পাতা:চোখের বালি-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১১২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

১০৮

চোখের বালি

 হঠাৎ চোখে আলো লাগাতে মুখের সামনে একটু হাতের আড়াল করিয়া নতনেত্রে বিনোদিনী বলিল, “কী জানি তাই। তোমার সঙ্গে কথায় কে পারিবে। এখন ঘাই, কাজ আছে।”

 মহেন্দ্র হঠাৎ তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, “বন্ধন যখন স্বীকার করিয়াছ, তখন যাইবে কোথায়।

 বিনোদিনী কহিল, “ছি ছি ছাভো। যাহার পালাইবা রাস্তা নাই, তাহাকে আবার আঁধিবার চেষ্টা কেন।”

 বিনোদিনী জোর করিয়া হাত ছাড়াইয়া লইয়া প্রস্থান করিল।

 মহেন্দ্র সেই বিছানায় স্বগন্ধ বালিশের উপর পড়িয়া রহিল, তাহার বুকের মধ্যে বক্ত তোলপাড় করিতে লাগিল। নিস্তব্ধ সন্ধ্যা, নির্জন ঘর, নববসন্তের বাতাস দিতেছে, বিননাদিনীর মন যেন ধরা দিল-দিল উন্মাদ মহেন্দ্র আপনাকে আর ধরিয়া রাখিতে পারিবে না এমনই বোধ হইল। তাড়াতাড়ি আলো নিবাইয়া ঘরের প্রবেশদ্বার বন্ধ করিল, তাহার উপরে শাসি আঁটিয়া দিল, এবং সময় হইতেই বিছানার মধ্যে গিয়া হইয়া পড়িল।

 এও তো সে পুরাতন বিছানা নহে। চার-পাঁচখানা তোশকে শয্যাতল পূর্বের চেয়ে অনেক নরম। আবার একটি গন্ধ - সে অগুরুর কি খসখসের কি কিসের ঠিক বুঝা গেল না। মহেন্দ্র অনেকবার এপাশ-ওপাশ করিতে লাগিল কোথায় যেন পুরাতনের কোনো-একটা নিদর্শন খুঁজিয়া পাইয়া তাহা আঁকড়াইয়া ধরিবার চেষ্টা। কিন্তু কিছুই হাতে ঠেকিল না।

 রাত্র নটার সময় রুদ্ধ দ্বারে ঘা পড়িল।বিনোদিনী বাহির হইতে কহিল, ঠাকুরপো, তোমার খাবার আসিয়াছে, দুয়ার খোলো।”

 তখনই দ্বার খুলিবার জন্য মহেন্দ্র ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া শাসির অর্গলে হাত লাগাইল। কিন্তু খুলল না— মেঝের উপর উপুড় হইয়া লুটাইয়া কহিল, “না না, আমার ক্ষুধা নাই, আমি খাইব না।”

 বাহির হইতে উদবিগ্ন করে প্রশ্ন শানা গেল, “অসুখ করে নি তো? জল আনিয়া দিব? কিছু চাই কি।”

 মহেন্দ্র কহিল, “আমার কিছুই চাই না কোনো প্রয়োজন নাই।”

 বিনোদিনী কহিল, “মাথা খাও, আমার কাছে ভাড়াইয়ো না। আচ্ছা, অসুখ থাকে তো একবার দরজা খোলো।”

 মহেন্দ্র সবেগে বলিয়া উঠিল, “না, খুলিব না; কিছুতেই না। তুমি যাও।”