পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১৩৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বিষবৃক্ষ তখন স্বরেন্দ্ৰ আসিয়া দেবেন্দ্রের কাছে বসিলেন এৱং তাছার শারীরিক কুশলাদি জিজ্ঞাসার পর বলিলেন, “আবার আজি তুমি কোথায় গিয়াছিলে ?” দে। ইহারই মধ্যে তোমার কাণে গিয়াছে ? মু । এই তোমার আর একটি ভ্রম । তুমি মনে কর, সব তুমি লুকিয়ে কর-কেহ জানিতে পারে না, কিন্তু পাড়ায় পাড়ায় ঢাক বাজে । দে। দোহাই ধৰ্ম্ম! আমি কাহাকেও লুকাইতে চাহি না—কোন শালাকে লুকাইব ? স্ব। সেও একটা বাহাদুরী মনে করিও না । তোমার যদি একটু লজ্জা থাকিত, তাহা হইলে আমাদেরও একটু ভরসা থাকিত। লজ্জা থাকিলে আর তুমি বৈষ্ণবী সেজে গ্রামে গ্রামে ঢলাতে যাও ? দে । কিন্তু কেমন রসের বৈষ্ণবী দাদা ? রসকলি দেখে ঘুরে পড়নি ত ? স্ব । আমি সে পোড়ারমুখ দেখি নাই, দেখিলে দুই চাবুকে বৈষ্ণবীর বৈষ্ণবী-যাত্রা ঘুচিয়ে দিতাম । পরে দেবেন্দ্রের হস্ত হইভে মদ্যপাত্র কডিয়া লষ্টয়া সুবেন্দ্র বলিতে লাগিলেন, “এখন একটু বন্ধ করিয়া, জ্ঞান থাকিতে থাকিতে দুটো কথা শুন, তার পর গিলো " দে। বল, দাদা ! আজি যে বড় চটচট দেখি —হৈমবর্তীর বাতাস গায়ে লেগেছে না কি ? স্বরেন্দ্র দুমুখের কথায় কর্ণপাত না করিয়া বলিলেন, “বৈষ্ণবী সেজেছিলে কার সর্বনাশ করবার জন্য ।” দে। তা কি জান না ? মনে নাই ; তারা মাষ্টারের বিয়ে হয়েছিল এক দেবকস্তার সঙ্গে ? সেই দেবকল্প এখন বিধবা হয়ে ও গায়ের দত্তবাড়ী রেধে খায় । তাই তাকে দেখতে গিম্বুছিলাম । স্ব। কেন, এত দুৰ্ব্বত্তিতেও তৃপ্তি জন্মিল না যে, সে অনাথা বালিকাকে অধঃপাতে দিতে হবে ? দেখ দেবেন্দ্র, তুমি এত বড় পাপিষ্ঠ, এত বড় নৃশংস, এমন অত্যাচারী ষে, বোধ হয়, আর আমরা তোমার সহবাস করিতে পারি না । সুরেন্দ্র এরূপ দাঢ্য সহকারে এই কথা বলিলেন যে, দেবেন্দ্র নিস্তব্ধ হইলেন । পরে দেবেন্দ্র গাম্ভীৰ্য্য সহকারে কছিলেন—“তুমি আমার উপর রাগ করিও না। আমার চিত্ত আমার বশ নহে । আমি সকল ত্যাগ করিতে পারি, এই স্ত্রীলোকের আশা ত্যাগ করিতে পারি না। যে দিন প্রথম তাহাকে তারাচরণের গৃহে দেখিয়াছি, সেই দিন অবধি আমি তাহার সৌন্দর্য্যে অভিভূত হইয়া আছি। আমার চক্ষে এত সৌন্দৰ্য্য আর কোথাও নাই । জরে যেমন তৃষ্ণ እፄ રમ রোগীকে দগ্ধ করে, সেই অবধি উহার জন্য লালসা আমাকে সেইরূপ দগ্ধ করিতেছে । সেই অবধি । আমি উহাকে দেখিবার জন্য কত কৌশল । করিতেছি, তাহা বলিতে পারি না । এ পর্য্যস্ত পাৱি : নাই—শেষে এই বৈষ্ণবী সজ্জা ধরিয়াছি । তোমার কোন আশঙ্কা নাই—সে স্ত্রীলোক অত্যন্ত সাধবী - * সু। তবে ষাও কেন ? . দে। কেবল তাহাকে দেখিবার জন্য। তাহাকে দেখিয়া, তাহার সঙ্গে কথা কহিয়া, তাহাকে গান ; শুনাইয়। আমার যে কি পৰ্য্যন্ত তৃপ্তি হয়, তাহ বলিতে পারি না । ." সু। তোমাকে আমি সত্য বলিতেছি—উপহাস : করিতেছি না । তুমি যদি এই ভূপ্রবৃত্তি ত্যাগ না. করিবে—তুমি যদি সে পথে আর যাইবে—তবে আমার সঙ্গে তোমার আলাপ এই পর্য্যন্ত বন্ধ । আমিও তোমার শত্ৰু হুইব । দে। তুমি আমার একমাত্র সুহৃদ। আমি অৰ্দ্ধেক বিষয় ছাড়িতে পারি, তবু তোমাকে ছাড়িতে পারিব না । কিন্তু তোমাকে যদি ছাড়িতে হয়, সেও স্বীকার, তবু আমি কুন্দনন্দিনীকে দেখিবার আশা ছাড়িতে পারিব না । স্থ । তবে তাহাই হউক । তোমার সঙ্গে আমার এই পৰ্য্যস্ত সাক্ষাৎ । এই বলিয়া সুরেন্দ্র দুঃখিতচিত্তে উঠিয়া গেলেন । দেবেন্দ্র একমাত্র বন্ধুবিচ্ছেদে অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ হইয় কিয়ৎকাল বিমৰ্ষভাবে রছিলেন । শেষ, ভাবিয়া চিন্তিয়া বলিলেন, “দুর হউক ! এ সংসারে কে কার! আমিই আমার ” এই বলিয়া পাত্র পূর্ণ করিয়া ব্র্যাণ্ডি পান করিলেন । তাহার বশে আশু চিত্ত প্রফুল্লতা জন্মিল। তখন দেবেন্দ্ৰ শুইয়া পড়িয়া চক্ষু মুদিয়া গান ধরিলেন— “আমার নাম হীরা মালিনী । আমি থাকি রাধার কুঞ্জে, কুজা আমার ননদিনী । রাবণ বলে চন্দ্রাবলী, তুমি আমার কমলকলি, শুনে কীচক মেরে কৃষ্ণ, উদ্ধারিল যাজ্ঞসেনী ।” তখন পারিষদের সকলে উঠিয়া গিয়াছিল ; দেবেন্দ্র নৌকাশূন্ত নদীবক্ষঃস্থিত ভেলার স্তায় এক বসিয়া রসের তরঙ্গে হাবুডুবু খাইতেছিলেন রোগরূপ তিমি, মকরাদি এখন জলের ভিতর লুকাইয়াছিল—এ* কেবল মন পবন আর টানের আলো!, এমন লম্বন্থে