পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১৫৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বিষবৃক্ষ চিত্তচাঞ্চল্যকেই আর্য্যকবির মদনশরজ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। যে বৃত্তির কল্পিত অবতার বসন্তসহায় হইয়া মহাদেবের ধ্যানভঙ্গ করিতে গিয়াছিলেন, যাহার প্রসাদে কবির বর্ণনায় মৃগের মৃগীদের গাত্রে গাত্র কঙুয়ন করিতেছে, করিগণ করিণীদিগকে পদ্মমৃণাল ভাঙ্গিয়া দিতেছে, সে এই রূপজ মোহমাত্র । এ বৃত্তিও জগদীশ্বরপ্রেরিত ; ইহা দ্বারাও সংসারের ইষ্ট সাধন হইয় থাকে এবং ইহা সৰ্ব্বজীবমুগ্ধকরী। কালিদাস, বাইরণ, জয়দেব, ইহার কবি ;–বিদ্যাসুন্দর ইহার ভেঙ্গান। কিন্তু ইহা প্রণয় নহে। প্রেম বুদ্ধিবৃত্তিমূলক। প্রণয়াস্পদ ব্যক্তির গুণ সকল যখন বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা পরিগৃহীত হয়, হৃদয় সেই সকল গুণে মুগ্ধ হইয়া তৎপ্রতি সমাকৃষ্ট এবং সঞ্চালিত হয়, তখন সেই গুণাধারের সংসৰ্গলিন্স, এবং তৎপ্রতি ভক্তি জন্মে । ইহার ফল, সহৃদয়ত এবং পরিণামে আত্মবিস্মৃতি ও আত্মবিসর্জন । এই যথার্থ প্রণয় ; সেক্ষপীয়র, বাল্মীকি, শ্ৰীমদ্ভাগবতকার ইহার কবি । ইহা রূপে জন্মে না । প্রথমে বুদ্ধিদ্বারা গুণগ্রহণ, গুণগ্রহণের পর আসঙ্গলিপস ; আসঙ্গলিপস সফল হইলে সংসর্গ, সংসৰ্গফলে প্রণয়, প্রণয়ে আত্মবিসর্জন । আমি ইহাকেই ভালবাস৷ বলি। নিতান্তপক্ষে স্ত্রীপুরুষের ভালবাসা আমার বিবেচনায় এইরূপ । আমার বোধ হয়, অন্য ভালবাসারও মূল এইরূপ ; তবে স্নেহ এক কারণে উপস্থিত হয় না। কিন্তু সকল কারণই বুদ্ধিবৃত্তিমূলক। নিতান্তপক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিমূলক কারণজীত স্নেহ ভিন্ন স্থায়ী হয় না। রূপজ মোহ তাহা নহে। রূপদৰ্শন-জনিত ষে সকল চিত্তবিকৃতি, তাহার তীক্ষত পৌনঃপুন্তে হ্রস্ব হয় । অর্থাৎ পৌনঃপুন্তে পরিতৃপ্তি জন্মে। গুণজনিতের পরিতৃপ্তি নাই। কেন না, রূপ এক-প্রত্যহুই তাহার একপ্রকারই বিকাশ, গুণ নিত্য নূতন নূতন ক্রিয়ায় নূতন হইয়। প্রকাশ পায়। রূপেও প্রণয় জন্মে, গুণেও প্রণয় জন্মে—কেন না, উভয়ের দ্বারা আসঙ্গলিঙ্গ জন্মে । যদি উভয় একত্র হয়, তবে প্রণয় শীঘ্ৰ জন্মে ; কিন্তু একবার প্রণয়সংসৰ্গফল বদ্ধমূল হইলে, রূপ থাকা না থাকা সমান। রূপবান ও কুৎসিতের প্রতি মেহ ইহার নিত্য উদাহরণস্থল। গুণজনিত প্রণয় চিরস্থায়ী বটে—কিন্তু গুণ চিনিতে দিন লাগে। এই জন্য সে প্রণয় একেবারে হঠাৎ বলবাম হয় না-ক্রমে সঞ্চারিত হয়। কিন্তু রূপজ মোহ এককালীন সম্পূর্ণ বলবান হইবে। তাহার প্রথম বল এমন দুৰ্দ্ধমনীয় হয় যে, অন্ত সকল বৃত্তি তত্ত্বারা উচ্ছিন্ন হয় । এই মোহ কি—এই স্থায়ী «» : প্রণয় কি না-ইছা জানিবার শক্তি থাকে না । অনন্তকালস্থায়ী প্রণয় বলিয়া তাহাকে বিবেচনা হয় । তোমার তাহাই বিবেচনা হইয়াছিল—এই মোহের প্রথম বলে স্বৰ্য্যমুখীর প্রতি তোমার যে স্থায়ী প্রেম, তাহা তোমার চক্ষে অদৃপ্ত হইয়াছিল। এই তোমার : ভ্রাস্তি। এ ভ্রাস্তি মমুন্যের স্বভাবসিদ্ধ। অতএব: তোমাকে তিরস্কার করিব না। বরং পরামর্শ দিই,'. ইহাতেই সুখী হুইবার চেষ্টা কর । , - তুমি নিরাশ হইও না । স্বৰ্য্যমুখী অবশু । পুনরাগমন করিবেন—তোমাকে না দেখিয়া তিনি. কত কাল থাকিবেন ? যত দিন না আসেন, তুমিঞ্জ কুন্দনন্দিনীকে স্নেহ করিও । তোমার পত্রাদিতে । যতদূর বুঝিয়াছি, তাহাতে বোধ হইয়াছে, তিনিও গুণহীন নহেন। রূপজ মোহ দূর হইলে, কালে স্থায়ী প্রেমের সঞ্চার হইবে । তাহা হইলে তাহাকে , লইয়াই সুখী হইতে পারিবে । এবং যদি তোমার", জ্যেষ্ঠ৷ ভাৰ্য্যার সাক্ষাৎ আর না পাও, তবে তাহাকে : ভুলিতেও পারিবে । বিশেষ কনিষ্ঠ তোমাকে ভালবাসেন । ভালবাসার কখন আযত্ব করিবে না। কেন না, ভালবাসাতেই মামুষের একমাত্ৰ নিৰ্ম্মল এবং অবিনশ্বর সুখ । ভালবাসাই মনুষ্যজাতির উন্নতির শেষ উপায়—মনুষ্যমাত্রে পরস্পরে ভালবাসিলে আর মনুষ্যকৃত অনিষ্ট পৃথিবীতে থাকিবে না । [ নগেন্দ্রনাথের প্রত্যুত্তর ] তোমার পত্র পাইয়া, মানসিক ক্লেশের কারণ, এ পর্য্যস্ত উত্তর দিই নাই। তুমি যাহা লিথিয়াছ, তাহা সকলই বুঝিয়াছি এবং তোমার পরামর্শই ষে সৎপরামর্শ, তাহাও জানি । কিন্তু গৃহে মনঃস্থির করিতে পারি না । এক মাসু হইল, আমার স্বৰ্য্যমুখী আমাকে ত্যাগ করিয়া গিয়াছেন, আর র্তাহার কোন সংবাদ পাইলাম না । তিনি যে পথে গিয়াছেন, আমিও সেই পথে যাইবার সঙ্কল্প করিয়াছি । আমিও । গৃহত্যাগ করিব। দেশে দেশে তাহার সন্ধান করিয়া', বেড়াইব । র্তাহাকে পাই, লইয়া গৃহে আসিব ; নচেৎ আর আসিব না। কুন্দনন্দিনীকে লইয়া আর গৃহে । থাকিতে পারি না । সে চক্ষুঃশূল হইয়াছে। তাহার দোষ নাই—দোষ আমারই—কিন্তু আমি তাহার মুখদর্শন আর সহ করিতে পারি না। আঞ্জে বলিতাম না—এখন নিত্য ওঁৎসনা করি—সে কাৰ্ব্ব: আমি কি করিব ? অামি চলিলাম, শীঘ্ৰ তেন্ত্রেীর । সহিত সাক্ষাৎ হুইবে । তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া অন্যত্র যাইব । ইতি । ‘. . .