পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১২০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বিষবৃক্ষ রমণীমণ্ডল ধিস্মিত বিমোহিতচিত্তে শুনিল যে, সেই বৈষ্ণবীর অতুলিত কণ্ঠ অট্টালিক পরিপূর্ণ করিয়া আকাশমার্গে উঠিল । মূঢ় পৌরস্ত্রীগণ সেই গানের পারিপাট্য কি বুঝিবে ? বোদ্ধা থাকিলে বুঝিত ষে, এই সৰ্ব্বাঙ্গীনতাললয়ুস্বরপরিশুদ্ধ গান কেবল স্বকণ্ঠের কাৰ্য্য নহে। বৈষ্ণবী যেই হউক, সে সঙ্গীত-বিদ্যায় অসাধারণ সুশিক্ষিত এবুং অল্পবয়সে তাহার পারদর্শী। বৈষ্ণবী গীত সমাপন করিলে, পৌরস্ত্রীগণ তাহাকে গায়িবার জন্য পুনশ্চ অনুরোধ করিল। তখন হরিদাসী সতৃষ্ণবিলোলনেরে কুন্দনন্দিনীর মুখপানে চাহিয়া পুনশ্চ কীৰ্ত্তন আরম্ভ করিল— "শ্ৰীমুখপঙ্কজ—দেখবো ব’লে হে, তাই এসেছিলাম এ গোকুলে । আমায় স্থান দিও রাষ্ট চরণতলে । মানের দায়ে তুই মানিনী, তাই সেজেছি বিদেশিনী, এখন বঁাচাও রাধে কথা কোয়ে, ঘরে যাই হে চরণ ছুঁয়ে । দেখবে তোমায় নয়ন ভীরে, তাই বাজাই বঁ।শী ঘরে ঘরে ; যখন রাধে ব’লে বাজে বাশী, তখন নয়নজলে আপনি ভাসি । তুমি যদি না চাও ফিরে, তবে যাব সেই যমুনাতীরে, ভাঙ্গবে। বাশী তেজ ব প্রাণ, এই বেলা তোর ভালুক মান । ব্রজের মুখ রাই দিয়ে জলে, বিকাইনু পদতলে, এখন চরণনুপুর বেঁধে গলে, পশিব যমুনাজলে ।” গীত সমাপ্ত হইলে বৈষ্ণব কুন্দনন্দিনীর মুখপ্রতি চাহিয়া বলিল, “গীত গাহিয়৷ আমার মুখ শুকাইতেছে, আমায় একটু জল দাও!” কুন্দ পাত্রে করিয়া জল আনিল । বৈষ্ণবী কহিল, “তোমাদিগের পাত্র আমি ছুইব না। আসিয়া আমার হাতে ঢালিয়া দাও ; আমি জাতিবৈষ্ণবী নহি ।” ইহাতে বুঝাইল, বৈষ্ণবী পূৰ্ব্বে কোন অপবিত্রজাতীয়া ছিল, এক্ষণে বৈষ্ণবী হইয়াছে । এই কথা শুনিয়া কুন্দ তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ জল ফেলিবার যে স্থান, সেইখানে গেল। যেখানে অন্য স্ত্রীলোকেরা বসিয়া রহিল, সে স্থান হইতে ঐ স্থান এরূপ ব্যবধান ষে, তথায় মৃদু মৃদ্ধ কথা কহিলে কেহ গুণিতে পায় $6 না । সেই স্থানে গিয়া কুন্দ বৈষ্ণবীর হাতে জল ঢালিয়া দিতে লাগিল, বৈষ্ণবী হাত-মুখ ধুইতে লাগিল । ধুইতে ধষ্টতে অন্যের অশ্রুতস্বরে বৈষ্ণবী মৃদ্ধ মূঢ় বলিতে লাগিল, “তুমি না কি গা কুন্দ ?" কুন্দ বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কেন গা ?” বৈষ্ণবী । তোমার শ্বাশুড়ীকে কখন দেখিয়াছ ? কুন্দ । না ! কুন্দ শুনিয়াছিল যে, তাহার শ্বাশুড়ী ভ্ৰষ্ট হইয়া দেশভাগিনী তুষ্টয়াছিল। বৈষ্ণবী । তোমার শ্বাশুড়ী এখানে আসিয়াছেন । তিনি আমার বাড়ীতে আছেন, তোমাকে একবার দেখবার জন্য বড়ষ্ট কঁাদিতেছেন—আহা ! হাজার হোক শ্বাশুড়ী । সে ত অার এখানে আসিয়া তোমাদের গিল্পীর কাছে পোড়ার মুখ দেখতে পারবে না —ত তুমি একবার কেন আমার সঙ্গে গিয়ে তাকে দেখা দিয়ে এস না ? কুন্দ সরল হইলেও বুঝিল যে, সে শ্বাশুড়ীর সঙ্গে সম্বন্ধস্বীকারই অকৰ্ত্তব্য । অতএব বৈষ্ণবীর কথায় কেবল ঘাড় নাড়িয়া অস্বীকার করিল। কিন্তু বৈষ্ণবী ছাড়ে ন!—পুনঃ পুনঃ উত্তেজনা করিতে লাগিল। তখন কুন্দ কহিল, “আমি গিল্পীকে ন বলিয়া যাইতে পারিব না ।” হরিদাসী মানা করিল ! বলিল, “গিন্নীকে বলিও ন! ! যাইভে দিবে না । হয় ত তোমার শ্বাশুড়ীকে আনিতে পাঠাইবে, তাহ হইলে তোমার শ্বাশুড়ী দেশছাড়া হইয়া পালাইবে ।” বৈষ্ণবী যতই দাঢ় প্রকাশ করুক, কুন্দ কিছু তেষ্ট স্বর্যমুখীর অনুমতি ব্যতীত যাইতে সম্মত হইল না । তখন অগত্যা হরিদাসী বলিল, “আচ্ছা, তবে তুমি গিল্পীকে ভাল করিয়া বলিয়া রেখ। আমি আর এক দিন আসিয়া লইয়া যাইব ; কিন্তু দেখো, ভাল করিয়া বলে ; আর একটু কাদাকাটা করিও, নহিলে হইবে না ।" কুন্দ ইহাতে স্বীকৃত হইল না, কিন্তু বৈষ্ণবীকে ই কি না, কিছু বলিল না। তখন হরিদাসী হস্ত মুখ প্রক্ষালন সমাপ্ত করিয়া অন্য সকলের কাছে ফিরিয়া আসিয় পুরস্কার চাহিল । এমন সময়ে সেইখানে স্বৰ্য্যমুখী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তখন বাজে কথা একেবারে বন্ধ হইল, অল্পবয়স্কারা সকলেই একটা একটা কাজ লইয়া বসিল । স্বৰ্য্যমুখী হরিদাসীকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া কহিলেন, “তুমি কে গা " তখন নগেন্দ্রের এক মামী কহিলেন, “ও এক জন বৈষ্ণবী গান করিতে