পাতা:আশুতোষ স্মৃতিকথা -দীনেশচন্দ্র সেন.pdf/১৬৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


RSVØR আশুতোষ-স্মৃতিকথা সামাজিক আবেষ্টনীর মধ্যে মানুষ অনেক সময় স্বাভাবিক গুণগুলি ভুলিয়া যায়। সর্বভূতে দয়ার কথা আমরা শুনিয়াছিলাম, কিন্তু সংস্কারবশতঃ সেই দয়ার গণ্ডি আমরা ক্ৰমশঃ সঙ্কুচিত করিয়া আসিতেছি। কুকুর, বিড়াল অবাধে মনুষ্য-গৃহে আনাগোনা করিতেছে, কিন্তু কোন হীনবর্ণের লোকের সেই আঙ্গিনায় প্রবেশ নিষিদ্ধ,—আসন্নমূত্যুি কোন হীনবর্ণের লোকেরও সেবা-শুশ্রুষা করিতে উচ্চবর্ণের প্রতিবেশী স্বীকৃত হন না। কিন্তু মহাপুরুষগণ এই আবেষ্টনীর মধ্যে থাকিয়াও সম্পূর্ণরূপে সেই আবেষ্টনীর প্রভাবমুক্ত। যেখানে বৈধব্যের কঠোর নিয়মে অষ্টমবর্ষীয়া বালিকা স্বীয় ভবিষ্যৎ দুর্ভাগ্যের ধারণা করিতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম,-বিপৰ্য্যন্ত ও ক্লিষ্ট—অথচ সে সম্বন্ধে সমাজের প্রবীণদের মন একেবারে প্রাচীন সংস্কারের পাষাণে গঠিত, সেখানে এই বীর দাডাইয়া উচ্চকণ্ঠে বলিলেন-এ কি ঘোর অত্যাচার ! তোমরা চাব্য-চোষ্য-লেহ-পেয়, পার্থিব যত সুখ ভোগ করিবে, একবারের জায়গায় পাঁচবার বিবাহ করিবে, এক স্ত্রী বর্তমানে আরও বহু স্ত্রীর কপালে সিদুর আঁকিয় তাহদেরও তোমাদের জীবনে ভোগাকেই বড় করিয়া দেখাইবে, কেবল নিবৃত্তি-মার্গ দেখাইবে ঐ উপবাস-ক্লিষ্ট, তৃষ্ণাৰ্ত্ত, আশন-বসন-বঞ্চিত দুৰ্ভাগ্য শিশুটিকে ? ভগবতী দেবী বিদ্যাসাগরকে গর্ভে ধারণা করিয়াছিলেন,-তাহারই চরিত্রে এই দয়া-ধৰ্ম্মের সংস্কার-মুক্ত সত্যের,—এই অমৃতফলের বীজ ছিল। বিদ্যাসাগরকে তিনি যখন ইহার ইঙ্গিত দিলেন, তখন তাহার, হৃদয়ে করুণার বন্যা বহিয়া গেল । অগ্নিশিখার উপাদান তাহার চরিত্রের মধ্যেই ছিল, এবার অনুকুল বায়ুতে তাহা জলিয়া উঠিল। সংসারের হিসাব-নিকাশ লইয়া বিদ্যাসাগর কখনই খাতাপত্ৰ ঘাটিতে বসিতেন না । তিনি সহস্ৰ সহস্র টাকা উপাৰ্জন করিয়াছেন, কিন্তু যে কুবের-দেবতা তাহাকে এই ঐশ্বৰ্য্য দিয়াছেন, তঁাহাকে চিরদিনই তিনি ভ্ৰকুটি দেখাইয়া আসিয়াছেন ; যখন তিনি কোন সত্য দৃঢ়ভাবে হৃদয়ঙ্গম করিয়াছেন, তখন তিনি সেই সত্য-প্রচারের জন্য তঁহার সমস্ত ধন-দৌলত ও পদ-গৰ্ব্ব বিসর্জন দিতে এতটুকুও দ্বিধা বোধ করেন নাই । কে বলিয়াছিল তাহাকে এই বিধবা-বিবাহ-প্রচারের চেষ্টা করিতে ? ইহাতে ব্ৰাহ্মণসমাজে তাহার প্রতিষ্ঠা নষ্ট হইয়াছিল, জলের মত অজস্র অর্থব্যয় হইয়াছিল। তথাপি অনাহুতভাবে, এই সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়া কে তঁাহাকে সর্বস্বাস্ত হইতে উপদেশ ও প্রেরণা দিয়াছিল ? ইহার এক উত্তর সত্যের তাড়না । মহাজনগণের হৃদয়ে যখন সত্যেপলব্ধি বদ্ধমূল হয়, তখন উহা শুধু প্রেরণা দেয় না,-দস্তুরমত তাড়না করে। সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও অর্থ ধ্বংস করিয়াই তিনি ক্ষান্ত হন নাই, তাহার স্বীয় পুত্রের বিধবা-বিবাহ সম্পাদনা করিয়া তাহারও সামাজিক জীবন বিড়ম্বিত করিয়াছিলেন। সত্য হইতে বড় কিছুই নাই,-তিনি এই কথা সিংহ-বিক্রমে ঘোষণা করিলেন।