৃষ্টি আমাদের দেশ একেবারে অতিক্ৰম করিয়া ইংলঙে গিয়া৷ পছছায়। ইংরাজের ইতিহাসে এই রাজনীতি যে আকার ধারণ করিয়াছে, আমরা সেই মূৰ্তিরই অৰ্চনা করিয়া থাকি। বিলাতের জিনিসটা আমরা যেন একেবারে তুলিয়। আনিয়া এই দেশে লাগাইয়া দিতে পারিলেই বাচি। এ ১৩ দেশবন্ধু রচনাসমগ্র মেশের মাটিতে তাহ। বাড়িবে কি না, তাহা ত একবারও ভাবি না। Barke এর খুলি যাহা স্কুলে কলেজে মুখস্থ করিয়াছিলাম, তাহাই আওড়াই, Glad stoneএর কথাযুক্ত পান করি অর মনে করি, ইহাই রাজনৈতিক ন্দোলনের চরম। “Seely'র Expansion of England” নামে মে. পুস্তক আছেতাগ হইতে বাছা বাছা বচন উদ্ধার করি। Sidgwick এর কেতাব হইতে কথার বুড়ি টানিয়া বাহির কবি, ফরাসী স্কুল, জার্মাণ শুধু এবং ইউরোপে রাজনীতির যত স্কুল আছেসব স্কুলের কেতাবে, কোরাণে যত ধারাল বাক্য আছেএকেবারে এক নিঃশ্বাসে ফুখস্ত করিয়া ফেলি, আর মনে করি, এইবার আমরা। বর্তৃতা ও তকৈ অজেয় হইলাম, দেথি আমাদের শাসনকর্তারা কেমন করিয়া আমাদের তক প্ৰণ্ডন করেন॥ মনে করি, রাজনৈতিক আালেন্দালন শুধু তর্কবিতর্কের বিষয়-বস্তৃতার ব্যাপার মাত্র। আমরা তর্ক করিয়া, বন্ধুতা করিয়া জিতিয়া ঘাইব। আমাদের সকল উদ্যম ও সকল চেষ্টার। উপরে আমাদের ধারকর কথার ভার চাপাইয়া দিই। যাহা স্বভাবতঃ সহজ সরল, তাগাকে মিছামিছি বিনা কারণে জটিল করিয়া তুলি। শুধু যাত। আবশ্যক, তাহা করি না।; দেশের প্রতি মুখ তুলিয়া চাই না, বাঙ্গলার কথা ভাবি না, জামাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাসকে সর্বতোভাবে তুচ্ছ করি। আমাদের বর্তমান অবস্থার দিকে একেবারেই দৃকপাত করি না। কাজেই আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলন অসার, বস্তুহীন। তাই এই অবাস্তব আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের দেশের প্রাণের যোগ নাই; এই কথা ২য় ত অনেকে স্বীকার করিবেন ন৷। কিন্তু স্বীকার না করিলেই কি কথাটা মিথ্যা হইয়া যাইবে? আমরা চোথ। বুজিয়া থাকিলেই কি কেহ আমাদের দেখিতে পাইবে না? আমরা যে শিক্ষিত বলিয়া অহার করি, আমরা দেশের কতটুকু স্থান অধিকার করিয়া থাকি? আমরা কয় জন? দেশের আপামর সাধারণের সঙ্গে আমাদের কে1থায় যোগ? অামল্প ঘঃ ভাবি, তাহার কি তাই ভাবে? সত্য কথা বলিতে হইলে কি স্বীকার করিব না যে, আমাদের উপর অামাদের দেশবাসীর সেরূপ আস্থা নাই? কেন নাই? আমরা যে ভিতরে ভিতরে ইংরাজী ভাবাপন্ন হইয়াছি। আমরা যে ইংরাজী পড়ি ও ইংরাজীতে ভাবি, এবং ইংরাজী তর্জমা করিয়া বাঙ্গলা বলি ও লিখি, তাহার! যে আমাদের কথা বুঝিতে পারে না॥ তাহারা মনে করে, নকলের চেয়ে আাসাই ভাল। আামরা যে তাহাদের স্থণ করি। কোন কাজে তাহাদের ডাকি। Government এর কাছে কোনও আবেদন করিতে হইলে দেশের কথা ১৭ তাহাদের গায়ে হাত বুলাইয়া একটা বিরাট সভার আয়োজন করি, কিন্তু সমৰ প্রাণ দিয়া কোন কাজে তাহাদের ডাকি ? আমাদের কোন কমিটিতে, কোন সমিতিতে চাষা সভ্যশ্রেণীভুক্ত ? কোন কাজ তাহাদের জিজ্ঞাসা করিয়া, তাহাদের মত লইয়া করি ? যদি না করি, তবে কেন অবনতমংকে আমাদের ক্রটি স্বীকার করিব না ? কেন সত্য কথা বলিব না ? মিথ্যার উপর কোনও সত্য বা সত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় না । তাই বলিতেছিলাম, অামাদের যে রাজনৈতিক আন্দোলন, ইহা একটা প্রাণহীন, বস্ত্রহীন, অলীক ব্যাপার। ইাকে সত্য করিয়া গড়িতে হইলে বাঙ্গলার সব দিক দিয়াই দেখিতে হইবে । বাঙ্গলার যে প্রাণ, তাহারই উপর ইহার প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। তাই বলিতেছিলাম, আজ এই মহাসভায় আমি বাঙ্গলার কথা বলিতে আসিয়াছি। কিন্তু অামি যে বিপদের কথা বলিয়াছি, তাহার জন্য নিরাশ হইবার কোনই কারণ নাই । আমাদের এ অবস্থা প্রকৃতপক্ষে অস্বাভাবিক হইলেও ইহার যথাযথ কারণ আাছে। ইংরাজ যখন প্রথমে আমাদের এদেশে আসে, তখন নানা কারণে আমাদের জাতীয় জীবন দুৰ্বলতার আধার হইয়াছিল। তখন আমাদের ধৰ্ম্ম একেবারেই নিস্তেজ ইয়া পড়িয়াছিল। । একদিকে চিরপুরাতন চিরশক্তির অাকর সনাতন হিন্দুধর্ম কেবলমাত্র মৌখিক আবৃত্তি ও আড়ম্বরের মধ্যে আপনার শিব-শক্তিকে হারাইয়া ফেলিয়াছিল ; অপর দিকে যে অপূর্ব প্ৰেমধৰ্ম্মবলে মহাপ্রভু সমস্ত বাঙ্গলা দেশকে জয় করিয়াছিলেন, সেই প্ৰেম ধর্মের অনন্ত মহিমা ও প্রাণসঞ্চারিণী শক্তি কেবলমাত্র তিলক-কাটা ও মালা ঠকঠকানিতেই নিঃশেষিত হইয়া যাইতেছিল । বাঙ্গলার হিন্দুর সমগ্ৰ ধৰ্ম্মক্ষেত্ৰ শক্তিহীন শাক্ত ও প্রেম-শূহ বৈষ্ণবের ধর্মগৃহ কলহে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছিল । তথন নবদ্বীপের চিরকীৰ্তিময় জ্ঞান-গৌরব কেবলমাত্র ইতিহাসের কথা— অতীত কাহিনী। বাঙ্গালী জীবনের সঙ্গে তাহার কোন সম্বন্ধ ছিল না । এইরূপে কি ধৰ্ম্মে, কি জানে বাঙ্গলার হিন্দু তথন সব বিষয়ে প্রাণহীন হইয়া পড়িয়াছিল। আলিবর্দি খার পর হইতেই বাজলার মুসলমানও ক্রমশঃ নিস্তেজ হইয়া। পড়িয়াছিল এবং এই সময় তাহাদের সকল জ্ঞান ও সকল শক্তি বলহীনের বিলাসে ভাসিয়া গিয়াছিল। এমন সময় সেই ঘোর অন্ধকারের মধ্যে ইংরাজ বণিক-বেশে আগমন করিল এবং অল্প দিনের মধ্যেই রাজত্ব স্থাপন করিয়া অসাধারণ শক্রির পরিচয় দিল । আমাদের জাতীয় হলতানিবন্ধন আমরা ইংরাজ রাজত্বের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ইংরাজ জাতিকে ও তাহাদের সভ্যতা ও তাহাদের বিলাসকে বরণ করিয়া লইলাম । ছঞ্চলের বাহু হয়, তাহাই হইল। ( )-২ ১৮ দেশবন্ধ রচনাসমগ্র ইংরাজী সভ্যতার সেই প্রখর অালোক সংযতভাবে ধারণ করিতে পায়িলাম না। অন্ধ হইয়া পড়িলাম। অন্ধকারাক্রান্ত দিগ প্রান্ত পথিক যেমন বিস্ময়ে ও যোহ বশতঃ আপনার পদপ্রান্তস্থিত সুপথকে অনায়াসে পরিত্যাগ কম্নিয়া, বহুদূৰ তুর্গম পথকে সহজ ও সন্নিকট মনে করিয়া, সেই পথেই অগ্রসর হয়, আমরাও ঠিক সেইরূপ নিজের ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম সকলই অবলীলাক্রমে পরিত্যাগ করিয়া নিজের শাস্ত্রকে অবজ্ঞা করিম, নিজের সাহিত্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করিয়া, আমাদের জাতীয় ইতিহাসের ইঙ্গিতকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করিয়া ইংরাজের সাহিত্য, ইংরাজের ইতিহাস, ইংরাজের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের দিকে নিতান্ত অসংযতভাৰে যুকিয়া পড়িলাম। সেই ঝেনকি অনেকটা কমিয়া৷ আসিয়াছে সত্য, কিন্তু এখনও একেবারে যায় নাই। রামমোহন যে দেশে “বিজ্ঞানের তুর্যধ্বনি করিয়াছিলেন, আমরা তাহাই শুনিয়া ছিলাম ব। মনে করিয়াছিলাম শুনিয়াছি, অন্ততঃপক্ষে বিজ্ঞানের বুলি আওড়াইতে আরম্ভ করিলাম। কিন্তু রামমোহন যে গভীর শাস্ত্রালোচনায় জীবনটাকে ঢালিয়া বিয়ছিলেন, তাহার দিকে ত আমাদের চোখ পড়ে নাই। তিনি যে আমাদের সভ্যতা ও সাধনার মধ্যে আমাদের উদ্ধারের পথ খুজিয়াছিলেন, সে কথ৷ ত আমরা এক বারও মনে করি নাই। তার পর দিন গেল। আমাদের স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠিত হইল, আমাদের ঝোকটা আারও বাড়িয়া গেল। তারপর বঙ্কিম সৰ্বপ্ৰথমে বাললার মূর্তি গড়িলেন, প্রাণপ্রতিষ্ঠা করিলেন { বঙ্গজননীকে দৰ্শন করিলেন। সেই “মুজাং সুফলাং মলয় জ শীতলাং শস্তথা মলাং মাতরম’তাহারই গান গাহিলেন। সবাইকে ডাকিয়া বলিলেন, ““দেখ, দেখ, এই আমাদের মা, বরণ করিয়া ঘৱে তোল।” কিন্তু আমরা ত তখন সে যুক্তি দেখিলাম না; সে গান গুনিলাম না। তাই বঙ্কিম আক্ষেপ করিয়া বলিয়া ছিলেন, “আমি একা মা মা বলিয়া ৱেদন করিতেছি।” তারপর শশধর তর্কচূড়ামণির হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানের আান্দোলন। এই আন্দোলন সম্বন্ধে আমাদের দেশে অনেক মতভেদ আছে। কেহ বলেন, উই। আমাদের দেশের অনেক অনিষ্ট করিয়াছিল, আবার কেহ কেহ বলেন উচ্ছা আমাদের অশেষ উপকার সাধন করিয়াছিল। সে সব কথা লইয়া আলোচনা কর। আমি আাবস্তক মনে করি না। এই আন্দোলন যে অনেক দিকে একেবারেই অল্প ছিল, তাই আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু আমি যেন সেই আন্দোলনের মধ্যেই বাগাসী জাতির, অন্ততঃপক্ষে শিক্ষিত বাঙ্গালীর জ।“ হইবার একট। প্রয়াস—-একটা উস্তন দেখিতে পাই। সেইটুকুই আষামের লা। তারপর অারও দিন গেণ। ১৯৪৩ খৃঃ হইতে স্বদেী মাবোননের দেশের কথা ১৯ বাজনা বাজিতে লাগিল। বাগালী আপনাকে চিনিতে ও বুঝিতে আরম্ভ করিগ। রবীন্দ্রনাথ গাহিলেন “বাংলার মাটি বাংলার জল সত্য কর সত্য কর হে ভগবানু।” ‘বাঙ্গঙ্গার জল বাঙ্গলার মাটি আপনাকে সার্থক করিতে লাগিল। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেক জ্ঞানী গুণী মহাপণ্ডিত আছেন, যাহার নাকি বলেন যে, এই স্বদেশী আন্দোলন ইহা একটা বৃৎ জাস্তির ব্যাপার। আমরা নাকি সব দিকে ঠিক হিসাব করিয়া চলিতে পারি নাই। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে আযাদের দেশে একটা প্রাণহীন জ্ঞানের 'মাবির্ভাব হইয়াছে। এই মুখস্ত করা জ্ঞানের ক্ষমত। অল্পই; কিন্তু অহঙ্কার অনেকখানি। এই স্কুনে যাহরা জ্ঞানী, তাগার সব জিনিস সের দাড়ি লইয়া যাপিতে বসেন। ঐাহারা। অঙ্কশাস্ত্রের শাস্ত্রী, সব জিনিস লইয়া আঁক কষিতে বসেন। কিন্তু প্রাণের যে বা, সে ত অঙ্ক-শাস্ত্ৰ মানে না, সে যে সকল মাপকাটী ভাসাইপ্পা লইয়া যায়। স্বদেশী আনোগন একটা ঝড়ের মত বহিয়া গিয়াছিল, একটা প্রবল বন্যায় আমাদের ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিল। প্রাণ যখন জাগে, তখন ত হিসাব করিয়া জাগে না। মাহুষ যখন জন্মায়, সে ত হিসাব করিয়া জন্মায় না বা জগাইতে পারে না বলিয়াই সে জন্মায়। আর না জাগিয়া থাকিতে পারে। না বলিয়াই প্ৰাণ একদিন অকস্মাৎ জাগিয়া৷ উঠে। এই ঘে মহাবড়ার কথা। বলিলাম, তাহাতে আাষরা ভাসিয়া-ডুবিয়া, বাচিয়া ছি। বাঙ্গলার যে জীবন্ত প্ৰাণ, তাহার সাক্ষাৎ পাইয়াছি। বাঙ্গলার প্রাণে প্ৰাণে আবহমান যে সভ্যতা ও সাধনার স্রোততাহ'তে অবগাহন করিয়াছি{ বাঙ্গলার যে ইতিহাসের •ধার, তাহাকে কতকটা বুদ্ধিতে পারিয়াছি। বৌদ্ধের বুদ্ধ, শৈবের শিব, শাক্তের শক্তি, বৈষ্ণবের ভক্তি, সবই যেন চক্ষের সম্মুখে প্রতিভাত হইল। চণ্ডিদাস, বিদ্যাপতির গান মনে পড়িল। মহাপ্রভুর জীবন-গৌরব আমাদের প্রাণের গৌরব বাড়াইয়া দিল। জ্ঞানদাসের গান, গোবিনদাসের গান, লোচন। দাদের গান, সবই যেন একসঙ্গে সাড়া দিয়া উঠিল। কবিওয়ালাদের গানের ধনি প্রাণের মধ্যে বাজিতে লাগিল। রামপ্রসাদের সাধনসঙ্গীতে আমরা মজিলাম। বুঝিলাম, কেমন ইংরাজ এ দেশে আসিল, বুঝিলাম রামমোহনের তপস্তার নিগুঢ় মৰ্ম্ম কি? বঙ্কিমের যে ধ্যানের মূৰ্ত্তি সেই “তুমি বিষ্ঠা তুমি ধর্ম তুমি হৃদি তুষি মৰ্ম্ম। দেশবন্ধু রচনাসমগ্র স্বং হি প্ৰাণা: শরীরে। বাহুতে তুমি মা শক্তি হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি তোমারি প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে—” সেই মাকে দেখিলাম। বঙ্কিমের গান আমাদের “কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল।” বুঝিলাম, রামকৃষ্ণের সাধনা কি—সিদ্ধি কোথায়! বুবিলাম, কেশবচন্দ্র কেন কাহার ডাক শুনিম্ন ধর্মের তর্করাজ্য ছাড়িয়া মম্রাজ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন। বিবেকাননের বাণীতে গ্রাণ ভরিয়া উঠিল। বুবিলাম, বাঙ্গালী হিন্দু হউক, মুসলমান হউক, খৃষ্টান হউক, বাঙ্গালী বাঙ্গালী। বাঙ্গালীর একটা বিশিষ্ট রূপ আছেএকটা বিশিষ্ট প্রকৃতি আছেএকটা স্বতন্ত্র ধর্ম আছে। এই জগতের মাঝে বাঙ্গালীর একটস্থান আছেঅধিকার অাছে, কৰ্ত্তব্য আছে বুঝিলাম, বাঙ্গালীকে প্রকত বাঙ্গালী হইতে হইবে। বিশ্ববিধাতার যে অনন্ত বিচিত্র সৃষ্টি, বাঙ্গালী সেই দৃষ্টিস্রোতের মধ্যে এক বিশিষ্ট সৃষ্টি। অনন্তরূপ লীলাধারের রূপবৈচিত্র্যে বাঙ্গালী একটি বিশিষ্টপ হইয়া ফুটিয়াছে। আযায় বাঙ্গলা৷ সেই রূপের মূৰ্ত্তি; আমার বাঙ্গল সেই বিশিষ্টরূপের প্রাণ। যখন জাগিলাম, মা আমার আপন গৌরবে তাহার বিশ্বরূপ দেখাইয়া দিলেন। সে রাপে প্রাণ ডুবিয়া গেল। দেখিলাম, সে রূপ বিশিষ্ট, সে অনন্ত! তোমরা হিসাব করিতে হয় কর, তর্ক করিতে চাও কর-আমি সে রাপের বালাই সইয়া মরি। খদেশী আনোলন হিসাব না করিয়াই আসিয়াছিল, হিসাব না করিয়াই চলিয়া গেল। কিন্তু এখন আমাদের হিসাব করিবার সময় আসিয়াছে, ম দেখা দিয়াছেন। - এখন যে পূজার আয়োজন করিতে হইবে। হিসাব করিয়' স্কর্য তৈরারী করিতে হইবে, হিসাব করিয়া পূজার উপকরণ সংগ্রহ করিতে হইবে। এই যে মহ৷ ব্যায় দেশ ভাসিয়া গিয়াছিল, এখন যে সব পতিত জমি সাবাদ করিয়া সোনা ফলাইতে হইবে। বিশ্বাস রাখিও, সোনা কলিবেই। এখন আমাদের বিচার্য্য যে, কেমন করিয়া এই নব-জাগ্রত বাঙ্গালী জাতিকে সম্পূর্ণরূপে বিকশিত করিয়া তুঙ্গিতে পারি। সেই সেই দিক দিয়াই কারণে য়েখিতে হইবে, জামাদের বিকাশের জচ্চ্য কি কি আবভক এবং তাহা কি করিয়া পাইতে পারি। এই বিচার লইয়াই সপ্রতি একটা গোল বাধিয়াছে। ইউরোপে নাকি কোন কোন পণ্ডিত স্থির করিয়াছেন যে, এই যে জাতিগত ভাব-ইংরাজীতে গেশের কথা ২১ বাহাকে lation ldea” বলে, ইহা নাকি একেবারেই কাল্পনিক, কোন বছর উপরে প্রতিষ্ঠিত নহে। কোন বিশিষ্ট জাতির নাকি কোন একটা স্বতন্ত্র মূল্য নাই। প্রত্যেক জাতির রক্তের মধ্যে অন্যান্য জাতির বৃক্ত মিশ্রিত আছে। আচার-ব্যবহারে, শিক্ষায় দীক্ষায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে সকল বিষয়েই ভিন্ন ভিন্ন জাতির মধ্যে আদান-প্রদান চলিয়াছে এবং এই আদান-প্রদানের মধ্যে যাহা গড়িয়া উঠিয়াছে, তাৰ কোন বিশিষ্ট জাতির জাতিত্বের ফল নহে; এই জাতিত্বের ভাব পোষণ করিলে নাকি জাতিতে জ্যতিতে সংগ্রাম ও সংঘর্ষ বাড়িয়া যাইবে ও সমগ্র মানবজাতির অমঙ্গলের কারণ হইয়া উঠিবে। কথাটি অনেকদিনকার কিন্তু বৰ্তমান যুগের সঙ্গে সঙ্গেই আবার নূতন করিয়া। প্রচারিত হইতেছে, কাজেই আমাদের দেশেও ছই একজন পণ্ডিত তাহ। ধরিয়া বসিয়াছেন, এবং এই মতের জোরেই আমাদের এই নব-জাগ্ৰত জাতীয় জীবনাকাহাকে হাসিয়া উড়াইয়া দিবার চেষ্টা করিতেছেন। ইউরোপের এই মত ইউরোপে অনেক বড় বড় পণ্ডিত অনেকবার খণ্ডন করিয়াছেন; আাৰি। ভরসা করি, এবারও করিবেন। তাহাদের সমস্যা তাহারাই পূরণ করিবেন। কিন্ধ স্বর্যের চেয়ে বালীর তাপ বেশী; আমাদের দেশে এই সব নকল পণ্ডিতদের পাণ্ডিত্য এত বেশী যে, তাহাদের কোন মতকে কিছুতেই খণ্ডন করা যায়। না! এমন কি, যে রবীন্দ্রনাথ সেই স্বদেশী আন্দোলনের সময় বাঙ্গলার যটি বাঙ্গলার জলকে সত্য করিবার কামনায় ভগবানের কাছে প্রার্থনা করিয়া ছিলেন, সেই রবীক্ষনাথ এখন ্যার রবীন্দ্রনাথ—এবার আমেরিকায় ঐ মতটি নাকি খুব জোরের সঙ্গে জাহির করিয়াছেন। তাহার সমস্ত বস্তৃতাটি কোন কাগজে প্রকাশিত হয় নাই। সুতরাং পড়িতে পারি নাই, Modern Review তে কোন কোন অংশ উজ্জ্বত হইয়াছে, তাহা পড়িয়াছি, হয় ত সমস্ত ন পড়িতে পাইয়া তাহার মতের সম্বন্ধে ভুল ধারণা করিয়াছি, কিন্তু যাহা প্রকাশিত হইয়াছে, সেই মতের, এই ক্ষেত্রে বাঙ্গালী জাতির এই মহাসভায় সভাপতির আাসন হইতে প্রতিবাদ হওয়া উচিত মনে করি। এই সমস্ত মতটাই বস্তুহীন, বিশ্বমানবের ছায়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। সমৰ্থ মানবজাতির মধ্যে সত্য জাতৃভাব। জাগাইতে হইলে ভিন্ন ভিন্ন জাতিসমূহকে বিকশিত করিতে হইবে। তাহার পূর্বে এই ভ্রাতৃভাব অসার কল্পনা মাত্র। জাতি তুলিয়া দিলে বিশ্বমানব ধাড়াইবে কোথায় যেমন প্রত্যেক ব্যক্তি বিকাশ না হইলে একটি পরিবারের উন্নতি হয় না, যেমন পরিবার সমূহের উন্নতি না হইলে সমাজের উন্নতি হয় না, যেমন সমাজের উন্নতি ন হইলে দেশবন্ধু রচনাসমগ্র জাতির উন্নতি হয় না, ঠিক তেমনি সেই একই কারণে সকল ভিন্ন ভিন্ন বিশিষ্ট জাতির উন্নতি না হইলে সমগ্র মানবজাতির উন্নতি হয় না॥ বাঙ্গালীর শিরায় শিরায় যে রক্তই প্রবাহিত হউক না কেন, সে রক্ত আর্য্যই হউক, কি অনার্থীই হউক, কি আৰ্য্য অনার্য্যের মিশ্রিত রক্তই হউক, যাহা সত্য, তাহ৷ সত্যকামের মত স্বীকার করিতে বাঙ্গালী কখনও কুষ্টিত হইবে না—বাদালীর শিরায় শিরায় যে রক্তই প্রবাহিত হউক না কেন, বাঙ্গালী যে বাঙ্গালী, সে কথা আর ত সে ভূপিতে পারে না, সে যে বাঙ্গলার মাটি বাঙ্গার জলে বাড়িয়া উঠিয়াছে, বাঙ্গলার মাটি বাজলার জলের সঙ্গে নিত্যই যে তাহার আদান প্রদান চলিতেছে। আর সেই আদান-প্রদানের মধ্যে যে একটা নিত্য সত্য জাগ্রত সম্বন্ধোর সৃষ্টি হইয়াছে, সেই সম্বন্ধের উপর বান্ধলার জাতিত্বের প্রতিষ্ঠা। অহাগ্য জাতির সহিত ব্যবসাবাণিজ্য শিক্ষা-দীক্ষার যে আদান-প্রদান, তাহাও এই জাতিত্বের লক্ষণ। জাতিত্বের গুণেই এক জাতি দান করিতেও সক্ষম হয়, গ্রহণ করিতেও সক্ষম হয়। ইহা সেই জাতির অবস্থার বিষয়, স্বভাবের বিষয়। তার পর বিরোধের কথা, জা তিত্বের প্রভাবে যে কতকটা বিরোধ জাগিন্না উঠে, তাহা অস্বীকার করা চলে না॥ সেও যে জাতির স্বভাবের ধৰ্ম্ম, তা! বলিয়াই জাতিগুলাকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। প্রত্যেক পরিবারমধ্যে প্রত্যেক সমাজে বিরোধ-বিসংবাদ ত লাগিয়াই আছে, তা বলিয়াই কি সেই ব্যক্তিগুলার অস্তিত্ব অস্বীকার করিতে হইবে, না উড়াইয়া দিতে হইবে? শত প্রকারের বিরোধ-বাদ-বিসংবাদের মধ্যেই মাসুষ মানুষ হইয়া উঠে ও মিলনের পথ খুজিয়া পায়। এই যে সব বিশিষ্ট জাতিসমূহ, ইহাদের পক্ষে ঐ একই কথা থাটে। এই বিরোধ-বিসংবাদ সংঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেই এই সব বিশিষ্ট জাতি সমস্ত মানবজাতির যে মিলন-মন্দির, সেই দিকে অগ্রসর হইতেছে ও হইবে। সংসারে প্রত্যেক জিনিসের প্রত্যেক ভাবের দুইটা মুথ আছেএই যে: বাদবিসংবাদ ইহারও দুইটা মুখ। আমরা এক মুখ দেখি, আর এক মুখ দেখি না। বিরোধ অাছে চক্ষে দেখিতেছি, যনে জনিতেছি, ইহাকে অস্বীকার করিতে পারি না, কিন্তু এই বিরোধেরই অপর মুখে যে মিলন, তাহ দেখিতে পাই না বলিয়া অস্বীকার করিয়া থাকি। ইউরোপে আজ যে ভীষণ সমরানল প্রজ্জলিত, এই অনলে ইউরোপের সকল ঈ, বিম্বেষ, দৈত, অপার শক্তির অভিমানজনিত যে হীনতা, অসীম স্বার্থপরতার যে মলিনতাসব পুড়িয়া ছাই হইয়া যাইগেছে। আমি দেখিতেছি, চক্ষে স্পষ্ট দেখিতেছি, এই পবিত্র ভক্ষ দেশের কথা ২০ সমাধির উপরে ইউরোপ তাহার মিলন-মনির খ্ৰীচনা করিতেছে। সকল প্রকার হীনতা ও স্বার্থপরতার ধৰ্ম্মই এই যে, সে নিজের আবেগে নিজের বিনাশ-সাধন করে এবং সেই বিনাশের মুখে পরমাসুরক্তি জাগাইয়া দেম্ব। সেই পর্যাংরক্তি না জাগিলে যথার্থ মিলন অসম্ভব। অনেকে হয় ত মনে করেন, এই যে কলিযুগের কুরুক্ষেত্র, ইহাতে ইউরোপের ধংস অবখ্যম্ভাবী। আমি। বলি, কখনও না। সকল যুদ্ধক্ষেত্র যে ধৰ্ম্মক্ষেত্র, সকল ইতিহাস যে ভগবৎ লীলার পৃত পুণ্য কাহিনী, ভারতের কুরুক্ষেত্রের ফলে কি তথনকার ভারত মিলনপথে অগ্রসর হয় নাই? নবজীবন লাভ করে নাই? আৰ্য অনার্থের মধ্যে কি একটা স্বাভাবিক মিলন সংঘটিত হয় নাই? আমর। অমঙ্গলের দিকটাই দেখি, কিন্তু তাহার সঙ্গে জড়িত যে মঙ্গল, সেই দিক দেখিতে ভুলিয়া যাই। ইউরোপ আজ অসীম ছঃখ-কষ্ট, যাতনা-বেদনা, অৰ্ধ-অনশনের মধ্যেই মিলনপথে পা বাড়াইয়াছে। অহঙ্কারের অবসান না হইলে প্রেমের জন্ম হয় না। এই টুঃখ-কষ্ট আজ ইউরোপকে ব্যথিত করিয়া তুলিয়াছে, ইহা সেই প্রেমমিলনের আগমনপ্রতীক্ষার প্রসববেদনা॥ এই সমরা নল নিৰ্বাপিত। হইলে দেখিতে পাইবে, ইউরোপ আপনার স্বার্থপরতাকে ছাড়াইয়া উঠিয়াছে। বিশ্বাস করিও, একদিন দেখিবে, যে প্রবল প্রতিত বেগে ইউরোপ আজ। তাহার স্বার্থ খুঁ জিয়া বেড়াইতেছে এবং সমস্ত প্ৰাণপণ দিয়া সেই স্বার্থপরতাকেই পোষণ করিতেছে, সেই ইউরোপ তেমনি অপ্রতিহত বেগে ঠিক সেই রকম সমস্ত প্ৰাণপণ দিয়া সে নিজের ও জগতের যথার্থ মঙ্গল সাধন করিতেছে। এই সমর, এই বিরোধ যে জাতিত্বের ফল, তাহ৷ আমি স্বীকার করি, কিন্তু এই সমৱক্ষেত্রের অপর পারে যে মিলনমন্দির রচিত হইতেছে, তাহাও এই জাতিত্বেরই ফন্স, সে কথা অস্বীকার করিলে চলিবে কেন? যদি কোন দিন মুদূর ভবিষ্যতে সমন্ত মানব জাতি লইয়া একটা যুক্তরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে বুঝিতে হইবে যে, তখন সমস্ত বিশিষ্ট জাতিগুলি নিজ নিড় স্বভাব ধর্মের পথ অবলম্বন করিয়া অপূর্বরূপে বিকশিত হইয়াছে এবং সেই ধূক্তয়াজ্যে সকল জাতিরই সমান অধিকার। কিন্তু আমার মনে হয়, এই বিশিষ্ট জাতি সমূহ সেই অবস্থায় উপস্থিত হইসে সমস্ত মানবজাতির কল্যাণের জষ্ট কোন বাজত্বেরই অবখ্যক হইবে না। এই যে বাঙ্গালী জাতির জাতিত্বের দাবী, ইহার সম্বন্ধে আরও দুই একটি কথাৰ আালোচনা আাবখ্যক। আমি এমন কথা শুনিয়াছি, আমার কাছেই ইঃ দেশবন্ধ রচনাসমগ্র অনেকে বসিয়াছেন যে, আমাদের পক্ষে জাতিত্বের গেীরব করা নিতান্ত অসদত। কারণ, এই যে জাতিত্বের ভাবইহার সমস্তই আাগাগোড়া বিলাতের আমদানি —একটা ধার করা সামগ্রী মাত্র। এটা যে তাদের ভূল, তাহা আমি বুঝাইতে চেষ্টা করিব। আামি আগেই বলিয়াছি, কোন একটা বিশিষ্ট দেশের সঙ্গে সেই দেশবাসীদের যে নিত্যসম্বন্ধ, তাহারই উপরে জাতিত্বের প্রতিষ্ঠা হইতে পারে, এ সম্বন্ধ যাহা নিত্য আবহমান কাল হইতে আছে ও চিরদিনই থাকিবে, তাহার প্রতি এতকাল এমতভাবে আমাদের চোখ পড়ে নাই; হইতে পারে, আমাদের সভ্যতায় ও সাধনায় এই সম্বন্ধে কোন বিশিষ্ট নাম রাখা হয় নাই; ইহাও হইতে পারে, ইউরোপের সভ্যতা ও সাধনা, তাহাদের শিক্ষা-দীক্ষা, বিজ্ঞান, ইতিহাস লইয়া এমন করিয়া হুড়মুড় করিয়া আমাদের ঘাড়ের উপর না। পড়িলে, হয় ত এত সহজে এত শীজ আমাদের জাতিত্বের চৈতন্য হইত না তাহ৷ বলিয়ন কি যাহা আমাদের, অামাদেরই দেশের, যাহা বাজলার মাটি বাদলার জলের সঙ্গে অণুতে অণুতে প্ৰাণে প্ৰাণে জড়াইয়া আছেতাহাকে বিলাতের আমদানি বলিয়া সমস্ত বাঙ্গালীজাতিকে অপমান করিব? যাহ৷ চিরকাল আছেতাহাকে দেখিতে পাই নাই, বুঝিতে পারি নাই বলিয়া কি ধরিয়া লইতে হইবে যে, তাহার কোন অস্তিত্ব ছিল না? বিজ্ঞান জগতে যে বড় বড় সত্য আবিষ্কার হইয়াছে, সে সব সত্যই যে সনাতন—তাহাদের সত্ত৷ বা অস্তিত্ব ত কোন বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানবিদের উপরে নির্ভর করে না? যাধ্যাকর্ষণ যেমন নিউটনের জন্মাই বার অাগেও ছিল, জামাদের জাতির জাতিত্ব তেমনি ইংরাজ আাসিবার আগেও ছিল। আঘরা দেখিতে পাই নাই বলিয়া যে ছিল না তাত। নহে। ইউরোপ হইতে একটা বিপরীত সাল্যতা আাসিয়া অামাদের জীবনে আঘাত করিল, সে আঘাতে আমাদের চৈতন্য হইল, সেই মুহুর্তেই আমাদের জাতির যে জাতিত্ব, তাহার সাক্ষাৎ পাইলাম। এমন কম্ৰিহ্মাই মহত্যজীবনে আত্মজ্ঞানের প্রতিষ্ঠ। হয়, বাহিরের রূপ ইন্দ্রিয়ের ভিতর দিয়া আত্মাকে আঘাত করে, সেই আঘাতেরই ফলে আমরা আপনাকে দেখিতে পাই, কিন্তু যাহা দেখি তাহ ত বাহিরের নয়, তাহা আমাদের প্রাণের বস্থা। অামাদের নবজাগ্রত বাঙ্গালী জাতির হে জাতিত্ব, তাহ৷ আমাদের প্রাণবন্ত, বিদেশের নহে। স্বদেশী আান্দোলনের সময় ভগবৎকুপায় অামাদেরই প্রাণের মধ্যে তাগার সাক্ষাৎ পাইয়াছি—তাহাকে ধার করিয়া সাত সমুদ্র তের নদী পার করিয়া লইয়া হাসি নাই। এই কথার সঙ্গে সঙ্গে অার একটা কথার বিচার ও আলোচনার অাবঠক। দেশেয় কথা আমরা কথায় কথায় বলিয়া থাকি, আমাদের দেশে ইংরাতের আগমন বিধির বিধান। আমার প্রদ্ধেয় বন্ধ তার সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহ ১৯১৫ : জন্ধের কংগ্রেসের সভাপতির অভিভাষণে এই কথাই বলিয়াছেন—এই কথার গুড ফর্ম কি তাষ ভাল করিয়া বুঝিতে হইবে। এই কথার সঙ্গে সঙ্গে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মিলন সম্বন্ধে আমরা অনেক কথা বলিয়া থাকি । এই দুইটি কথাই মূলে এক কথ। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মিলন সম্ভবপর কিনা, এই বিষয়ে যে ‘অনেক মতভেদ মাছে । সেই সব ভিন্ন ভিন্ন মতের মর্ম কথাটি কি, তাহ তলাইয়৷ বুধিলে জাতির জাতিত্বের কথা আরও পরিষ্কার হইয়া উঠিবে । Keepling লিখিয়াছিলেন—“The East is East and the West is 'west, never the twain shall meet.” অর্থাৎ প্রাচ্য ও প্রতীচ্য চিরকালই ভিন্ন ভিন্ন থাকিবে, তাহাদের মিলন অসম্ভব । আ৷ বার বিলাতে ও আমাদের দেশে এমন অনেকে আছেন, যাহারা বলেন যে, এই মিলন একেবারে অবশ্যম্ভাবী। স্টার রবীন্দ্রনাথ এবার আমেরিকায় বলিয়াছেন যে, জাতির বদলে একটা Universal brotherhood of man kind হুইবে অর্থাৎ সমস্ত মানবজাতি ভ্ৰাতৃভাবে একত্র হইবে। বোম্বাইএর কংগ্রেসে স্টার সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন বলিয়াছেন : “The East and the west have metnot in vain —. The invisible scribe, who has been writing the most marvellous history that has ever been written, has not been idle. Those who have the discernment and the inner vision to see will note that there is only one goal, there is only one path. অর্থাৎ—প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মিলন ব্যর্থ হয় নাই, যে অদৃষ্ঠ্য বিধাতাপুরু। এতাবৎকাল পর্যন্ত রচিত ইতিহাসের পৃষ্ঠায় ঘে আশ্চৰ্য্য লেখা লিখিতেছেন, তিনি ত নিশ্চিন্ত হইয়া নাই । ধাঁহাদের বিচারবুদ্ধি ও দিব্যচক্ষু আছে। তাহার বলিতেন যে, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের একই ইষ্ট, একই পন্থা। এই বিষয়ে আমি যতই চিন্তা করিমনে হয়, এই দুইটা কথা সত্য, আবার দুইটা কথাই মিথ্যা, ইহার কোনটাই একেবারে সত্য নয়। টুইট একেবারে বিপরীত রকমের সভ্যতা ও সাধনা লইয়া এই যে প্রাচ্য ও প্রতীচ্য, ইহাদের মধ্যে মিলনের সম্ভাবনা কোথায়। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বদলে আমি ইংলণ্ড ও বাদলা দেশ প্ৰরিয়া দই, তাহা হইলে কথাটা অনেক পরিমাণে সরল হই! আসিবে । এই দেশবন্ধ রচনাসমগ্র ' ' . মিলন কত প্রকারে হইতে পারে, তাহা বিচার করা যা’ক। আমাদের ও ইংরাজের মিলনের মর্ম যদি এই কয় যে, আমরা ইংরাজের ইতিহাসের সাহায্যে সেই ধাচে গড়িয়া উঠিব অর্থাৎ বাগলা দেশটা একটা নকল ইংলও হইবে, আযাদের নরনারী নকল সাহেব মেম হইয়া উঠিবে, আমাদের শিক্ষাপ্রণালী ঠিক হুবহু বিলাতের মত দুইবে, আমাদের চাষবাস ব্যবসা-বাণিজ্যের চেষ্টায় সমস্ত দেশটাই যথার্থ গৃস্থের আপ্রশ্ন না হইয়া একটা বৃহৎ ভীষণ কলের কায় খানা হইয়া উঠিবে, তাহা হইলে আমি বলি, মিলন একেবারে অসম্ভব h অনেকে হয় ত বসিবেন, কেন অসম্ভব ? এই সহরে ত অনেকেই ইংরাজী রকমে জীবন যাপন করেন। আহার . । বিহার, আচারে ব্যবহ৷ রে চালচলনে ইংরাজের সহিত তাহাদের কোন পার্থক্যই দেখা যায় না। । কলিকাতায় আমাদের ব্যবসা বাণিজ্য ত একরকম বিলাতের ছাঁচেই টালা, আর কলিকাতায় যাহা দেখা যায়, তাগি যে ক্রমশ: দেশে ছড়াইয়া। পড়িতেছে, তবে কেমন করিয়া বলা যায় যে, আমরা আমাদের বিলাতের ধাচে. গড়িয়া উঠিব না ? অামার কথা এই যে, নকল সাজা সহজ, কিন্তু যথার্থ নকল। হওয়া বড়ই কঠিন। সাজ। জিনিসটা খেয়ালের ব্যাপার, একদিন থাকে, তারু পর থাকে না ; কিন্তু হওয়া জিনিসটার সঙ্গে রক্তমাংসের সম্বন্ধ আছেকোন একটা জাতিকে কিছু হইতে হইলে তাহার স্বভাবধৰ্মে সেই হওয়া জিনিসটার বীজ থাকা চাই। আমার কিছুতেই মনে হয় না, বাঙ্গালীর স্বভাবধর্মের মধ্যে ইংলণ্ডের সভ্যতা ও সাধনার বীজ আছেসুতরাং এই অর্থে ইংরাজ ও: বাঙ্গালীর মিলন অসম্ভব, এবং এইভাবে দেখিতে গেলে Keeping এর কথাই ঠিক বলিয়া মনে হয়, প্রাচ্য প্রাচ্যই থাকিবে, প্রতীচ্য প্রতীচ্যই থাকিবেইহার" কখনও মিলিবে না। তবে কি এই দুইটা জাতি ভাঙ্গিয়া চুরিয়া নিজ নিজ সত্ব হারাইয়া একটা নূতন রকমের দোত্মাসল৷ জাতি গড়িয়া উঠিবে, না একটা নূতন বর্ণসঙ্কর জাতির উৎপত্তি হইবে ? এ কথ। অর্বাচীনের কথাইহার বিচারের কোন আবশ্যকত নাই। ভাষার কেহ কেহ বলেন যে, এই মিলনের অর্থ এই যে, ইংরাজের যাহা কিছু ভাল, আমরা লইব, জামাদের যাহ কিছু ভাল, তাহা ইংরাজ লইবে এবং উভয়ের যাহা কিছু মদ, তাহ৷ বিসৰ্জন কন্নিতে হইবে। এ কথার অর্থ আমি বুঝিতে পারি না। । আামাদের কি ইংরাজের যাহা ভাল, যাহ৷ মন, তাহা কি এখন পৃথকভাবে জাতিয় জীবনের মধ্যে অবস্থিতি করে যে, একটা একেবারে দেশের কথ ২ • ছাড়িল্লা দিয়া আর একটা লওয়া যায় । একটা বিশিষ্ট জাতির ভালমন্দ যে এক সঙ্গে সেই জাতির রক্তমাংসের সঙ্গে জড়ান। ব্ৰাটী ভালটুকু ছিড়িয়া লইবে। কি করিয়া } এমন করিয়া ত ছেড়া যায় না। । একটা জাতির জীবন ত ঠিক ইটের এমারত নয় যে, ঠেকা দিয়া খানিকটা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়া সে দিকটা। আবার নূতন ধরণে মূতন উপকরণে গড়িয়৷ তুলিবে। কোন জাতির সংস্কার অন্ত জাতির আদর্শে সম্ভব হয় না। আমাদের যে সব সংস্কারের আবশ্যক, তাহ৷ আমাদের স্বভাব-ধর্মের মধ্যে যে সব শক্তি নিহিত আছে, তাহার বলেই হইবে। বিলাতের সমাজশক্তির বলে আমাদের আবশ্যকীয় সংস্কার সাধিত হইবে না, -৫ইতেই পারে না। হইট জিনিস যেমন আঠ দিয়া জোড়া লাগান যায়, ঠিক তেমনি করিয়া ত বিল্যতের ভালটুকু আমাদের জাতীয় জীবনের সঙ্গে। জোড়া লাগান যায় না। । এ যে জীবনের লীলা—জীবন বিকশিত হয়, তাহার বিকাশের মধ্যে যাহা নাই, সে ত তাহার সঙ্গে জোড়া লাগে না । এই কথাটি আর একদিক দিয়া বোঝা যায়। ধরিয়া লও যে, বিলাতের ভালটুকু তুলিয়া আনিয়া আমাদের জীবনের মধ্যে চালাইয়া দেওয়া যায়। কিন্ত তাহার ফলে কি হইবে, বিলাতি সামাজিক প্রথা বা অবস্থা যদি আমাদের মধ্যে চালাইিয়া দেওয়া যায়, তবে সেই প্রথা বা অবস্থার যাহা স্বাভাবিক ফল, তাহা। ফলিবেই, এবং তাহার ফলে আমাদের দেশের যে বিশিষ্ট রূপ, তাহা নষ্ট হইয়া। বাঙ্গালী সমাজ একটি দ্বিতীয় বিলাতি সমাজ তইয়। উঠিবে। । এমন করিয়, আর একটা জাতির প্রতিধ্বনি হইয়া উঠিলে আমাদের বাচিয়া থাকার সার্থকতা কোথায় ? এভাবে ধাহারা আমাদের দেশে বিলাতি সমাজের প্রতিষ্ঠা করিতে চেষ্ট৷৷ করেন, তাহাদের চেষ্টা করিতে ঘাও, আমাদের ভীত হইবার কোন কারণ নাই। আমি জানি, বাঙ্গালী জাতির একটা বিশিষ্ট জাতিত্ব আছেতাহার একটা বিশিষ্ট স্বভাব-ধৰ্ম্ম আছেসেই স্বভাব-ধৰ্ম্ম নিজেকে প্রতিষ্ঠিত ও প্রকাশ করিবে, এবং ঘাহা সেই স্বভাব-ধৰ্ম্ম বিরূদ্ধ, তাহাকে বাহির করিয়া দিয়া এই সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করির দিবে। তবে এই যে মিলন-যাহাতে অনেকেই বিশ্বাস করেন ও আমিও বিশ্বাস। করি, গেই মিলনের যথার্থ মৰ্ম্ম কি ? এই বিষয়টা ছুই দিক দিয়া দেখা যায়, ইহাকে জাতিত্বের দিক দিয়া অর্থাৎ বাঙ্গালী জাতির যে জাতিত্ব ও ইংরাজ জাতির যে জাতিত্ব, এই দুইটি সত্যের দিক দিয়া দেখা যায়। আর একটা? দেশবন্ধ রচনাসমগ্র দিক দিয়াও দেখা যায়, সেটা আমাদের নিজ নিজ শাসনবিভাগ অর্থাৎ ‘গবৰ্ণমেন্টের দিক দিয়া । এই শেষোক্ত দিক দিয়া বিচার করিতে হইলে ইহা নিশ্চয়ই বলা যায় যে, ‘ছইটি স্বতন্ত্র জাতি নিজ নিজ বিশিষ্টরূপেই বিকশিত হইয়াও এই ছটি জাতির শাসনবিভাগের উপর দিকে একটা একচ্ছত্র যোগাযোগ থাকিবে। বাঙ্গালী জাতির ও ভারতবর্ষের অত্যান্ত্য জাতির ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের পরস্পরের শাসনবিভাগের একটা সম্বন্ধ স্থাপিত হইবে এবং সমস্ত ভারতবর্ষের যে শাসনবিভাগ, তাগার সহিত ইংলণ্ডের সম্বদ্ধ, একটা বাস্তবিক সম্বন্ধ গড়িয়া উঠিবেই উঠিবে। কিন্তু সেই সম্বন্ধের ভিতরের প্রকৃতি কি হইবে, বাহিরের আাকার হইবে, তাহ ঠিক করিয়া বুৱা এবং বলা অসম্ভব। তার কি এখনও সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহ বোম্বাই কংগ্রেসে বলিয়াছিলেন :- “It seems to me that having fixed our goal it is hardly necessary to attempt to define in concrete terms the precise relationship that will exist between England and India " when the goal is reached,* অর্থাৎ ~আমাদের যে উদেণ্যতাই সম্পূর্ণভাবে সফল হইলে ইংলণ্ডের সঙ্গে আমাদের সঙ্গে যে ঠিক কি সম্বন্ধ থাকিবে, তা নির্ধারণ করিবার চেষ্টা । “আমার মতে এখন অনাবশ্যক। আমার ঠিক তাহাই মনে হয়, তবে এই পৰ্য্যন্ত বলা যায় যে, এমন সম্বন্ধ হইতে বা থাকিতে পারে না, যাহাতে আমাদের ও ইংরাজের জাতীয় স্বভাব থমে র বিনাশ-সাধন হইবে। ধু জাতিত্বের দিক দিয়া দেখিতে গেলে ইংরাজ "ও বাঙ্গালীর বখার্থ মিলনভূমি স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়। আমি আগেই বসিয়াছি, ছুইটি জাতি যখন নিজ নিজ প্রকৃতির মধ্যে নিজ নিজ স্বভাবধর্মের শুণে উম্মত অবস্থা প্রাপ্ত হয়, তখনই তাহাদের মধ্যে যথার্থ আদান-প্রদান ও মিলন সম্ভব হয়। যখন ইংরাঙ্গ ও বাঙ্গালী এই উভয় জাতিই সেই প্রকার । উন্নতির পথে অগ্রসর হইবে, তখনই তাহাদের মধ্যে প্রকৃত মিলন হইবে। প্রকৃত মিলনের ফল এই যে, শত শত ভিন্ন ভিন্ন বিশিষ্টরূপে বিকশিত স্বতন্ত্র জাতিসমূহ বিধাতার সৃষ্টি শ্রোতে ভাসিতেছে, ফুটিতেছে, ইমাদের সকলের মধ্যে যে একটাএকত্ব , এই সব ডিলাপের যে স্বরূপ, তাহার সন্ধান পাওয়া যায়। বৈশিষ্ট্য লুথ হয় না। জাতিষ মরে না-গুল্লু সকল্প জাতির মধ্যে সকল বিশিষ্টরাপের মধ্যে যে একত্ব আছে, তাহাই লাগিয়া উঠে। এই দেশের কথা জরাই ইংরাজ এ দেশে আসিয়াছিল। এইখানেই প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের যথার্থ মিলন। এই ক্ষেত্রেই Universal Brotherhood of man সম্ভব। তাই শুধু এই দিক দিয়া দেখিলেই দেখা যায়, the East and the west have met not in vain. অর্থাৎ প্রাচা ও প্রতীচ্য যে একত্র হইয়াছে— তাহা ব্যর্থ হইবে ন । এখন দেখা যাইতেছে যে, আমাদের দেশের উন্নতিসাধন করিতে হইলে আমাদের এই নব-জাগ্ৰত জাতিত্বের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া আমাদের ইতিহাসের ধারাকে উপলব্ধি করিয়া ও সাক্ষী রাখিয়া আমাদের দেশের সকল দিকের বর্তমান অবস্থা অালোচনা করিতে হইবে এবং সেই আলোচনার ফলে কি কি উপায় অবলম্বন করিলে আমাদের স্বভাবধর্মসঙ্গত অথচ সাৰ্বভৌমিক উন্নতি সাধিত হইতে পারে, তাছা নিৰ্ধারিত করিতে হইবে ।


কৃষকের কথা আমাদের বর্তমান অবস্থার কথা ভাবিতে গেলে প্রথমেই আমাদের কৃষি জীবীদের কথা মনে আসে, তার পরই আমাদের দারিদ্র্যের কথা মনে হয়। কুবকের কথা ও দারিদ্র্যের কথা একই কথা বলিয়া মনে হয়। । আমর সকলেই জানি যে, ব্যবসা-বাণিজ্যের অভাব কৃষিকাৰ্য্যই আমাদের উপজীবিকার প্রধান উপায় { আামরা সকলেই জানি যে, বাঙ্গালী জাতির মত এত দরিদ্র জাতি বোধ হয় জগতের আর কোথাও নাই। কিন্তু ঘোর দারিদ্র্যের প্রবৃত অবস্থা বোধ হয় ভাল করিয়া জানি না, সম্যকৃরূপে উপলব্ধি করিতে পারি না। জামরা. ত একেবারে এক মূহণ্ডে দরিদ্র হইয়া পড়ি নাই—আমরা যে ধীরে ধীরে ক্রমে ক্ৰমে কঙ্কালসার হইয়া পড়িয়াছি। তাই এই অতি সত্য যথার্থ অবস্থ৷ আমরা ঠিক ভাল কৰিয়া বুঝিতে পারি না। বিদেশীর যখন প্রথম আমাদের দেশে । আসে, তখন তাহারা আমাদের সোনারূপার প্রাচুর্য্য দেখিয়া অবাক ইয়া। গিয়াছিল। । সে সোনা-রুপ আাসিত কোথা হইতে ? বাঙ্গল দেশে ত সোনা-. রূপার খনি নাই। তবেই বলিতে হইবে যে, আমাদের ঐধিকার্য্য ও ব্যবসা-- বাণিজ্যের সাহায্যে আমরা অনেক অর্থ উপার্জন করিতাম। সরকারী কাগজপত্রে পাওয়া যায় যে, আমাদের সমস্ত জনসংখ্যা ধরিলে এবং জামাদের সমস্ত চাষযোগ্য ভূমি হিসাব করিলে জন পিছে ছই বিধারও.