প্রধান মেনু খুলুন

পল্লী-সমাজ/একাদশ পরিচ্ছেদ


১১

 দুইদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টিপাত হইয়া অপরাহ্ন-বেলায় একটু ধরণ হইয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপে গোপাল সরকারের কাছে বসিয়া রমেশ জমীদারীর হিসাবপত্র দেখিতেছিল; অকস্মাৎ প্রায় কুড়িজন কৃষক আসিয়া কাঁদিয়া পড়িল—“ছোটবাবু, এ যাত্রা রক্ষে করুন, আপনি না বাঁচালে ছেলেপুলের হাত ধ’রে আমাদের পথে ভিক্ষে কর্‌তে হবে।” রমেশ অবাক্‌ হইয়া কহিল, “ব্যাপার কি?” চাষীরা কহিল,—“একশ-বিঘের মাঠ ডুবে গেল, জল বা’র ক’রে না দিলে সমস্ত ধান নষ্ট হয়ে যাবে বাবু, গাঁয়ে একটা ঘরও খেতে পাবে না!” কথাটা রমেশ বুঝিতে পারিল না। গোপাল সরকার তাহাদের দুই একটা প্রশ্ন করিয়া, ব্যাপারটা রমেশকে বুঝাইয়া দিল। একশ-বিঘার মাঠটাই এ গ্রামের একমাত্র ভরসা। সমস্ত চাষীদেরই কিছু কিছু জমি তাহাতে আছে। ইহার পূর্ব্বধারে সরকারী প্রকাণ্ড বাঁধ, পশ্চিম ও উত্তর ধারে উচ্চ গ্রাম, শুধু দক্ষিণধারের বাঁধটা ঘোষাল ও মুখুয্যেদের। এই দিক্‌ দিয়া জল-নিকাশ করা যায় বটে, কিন্তু বাঁধের গায়ে একটা জলার মত আছে। বৎসরে দু’শ টাকার মাছ বিক্রী হয় বলিয়া জমিদার বেণীবাবু তাহা কড়া-পাহারায় আট্‌কাইয়া রাখিয়াছেন। চাষীরা আজ সকাল হইতে তাঁহাদের কাছে হত্যা দিয়া পড়িয়া থাকিয়া, এইমাত্র কাঁদিতে কাঁদিতে উঠিয়া এখানে আসিয়াছে। রমেশ আর শুনিবার জন্য অপেক্ষা করিল না, দ্রুতপদে প্রস্থান করিল। এ বাড়ীতে আসিয়া যখন প্রবেশ করিল, তখন সন্ধ্যা হয় হয়। বেণী তাকিয়া ঠেস দিয়া তামাক খাইতেছেন এবং কাছে হালদার-মহাশয় বসিয়া আছেন; বোধ করি, এই কথাই হইতেছিল। রমেশ কিছুমাত্র ভূমিকা না করিয়াই কহিল,—“জলার বাঁধ আট্‌কে রাখ্‌লে ত আর চল্‌বে না, এখনি সেটা কাটিয়ে দিতে হবে।” বেণী হুঁকাটা হালদারের হাতে দিয়া মুখ তুলিয়া বলিলেন, “কোন্‌ বাঁধটা?” রমেশ উত্তেজিত হইয়াই আসিয়াছিল, ক্রুদ্ধভাবে কহিল,—“জলার বাঁধ আর একটা আছে বড়দা? না কাটালে সমস্ত গাঁয়ের ধান হেজে যাবে। জল বা’র ক’রে দেবার হুকুম দিন।” বেণী কহিলেন,—“সেই সঙ্গে দু’তিনশ টাকার মাছ বেরিয়ে যাবে, সে খবরটা রেখেচ কি? এ টাকাটা দেবে কে? চাষারা, না তুমি?” রমেশ রাগ সামলাইয়া বলিল—“চাষারা গরীব; তারা দিতে ত পার্‌বেই না, আর আমিই বা কেন দেব, সে ত বুঝ্‌তে পারিনে।” বেণী জবাব দিলেন,—“তা হ’লে আমরাই বা কেন এত লোকসান কর্‌তে যাব, সে ত আমিও বুঝ্‌তে পারিনে।” হালদারের দিকে চাহিয়া বলিলেন,—“খুড়ো, এম্‌নি ক’রে ভায়া আমার জমীদারী রাখবেন। ওহে রমেশ, হারামজাদারা সকাল থেকে এতক্ষণ এইখানে পড়েই মড়াকান্না কাঁদ্‌ছিল। আমি সব জানি। তোমার সদরে কি দরওয়ান নেই? তার পায়ের নাগরা-জুতো নেই? যাও, ঘরে গিয়ে সেই ব্যবস্থা কর গে; জল আপনি নিকেশ হ’য়ে যাবে।” বলিয়া বেণী, হালদারের সহিত একযোগে হিঃ—হিঃ— করিয়া নিজের রসিকতায় নিজে হাসিতে লাগিলেন। রমেশের আর সহ্য হইতেছিল না, তথাপি সে প্রাণপণে নিজেকে সংবরণ করিয়া বিনীতভাবে বলিল,-“ভেবে দেখুন বড়দা, আমাদের তিন ঘরের দু’শ টাকার লোকসান বাঁচাতে গিয়ে গরীবদের সারা বছরের অন্ন মারা যাবে। যেমন ক’রে হোক্‌, পাঁচসাত হাজার টাকা তাদের ক্ষতি হবেই।” বেণী হাতটা উল্‌টাইয়া বলিলেন,—“হ’ল হ’লই। তাদের পাঁচহাজারই যাক্‌, আর পঞ্চাশ হাজারই যাক্‌, আমার গোটা সদরটা কোপালেও ত দুটো পয়সা বা’র হবে না, ভায়া, যে ও শালাদের জন্যে দু’দশ’ টাকা উড়িয়ে দিতে হবে?”

 রমেশ শেষ চেষ্টা করিয়া বলিল, “এরা সারা বছর খাবে কি?” যেন ভারি হাসির কথা। বেণী একবার এপাশ, একবার ওপাশ হেলিয়া-দুলিয়া মাথা নাড়িয়া, হাসিয়া, থুথু ফেলিয়া, শেষে স্থির হইয়া কহিলেন—“খাবে কি? দেখ্‌বে, ব্যাটারা যে যার জমি বন্ধক রেখে আমাদের কাছেই টাকা ধার কর্‌তে ছুটে আস্‌বে। ভায়া, মাথাটা একটু ঠাণ্ডা ক’রে চল, কর্ত্তারা এম্‌নি করেই বাড়িয়ে গুছিয়ে এই যে এক-আধ টুক্‌রা উচ্ছিষ্ট ফেলে’ রেখে গেছেন, এই আমাদের নেড়েচেড়ে গুছিয়ে গাছিয়ে খেয়েদেয়ে, আবার ছেলেদের জন্যে রেখে যেতে হবে। ওরা খাবে কি? ধারকর্জ্জ ক’রে খাবে। নইলে আর ব্যাটাদের ছোটলোক বলেছে কেন?” ঘৃণায়, লজ্জায়, ক্রোধে, ক্ষোভে রমেশের চোখ-মুখ উত্তপ্ত হইয়া উঠিল, কিন্তু, কন্ঠস্বর শান্ত রাখিয়াই বলিল,—“আপনি যখন কিছুই কর্‌বেন না ব’লে স্থির করেছেন, তখন এখানে দাঁড়িয়ে তর্ক ক’রে লাভ নেই। আমি রমার কাছে চল্‌লুম, তার মত হ’লে আপনার একার অমতে কিছুই হবে না।”

 বেণীর মুখ গম্ভীর হইল; বলিলেন,—“বেশ, গিয়ে দেখ গে, তার আমার মত ভিন্ন নয়। সে সোজা মেয়ে নয় ভায়া,—তাকে ভোলানো সহজ নয়। আর তুমি, ত ছেলেমানুষ, তোমার বাপকেও সে চোখের জলে নাকের জলে ক’রে তবে ছেড়েছিল! কি বল খুড়ো?” খুড়ার মতামতের জন্য রমেশের কৌতূহল ছিল না; বেণীর এই অত্যন্ত অপমানকর প্রশ্নের উত্তর দিবারও তাহার প্রবৃত্তি হইল না; সে নিরুত্তরে বাহির হইয়া গেল।

  প্রাঙ্গণে তুলসীমূলে সন্ধ্যার প্রদীপ দিয়া প্রণাম সাঙ্গ করিয়া রমা মুখ তুলিয়াই বিস্ময়ে অবাক্‌ হইয়া গেল। ঠিক সম্মুখে রমেশ দাঁড়াইয়া। তাহার মাথার আঁচল গলায় জড়ানো। ঠিক যেন সে এইমাত্র রমেশকেই নমস্কার করিয়া মুখ তুলিল। ক্রোধের উত্তেজনায় ও উৎকণ্ঠায় মাসীর সেই প্রথম দিনের নিষেধবাক্য রমেশের স্মরণ ছিল না; তাই সে সোজা ভিতরে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল এবং রমাকে তদবস্থায় দেখিয়া নিঃশব্দে অপেক্ষা করিতেছিল; দুজনের মাসখানেক পরে দেখা।

 রমেশ কহিল,-“তুমি নিশ্চয়ই সমস্ত শুনেচ। জল বা’র ক’রে দেবার জন্যে তোমার মত নিতে এসেচি।” রমার বিস্ময়ের ভাব কাটিয়া গেলে, সে মাথায় আঁচল তুলিয়া দিয়া কহিল,—“সে কেমন ক’রে হবে? তা’ ছাড়া বড়দার মত নেই।” “নেই জানি। তাঁর একলার অমতে কিছুই আসে যায় না।” রমা একটুখানি ভাবিয়া কহিল,—“জল বা’র ক’রে দেওয়া উচিত বটে; কিন্তু, মাছ আট্‌কে রাখার কি বন্দোবস্ত কর্‌বেন?” রমেশ কহিল,—“অত জলে কোন বন্দোবস্ত হওয়া সম্ভব নয়। এ বছর সে টাকাটা আমাদের ক্ষতি স্বীকার কর্‌তেই হবে। না হ’লে গ্রাম মারা যায়।” রমা চুপ করিয়া রহিল। রমেশ কহিল,—“তা হ’লে অনুমতি দিলে?” রমা মৃদুকন্ঠে কহিল,—“না। অত টাকা আমি লোকসান কর্‌তে পার্‌ব না।” রমেশ বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হইয়া গেল। সে কিছুতেই এরূপ উত্তর আশা করে নাই। বরং, কেমন করিয়া তাহার যেন নিশ্চিত ধারণা জন্মাইয়াছিল, তাহার একান্ত অনুরোধ রমা কিছুতেই প্রত্যাখ্যান করিতে পারিবে না। রমা মুখ না তুলিয়াই, বোধ করি, রমেশের অবস্থাটা অনুভব করিল। কহিল,—“তা’ ছাড়া, বিষয় আমার ভাইয়ের, আমি অভিভাভক মাত্র।” রমেশ কহিল, “না, অর্দ্ধেক তোমার।”

 রমা বলিল,—“শুধু নামে। বাবা নিশ্চয় জান্‌তেন, সমস্ত বিষয় যতীনই পাবে; তাই অর্দ্ধেক আমার নামে দিয়ে গেছেন।” তথাপি রমেশ মিনতির কন্ঠে কহিল,—“রমা, এ ক’টা টাকা? তোমাদের অবস্থা এদিকের সকলের চেয়ে ভাল। তোমার কাছে এ ক্ষতি ক্ষতিই নয়, আমি মিনতি জানাচ্চি, রমা, এর জন্যে এত লোকের অন্নকষ্ট ক’রে দিয়ো না। যথার্থ বল্‌চি, তুমি যে এত নিষ্ঠুর হ’তে পার, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।”

 রমা তেমনি মৃদুভাবেই জবাব দিল,—“নিজের ক্ষতি কর্‌তে পারিনে ব’লে যদি নিষ্ঠুর হই, না হয় তাই। ভাল, আপনার যদি এতই দয়া, নিজেরই না হয় ক্ষতিপূরণ ক’রে দিন না।” তাহার মৃদু কন্ঠস্বরে বিদ্রূপ কল্পনা করিয়া রমেশ জ্বলিয়া উঠিল। কহিল,—“রমা, মানুষ খাঁটি কি না, চেনা যায় শুধু টাকার সম্পর্কে। এই জায়গাটায় না কি ফাঁকি চলে না, তাই, এইখানেই মানুষের যথার্থ রূপ প্রকাশ পেয়ে উঠে। তোমারও আজ তাই পেলে, কিন্তু, তোমাকে আমি কখনো এমন ক’রে ভাবিনি। চিরকাল ভেবেচি, তুমি এর চেয়ে অনেক—অনেক উঁচুতে; কিন্তু, তুমি তা’ নও। তোমাকে নিষ্ঠুর বলাও ভুল। তুমি অতি নীচ—অতি ছোটো।” অসহ্য বিস্ময়ে রমা দুই চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া কহিল,—“কি আমি?”

 রমেশ কহিল,—“তুমি অত্যন্ত হীন এবং নীচ। আমি যে কত ব্যাকুল হ’য়ে উঠেছি, সে তুমি টের পেয়েচ ব’লেই আমার কাছে ক্ষতিপূরণের দাবী কর্‌লে! কিন্তু, বড়দাও মুখ ফুটে এ কথা বল্‌তে পারেন নি; পুরুষমানুষ হ’য়ে তাঁর মুখে যা’ বেধেচে, স্ত্রীলোক হ’য়ে তোমার মুখে তা’ বাধেনি! আমি এর চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতিপূরণ কর্‌তে পারি, কিন্তু, একটা কথা আজ তোমাকে ব’লে যাই, রমা, সংসারে যত পাপ আছে, মানুষের দয়ার উপরে জুলুম করাটা, সব চেয়ে বেশি। আজ তুমি তাই ক’রে আমার কাছে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেচ।” রমা বিহ্বল, হতবুদ্ধির ন্যায় ফ্যাল্‌-ফ্যাল্‌ করিয়া চাহিয়া রহিল-—একটা কথাও তাহার মুখ দিয়া বাহির হইল না। রমেশ তেমনি শান্ত, তেমনি দৃঢ়কন্ঠে কহিল,-“আমার দুর্ব্বলতা কোথায়, সে তোমার অগোচর নেই বটে, কিন্তু, সেখানে পাক দিয়ে আর এক বিন্দু রস পাবে না, তা’ ব’লে দিয়ে যাচ্চি। আমি কি কর্‌ব, তাও এইসঙ্গে জানিয়ে দিয়ে যাই। এখনি জোর ক’রে বাঁধ কাটিয়ে দেব—তোমরা পার আট্‌কাবার চেষ্টা কর গে।” বলিয়া রমেশ চলিয়া যায় দেখিয়া রমা ফিরিয়া ডাকিল। আহ্বান শুনিয়া রমেশ নিকটে আসিয়া দাঁড়াইতে রমা কহিল,—“আমার বাড়ীতে দাঁড়িয়ে আমাকে এত অপমান কর্‌লেন, আমি তাঁর একটারও জবাব দিতে চাইনে, কিন্তু, এ কাজ আপনি কিছুতেই কর্‌বার চেষ্টা কর্‌বেন না।” রমেশ প্রশ্ন করিল,—“কেন?” রমা কহিল,—“কারণ, এত অপমানের পরেও আমার আপনার সঙ্গে বিবাদ কর্‌তে ইচ্ছা করে না।” তাহার মুখ যে কিরূপ অস্বাভাবিক পাণ্ডুর হইয়া গিয়াছিল এবং কথা কহিতে ঠোঁট কাঁপিয়া গেল, তাহা সন্ধ্যার অন্ধকারেও রমেশ লক্ষ্য করিতে পারিল। কিন্তু, মনস্তত্ত্ব আলোচনার অবকাশ এবং প্রবৃত্তি তাহার ছিল না;—তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল,—“কলহ-বিবাদের অভিরুচি আমারও নেই বটে, কিন্তু, তোমার সম্ভাবের মূল্যও আর আমার কাছে কিছুমাত্র নেই। যাই হোক্‌, বাগ্‌বিতণ্ডার আবশ্যক নেই, আমি চল্‌লুম।” মাসী উপরে ঠাকুরঘরে আবদ্ধ থাকায় এ সকলের কিছুই জানতে পারেন নাই। নীচে আসিয়া দেখিলেন, রমা দাসীকে সঙ্গে লইয়া বাহির হইতেছে। আশ্চর্য্য হইয়া প্রশ্ন করিলেন,—“এই জল-কাদায় সন্ধ্যার পর কোথায় যাস্‌ রমা?”

 “একবার বড়দা’র ওখানে যাব মাসি!”

 দাসী কহিল,—“পথে আর এতটুকু কাদা পাবার যো নেই দিদিমা! ছোটবাবু এম্‌নি রাস্তা বাঁধিয়ে দিয়েচেন যে, সিঁদূর পড়্‌লে কুড়িয়ে নেওয়া যায়। ভগবান্‌ তাঁকে বাঁচিয়ে রাখুন, গরীব দুঃখী সাপের হাত থেকে রেহাই পেয়ে বেঁচেচে।”

 তখন রাত্রি বোধ করি এগারটা। বেণীর চণ্ডীমন্ডপ হইতে অনেকগুলি লোকের চাপাগলার আওয়াজ আসিতেছিল। আকাশে মেঘ কতকটা কাটিয়া গিয়া ত্রয়োদশীর অস্বচ্ছ জ্যোৎস্না বারান্দার উপরে আসিয়া পড়িয়াছিল। সেইখানে খুঁটিতে ঠেস দিয়া একজন ভীষণাকৃতি প্রৌঢ় মুসলমান চোখ বুজিয়া বসিয়া ছিল। তাহার সমস্ত মুখের উপর কাঁচা রক্ত জমাট বাঁধিয়াগিয়াছে—পরণের বস্ত্র রক্তে রাঙা; কিন্তু, সে চুপ করিয়া আছে। বেণী চাপা-গলায় অনুনয় করিতেছে,—“কথা শোন্‌ আক্‌বর, থানায় চল্‌। সাত বচ্ছর যদি না তাকে দিতে পারি, ত ঘোষালবংশের ছেলে নই আমি।” পিছনে চাহিয়া কহিল,—“রমা, তুমি একবার বল না, চুপ ক’রে রইলে কেন?” কিন্তু, রমা তেমনি কাঠের কত বসিয়া রহিল। আক্‌বর আলি এবার চোখ খুলিয়া সোজা হইয়া বসিয়া বলিল,—“সাবাস! হাঁ,—মায়ের দুধ খায়েছিল বটে ছোটবাবু! লাঠি ধর্‌লে বটে!” বেণী ব্যস্ত এবং ক্রুদ্ধ হইয়া কহিল,—“সেই কথা বল্‌তেই ত বল্‌চি আক্‌বর! কার লাঠিতে তুই জখম হলি? সেই ছোঁড়ার, না তার সেই হিন্দুস্থানী চাকরটার?” আক্‌বরের ওষ্ঠপ্রান্তে ঈষৎ হাসি প্রকাশ পাইল। কহিল,—“সেই বেঁটে হিন্দুস্থানীটার? সে ব্যাটা লাঠির জানে কি বড়বাবু? কি বলিস্‌ রে গহর, তোর পয়লা চোটেই সে বসেছিল না রে?” আক্‌বরের দুই ছেলেই অদূরে জড়সড় হইয়া বসিয়াছিল। তাহারাও অনাহত ছিল না। গহর মাথা নাড়িয়া সায় দিল, কথা কহিল না। আক্‌বর কহিতে লাগিল,—“আমার হাতের চোট পেলে সে ব্যাটা বাঁচত না। গহরের লাঠিতেই ‘বাপ-করে’ বসে পড়্‌ল, বড়বাবু!” রমা উঠিয়া আসিয়া অনতিদূরে দাঁড়াইল। আক্‌বর তাহাদের পিরপুরের প্রজা। সাবেক দিনে লাঠির জোরে অনেক বিষয় হস্তগত করিয়া দিয়াছে। তাই আজসন্ধ্যার পরে ক্রোধে ও অভিমানে ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া রমা তাহাকে ডাকাইয়া আনিয়া, বাঁধ পাহারা দিবার জন্য পাঠাইয়া দিয়াছিল, এবং ভাল করিয়া একবার দেখিতে চাহিয়াছিল, রমেশ শুধু সেই হিন্দুস্থানীটার গায়ের জোরে কেমন করিয়া কি করে! সে নিজেই যে কত বড় লাঠিয়াল, এ কথা রমা স্বপ্নেও কল্পনা করে নাই।

 আক্‌বর রমার মুখের প্রতি চাহিয়া কহিল,—“তখন ছোট বাবু সেই ব্যাটার লাঠি তুলে নিয়ে বাঁধ আটক ক’রে দাঁড়াল দিদিঠাক্‌রাণ, তিন ব্যাপ-ব্যাটায় মোরা হটাতে নার্‌লাম। আঁধারে বাঘের মত তেনার চোখ জ্বল্‌তি লাগ্‌ল। কইলেন, আক্‌বর, বুড়োমানুষ তুই, সরে যা। বাঁধ কেটে না দিলে সারাগাঁয়ের লোক মারা পড়্‌বে, তাই কেট্‌তেই হবে। তোর আপনার গাঁয়েও ত জমিজমা আছে, সম্‌ঝে দেখ রে, সব বরবাদ হ’য়ে গেলে তোর ক্যামন লাগে?” মুই সেলাম ক’রে কইলাম, “আল্লার কিরে ছোটবাবু, তুমি একটিবার পথ ছাড়। তোমার আড়ালে দেঁড়িয়ে ঐ যে ক’ সম্মুন্দি মুয়ে কাপড় জড়ায়ে ঝপাঝপ্‌ কোদাল মার্‌চে, ওদের মুণ্ডু ক’টা ফাঁক ক’রে দিয়ে যাই!” বেণী রাগ সাম্‌লাইতে না পারিয়া কথার মাঝ্‌খানেই চেঁচাইয়া কহিল,—“বেইমান ব্যাটারা—তাকে সেলাম বাজিয়ে এসে এখানে চালাকি মারা হ’চ্চে—”

 তাহারা তিন বাপবেটাই একেবারে একসঙ্গে হাত তুলিয়া উঠিল। আক্‌বর কর্কশকন্ঠে কহিল,—“খবরদার বড়বাবু, বেইমান কোয়ো না; মোরা মোছলমানের ছ্যালে, সব সইতে পারি,—ও পারি না।” কপালে হাত দিয়া খানিকটা রক্ত মুছিয়া ফেলিয়া রমাকে উদ্দেশ করিয়া কহিল,—“অ্যারে বেইমান কয় দিদি? ঘরের মধ্যি বসে বেইমান কইচ, বড়বাবু, চোখে দেখ্‌লে জান্‌তি পার্‌তে ছোটবাবু কি!” বেণী মুখ বিকৃত করিয়া কহিল,—“ছোটবাবু কি! তাই থানায় গিয়ে জানিয়ে আয় না! বল্‌বি, তুই বাঁধ পাহারা দিচ্ছিলি, ছোটবাবু চড়াও হ’য়ে তোরে মেরেচে।” আক্‌বর জিভ্‌ কাটিয়া বলিল,—“তোবা তোবা, দিনকে রাত কর্‌তি বল বড়বাবু?” বেণী কহিল, “না হয় আর কিছু বল্‌বি। আজ গিয়ে জখম দেখিয়ে আয় না—কাল ওয়ারেন্ট বা’র ক’রে একেবারে হাজতে পুর্‌ব। রমা, তুমি ভাল ক’রে আর একবার বুঝিয়ে বল না।—এমন সুবিধে যে আর কখনো পাওয়া যাবে না।” রমা কথা কহিল না, শুধু আক্‌বরের মুখের প্রতি একবার চাহিল। আক্‌বর ঘাড় নাড়িয়া বলিল,—“না দিদি ঠাক্‌রাণ, ও পার্‌ব না।” বেণী ধমক্‌ দিয়া কহিল,—“পার্‌বিনে কেন?” এবার আক্‌বরও চেঁচাইয়া কহিল,—“কি কও বড়বাবু, সরম নেই মোর? পাঁচখানা গাঁয়ের লোক মোরে সর্দ্দার কয় না? দিদিঠাক্‌রাণ, তুমি হুকুম কর্‌লে আসামী হ’য়ে জ্যাল খাট্‌তি পারি, ফৈরিদি হব কোন্‌ কালামুয়ে?” রমা মৃদুকন্ঠে একবারমাত্র কহিল,—“পার্‌বে না আক্‌বর?” আক্‌বর সবেগে মাথা নাড়িয়ে বলিল,—“না দিদিঠাক্‌রাণ, আর সব পারি, সদরে গিয়ে গায়ের চোট দেখাতে না পারি।—ওঠ্‌রে গহর, এইবারে ঘরকে যাই। মোরা নালিশ কর্‌তি পার্‌ব না।” বলিয়া তাহারা উঠিবার উপক্রম করিল।

 বেণী ক্রুদ্ধ নিরাশায় তাহাদের দিকে চাহিয়া দুই চোখে অগ্নিবর্ষণ করিয়া মনে মনে অকথ্য গালিগালাজ করিতে লাগিল এবং রমার একান্ত নিরুদ্যম স্তব্ধতার কোন অর্থ বুঝিতে না পারিয়া তূঁষের আগুণে পুড়িতে লাগিল। সর্ব্বপ্রকার অনুনয় বিনয়, ভর্ৎসনা, ক্রোধ উপেক্ষা করিয়া আক্‌বর আলি ছেলেদের লইয়া যখন বিদায় হইয়া গেল, তখন রমার বুক চিরিয়া একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বাহির হইয়া, অকারণে তাহার দুইচক্ষু অশ্রু প্লাবিত হইয়া উঠিল, এবং আজিকার এতবড় অপমান তাহার সম্পূর্ণ পরাজিত ও নিষ্ফল হওয়া সত্ত্বেও কেন যে, কেবলি মনে হইতে লাগিল, তাহার বুকের উপর হইতে একটা অতি গুরুভার পাষাণ নামিয়া গেল, তাহার কোন হেতুই সে খুঁজিয়া পাইল না। সারারত্রি তাহার ঘুম হইল না, সেই যে তারকেশ্বরে সুমুখে বসিয়া খাওয়াইয়াছিল, নিরস্তর তাহাই চোখের উপর ভাসিয়া বেড়াইতে লাগিল; এবং, যতই মনে হইতে লাগিল, সেই সুন্দর সুকুমার দেহের মধ্যে এত মায়া এবং এত তেজ কি করিয়া এমন স্বছন্দে শান্ত হইয়াছিল, ততই তাহার চোখের জলে সমস্ত মুখ ভাসিয়া যাইতে লাগিল।