পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১১৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


为8 গ্রামের মধ্যে গণ্ডমূর্ণ, তিনি সেই স্বামীর অলৌকিক পাণ্ডিত্য কীৰ্ত্তন করিয়া সঙ্গিনীকে বিস্মিতা করিতেছিলেন । যাহার পুত্রকষ্ঠাগুলি এক একটি কৃষ্ণবর্ণ মাংসপিণ্ড, তিনি রত্নগর্ভ বলিয়। আস্ফালন করিতেছিলেন । স্বৰ্য্যমুখী এ সভায় ছিলেন না । তিনি কিছু গৰ্ব্বিত, এ সকল সম্প্রদায়ে বড় বসিতেন না এবং তিনি থাকিলে অন্ত সকলের আমোদের বিঘ্ন হুইত । সকলেই তাহাকে ভয় করিত, তাহার নিকট মন খুলিয়া সকল কথা চলিত না । কিন্তু কুন্দনন্দিনী এক্ষণে এই সম্প্রদায়েই থাকিত ; এখনও ছিল । সে একটি বালককে তাহার মাতার অনুরোধে ক, খ, শিখাইতেছিল। কুন্দ বলিয়া দিতেছিল, তাহার ছাত্র অন্ত বালকের করস্থ সন্দেসের প্রতি হা করিয়া চাহিয়াছিল ; সুতরাং তাহার বিশেষ বিদ্যালাভ হইতেছিল । এমন সময়ে সেই নারীসভামণ্ডলে “জয় রাধে” বলিয়া এক বৈষ্ণবী আসিয় দাড়াইল । নগেন্দ্রের ঠাকুরবাড়াতে নিত্য অতিথিসেবা হৃষ্টত এবং তদ্ব্যতীত সেইখানেই প্রতি রবিবারে তণ্ডুলাদি বিতরণ হুইত, ইহা ভিন্ন ভিক্ষার্থ বৈষ্ণবা কি কেহ অন্তঃপুরে আসিতে পাইত না । এই জন্ত অস্তঃপুরমধ্যে “জয় রাধে’ শুনিয়া এক হন পুরবাদিনী বলিতেছিল,—“কে রে মাগী বাড়ীর ভিতর ? ঠাকুরবাড়ী যা " কিন্তু এই কথা বলিতে বলিতে সে মুখ ফিরাইয়া বৈষ্ণবীকে দেখিয়া কথা আর সমাপ্ত করিল না ; তৎপরিবর্তে বলিল, “ও মা ! এ আবার কোন বৈষ্ণবী গে৷ ” সকলেই বিস্মিত হইয়া দেখিল যে, বৈষ্ণবী যুবতী, তাহার শরীরে আর রূপ ধরে না । সেই বহুসুন্দরীশোভিত রমণীমণ্ডলেও, কুন্দনন্দিনী ব্যতীত তাহ হইতে সমধিক রূপবতী কেহই নহে। তাহার স্ফুরিত বিম্বাধর, সুগঠিত নাসা, বিস্ফারিত ফুল্লেন্দীবরতুল্য চক্ষু, চিত্ররেখাবৎ ভ্ৰযুগ, নিটোল ললাট, বাহুযুগের মৃণালৰৎ গঠন এবং চম্পকদামবৎ বর্ণ রমণীকুলকুল্লভ । কিন্তু সেখানে যদি কেহ সৌন্দর্য্যের সদ্বিচারক থাকিত, তবে সে বুলিত ষে, বৈষ্ণবীর গঠনে কিছু লালিত্যের অভাব। চলনফেরন এ সকলও পৌরুষ । বৈষ্ণবীর নাকে রসকলি, মাথায় টেড়িকাটা, পরণে কালাপেড়ে সিমলার ধূতি, ছাতে একটি খঞ্জনী । হাতে পিত্তলের বালা এবং তাহার উপরে জলতরঙ্গ চুড়ি। স্ত্রীলোকদিগের মধ্যে এক জন বয়োজ্যেষ্ঠ কহিল, *্য গী, তুমি কে গা ?” বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী বৈষ্ণৰী কহিল, “আমার নাম হরিদাসী বৈষ্ণবী মা ঠাকুরাণীর গান শুম্বে ?” তখন “শুনূবে গে শুনৰে|” এই ধ্বনি চারিদিকে আবালবৃদ্ধার কণ্ঠ হইতে বাহির হইতে লাগিল । তখন খঞ্জনীহাতে বৈষ্ণবী উঠিয়া গিয়া ঠাকুরাণীদিগের কাছে বসিল । সে যেখানে বসিল, সেইখানেই কুন্দ ছেলে পড়াইয়েছিল। কুন্দ অত্যন্ত গীতপ্রিয়, বৈষ্ণবী গান করিবে শুনিয়া দে তাহার আর একটু সন্নিকটে আদিল । তাহার ছাত্র সেই অবকাশে উঠিয়া গিয়৷ সন্দেসভোজী বালকের ইতি হইতে সন্দেস কাড়িয়া লইয়। আপনি ভক্ষণ করিল। বৈষ্ণবী জিজ্ঞাসা করিল, “কি গায়িব ?” তখন শ্রোত্রীগণ নানাবিধ ফরমায়েস আরম্ভ করিলেন । কেহ চাহিলেন, “গোবিন্দ অধিকারী”-- কেহ “গোপাল উড়ে ” যিনি দাশরথির পাচালী পড়িতেছিলেন, তিনি তাহাই কামনা করিলেন । তুই এক জন প্রাচীন। কৃষ্ণবিষয়ক হুকুম করিলেন । তাহারই টকা করিতে গিয়া মধ্যবয়সীর “সখীসংবাদ এবং ‘বিরহ বলিয়া তভেদ প্রচার করলেন । কেহ চাহিলেন ‘গোষ্ঠ’কোন লজ্জাহীন যুব তা বলিল, “নিধুর টপ্ল গাইতে হয় ত গাও—নহলে শুনিব না।” একটি অস্ফুটবাচ বালিক বৈষ্ণবকে শিক্ষা দিবার অভিপ্রায়ে গাইয়া দিল, “তোলা দাসনে দাসনে দাসনে দুতি ।" বৈষ্ণবী সকলের হুকুম শুনিয়া কুন্দের প্রতি বিদ্যুদামতুল্য এক কটাক্ষ করিয়া কহিল, “হঁ্য গা - তুমি কিছু ফরমাস করিলে না?” কুন্দ তখন লজ্জাবনত মুখী হইয়া অল্প একটু হাসিল, কিছু উত্তর করিল না ; কিন্তু তখনই একজন বয়স্তার কাণে কাণে কহিল, “কীৰ্ত্তন গায়িতে বল না ?” বয়স্তা তখন কহিল, “ওগো, কুন্দ কীৰ্ত্তন করিতে বলিতেছে গো !” তাহ শুনিয়া বৈষ্ণবী কীৰ্ত্তন করিতে আরম্ভ করিল । সকলের কথা টালিয়া বৈষ্ণবী তাহার কথ। রাখিল দেখিয়া কুন্দ বড় লজ্জিত হইল । হরিদাসী বৈষ্ণবী প্রথমে খঞ্জনীতে দুই একবার মৃদু মৃদু ষেন ক্রাড়াচ্ছলে অঙ্গুলী প্রহার করিল । পরে আপন কণ্ঠমধ্যে অতি মৃদ্ধ মৃদু নববসস্তপ্রেরিতা এক ভ্রমরীর গুঞ্জনবৎ স্বরের আলাপ করিতে লাগিল— যেন লজ্জাশীল৷ বালিকা স্বামীর নিকট প্রথম প্রেমব্যক্তি জন্য মুখ ফুটাইতেছে। পরে অকস্মাৎ সেই ক্ষুদ্রপ্রাণ খঞ্জনী হইতে বাস্তবিদ্যাবিশারদের অঙ্গুলিজনিত শব্দের তায় মেঘগম্ভীর শ্বব্য বাহির হুইল এবং তৎসঙ্গে শ্রোত্রীদিগের শরীর কণ্টকিত করিয়া অন্সরোনিন্দিভ কণ্ঠগীতিধ্বনি সমুখিত হইল। তখন