পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১৫৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


* દર বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী নগেন্দ্রনাথ যেরূপ লিখিয়াছিলেন, সেইরূপই করিলেন । বিষয়ের রক্ষণাবেক্ষণের ভার দেওয়ানের উপর গুস্ত করিয়ু অচিরাৎ গৃহত্যাগ করিয়া পৰ্য্যটনে স্বাত্রা করিলেন। কমলমণি অগ্ৰেই কলিকাতায় গিয়াছিলেন । সুতরাং এ আখ্যায়িকার লিখিত ব্যক্তিদিগের মধ্যে কুন্দনন্দিনী একাই দত্তদিগের অন্তঃপুরে রছিলেন, আর হীরা দাসী তাহার পরিচর্য্যায় নিযুক্ত রছিল । দত্তদিগের সেই সুবিস্তৃতা পুরী অন্ধকার হুইল । যেমন বহুদীপসমুজ্জ্বল, বহুলোকসমাকীর্ণ, গীতধ্বনিপূর্ণ নাট্যশালা নাট্যরঙ্গ সমাপন হইলে পর, অন্ধকার, জনশূন্ত, নীরব হয় ; এই মহাপুরী স্বৰ্য্যমুখীনগেন্দ্র কর্তৃক পরিত্যক্ত হইয়া সেইরূপ আঁধার হইল । যেমন বালক, চিত্রিত পুত্তলি লইয়া এক দিন ক্রীড়া করিয়া, পুতুল ভাঙ্গিয়া ফেলিয়া দেয়, পুতুল মাটীতে পড়িয় থাকে, তাহার উপর মাট পড়ে, তৃণাদি জন্মিতে থাকে ; তেমন কুন্দনন্দিনী, ভগ্ন পুতুলের ন্যায় নগেন্দ্র কর্তৃক পরিত্যক্ত হইয়৷ একাকিনী সেই বিস্তৃতা পুরামধ্যে অযত্নে পড়িয়া রহিলেন । যেমন দাবানলে বনদাহকালীন শাবকসহিত পক্ষিনীড় দগ্ধ হইলে, পক্ষিণী আহার লইয়া আসিয়া দেখে, বৃক্ষ নাই, শাবক নাই ; তখন বিহঙ্গী নীড়ান্বেষণে উচ্চ কাতরোক্তি করিতে করিতে সেই দগ্ধ বনের উপরে মণ্ডলে মণ্ডলে ঘুরিয়া বেড়ায়, নগেন্দ্র সেইরূপ স্বৰ্য্যমুখীর সন্ধানে দেশে দেশে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন । যেমন অনস্তসাগরে অতল জলে মণিখণ্ড ডুবিলে আর দেখা যায় না, স্বৰ্য্যমুখী তেমনি দুষ্প্রাপণীয়া হইলেন। ত্ৰেয়ন্ত্রিংশত্তম পরিচ্ছেদ ভালবাসার চিহ্নস্বরূপ কার্পাসবক্সমধ্যস্থ তপ্ত অঙ্গারের ন্যায় দেবেন্দ্রের নিরুপম মূৰ্ত্তি হীরার অন্তঃকরণকে স্তরে স্তরে দগ্ধ করিতেছিল। অনেকবার হারার ধৰ্ম্মভীতি এবং লোকলজ্জা, প্রণয়বেগে ভাসিয়া যাইবার উপক্রম খইল ; কিন্তু দেবেন্দ্রের স্নেহহীন ইন্দ্রিয়পর চরিত্র মনে পড়াতে আবার তাহ বদ্ধমূল হইল। হীরা চিত্তসংযমে ৰিলক্ষণ ক্ষমতাশালিনী, এবং সেই ক্ষমতা ছিল বলিয়াই, সে বিশেষ ধৰ্ম্মভীতা না হইয়াও এ পর্য্যন্ত সতীত্বধৰ্ম্ম সহজেই রক্ষা করিয়াছিল। সেই ক্ষমতাপ্রভাবেই সে দেবেক্সের প্রতি প্রবলামুরাগ অপাত্রস্তস্ত জানিয়া সহজেই শমিত করিয়া রাখিতে পারিল। বরং চিত্তসংযমের সদুপায়স্বরূপ হীরা স্থির করিল যে, পুনৰ্ব্বার দাসীবৃত্তি অবলম্বন করিবে । পরন্থচুের গৃহকৰ্ম্মাদিতে অমুদিন নিরত থাকিলে সে অন্তমনে এই বিফলামুরাগের বৃশ্চিকদংশনস্বরূপ জালা ভুলিতে পারিবে । নগেন্দ্র যখন কুন্দনন্দিনীকে গোবিন্দপুরে রাখিয়া পৰ্য্যটনে যাত্রা করিলেন, তখন হীরা ভূতপূৰ্ব্ব আমুগত্যের বলে দাসীত্ব ভিক্ষা করিল। কুনের অভিপ্রায় জানিয়া নগেন্দ্র হীরাকে কুন্দনন্দিনীর পরিচর্য্যায় নিযুক্ত রাখিয়া গেলেন। হীরার পুনৰ্ব্বার দাসীবৃত্তি স্বীকার করার আর একটি কারণ ছিল। হীরা পূৰ্ব্বে অর্থাদি কামনায়, কুন্দকে নগেন্দ্রের ভবিষ্যৎ প্রিয়তম মনে করিয়া স্বীয় বশীভূত করিবার জন্ত ষত্ব পাইয়াছিল। ভাবিয়াছিল, নগেন্দ্রের অর্থ কুন্দের হস্তগত হইবে, কুন্দের হস্তগত অর্থ হীরার হইবে, এক্ষণে সেই কুন্দ নগেন্দ্রের গৃহিণী হইল। অর্থসম্বন্ধে কুন্দের কোন বিশেষ আধিপত্য জন্মিল না । কিন্তু এখন সে কথা হীরারও মনে স্থান পাইল না । হীরার অর্থে আর মন ছিল না, মন থাকিলেও কুন্দ হইতে লব্ধ অর্থ বিষণ্ডুল্য বোধ হইত। ইরা, আপনার নিষ্ফল প্রণয়যন্ত্রণ সহ করিতে পারিত, কিন্তু কুন্দনন্দিনীর প্রতি দেবেন্দ্রের অনুরাগ সহ্য করিতে পারিল না । যখন হীরা শুনিল যে, নগেন্দ্র বিদেশপরিভ্রমণে যাত্রা করিবেন, কুন্দনন্দিনী গৃহে গৃহিণী হইয়া থাকিবেন, তখন হরিদাসী বৈষ্ণবীর যাতায়াতের পথে কাটা দিবার জন্য প্রহরী হইয়া আসিল । হীরা কুন্দনন্দিনীর মঙ্গলকামনা করিয়া এরূপ অভিসন্ধি করে নাই। হীর ঈর্ষাবশতঃ কুন্দের উপরে এরূপ জাতক্রোধ হইয়াছিল যে, তাহাব মঙ্গলচিন্তা দূরে থাকুক, কুন্দের নিপাত দৃষ্টি করিলে পরমাহলাদিত হইত। পাছে কুন্দের সঙ্গে দেবেন্দ্রের সাক্ষাৎ হয়, এইরূপ ঈৰ্য্যাজাত ভয়েই হীরা নগেন্দ্রের পত্নীকে প্রহরাতে রাখিল । হীরা দাসী কুন্দের এক যন্ত্রণার মূল হইয়া উঠিল । কুন্দ দেখিল, হীরার সে যত্ন, মমতা বা প্রিয়বাদিনীত্ব নাই । দেখিল ষে হীরা দাসী হইয় তাহার প্রতি সৰ্ব্বদা অশ্রদ্ধা প্রকাশ করে, এবং তাহাকে তিরস্থত ও অপমানিত করে। কুন্দ নিতান্ত শান্তস্বভাব ; হীরার আচরণে নিতান্ত পীড়িত হইয়াও কখনও তাহাকে কিছু বলিত না। কুন্দ শীতলপ্রকৃতি, হীরা উগ্রপ্রকৃতি। এজন্ত কুন্দ প্রভুপত্নী হইয়াও দাসীর নিকট দাসীর মত থাকিতে লাগিল, হীরা দাসী হইয়াও প্রভুপত্নীর প্রভু হুইয়া বসিল । পুরবাসিনীর