তিন

আজ আমার প্রণতি গ্রহণ করাে, পৃথিবী,
শেষ নমস্কারে অবনত দিনাবসানের বেদীতলে।

মহাবীর্যবতী, তুমি বীরভােগ্যা,
বিপরীত তুমি ললিতে কঠোরে,
মিশ্রিত তােমার প্রকৃতি পুরুষে নারীতে;
মানুষের জীবন দোলায়িত করাে তুমি দুঃসহ দ্বন্দে।
ডান হাতে পূর্ণ করো সুধা
বাম হাতে চূর্ণ করো পাত্র,
তােমার লীলাক্ষেত্র মুখরিত করো অট্টবিদ্রূপে;
দুঃসাধ্য করাে বীরের জীবনকে, মহৎজীবনে যার অধিকার।
শ্রেয়কে করাে দুর্মূল্য,
কৃপা করাে না কৃপাপাত্রকে।
তােমার গাছে গাছে প্রচ্ছন্ন রেখেছ প্রতিমুহূর্তের সংগ্রাম,
ফলে শস্যে তার জয়মাল্য হয় সার্থক।
জলে স্থলে তােমার ক্ষমাহীন রণরঙ্গভূমি,
সেখানে মৃত্যুর মুখে ঘােষিত হয় বিজয়ী প্রাণের জয়বার্তা।
তােমার নির্দয়তার ভিত্তিতে উঠেছে সভ্যতার জয়তোরণ,
ত্রুটি ঘটলে তার পূর্ণ মূল্য শােধ হয় বিনাশে।
তােমার ইতিহাসের আদিপর্বে দানবের প্রতাপ ছিল দুর্জয়,
সে পরুষ, সে বর্বর, সে মূঢ়।

তার অঙ্গুলি ছিল স্থূল, কলাকৌশলবর্জিত;
গদা-হাতে মুষল-হাতে লণ্ডভণ্ড করেছে সে সমুদ্র পর্বত;
অগ্নিতে বাষ্পেতে দুঃস্বপ্ন ঘুলিয়ে তুলেছে আকাশে।
জড় রাজত্বে সে ছিল একাধিপতি,
প্রাণের পরে ছিল তার অন্ধ ঈর্ষা।


দেবতা এলেন পর-যুগে
মন্ত্র পড়লেন দানব-দমনের,
জড়ের ঔদ্ধত্য হােলাে অভিভূত;
জীবধাত্রী বসলেন শ্যামল আস্তরণ পেতে।
উষা দাঁড়ালেন পূর্বাচলের শিখরচূড়ায়,
পশ্চিম সাগরতীরে সন্ধ্যা নামলেন মাথায় নিয়ে শান্তিঘট।
নম্র হােলো শিকলে-বাঁধা দানব,
তবু সেই আদিম বর্বর আঁকড়ে রইল তােমার ইতিহাস।
ব্যবস্থার মধ্যে সে হঠাৎ আনে বিশৃঙ্খলতা,
তোমার স্বভাবের কালাে গর্ত থেকে
হঠাৎ বেরিয়ে আসে এঁকেবেঁকে।
তােমার নাড়ীতে লেগে আছে তার পাগলামি।
দেবতার মন্ত্র উঠছে আকাশে বাতাসে অরণ্যে
দিনেরাত্রে
উদাত্ত অনুদাত্ত মন্দ্রস্বরে।
তবু তােমার বক্ষের পাতাল থেকে আধপােষা নাগ-দানব
ক্ষণে ক্ষণে উঠছে ফণা তুলে’,
তার তাড়নায় তােমার আপন জীবকে করছ আঘাত,
ছারখার করছ আপন সৃষ্টিকে।

শুভে অশুভে স্থাপিত তােমার পাদপীঠে,
তােমার প্রচণ্ড সুন্দর মহিমার উদ্দেশে
আজ রেখে যাব আমার ক্ষতচিহ্নলাঞ্ছিত জীবনের প্রণতি।
বিরাট প্রাণের, বিরাটমৃত্যুর গুপ্তসঞ্চার
তােমার যে-মাটির তলায়
তাকে আজ স্পর্শ করি, উপলব্ধি করি সর্ব দেহে মনে।
অগণিত যুগযুগান্তরের
অসংখ্য মানুষের লুপ্তদেহ পুঞ্জিত তার ধুলায়।
আমিও রেখে যাব কয় মুষ্টি ধূলি
আমার সমস্ত সুখদুঃখের শেষ পরিণাম,
রেখে যাব এই নামগ্রাসী, আকারগ্রাসী সকল পরিচয়গ্রাসী
নিঃশব্দ মহাধূলিরাশির মধ্যে।
অচল অবরােধে আবদ্ধ পৃথিবী, মেঘলােকে উধাও পৃথিবী,
গিরিশৃঙ্গমালার মহৎ মৌনে ধ্যানমগ্না পৃথিবী,
নীলাম্বুরাশির অতন্দ্রতরঙ্গে কলমন্দ্রমুখরা পৃথিবী,
অন্নপূর্ণা তুমি সুন্দরী, অন্নরিক্তা তুমি ভীষণা।
একদিকে আপক্কধান্যভারনম্র তােমার শস্যক্ষেত্র,
সেখানে প্রসন্ন প্রভাতসূর্য প্রতিদিন মুছে নেয় শিশিরবিন্দু
কিরণ-উত্তরীয় বুলিয়ে দিয়ে।
অস্তগামী সূর্য শ্যামলশস্যহিল্লোলে রেখে যায় অকথিত এই বাণী—
“আমি আনন্দিত।”
অন্যদিকে তােমার জলহীন ফলহীন আতঙ্কপাণ্ডুর মরুক্ষেত্রে
পরিকীর্ণ পশুকঙ্কালের মধ্যে মরীচিকার প্রেতনৃত্য।
বৈশাখে দেখেছি বিদ্যুৎচঞ্চুবিদ্ধ দিগন্তকে ছিনিয়ে নিতে এল
কালাে শ্যেন পাখির মতাে তােমার ঝড়,
সমস্ত আকাশটা ডেকে উঠল যেন কেশর-ফোলা সিংহ,

তার ল্যাজের ঝাপটে ডালপালা আলুথালু ক’রে
হতাশ বনস্পতি ধুলায় পড়ল উবুড় হয়ে।
হাওয়ার মুখে ছুটল ভাঙা কুঁড়ের চাল
শিকলছেঁড়া কয়েদী-ডাকাতের মতাে।
আবার ফাল্গুনে দেখেছি তােমার আতপ্ত দক্ষিণে হাওয়া
ছড়িয়ে দিয়েছে বিরহ মিলনের স্বগতপ্রলাপ
আম্রমুকুলের গন্ধে।
চাঁদের পেয়ালা ছাপিয়ে দিয়ে উপচিয়ে পড়েছে
স্বর্গীয় মদের ফেনা।
বনের মর্মরধ্বনি ঝঞ্ঝাবায়ুর স্পর্ধায় ধৈর্য হারিয়েছে
অকস্মাৎ কলােচ্ছ্বাসে॥
স্নিগ্ধ তুমি, হিংস্র তুমি, পুরাতনী, তুমি নিত্যনবীনা,
অনাদি সৃষ্টির যজ্ঞ হুতাগ্নি থেকে বেরিয়ে এসেছিলে
সংখ্যাগণনার অতীত প্রত্যূষে,
তােমার চক্রতীর্থের পথে পথে ছড়িয়ে এসেছ
শত শত ভাঙা ইতিহাসের অর্থলুপ্ত অবশেষ—
বিনাবেদনায় বিছিয়ে এসেছ তােমার বর্জিত সৃষ্টি
অগণ্য বিস্মৃতির স্তরে স্তরে।
জীবপালিনী, আমাদের পুষেছ
তােমার খণ্ডকালের ছােটো ছােটো পিঞ্জরে।
তারই মধ্যে সব খেলার সীমা
সব কীর্তির অবসান।
আজ আমি কোনাে মােহ নিয়ে আসিনি তােমার সম্মুখে,
এতদিন যে দিনরাত্রির মালা গেঁথেছি বসে বসে
তার জন্যে অমরতার দাবি করব না তােমার দ্বারে।

তােমার অযুত নিযুত বৎসর সূর্য-প্রদক্ষিণের পথে
যে বিপুল নিমেষগুলি উন্মীলিত নিমীলিত হােতে থাকে
তারই এক ক্ষুদ্র অংশে কোনাে একটি আসনের
সত্যমূল্য যদি দিয়ে থাকি,
জীবনের কোনাে একটি ফলবান খণ্ডকে
যদি জয় ক’রে থাকি পরম দুঃখে
তবে দিয়াে তােমার মাটির ফোঁটার একটি তিলক আমার কপালে;
সে চিহ্ন যাবে মিলিয়ে
যে-রাত্রে সকল চিহ্ন পরম অচিনের মধ্যে যায় মিশে॥


হে উদাসীন পৃথিবী,
আমাকে সম্পূর্ণ ভােলবার আগে
তােমার নির্মল পদপ্রান্তে
আজ রেখে যাই আমার প্রণতি॥

শান্তিনিকেতন

১৬ অক্টোবর, ১৯৩৫