প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৭৮

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
২৮৯
দিদি

 নীলমণি পুস্তক শব্দের অর্থ না বুঝিয়া নিস্তব্ধভাবে ম্যাজিস্ট্রেটের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।

 ম্যাজিস্ট্রেট-সাহেবের সহিত এই পরিচয়ের কথা নীলমণি অত্যন্ত উৎসাহের সহিত তাহার দিদির নিকট বর্ণনা করিল।

 মধ্যাহ্নে চাপকান প্যাণ্ট্‌লুন পাগড়ি পরিয়া জয়গােপাল ম্যাজিস্ট্রেটকে সেলাম করিতে গিয়াছে। অর্থী প্রত্যর্থী চাপরাসি কনস্টেবলে চারি দিক লােকারণ্য। সাহেব গরমের ভয়ে তাঁবুর বাহিরে খােলা ছায়ায় ক্যাম্প্ টেবিল পাতিয়া বসিয়াছেন এবং জয়গােপালকে চৌকিতে বসাইয়া তাহাকে স্থানীয় অবস্থা জিজ্ঞাসা করিতেছিলেন। জয়গােপাল তাহার গ্রামবাসী সর্বসাধারণের সমক্ষে এই গৌরবের আসন অধিকার করিয়া মনে মনে স্ফীত হইতেছিল এবং মনে করিতেছিল,‘এই সময়ে চক্রবতীরা এবং নন্দীরা কেহ আসিয়া দেখিয়া যায় তাে বেশ হয়।’

 এমন সময় নীলমণিকে সঙ্গে করিয়া অবগুণ্ঠনাবৃত একটি স্ত্রীলােক একেবারে ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। কহিল, “সাহেব, তােমার হাতে আমার এই অনাথ ভাইটিকে সমর্পণ করিলাম, তুমি ইহাকে রক্ষা করাে।”

 সাহেব তাঁহার সেই পূর্ব পরিচিত বৃহৎমস্তক গম্ভীরপ্রকৃতি বালকটিকে দেখিয়া এবং স্ত্রীলােকটিকে ভদ্রস্ত্রীলােক বলিয়া অনুমান করিয়া তৎক্ষণাৎ উঠিয়া দাঁড়াইলেন; কহিলেন, “আপনি তাঁবুতে প্রবেশ করুন।”

 স্ত্রীলােকটি কহিল, “আমার যাহা বলিবার আছে আমি এইখানেই বলিব।” জয়গােপাল বিবর্ণমুখে ছট্‌ফট্ করিতে লাগিল। কৌতূহলী গ্রামের লােকেরা পরম কৌতুক অনুভব করিয়া চারি দিকে ঘেঁষিয়া আসিবার উপক্রম করিল। সাহেব বেত উঁচাইবা মাত্র সকলে দৌড় দিল।

 তখন শশী তাহার ভ্রাতার হাত ধরিয়া সেই পিতৃমাতৃহীন বালকের সমস্ত ইতিহাস আদ্যোপান্ত বলিয়া গেল। জয়গােপাল মধ্যে মধ্যে বাধা দিবার উপক্রম করাতে ম্যাজিস্ট্রেট রক্তবর্ণমুখে গর্জন করিয়া বলিয়া উঠিলেন “চুপ রও” এবং বেত্রাগ্র দ্বারা তাহাকে চৌকি ছাড়িয়া সম্মুখে দাঁড়াইতে নির্দেশ করিয়া দিলেন।

 জয়গােপাল মনে মনে শশীর প্রতি গর্জন করিতে করিতে চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। নীলমণি দিদির অত্যন্ত কাছে ঘেঁষিয়া অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া শুনিতে লাগিল।

 শশীর কথা শেষ হইলে ম্যাজিস্ট্রেট জয়গােপালকে গুটিকতক প্রশ্ন করিলেন এবং তাহার উত্তর শুনিয়া অনেক ক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া শশীকে সম্বােধনপূর্বক কহিলেন, “বাছা, এ মকর্দমা যদিও আমার কাছে উঠিতে পারে না তথাপি তুমি নিশ্চিত থাকো, এ সম্বন্ধে যাহা কর্তব্য আমি করিব। তুমি তােমার ভাইটিকে লইয়া নির্ভয়ে বাড়ি ফিরিয়া যাইতে পার।”

 শশী কহিল, “সাহেব, যত দিন নিজের বাড়ি ও না ফিরিয়া পায় তত দিন আমার ভাইকে বাড়ি লইয়া যাইতে সাহস করি না। এখন নীলমণিকে তুমি নিজের কাছে না রাখিলে ইহাকে কেহ রক্ষা করিতে পারিবে না।”

 সাহেব কহিলেন, “তুমি কোথায় যাইবে।”

 শশী কহিল, “আমি আমার স্বামীর ঘরে ফিরিয়া যাইব, আমার কোন ভাবনা নাই।”