পাতা:অরক্ষণীয়া - শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়.pdf/৭৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অরক্ষণীয়া Ved করিয়া ধিক্কার দিয়া গেল-কেহই ক্ষমা করিল না। কিন্তু অন্তরে বসিয়া যিনি সর্বকালে সর্বলোকের বিচারক, তিনি হয়ত দুৰ্ভাগা বালিকার এই অপুরাধের ভার আপনার শ্ৰীহস্তেই গ্ৰহণ করিলেন। জ্ঞানদা উঠিয়া দাড়াইল । কখনো সে পরের সমক্ষে কঁদে নাই -আজ কিন্তু অতুলের সম্মুখে তাহার চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল । অথচ, একটা কথারও কৈফিয়ত দিল না, কাহারও পানে চাহিয়া দেখিল না-নীরবে চোখ মুছিতে মুছিতে চলিয়া গেল। কলিকাতা যাইবার আর গাড়ি ছিল না বলিয়া অতুল সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরিয়া গেল। পথে সব কথা ছাপাইয়া ছোটমাসির সেই শেষ কথাটাই বারংবার মনে পড়িতে লাগিল। সেদিন বাপের বাড়ি যাইবার সময় অতুলকে নিভৃতে ডাকিয়া বলিয়াছিলেন, অতুল, হীরা ফেলে যে কাচ আঁচলে বঁধে তার মনস্তাপের আর অবধি থাকে না বাবা । সেদিন কথাটা ভাল বুঝিতে পারে নাই ; কিন্তু আজ তাহার যেন নিঃসংশয়ে মনে হইল, কথাটা তাহাকেই লক্ষ্য করিয়া বলা হইয়াছিল। লজ্জাহীনা বলিয়া যাহাকে আজ সবাই লাঞ্ছনা করিয়া বিদায় দিল, তাহারই লজ্জাশরমের সীমারেখাটা যে কোনখানে, আজ সে কথাও তাহার স্মরণ হইল। তখনো ভোর হয় নাই, অনাথ ডাকিতে আসিল-মেজবেীকে দাহ করিতে হইবে । চলুন যাই, বলিয়া অতুল বাহির হইয়া পড়িল। গিয়া দেখিল, দেড় বৎসর পূর্বে তুলসীমূলে পিতার পা-দুটি কোলে করিয়া যেমন বসিয়াছিল, আজিও তেমনি নিঃশব্দে মায়ের পা-দুটি কোলে লইয়া জ্ঞানদা বসিয়া আছে। শুধু একটিবার ছাড়া জীবনে কেহ কখনো তাহাকে চঞ্চল হইতে দেখে নাই--সেই যখন সে অতুলেরই পায়ের উপর পড়িয়া মাথা খুড়িয়াছিল। সুতরাং, তাহার এই নিবিড় নীরবতায় কেহ কিছুই মনে করিল না। সেদিকে কাহারো দৃষ্টিই ছিল না, সৎকারের উদ্যোগআয়োজনেই পাড়ার লোক ব্যস্ত ।