পাতা:তিনসঙ্গী - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১০

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
তিন সঙ্গী

অনুস্বার-বিসর্গওয়ালা গােলা দাগেন ঈশ্বরের অস্তিত্ববাদের উপরে। হিন্দুসমাজ হেসে বলে ‘গােলা খা ডালা’, দাগ পড়ে না সমাজের পাকা প্রাচীরের উপরে। আচারধর্মের খাঁচাটাকে ঘরের দাওয়ায় দুলিয়ে রেখে ধর্মবিশ্বাসের পাখিটাকে শূন্য আকাশে উড়িয়ে দিলে সাম্প্রদায়িক অশান্তি ঘটে না। কিন্তু অভীক কথায় কথায় লােকাচারকে চালান দিত ভাঙা কুলােয় চড়িয়ে ছাইয়ের গাদার উদ্দেশে। ঘরের চার দিকে মােরগদম্পতিদের অপ্রতিহত সঞ্চরণ সর্বদাই মুখরধ্বনিতে প্রমাণ। করত তাদের উপর বাড়ির বড়ােবাবুর আভ্যন্তরিক আকর্ষণ। এ-সমস্ত স্লেচ্ছাচারের কথা ক্ষণে ক্ষণে বাপের কানে পৌঁচেছে, সে তিনি কানে তুলতেন না। এমন-কি, বন্ধুভাবে যে-ব্যক্তি তাঁকে খবর দিতে আসত, সগর্জনে দেউড়ির অভিমুখে তার নির্গমনপথ দ্রুত নির্দেশ করা হত। অপরাধ অত্যন্ত প্রত্যক্ষ না হলে সমাজ নিজের গরজে তাকে পাশ কাটিয়ে যায়, কিন্তু অবশেষে অভীক একবার এত বাড়াবাড়ি করে বসল যে তার অপরাধ অস্বীকার করা অসম্ভব হল। ভদ্রকালী ওদের গৃহদেবতা, তার খ্যাতি ছিল জাগ্রত বলে। অভীকের সতীর্থ বেচারা ভজু ভারি ভয় করত ঐ দেবতার অপ্রসন্নতা। তাই অসহিষ্ণু হয়ে তার ভক্তিকে অশ্রদ্ধেয় প্রমাণ করবার জন্যে পুজোর ঘরে অভীক এমন-কিছু অনাচার করেছিল যাতে ওর বাপ আগুন হয়ে বলে উঠলেন, ‘বেরো আমার ঘর থেকে, তাের মুখ দেখব না।’ এত বড়ো ক্ষিপ্রবেগের কঠোরতা নিয়মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণপণ্ডিত-বংশের চরিত্রেই সম্ভব।

 ছেলে মাকে গিয়ে বললে, “মা, দেবতাকে অনেককাল ছেড়েছি, এমন অবস্থায় আমাকে দেবতার ছাড়াটা নেহাত বাহুল্য। কিন্তু জানি, বেড়ার ফাঁকের মধ্য দিয়ে হাত বাড়ালে তােমার প্রসাদ মিলবেই। ঐখানে কোনাে দেবতার দেবতাগিরি খাটে না, তা যত বড় জাগ্রত হােন-না তিনি।”

 মা চোখের জল মুছতে মুছতে আঁচল থেকে খুলে ওকে একখানি