প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (প্রথম খণ্ড).djvu/৪৫

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
৪১
রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা

 উইলের বৃত্তান্ত শুনিয়া নবদ্বীপের মা ছুটিয়া আসিয়া বিষম গােল বাধাইয়া দিল; বলিল, “মরণকালে বুদ্ধিনাশ হয়। এমন সােনার-চাঁদ ভাইপাে থাকিতে—”

 রামকানাই যদিও স্ত্রীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতেন— এত অধিক যে তাহাকে ভাষান্তরে ভয় বলা যাইতে পারে— কিন্তু তিনি থাকিতে পারিলেন না, ছুটিয়া আসিয়া বলিলেন, “মেজোবউ, তােমার তো বুদ্ধিনাশের সময় হয় নাই, তবে তােমার এমন ব্যবহার কেন। দাদা গেলেন, এখন আমি তাে রহিয়া গেলাম, তােমার যা-কিছু বক্তব্য আছে অবসরমতো আমাকে বলিয়াে, এখন ঠিক সময় নয়।”

 নবদ্বীপ সংবাদ পাইয়া যখন আসিল তখন তাহার জ্যাঠামহাশয়ের কাল হইয়াছে। নবদ্বীপ মৃত ব্যক্তিকে শাসাইয়া কহিল, “দেখিব মুখাগ্নি কে করে— এবং শ্রাদ্ধশান্তি যদি করি তাে আমার নাম নবদ্বীপ নয়।” গুরুচরণ লােকটা কিছুই মানিত না। সে ডফ-সাহেবের ছাত্র ছিল। শাস্ত্রমতে যেটা সর্বাপেক্ষা অখাদ্য সেইটাতে তার বিশেষ পরিতৃপ্তি ছিল। লােকে যদি তাহাকে ক্রিশ্চান বলিত, সে জিভ কাটিয়া বলিত, “রাম, আমি যদি ক্রিশ্চান হই তাে গােমাংস খাই।” জীবিত অবস্থায় যাহার এই দশা, সদ্যমৃত অবস্থায় সে-যে পিণ্ডনাশ-আশঙ্কায় কিছুমাত্র বিচলিত হইবে, এমন সম্ভাবনা নাই। কিন্তু উপস্থিতমতাে ইহা ছাড়া আর-কোনো প্রতিশােধের পথ ছিল না। নবদ্বীপ একটা সান্ত্বনা পাইল যে, লােকটা পরকালে গিয়া মরিয়া থাকিবে। যতদিন ইহলােকে থাকা যায় জ্যাঠামহাশয়ের বিষয় না পাইলেও কোনােক্রমে পেট চলিয়া যায়, কিন্তু জ্যাঠামহাশয় যে লােকে গেলেন সেখানে ভিক্ষা করিয়া পিণ্ড মেলে না। বাঁচিয়া থাকিবার অনেক সুবিধা আছে।

 রামকানাই বরদাসুন্দরীর নিকট গিয়া বলিলেন, “বউঠাকুরানী, দাদা তােমাকেই সমস্ত বিষয় দিয়া গিয়াছেন। এই তাঁহার উইল। লােহার সিন্দুকে যত্নপূর্বক রাখিয়া দিয়াে।”

 বিধবা তখন মুখে-মুখে দীর্ঘ পদ রচনা করিয়া উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করিতেছিলেন, দুইচারিজন দাসীও তাঁহার সহিত স্বর মিলাইয়া মধ্যে মধ্যে দুইচারিটা নূতন শব্দ যােজনাপূর্বক শােকসংগীতে সমস্ত পল্লীর নিদ্রা দূর