পাতা:অতিথি (প্রথম বর্ষ ১৯৩০).pdf/১৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


সন্ধ্যামূত্ৰী —শ্ৰীভবানীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়— ৩২শে জ্যৈষ্ঠ বৃষ্টি আরম্ভ হইল, ছাড়িল ২রা অtষাঢ় । অবিশ্রাস্ত তিন দিন বৃষ্টির পর আজ বিকালে আবার স্বৰ্য্য উঠিল ; বন, জঙ্গল, আকাশ, পৃথিবীর মেঘের অন্ধকূপ হইতে বাহির হইয় হাফ ছাড়িয়া বঁচিল । ছোট শিবা’য় প্রথম বন পড়িয়াছে ; লাল জল কানায় কানায় ছাপাইয়া উঠিয়াছে। গ্রামের বালকবালিকা বান দেখিতে দল বাধিয়া নদীর উত্তর পারে জড়ো হইয়াছে : কেহ হাসে, কেহ মারামারি করে, কেহ নদীর স্রোতে ভাসিয়া যাওয়া কাঠি কুটা ধরিতে ব্যস্ত । নাপিতদের ছেলেট একবোঝা খড়ে লম্বা দড়ি বাধিয় বোঝাটী স্রোতে ছাড়িয়া দিয়া টানাটানি লাগাইয়া দিয়াছে, এমনি কত ! অবেলায় ‘শিবা’র তীরে জ্ঞে ছেলের হাট বসিয়াছে ; তাহাদের কলরবে নদীর ক্ষুদ্ধ কল্লেীল কখন তলাইয়া গিয়াছে ! বেলা বেশী নাই। সূৰ্য্য যখন শর-বনের আড়ালে নেহাতই ঝুলিয়া পড়িল, ছেলের দল বাড়ী ফিরিতে ব্যস্ত হইল। সবাই ফিরিল,—রহিল শুধু রতু আর বীণা ; বলিল “তোরা যা, আমরা খানিক পরে যাব ; এখনো ঢের বেলা ।” আরো ডান ধারে সরিয়া গিয় তাহারা জাম গাছের তলে বসিয়া বান দেখিতে লাগিল। কত গাছ, কত লতাপাতা ভাসিয়া আসিয় তাহাদের সম্মুখের ঘূর্ণিতে পড়িয়া, ডুবিয়া, উঠিয়া আবার ভাসিয়া যায় ; কোনটাই তাহাদের দৃষ্টি এড়ায় না। কাঠ ভাসিয়া আসে, রতু বীণার দিকে চাহিয়া বলে, “দেখ বীণা, দেখেচিস ?” ঘূর্ণিতে কাঠ ডবিয়া যায়, বীণা বলে, “যাঃ,—আর উঠবে না।” আবার কাঠ ভাসিয় উঠে ; দু’জনে হাততালি দিয়া হাসিয়া বলে, “দেথলি, এবার কারে কথাই সত্যি হলে ना।। 1* ডালে জড়াইয়া সাপ ভালিয়া আসে ; দু’জনে হাত ধরিয়া দূরে সরিয়া যায়,—আবার আদিয়া বসে। দূরে নদীর ধার ধসিয়া ছপাৎ করিয়া জলে পড়ে, বালক-বালিকা চকিত হইয়া উঠে । তাহদের বান দেখার বিরাম নাই। লাল, সাদা তাক-বাক ঢেউ সন্ধ্যা-সুৰ্য্যের শাস্ত কিরণে ঝলমল করিয়া একটার পিছনে একটা ছুটিয়াছে ; তাহার অবাক হইয়া দেখিয়ই যায় শুধু । উভয়ে একসঙ্গে উদ্ধে ং কায়,—ছেড়া খোড়া মেঘ একটার পিছনে একটা । রতু বীণার চিবুকে হাত দিয়া বলে, “দেখ এই মেঘট ঐ মেঘটাকে কেমন তাড় করেছে !” বীণা হাসিয়া বলে, “আর ধ’রলে ব’লে।” র তৃ বীণার কাণের কাছে মুখ লইয়া বলে, “ঠিক্‌ তেমনি,—সেদিন যেমন তোকে আমি,—মনে পড়ে ?” বীণ রাগ করিয়া রতুকে ঠেলিয়া দিয়া বলে, “ধাতোর খালি ঐ কথা !” শরবনের আড়ালে আর সূৰ্য্য দেখা যায় না । রক্তমেঘ পূৰ্ব্বদিকের দিক্রেখ পর্য্যন্ত ছড়াইয়। গিয়াছে। রক্ত-সন্ধ্যার আভায় নদীর লাল জল আরো লাল হইয়া উঠিয়াছে ; সমস্ত নদীর ধারটা যেন কে গেরুয়া রঙে ছোপাইয়া দিয়াছে । বীণা ডান হাতখানি রতুর হাতের কাছে চিত করিয়া বলে, “কার হাত বেশী লাল বল দিকি ?” সমস্ত রক্ত আকাশখানি বালক-বলিকার কর-তলে নামিয়া আসিয়াছে। রতু হাসিয়া বলে, “তোরই, তুই যে আমার চেয়ে সুন্দর।” >२