পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১১৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


& vʻ' অনতিতপ্ত জল ছিল, অকস্মাৎ কুন্দকে তাহার ভিতরে ফেলিলেন। কুন্দ মহা ভীত হইল । কমল তখন হাসিতে হাসিতে স্নিগ্ধসৌরভযুক্ত সোপ হস্তে লইয়া স্বয়ং তাহার গাত্র ধৌত করিতে আরম্ভ করিলেন । এক জন পরিচারিক স্বয়ং কমলকে এরূপ কাজে ব্যাপৃত দেখিয়া তাড়াতাড়ি ‘আমি দিতেছি, আমি দিতেছি বলিয়া দৌড়িয়৷ আসিতেছিল—কমল সেই তপ্ত জল ছিটাইয়া পরিচারিকার গায়ে দিলেন, পরিচারিক পলাইল । কমল স্বহস্তে কুন্দকে মাজ্জিত এবং স্নাত করাইলে —কুন্দ শিশিরধৌত পদ্মবৎ শোভা পাইভে লাগিল । তখন কমল তাহাকে শ্বেত চারু বস্ত্র পরাইয় গন্ধতৈল সহিত তাহার কেশ রচনা করিয়া দিলেন এবং কম্ভকগুলি অন স্কার, পরাইয়া দিয়া বলিলেন, “যা, এখন দাদাবাবুকে প্রণাম করিয়া আয় । আর দেখিসযেন এ বাড়ীর বাবুকে প্রণাম ক’রে ফেলিস না । এ বাড়ীর বাবু দেখিলেই বিয়ে ক’রে ফেলিবে ।” নগেন্দ্রনাথ কুন্দের সকল কথা স্বৰ্য্যমুখীকে লিখিলেন । হরদেব ঘোষাল নামে র্তাহার এক প্রিয় সুহৃদ দুরদেশে বাস করিতেন । নগেন্দ্র তাহাকেও পত্র লেখার কালে কুন্দনন্দিনীর কথা বলিলেন, যথা— “বল দেখি, কোন বয়সে স্ত্রীলোক সুন্দরী ? তুমি বলবে চল্লিশ পরে, কেন না, তোমার ব্রাহ্মণীর আর ও দুই এক বৎসর হইয়াছে। কুন্দ নামে যে কন্যার পরিচয় দিলাম—তাহার বয়স তের বৎসর, তাহাকে দেখিয়া বোধ হয় যে, এই সৌন্দর্য্যের সময় । প্রথম যৌবনসঞ্চারের অব্যবহিত পূৰ্ব্বেষ্ট যেরূপ মাধুর্ঘ্য এবং সরলতা থাকে, পরে তত থাকে না । এই কুন্দের সরলতা চমৎকার ; সে কিছুই বুঝে ন । জিও রাস্তার বালকদিগের সহিত খেলা করিতে ছুটে ; আবার বারণ করিলেই ভীত হইয় প্রতিনিবৃত্তা হয় । কমল তাঁহাকে লেখাপড়া শিখাইতেছে । কমল বলে, লেখাপড়ায় তাহার দিব্য বুদ্ধি । কিন্তু অন্য কোন কথাই বুঝে না । বলিলে বৃহৎ নীল দুইটি চক্ষু-চক্ষু দুইটি শরতের মত সৰ্ব্বদাই স্বচ্ছ জলে ভাসিতেছে—সেই দুইটি চক্ষু আমার মুখের উপর স্থাপিত করিয়া চাহিয়া থাকে ; কিছু বলে না – আমি সে চক্ষু দেখিতে দেখিতে অন্যমনস্ক তই ; আর বুঝ+ ইতে পারি না । তুমি আমার মতিস্থৈৰ্য্যের এই পরিচয় শুনিয়া হাসিবে, বিশেষ তুমি বাতিকের গুণে গাছ কয় চুল পাকাইয়া ব্যঙ্গ করিবার পরওয়ানা । হাসিল করিয়াছ ; কিন্তু যদি তোমাকে সেই দুইটি চক্ষুর সম্মুখে দাড় করাইতে পারি, তবে তোমারও বঙ্কিমচন্ত্রের গ্রন্থাবলী মতিস্থৈৰ্য্যের পরিচয় পাই। চক্ষু দুইটি কিরূপ, তাহা আমি এ পর্য্যন্ত স্থির করিতে পারিলাম না । তাহ দুইবার এক রকম দেখিলাম না আমার বোধ হয় যেন, এ পৃথিবীর সে চোখ নয় ; এ পৃথিবীর সামগ্ৰী যেন ভাল করিয়া দেখে না, অন্তরীক্ষে যেন কি দেখিয়া তাহাতে নিযুক্ত আছে । কুনা ষে নির্দোষ সুন্দরী, তাহা নহে । অনেকের সঙ্গে তুলনায় তাহার মুখাবয়ব অপেক্ষাকৃত অপ্রশংসনীয় বোধ হয় ; অথচ আমার বোধ হয়, এমন স্বন্দরী কখনও দেখি নাই। বোধ হয় ষেন, কুন্দনন্দিনীতে পৃথিবী ছাড়া কিছু আছে । রক্তমাংসের, যেন গঠন নয় ; যেন চন্দ্রকর কি পুষ্পসৌরভকে শরীরী করিয়া তাহাকে গড়িয়াছে। তাহার সঙ্গে তুলনা করিবার সামগ্ৰী হঠাৎ মনে হয় না । অতুল্য পদার্থটি, তাহার সর্বাঙ্গীন শাস্তভাবব্যক্তি—যদি শরচ্চন্দ্রের কিরণসম্পাতে যে স্বচ্ছসরোবরের ভাবব্যক্তি, তাহা বিশেষ করিয়া দেখ, তবে ইহার সাদৃশু কতক অনুভূত করিতে পরিবে। তুলনার অন্য সামগ্ৰী পাইলাম না ।” - নগেন্দ্র স্বৰ্য্যমুখীকে যে পত্র লিখিয়াছিলেন, কিছু দিন পরে তাহার উত্তর আসিল । উত্তর এইরূপ — “দাসী শ্রীচরণে কি অপরাধ করিয়াছে, তাহা বুঝিতে পারিলাম না । কলিকাতায় যদি তোমার এত দিন থাকিতে হইবে, তবে আমি কেনই বা নিকটে গিয়া পদসেব না করি ? এ বিষয়ে আমার বিশেষ মিনতি ; হুকুম পাইলেই ছুটিব । “একটি বালিকা কুড়াইয়া পাইয়া কি আমাকে ভুলিলে ? অনেক জিনিসের কাচারই আদর । নারিকেলের ডাবহ শী হল । এ অধম স্ত্রীজাতিও বুঝি কেবল র্কাচামিঠে ? নহিলে বালিকাটি পাইয়। আমায় ভুলিবে কেন ? 曙 “তামাস যাউক, তুমি কি মেয়েটিকে একেবারে স্বত্বত্যাগ করিয়া বিলাষ্টয়া দিয়াছ ? নহিলে আমি সেটি তোমার কাছে ভিক্ষা করিয়া লইতাম । মেয়েটিতে আমার কাজ আছে । তুমি কোন সামগ্ৰী পাইলে তাহাতে আমার অধিকার হওয়াই উচিত, কিন্তু আজিকালি দেখিতেছি, তোমার ভগিনীরই পুর। অধিকার । “মেয়েটিতে কি কাজ ? আমি তারাচরণের সঙ্গে তাহার বিবাহ দিব । তারাচরণের জন্য একটি ভাল মেয়ে আমি কত খুজিতেছি, তা ত জান । যদি একটি ভাল মেয়ে বিধাতা মিলাইয়াছেন, তবে আমাকে নিরাশ করিও না । কমল যদি ছাড়িয়া দেয়, তবে কুন্দনন্দিনীকে আসিবার সময়ে সঙ্গে করিয়া