পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১৫২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


তোমাকে আসিতে লিখিয়াছিলাম—তুমি অবশু আসিবে, জ্ঞানিতাম। এখন উভয় সাধ পরিপূর্ণ হুইয়াছে। অামার যিনি প্রাণাধিক, তিনি সুখী হইয়াছেন, ইহা দেখিয়াছি। তোমার নিকট বিদায় লইয়াছি । আমি এখন চলিলাম । “তুমি যখন এই পত্র পাইবে, তখন আমি অনেক দুর যাইব । তোমাকে যে বলিয়া আসিলাম না, তাহার কারণ এই যে, তাহা হইলে তুমি আসিতে দিতে না। এখন তোমাদের কাছে আমার এই ভিক্ষা যে, তোমরা আমার সন্ধান করিও না ।

  • আর ষে তোমার সহিত সাক্ষাৎ হইবে, এমন ভরসা নাই । কুন্দনন্দিনী থাকিতে আমি আর এ দেশে আসিব না এবং আমার সন্ধানও পাইবে না । আমি এখন পথের কাঙ্গালিনী হইলাম—ভিখারিণীবেশে দেশে দেশে ফিরিব—ভিক্ষা করিয়া দিনপাত করিব—আমাকে কে চিনিবে ? আমি টাকা-কড়ি সঙ্গে লইলে লইতে পারিতাম, কিন্তু প্রবৃত্তি হইল না। আমার স্বামী অামি ত্যাগ করিয়া চলিলাম—সোণরূপা সঙ্গে লইয়া যাইব ?

“তুমি আমার একটি কাজ করিও । আমার স্বামীর চরণে আমার কোটি কোটি প্রণাম জানাইও । আমি তাহাকে পত্র লিখিয়া যাইবার জন্য অনেক চেষ্টা করিলাম, কিন্তু পারিলাম না । চক্ষের জলে অক্ষর দেখিতে পাইলাম না-কাগজ ভিজিয়া নষ্ট হইল । কাগজ ছিড়িয়া ফেলিয়া আবার লিখিলাম-আবার ছিড়িলাম—আবার ছিড়িলাম--কিন্তু আমার বলিবার যে কথা আছে, তাহ কোন পত্রেই বলিতে পারিলাম না । কথা বলিতে পারিলাম না বলিয়া, র্তাহাকে পত্র লেখা হইল না । তুমি যেমন করিয়া ভাল বিবেচনা কর, তেমনি করিয়া আমার এ সংবাদ র্তাহাকে দিও। তাহাকে বুঝাইয়া বলিও যে, তাহার উপর রাগ করিয়া আমি দেশান্তরে চলিলাম না । র্তাহার উপর আমার রাগ নাই ; কখনও তাহার উপর রাগ করি নাই ; কখনও করিব না। র্যাহাকে মনে হইলে আহলাদ হয়, তাহার উপর কি রাগ হয় ? তাহার উপর যে অচলা ভক্তি, তাহাই রহিল,—ষতদিন না মাটীতে এ মাটী মিশে, ততদিন থাকিবে । কেন না, তাহার সহস্র গুণ আমি কখনও ভুলিতে পারিব না। এত গুণ কাহারও নাই। এত গুণ কাহারও নাই বলিয়াই অামি তাহার দাসী । এক দোষে যদি র্তাহার সহস্র গুণ ভুলিতে পারিতাম, তবে আমি র্তাহার দাসী হুইবার যোগ্য নহি । তাহার নিকট আমি জন্মের মত বিদায় লইলাম। জন্মের মত 'i o ; - k l g স্বামীর কাছে বিদায় লইলাম, ইহাতেই জানিতে পারিবে ষে, আমি কত দুঃখে সৰ্ব্বত্যাগিনী হুইতেছি । “তোমার কাছে জন্মের মত বিদায় হইলাম,— আশীৰ্ব্বাদ করি, তোমার স্বামি-পুত্র দীর্ঘজীবী হউক, তুমি চিরমুখী হও, আরও আশীৰ্ব্বাদ করি যে, যে দিন তুমি স্বামীর প্রেমে বঞ্চিত হইবে, সেইদিন যেন তোমার আয়ুঃশেষ হয়। আমায় এ আশীৰ্ব্বাদ কেন্থ وية. وحي" করে নাই । o-o-o: উনত্রিংশ পরিচ্ছেদ বিষবৃক্ষ কি ? যে বিষবৃক্ষের বাজবপন হইতে ফলোৎপত্তি এবং ফলভোগ পর্য্যন্ত ব্যাখ্যানে আমরা প্রবৃত্ত হইয়াছি, তাহা সকলেরই গৃহপ্রাঙ্গণে রোপিত আছে। রিপুর প্রাবল্য ইহার বীজ ; ঘটনাধীনে তাহা সকল ক্ষেত্রে উপ্ত হইয়া থাকে। কেহই এমন মনুষ্য নাই যে, তাহার চিত্ত রাগ-দ্বেষ-কাম-ক্রোধাদির অস্পৃষ্ঠ । জ্ঞানী ব্যক্তিরাও ঘটনাধীনে সেই সকল রিপু কর্তৃক বিচলিত হইয়া থাকেন। কিন্তু মনুষ্যে মন্তষ্যে প্রভেদ এই ষে, কেহ আপন উচ্ছলিত মনোবৃত্তি সকল সংষত করিতে পারেন এবং করিয়া থাকেন,—সেই ব্যক্তি মহাত্মা ; কেহ বা আপন চিত্ত সংযত করে না,– তাহারই জন্ত বিষবৃক্ষের বীজ উপ্ত হয় । চিত্তসংযমের অভাবই ইহার অঙ্কুর, তাহতেই এ বৃক্ষের বৃদ্ধি। এই বৃক্ষ মহা তেজস্বী, একবার ইহার পুষ্টি হইলে আর নাশ নাই । এবং ইহার শোভা অতিশয় নয়ন-প্রতিকর দুর হইতে ইহার বিবিধবর্ণ পল্লব ও সমুৎফুল্ল মুকুলদাম দেখিতে অতি রমণীয়। কিন্তু ইহার ফল বিষময় ; যে খায়, সেই মরে । ক্ষেত্রভেদে, বিষবৃক্ষে নানাবিধ ফল ফলে । পাত্রবিশেষে, বিষবৃক্ষে রোগশোকাদি নানাবিধ ফল । চিত্তসংযমপক্ষে প্রথমতঃ চিত্তসংষমে প্রবৃত্তি, দ্বিতীয়তঃ চিত্তসংযমের শক্তি আবশু্যক । ইহার মধ্যে শক্তি প্রকৃতিজন্তা ; প্রবৃত্তি শিক্ষাজন্য। প্রকৃতিও শিক্ষার উপর নির্ভর করে । সুতরাং চিত্তসংষমপক্ষে শিক্ষাই মূল। কিন্তু গুরূপদেশকে কেবল শিক্ষা বলিতেছি না, অন্তঃকরণের পক্ষে দুঃখভোগই প্রধান শিক্ষা । ". নগেন্দ্রের এ শিক্ষা কখনও হয় নাই । জগদীশ্বর তাহাকে সকল মুখের অধিপতি করিয়া পৃথিবীতে পাঠাইয়াছিলেন। কান্ত রূপ, অতুল ঐশ্বৰ্য্য, নীরোগ শরীর, সৰ্ব্বব্যাপিনী বিদ্যা, স্বশীল চরিত্র, জেহুমী