প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (চতুর্থ খণ্ড).pdf/১৫৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


১২8 গল্পগুচ্ছ এই নরেন্দ্রই কর্ণার সঙ্গী। কর্ণা নরেন্দ্রের সহিত সেই পকেরিণীর পাড়ে গিয়া কাদার ঘর নিমাণ করিত, ফলের মালা গাঁথিত এবং পিতার কাছে যে-সকল গল্প শুনিয়াছিল তাহাই নরেন্দ্রকে শনাইত, কালপনিক বালিকার যত কল্পনা সব নরেন্দ্রের উপর ন্যস্ত হইল। কর্ণা নরেন্দ্রকে এত ভালোবাসিত যে কিছুক্ষণ তাহাকে না দেখিতে পাইলে ভালো থাকিত না, নরেন্দ্র পাঠশালে গেলে সে সেই পাখিটি হাতে করিয়া গহ্বারে দাঁড়াইয়া অপেক্ষা করিত, দর হইতে নরেন্দ্রকে দেখিলে তাড়াতাড়ি তাহার হাত ধরিয়া সেই পাকরিণীর পাড়ে সেই নারিকেল গাছের তলায় আসিত, ও তাহার কল্পনারচিত কত কী অস্তুত কথা শনাইত। নরেন্দ্র রুমে কিছু বড়ো হইলে কলিকাতায় ইংরাজি বিদ্যালয়ে প্রেরিত হইল। কলিকাতার বাতাস লাগিয়া পল্লীগ্রামের বালকের কতকগুলি উৎকট রোগ জন্মিল। শনিয়াছি স্কুলের বেতন ও পুস্তকাদি ক্লয় করিবার ব্যয় যাহাকিছ পাইত তাহাতে নরেন্দ্রের তামাকের খরচটা বেশ চলিত। প্রতি শনিবারে দেশে যাইবার নিয়ম আছে। কিন্তু নরেন্দ্র তাহার সঙ্গীদের মখে শুনিল যে, শনিবারে যদি কলিকাতা ছাড়িয়া যাওয়া হয় তবে গলায় দড়ি দিয়া মরাটাই বা কী মন্দ ! বালক বাটীতে গিয়া অনপেকে বাঝাইয়া দিল যে, সপ্তাহের মধ্যে দই দিন বাড়িতে থাকিলে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারিবে না। অনুপ নরেন্দ্রের বিদ্যাভাসে অনুরাগ দেখিয়া মনে-মনে ঠিক দিয়া রাখিলেন যে, বড়ো হইলে সে ডিপটি মাজিস্টর হইবে। তখন দই-এক মাস অন্তর নরেন্দ্র বাড়িতে আসিত। কিন্তু এ আর সে নরেন্দ্র নহে। পানের পিকে ওঠাধর পলাবিত করিয়া, মাথায় চাদর বাধিয়া, দই পাশেবা দই সঙ্গীর গলা জড়াইয়া ধরিয়া, কনস্টেবলদের ভীতিজনক যে নরেন্দ্র প্রদোষে কলিকাতার গলিতে গলিতে মারামারি খ:জিয়া বেড়াইত, গাড়িতে ভদ্রলোক দেখিলে কদলীর অনুকরণে বদ্ধ অঙ্গষ্ঠে প্রদর্শন করিত, নিরীহ পান্থ বেচারিদিগের দেহে ধালি নিক্ষেপ করিয়া নিদোষীর মতো আকাশের দিকে তাকাইয়া থাকিত, এ সে নরেন্দ্র নহে— অতি নিরীহ, আসিয়াই অনপকে ঢীপ করিয়া প্রণাম করে। কোনো কথা জিজ্ঞাসা করিলে মদ বরে, নতমখে, অতি দীনভাবে উত্তর দেয় এবং যে পথে অনপে সবাদা যাতায়াত করেন সেইখানে একটি ওয়েবস্টার ডিকসনারী বা তৎসদশ অন্য কোনো দীঘকায় পুস্তক খালিয়া বসিয়া থাকে। নরেন্দ্র বহুদিনের পর বাড়ি আসিলে কর্ণা আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া উঠিত। নরেন্দ্রকে ডাকিয়া লইয়া কত কী গল্প শনাইত। বালিকা গল্প শনাইতে যত উৎসক শনিতে তত নহে। কাহারও কাছে কোনো নতন কথা শুনিলেই যতক্ষণ না নরেন্দ্রকে শনাইতে পাইত, ততক্ষণ উহা তাহার নিকট বোঝা-স্বরপ হইয়া থাকিত। কিন্তু কর্ণার এইরুপ ছেলেমানমষিতে নরেন্দ্রের বড়োই হাসি পাইত, কখনো কখনো সে বিরক্ত হইয়া পলাইবার উদ্যোগ করিত। নরেন্দ্র সঙ্গীদের নিকটে কর্ণার কথাপ্রসঙ্গে নানাবিধ উপহাস করিত। 喝 নরেন্দ্র বাড়ি আসিলে পণ্ডিতমহাশয় সবাপেক্ষা অধিক ব্যগ্র হইয়া পড়েন। এমনকি, সেদিন সন্ধ্যার সময়েও গহ হইতে নিগত হইয়া বাঁশঝাড়ময় পল্লীপথ দিয়া রাম-নাম জপিতে জপিতে নরেন্দ্রের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইতেন, নরেন্দ্রকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া নানাবিধ কুশলসংবাদ লইতেন। এই পণ্ডিতের কথা শুনিয়া