পাতা:আত্মকথা - সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২০৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


প্ৰকৃতি সংশোধন করিয়া লয়েন-যাহা সুন্দর, তাহাই বাছিয়া বাছিয়া লয়েন । যাহা অনুন্দর তাহা বহিষ্কৃত করিয়া কাব্যের প্রণয়ন করেন । কেবল তাহাই নহে । সুন্দরে ও যে সৌন্দৰ্য্য নাই,-যে রস, যে রূপ, যে স্পর্শ, যে গন্ধ, কেহ কখন ইন্দ্ৰিয়গোচর করে নাই, “যে আলোক জলে স্থলে কোথাও নাই” সেই আত্ম-চিত্তপ্ৰসূত উজ্জ্বল হৈমকিরণে সকলকে পরিপুত করিয়া, সুন্দরকে আরও সুন্দর করেন— সৌন্দর্ঘ্যের অতি-প্ৰাকৃত চরমোৎকর্ষের সৃষ্টি করেন । অতি-প্ৰাকৃত কিন্তু অপ্রকৃত নহে । * * * আমরা দুইজন বাঙ্গালি কবির কাব্যকে উদাহরণ স্বরূপ প্ৰয়োগ করিয়া এই কথাটি সুস্পষ্ট করিতে চাহি । যে কাব্যের উদ্দেশ্য শোধন, হেমবাবু প্ৰণীত “বৃত্ৰসংহার” তাহার উৎকৃষ্ট উদাহরণ । তঁহার কাব্যে প্ৰকৃতি পরিশুদ্ধ হইয়া, মনোহর নবীন পরিচ্ছদ পরিধান করিয়া, লোকের মনোমোহন করিতেছেন । মানব স্বভাব সংশুদ্ধ হইয়া দৈব এবং আসুদ্রিক প্ৰকৃতিতে পরিণত হইয়াছে ; কর্কশ পৃথিবী পরিশুদ্ধ হইয়া স্বর্গে ও নৈমিষারণে পরিণত হইয়াছে। যে জ্যোতিঃ দেবগণের শিরোমণ্ডলে, তাহা জগতে নাই-কবির হৃদয়ে আছে । যে জ্বালা শচীর কটাক্ষে, তাহা জগতে নাই-কবির হৃদয়ে আছে । সংসারকে শোধন করিয়া, কবি আপনার কবিত্বের পরিচয় দিয়াছেন । দ্বিতীয় শ্রেণীর কাব্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ বাবু গঙ্গাচরণ সরকার প্রণীত ঋতুবর্ণন । ইহাতে প্ৰকৃতির সংশোধন উদ্দিষ্ট নহে-প্ৰকৃত বর্ণনা, স্বরূপ চিত্র, বাহা জগতের আলোক চিত্র, ইহার উদ্দেশ্য । উভয়েই কৃতকাৰ্য্য, উভয়েই সুকবি । কিন্তু প্ৰভেদও। অতি স্পষ্ট ; একটি উদাহরণে তাহা বুঝাইতে চেষ্টা করিব। উভয়েরই কাবো বিদ্যুৎ আছে-গঙ্গাচরণবাবুর কাবো বিদ্যুৎ, উৎকৃষ্ট রূপে আত্মকাৰ্য্য সম্পন্ন করে, যথা— “ঘনতম ঘোর ঘটা ক্ৰমে ঘোরতর } চতুর্দিকে অন্ধকার, অতি ভয়ঙ্কর । চািপলা চমকি প্ৰভা করিছে বাহির । ভীষণ নিনাদে ঘন নির্ঘোষে গভীর ” চাবি ছত্রে এই চিত্রটি সম্পূর্ণ, ইহাতে অসম্পূর্ণতা কিছুই নাই। দোষ ধরিবার কথা কিছুই নাই। যাহা প্ৰকৃত, তাহার কিছুরই অভাব নাই ; তাহার অতিরিক্ত একটি কপৰ্দকও নাই। পরে হেমবাবুর বিদ্যুৎ দেখ,- “কিম্বা গিবিশৃঙ্গ বুজি, মধ্যে যথা তেজে সাজি, ক্ষণ-প্ৰভা খেলে রঙ্গে করি ঘোর ঘট । খেলে রঙ্গে ভীম ভজি, শিখর শিখব লক্তিব, শৈলে শৈলে আঘাতিয়া দুল জীক্ষ ছটা ।