পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১১৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বিষবৃক্ষ SS উঠিয়াছে, কুঠারি সকল আসবাবে ভরা-চাবিবন্ধ। তাহার পাশে ঠাকুরবাড়ী, সেখানে বিচিত্র দেবমন্দির, সুনার প্রস্তরবিশিষ্ট “নাটমন্দির।” তিন পাশে দেবতাদিগের পাকশাল, পূজারিদিগের থাকিবার ঘর এবং অতিথিশালা । সে মহলে লোকের অভাব নাই । গলায় মালা, চন্দনতিলকবিশিষ্ট পূজারির দল, পাচকের দল ; কেহ ফুলের সাজি লইয়া আসিতেছে, কেহ ঠাকুর স্বান করাইতেছে, কেহ ঘণ্টা নাড়িতেছে, কেহ বকাবকি করিতেছে, কেহ চন্দন ঘযিতেছে, কেহ পাক করিতেছে । দাসদাসীরা কেহ জলের হর আনিতেছে, কেহ ঘর ধুইতেছে, কেহ চাল ধুইয়। অনিতেছে, কেহ ত্ৰাহ্মণদিগের সঙ্গে কলহ করিতেছে । অতিথিশালায় কোথাও ভষ্মমাখ। সন্ন্যাসী ঠাকুর জট এলাইয়া, চিত হইয়| শুইয়া আছেন । কোথাও উদ্ধবাহু এক হাত উচ্চ করিয়া দন্তবাড়ীর দাসী-মহলে ঔষধ বিতরণ করিতেছেন ; কোথাও শ্বেতশ্বাশ্রবিশিষ্ট শৈরিকবসনধারী ব্ৰহ্মচারী রুদ্রাক্ষমালা দোলাইয়া, নাগরী অক্ষরে হাতে লেখা ভগবদগীতা পাঠ করিতেচেন। কোথাও কোন উদরপরায়ণ “সাধু” ঘি-ময়দার পরিমাণ লইয়া গণ্ডগোল বাধাইতেছে । কোথাও বৈরাগীর দল শুষ্ককণ্ঠে তুলসীর মালা আটিয়া, কপাল কড়িয়ঃ তিলক করিয়৷ মৃদঙ্গ বাজাইতেছে, মাথায় ং:কফল নড়িতেছে এবং নাসিক দোলাইয়া “কথা ষ্টতে যে পেলেম না - দাদা বলাই সঙ্গে ছিল—কথা *ইতে ’যে* বলিয়া কীৰ্ত্তন করিতেছে । কোথাও বৈষ্ণবীরা বৈরাগিরঞ্জন রসকলি কাটিয়া, খঞ্জনীর ং ‘লে “মধে। কানের" কি “গোবিন্দ অধিকারীর” গীত “:রিতেছে । কোথাও কিশোরবয়স্ক নবীন বৈষ্ণবী *}চীনার সঙ্গে গায়িতেছে, কোথা ও অৰ্দ্ধবয়সী বুড় :পশাগীর সঙ্গে গল মিলাইতেছে। নাটমন্দিরের ঝখানে পাড়ার নিষ্কৰ্ম্মী ছেলের লড়াই, ঝগড়া, ম: লামারি করিতেছে এবং পরপর মাতাপিতার উদ্দেশে নানাপ্রকার সুসভা গালাগলি করিতেছে । এই তিন মহল সদর । এই তিন মহলের পশ্চাতে তন মহল অন্দর । কাছারাবাড়ীর পশ্চাতে যে সন্দরমহল, তাহ নগেন্দ্রের নিজ ব্যবহার্য ; তন্মধ্যে !ে বল তিনি, তা হার ভার্য্যা ও তাঁহাদের নিজ পরিচর্য্যায় নিযুক্ত দাসীরা থাকিত এবং তাহাদের শিঙ্গ ব্যবহার্য্য দ্রব্যসামগ্রী থাকিত । এই মহল তন, নগেন্দ্রের নিজের প্রস্তুত এবং তাহার নিৰ্ম্মাণ অতি পরিপাটা। তাহার পাশে পূজার বাড়ীর পশ্চাতে সাবেক অন্দর। তাহা পুরাতন, কুনিৰ্ম্মিত ; গর সকল অমুচ্চ, ক্ষুদ্র এবং অপরিস্কৃত । এই পুরী বহুসংখ্যক আত্মীয়কুটুম্ব, কন্য, মাসী, মাসীত ভগিনী, পিসী, পিঙ্গীত ভগিনী, বিধবা মাসী, সধবা ভাগিনেয়ী, পিসীত ভাইয়ের স্ত্রী, মাসীত ভাইয়ের মেয়ে ইত্যাদি নানাবিধ কুটুম্বিনীতে কণকসমাকুল বটবৃক্ষের ন্তায় রাত্রি দিব। কলকল করিত এবং অমুক্ষণ নানাপ্রকার চীৎকার, হাস্তপরিহাস, কলহ, কুতর্ক, গল্প, পরনিন্দ, বালকের হুড়াহুড়ি, বালিকার রোদন, “জল আন;" “কাপড় দে,” “ভাত রাধলে না,” “ছেলে খায় নাই,” “দুধ কই,” ইত্যাদি শব্দে সংক্ষুব্ধ সাগরবৎ শদিত হইত। তাহার পাশে ঠাকুরবাড়ীর পশ্চাতে রন্ধনশাল । সেখানে আরও জাক । কোথাও কোন পাচিক ভাতের ষ্টাড়িতে জাল দিয়া প! গোট করিয়া, প্রতিবাসিনীর সঙ্গে তাহার ছেলের বিবাহের ঘটার গল্প করিতেছেন । কোন পাচিক বা কাচা কাঠে ফু দিতে দিতে ধূয়ায় বিগলিতাশ্রলোচনা হইয়া, বাড়ীর গোমস্তার নিন্দ করিতেছেন এবং সে যে টাকা চুরি করিবার মানসেই ভিজা কাঠ কাটাইয়াছে, তদ্বিসয়ে বহুবিধ প্রমাণ প্রয়োগ করিতেছেন। কোন সুন্দরী তপ্ত ভৈলে মাছ দিয়া, চক্ষু মুদিয়া, দশনাবলী বিকট করিয়া, মুখভঙ্গী করিয়া আছেন, কেন না, তপ্ত তৈল ছিটকাইয় তাহার গায়ে লাগিয়াছে ; কেহ বা স্নানকালে বহু তৈলাক্ত অসংযমিত কেশরাশি চুড়ার আকারে সীমন্তদেশে বাধিয়া ডালে কাষ্ঠী দিতেছে-- যেন রাখাল পাচনীহস্তে গোরু ঠেঙ্গাইতেছে। কোথাও বা বড় বঁট পাতিয়া বামী, ক্ষেমী, গোপালের ম, নেপালের মা লাউ, কুমড়া, বাৰ্ত্তাকু, পটোল, শাক কুটিতেছে । তাতে ঘস্ঘস কচকচ শব্দ হইতেছে ; মুখে পাড়ার নিন্দ, মুনিবের নিন্দ, পরস্পরকে গালাগালি করিতেছে এবং গোলাপী অল্পবষসে বিধবা হইল, চাদর স্বামী বড় মাতাল, কৈলাসীর জামায়ের বড় চাকরী হইয়াছে—সে দারোগার মুহুরী, গোপালে উড়ের যাত্রার মত পুথিবীতে এমন আর কিছুই নাই, পাৰ্ব্বতীর ছেলের মত দুষ্ট ছেলে আর বিশ্ববাঙ্গালীয় নাই, ইংরেজরা ন। কি রাবণের বংশ, ভগীরথ গঙ্গা এনেছেন, ভটচার্মিাদের মেয়ের উপপতি শু্যাম বিশ্বাস, এইরূপ নানা বিষয়ের সমালোচনা হইতেছে । কোন কৃষ্ণবর্ণ স্কুলাঙ্গী, প্রাঙ্গণে এক মহাস্ত্ররূপী বঁটা ছাইয়ের উপর সংস্থাপিত করিয়৷ মৎস্ত্যজাতির সদ্য প্রাণসংহার করিতেছেন, চিলের বিপুলাঙ্গীর শরীরগৌরব এবং হস্ত লাঘব দেখিয়া ভয়ে আগু হইতেছে না ; কিন্তু দুই একবার ছে৷ মারিতেও ছাড়িতেছে না । কোন পঙ্ককেশা জল আনিতেছে, কোন ভীমদশনা বাটন