পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১১১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૭ বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী হইতেছে। তখন কুন্দ সভয়ে সাননো চিনিল ষে, সেই করুণাময়ী তাহার বহুকালমৃত প্রস্থতির অবয়ব ধারণ করিয়াছে। আলোকময়ী সস্নেহাননে কুন্দকে ভূতল হইতে উত্থিত করিয়া ক্রোড়ে লইলেন এবং মাতৃহীন কুন্দ বহুকাল পরে “মা” কথা মুখে আনিয়া যেন চরিতার্থ হইল। পরে জ্যোতিৰ্ম্মণ্ডলমধ্যস্থ কুন্দের মুখচুম্বন করিয়া বলিলেন, “বাছা! তুই বিস্তর দুঃখ পাইয়াছিস্ ! আমি জানিতেছি যে, তুই বিস্তর দুঃখ পাইবি । তোর এই বালিকা-বয়ঃ, এই কুসুমকোমল শরীর, তোর শরীরে সে দুঃখ সহিবে না । অতএব তুই আর এখানে থাকিস না, পৃথিবী ত্যাগ করিয়৷ আমার সঙ্গে অায় " কুন্দ যেন ইহাতে উত্তর করিল ষে, “কোথায় যাইব ?” তখন কুন্দের জননী উৰ্দ্ধে অজুলীনির্দেশ দ্বারা উজ্জ্বলপ্ৰজলিত নক্ষত্ৰলোক দেখাইয়া দিয়া বলিলেন যে, “ঐ দেশে ” কুন্দ তখন ষেন বহুদূরবর্তী বেলাবিহীন অনন্তসাগরপারস্থবৎ— অপরিজ্ঞাত নক্ষত্ৰলোক দৃষ্টি করিয়া কহিল, “আমি অঙ দূর ষাইতে পারিব না, আমার বল নাই ।” তখন ইছা শুনিয়া জননীর কারুণ্য-প্রফুল্ল অথচ গম্ভীর মূখমণ্ডলে ঈষৎ অনাহলাদজনিতবৎ ভ্ৰকুট-বিকাশ হৃষ্টল এবং তিনি মৃদুগম্ভীরস্বরে কহিলেন, “বাছা, যাহা তোমার ইচ্ছা, তাহ কর । কিন্তু আমার সঙ্গে আসিলে ভাল করিতে । ইহার পর তুমি ঐ নক্ষত্ৰলোক প্রতি চাহিয়া তথায় আসিবার জন্য কাতর হইবে । আমি আর একবার তোমাকে দেখা দিব । যখন তুমি মনঃপীড়ায় ধূল্যবলুষ্ঠিত হইম, আমাকে মনে করিয়া, আমার কাছে আসিবার জন্ত কঁাদিবে, তখন আমি আবার দেখা দিব, তখন আমার সঙ্গে আসিও । এখন তুমি আমার অঙ্গুলীসঙ্কেতনীতনয়নে আকাশপ্রান্তে চাহিয়া দেখ। আমি তোমাকে দুইটি মনুষ্যমূৰ্ত্তি &দেখাইতেছি । এই দুই মনুষ্যই ইহলোকে তোমার গুড়াশুভের কারণ হইবে। যদি পার, তবে ইহাদিগকে দেখিলে বিষধরবৎ প্রত্যাখ্যান করিও । তাহারা যে পথে ষাইবে, সে পথে যাইও না ।” তখন জ্যোতিৰ্ম্ময়ী অঙ্গুলীসঙ্কেত দ্বারা গগনেপান্ত দেখাইলেন। কুন্দ তৎসঙ্গেতানুসারে দেখিল, নীল গগনপটে এক দেবনিন্দিত পুরুষমূৰ্ত্তি অঙ্কিত হইয়াছে। র্তাহার উন্নত, প্রশস্ত প্রশান্ত ললাট, সরল সকরুণ কটাক্ষ ; তাহার মরালষৎ দীর্ঘ ঈষৎ বঙ্কিম গ্রীব। এবং অন্তান্ত মহাপুরুষলক্ষণ দেখিয়া কাহারও বিশ্বাস হইতে পারে না যে, ইহা হইতে আশঙ্কা সস্তবে । তখন ক্রমে ক্রমে সে প্রতিমূৰ্ত্তি জলবুদবুদবৎ গগনপটে বিলীন হইলে, জননী কুনকে কহিলেন, “ইহার দেবকান্ত রূপ দেখিয়া ভুলিও না। ইনি মহুদাশয় হইলেও তোমায় অমঙ্গলের কারণ । অতএব বিষধরবোধে ইহাকে ত্যাগ করিও ” পরে আলোকময়ী পুনশ্চ “ঐ দেখ” বলিয়া গগনপ্রাস্তে নির্দেশ করিলে, কুন দ্বিতীয় মূৰ্ত্তি আকাশের নীলপটে চিত্রিত দেখিল। কিন্তু এবার পুরুষমূৰ্ত্তি নহে । কুন্দ তথায় এক উজ্জল খামাঙ্গী, পদ্মপলাশনয়ন যুবতী দেখিল । তাহাকে দেখিয়াও কুন্দ ভীত হইল না । জননী কহিলেন, "এই স্থামাঙ্গী নারীবেশে রাক্ষসী । ইহাকে দেখিলে পলায়ন করিও ।” ইহা বলিতে বলিতে সহসা আকাশ অন্ধকারময় হইল, বৃহচ্চন্দ্রমণ্ডল আকাশে অন্তহিত হইল এবং তৎসহিত তন্মধ্যসংবৰ্ত্তিনী তেজোময়ীও অস্তহিত৷ হইলেন । তখন কুন্দের নিদ্রাভঙ্গ হইল । চতুর্থ পরিচ্ছেদ এই সেই নগেন্দ্র গ্রামমধ্যে গমন করিলেন । শুনিলেন, গ্রামের নাম ঝুমঝুমপুর । তাহার অনুরোধে এবং আমুকুল্যে গ্রামস্থ কেহ কেহ আসিয়া মৃতের সৎকারের আয়োজন করিতে লাগিল । এক জন প্রতিবেশিনী কুন্দনন্দিনীর নিকটে রহিল। কুন্দ যখন দেখিল যে, তাহার পিতাকে সৎকারের জন্য লইয়া গেল, তখন র্তাহার মৃত্যু সম্বন্ধে কৃতনিশ্চয় হইয়া অবিরত রোদন করিতে লাগিল । প্রভাতে প্রতিবেশিনী আপন গৃহকার্য্যে গেল, কুন্দনন্দিনীর সাস্তুনার্থ আপন কন্যা চাপাকে পাঠাইয়। দিল । চাপ কুন্দের সমবযস্ক এবং সঙ্গিনী । চাপ আসিয়া কুন্দের সঙ্গে নানাবিধ কথা কহিয়া তাহাকে সাস্তুনা করিতে লাগিল । কিন্তু দেখিল যে, কুন্দ কোন কথাই শুনিতেছে না, রোদন করিতেছে এবং মধ্যে মধ্যে প্রত্যাশাপন্নবৎ আকাশপানে চাহিয়া দেখিতেছে । চাপ কৌতুহলপ্রযুক্ত জিজ্ঞাসা করিল, “একশ বার আকাশপানে চাহিয়৷ কি দেখিতেছ?” কুন্দ তখন কহিল, “আকাশ থেকে কাল মা আসিয়াছিলেন ; তিনি আমাকে ডাকিলেন, “আমার সঙ্গে আয় । আমার কেমন দুৰ্ব্বদ্ধি হইল, আমি ভয় পাইলাম, মা’র সঙ্গে গেলাম না । এখন ভাবিতেছি, কেন গেলাম না ? এখন আর যদি তিনি আসেন, আমি যাই। তাই ঘন ঘন আকাশপানে চাহিয়৷ দেখিতেছি ।”