প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৭১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৫৮১
মাস্টারমশায়

 হরলাল কোনাে উত্তর না দিয়া মুখ নিচু করিয়া বসিয়া রহিল।
 সাহেব। তােমার জ্ঞাতসারে এ টাকা কেহ লইয়াছে?
 হরলাল কহিল, “আমার প্রাণ থাকিতে আমার জ্ঞাতসারে এ টাকা কেহ লইতে পারিত না।”
 বড়ােসাহেব কহিলেন, “দেখাে হরলাল, আমি তােমাকে বিশ্বাস করিয়া কোনো জামিন না লইয়া এই দায়িত্বের কাজ দিয়াছিলাম। আপিসের সকলেই বিরােধী ছিল। তিন হাজার টাকা কিছুই বেশি নয়। কিন্তু তুমি আমাকে বড়াে লজ্জাতেই ফেলিবে। আজ সমস্ত দিন তােমাকে সময় দিলাম—যেমন করিয়া পার টাকা সংগ্রহ করিয়া আনাে—তাহা হইলে এ লইয়া কোনাে কথা তুলিব না, তুমি যেমন কাজ করিতেছ তেমনি করিবে।”
 এই বলিয়া সাহেব উঠিয়া গেলেন। তখন বেলা এগারােটা হইয়া গেছে। হরলাল যখন মাথা নিচু করিয়া বাহির হইয়া গেল তখন আপিসের বাবুরা অত্যন্ত খুশি হইয়া হরলালের পতন লইয়া আলােচনা করিতে লাগিল।
 হরলাল এক দিন সময় পাইল। আরও একটা দীর্ঘ দিন নৈরাশ্যের শেষতলের পঙ্ক আলােড়ন করিয়া তুলিবার মেয়াদ বাড়িল।
 উপায় কী, উপায় কী, উপায় কী—এই ভাবিতে ভাবিতে সেই রৌদ্রে হরলাল রাস্তায় বেড়াইতে লাগিল। শেষে উপায় আছে কি না সে ভাবনা বন্ধ হইয়া গেল, কিন্তু বিনা কারণে পথে ঘুরিয়া বেড়ানাে থামিল না। যে কলিকাতা হাজার হাজার লােকের আশ্রয়স্থান তাহাই এক মুহূর্তে হরলালের পক্ষে একটা প্রকাণ্ড ফাঁসকলের মতাে হইয়া উঠিল। ইহার কোনাে দিকে বাহির হইবার কোনাে পথ নাই। সমস্ত জনসমাজ এই অতিক্ষুদ্র হরলালকে চারি দিকে আটক করিয়া দাঁড়াইয়াছে। কেহ তাহাকে জানেও না, এবং তাহার প্রতি কাহারও মনে কোনাে বিদ্বেষও নাই, কিন্তু প্রত্যেক লােকেই তাহার শত্রু। অথচ, রাস্তার লােক তাহার গা ঘেঁষিয়া তাহার পাশ দিয়া চলিয়াছে; আপিসের বাবুরা বাহিরে আসিয়া ঠোঙায় করিয়া জল খাইতেছেন, তাহার দিকে কেহ তাকাইতেছেন না; ময়দানের ধারে অলস পথিক মাথার নীচে হাত রাখিয়া একটা পায়ের উপর আর-একটা পা তুলিয়া গাছের তলায় পড়িয়া আছে; স্যাকরাগাড়ি ভরতি করিয়া হিন্দুস্থানী মেয়েরা কালীঘাটে চলিয়াছে; একজন চাপরাসি একখানা চিঠি লইয়া হরলালের সম্মুখে ধরিয়া কহিল, “বাবু, ঠিকানা পড়িয়া দাও”— যেন তাহার সঙ্গে অন্য পথিকের কোনাে প্রভেদ নাই; সেও ঠিকানা পড়িয়া তাহাকে বুঝাইয়া দিল। ক্রমে আপিস বন্ধ হইবার সময় আসিল। বাড়িমুখাে গাড়িগুলাে আপিস-মহলের নানা রাস্তা দিয়া ছুটিয়া বাহির হইতে লাগিল। আপিসের বাবুরা ট্রাম ভরতি করিয়া থিয়েটারের বিজ্ঞাপন পড়িতে পড়িতে বাসায় ফিরিয়া চলিল। আজ হইতে হরলালের আপিস নাই, আপিসের ছুটি নাই, বাসায় ফিরিয়া যাইবার জন্য ট্রাম ধরিবার কোনাে তাড়া নাই। শহরের সমস্ত কাজকর্ম, বাড়িঘর, গাড়িজুড়ি, আনা-গােনা হরলালের কাছে কখনাে-বা অত্যন্ত উৎকট সত্যের মতাে দাঁত মেলিয়া উঠিতেছে, কখনাে-বা একেবারে বস্তুহীন স্বপ্নের মতাে ছায়া হইয়া আসিতেছে। আহার নাই, বিশ্রাম নাই, আশ্রয় নাই, কেমন করিয়া যে হরলালের দিন কাটিয়া গেল তাহা সে জানিতেও পারিল না। রাস্তায় রাস্তায় গ্যাসের আলাে জ্বলিল—যেন একটা সতর্ক
 ৩৮