পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১৫৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


& is কু। বরাবর বাসি । নগেন্দ্ৰ বুঝিয়াও বুঝিলেন না যে, এ স্বৰ্য্যমুখী নয়। স্বৰ্য্যমুখীর ভালবাসা ষে কুন্দনন্দিনীতে ছিল না, তাহা নহে–কিন্তু কুন্দ কথা জানিতেন না। তিনি বালিকা, ভীরুস্বভাব, কথা জানেন না, আর কি বলিবেন ? কিন্তু নগেন্দ্র তাহা বুঝিলেন না, বলিলেন, “আমাকে স্বৰ্য্যমুখী বরাবর ভালবাসিত। বানরের গলায় মুক্তার হার সহিবে কেন ?- লোহার শিকলই छोठा !' এবার কুন্দনন্দিনী রোদন সংবরণ করিতে পরিলেন না। ধীরে ধীরে উঠিয়া বাহিরে গেলেন । এমন কেহ ছিল না যে, তাহার কাছে রোদন করেন । কমলমণি আসা পৰ্য্যস্ত কুন্দ তাহার কাছে ধান নাই —কুন্দনন্দিনী আপনাকে এ বিবাহের প্রধান অপরাধিনী বোধ করিয়া লজ্জায় তাহার কাছে মুখ দেখাইতে পারেন নাই ! কিন্তু আজিকার মৰ্ম্মপীড়া, সহৃদয়ত স্নেহময়ী কমলমণির সাক্ষাতে বলিতে ইচ্ছ। করিলেন । সে দিন প্রণয়ের নৈরাষ্ঠের সময়, কমলমণি র্তাহার দুঃখে দুঃখী হইয়া, তাহাকে কোলে লইয়া, চক্ষের জল মুছইয়া দিয়াছিলেন—সেই দিন মনে করিয়া, তাহার কাছে কঁাদিতে গেলেন । কমলমণি কুন্দনন্দিনীকে দেখিয়া অপ্রসন্ন হইলেন,—কুন্দকে কাছে আসিতে দেখিয়া বিস্মিত হইলেন, কিছু বলিলেন না । কুন্দ তাহার কাছে আসিয়া বসিয়া কাদিতে লাগিলেন । কমলমণি কিছু বলিলেন না ; জিজ্ঞাসাও করিলেন না, কি হইয়াছে। সুতরাং কুন্দনন্দিনী আপন আপনি চুপ করিলেন। কমল তখন বলিলেন, “আমার কাজ আছে ।” অনন্তর উঠিয়া গেলেন । কুন্দনন্দিনী দেখিলেন, সকল সুখেরই সীমা আছে । দ্বাত্রিংশত্তম পরিচ্ছেদ বিষবৃক্ষের ফল ( হুরদেব ঘোষালের প্রতি নগেন্দ্র দত্তের পত্র ) তুমি লিখিয়াছ যে, আমি এ পৃথিবীতে যত কাজ করিয়াছি, তাহার মধ্যে কুন্দনন্দিনীকে বিবাহ করা সৰ্ব্বাপেক্ষ ভ্রান্তিমূলক কাজ, ইহা আমি স্বীকার করি । আমি এই কাজ করিয়া স্থৰ্যমুখীকে হারাইলাম । স্বৰ্য্যমুখীকে পত্নীভাবে পাওয়া বড় জোর কপালের কাজ। সকলেই মাটী খোড়ে, কোহিমুর এক জনের বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী কপালেই উঠে। স্বৰ্য্যমুখী সেই কোহিমুর । কুন্দনন্দিনী কোন গুণে র্তাহার স্থান পূর্ণ করিবে ? তবে কুন্দনন্দিনীকে তাহার স্থলাভিষিক্ত করিয়াছিলাম কেন ? ভ্রাস্তি ! ভ্রান্তি ! এখন চেতনা হইয়াছে । কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ হইয়াছিল মরিবার জন্য। আমারও মরিবার জন্য মোহনিদ্রা ভাঙ্গিয়াছে। এখন স্বৰ্য্যমুখীকে কোথায় পাই । আমি কেন কুন্দনন্দিনীকে বিবাহ করিয়াছিলাম ? আমি কি তাহাকে ভালবাসিতাম ? ভালবাসিতাম বৈ কি—তাহার জন্য উন্মাদগ্ৰস্ত হইতে বসিয়াছিলাম —প্রাণ বাহির হইতেছিল । কিন্তু এখন বুঝিতেছি, সে কেবল চোখের ভালবাসা । নহিলে আজি পনের দিবসমাত্র বিবাহ করিয়াছি—এখনই বলিব কেন, “আমি কি তাহাকে ভালবাসিতীম ? ভালবাসিতাম কেন ? এখনও ভালবাসি—কিন্তু আমার স্বৰ্য্যমুখী কোথায় গেল ? অনেক কথা লিখিব মনে করিয়াছিলাম, কিন্তু আজ আর পারিলাম না । বড় কষ্ট হইতেছে । ইতি । ( হরদেব ঘোষালের উত্তর ) আমি তোমার মন বুঝিয়াছি। কুন্দনন্দিনীকে ভালবাসিতে না, এমত নহে—এখনও ভালবাস ; কিন্তু সে ষে চোখের ভালবাস, ইহা যথার্থ বলিয়াছ । স্বৰ্য্যমুখীর প্রতি তোমার গাঢ় স্নেহ—কেবল দুইদিনের জন্য কুন্দনন্দিনীর ছায়ায় তাহ আবৃত হইয়াছিল । এখন স্থৰ্যমুখীকে হারাইয়া তাহা বুঝিয়াছ । যতক্ষণ স্বৰ্য্যদেব অনাচ্ছন্ন থাকেন, ততক্ষণ র্তাহার কিরণে সস্তাপিত হই, মেঘ ভাল লাগে । কিন্তু সূৰ্য্য অস্ত গেলে বুঝিতে পারি, স্বৰ্য্যদেবই সংসারের চক্ষু । সূৰ্য্য বিনা সংসার আঁধার । তুমি আপনার হৃদয় না বুঝিতে পারিয়া এমন গুরুতর ভ্রান্তিমূলক কাজ করিয়াছ—ইহার জন্য আর তিরস্কার করিব না—কেন না, তুমি যে ভ্রমে পড়িয়াছিলে, আপন হইতে তাহার অপনোদন বড় কঠিন । মনের অনেকগুলি ভাব আছে, তাহার সকলকেই লোকে ভালবাসা বলে। কিন্তু চিত্তের ষে অবস্থায়, অন্তের সুখের জন্য আমরা আত্মমুখ বিসর্জন করিতে স্বতঃপ্রস্তুত হই, তাহাকে প্রকৃত ভালবাস বলা যায় । “স্বতঃপ্রস্তুত হই” অর্থাৎ ধৰ্ম্মজ্ঞান বা পুণ্যাকাঙ্ক্ষায় নহে । সুতরাং রূপবতীর রূপভোগলালসা ভালবাসা নছে। যেমন ক্ষুধাতুরের ক্ষুধাকে অল্পের প্রতি প্রণয় বলিতে পারি না, তেমনই কামাতুরের চিত্তচাঞ্চলকে রূপবতীর প্রতি ভালবাসা বলিতে পারি না । সেই