পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১৫৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ৰিষবৃক্ষ কখনও কখনও কুন্দের যন্ত্রণা দেখিয়া হীরাকে তিরস্কার করিত, কিন্তু বাষ্ময়ী হীরার নিকট তাল কঁাদিতে পারিত না । দেওয়ানজী এ সকল বৃত্তান্ত শুনিয়া হীরাকে বলিলেন, “তুমি দূর হও । তোমাকে জবাব দিলাম।” শুনিয়া হীরা রোষবিশ্বফারিতলোচনে দেওয়ানজীকে কহিল, “তুমি জবাব দিবার কে ? আমাকে মুনিব রাখিয়া গিয়াছেন । মুনিবের কথা নহিলে আমি যাইব না । আমাকে জবাব দিব৷র তোমার যে ক্ষমতা, তোমাকে জবাব দিবার অামারও সেই ক্ষমতা ।” শুনিয়া দেওয়ানজী অপমানভয়ে দ্বিতীয় বাক্যব্যয় করিলেন না । - হীরা আপন জোরেই রছিল। স্বৰ্য্যমুখী নহিলে কেহ হীরাকে শাসিত করিতে পারিত না । একদিন নগেন্দ্র বিদেশযাত্রা করিলে পর, হীরা একাকিনী অন্তঃপুরসন্নিহিত পুষ্পোপ্তানে লতামণ্ডপে শয়ন করিয়াছিল। নগেন্দ্র ও স্বৰ্য্যমুখী পরিত্যাগ করা অবধি দে সকল লতামণ্ডপ হীরারই তাধিকারগত হইয়াছিল। তখন সন্ধ্যা অতীত হইয়াছে ; আকাশে প্রায় পূর্ণচন্দ্র শোভা করিতেছে।- উদ্যানের ভাস্বর বৃক্ষপত্রে তৎকিরণমালা প্রতিফলিত হইতেছে । লতাপল্লবরঞ্জ-মধ্য হইতে অপসৃত হইয়া চন্দ্রকিরণ শ্বেতপ্রস্তরময় হৰ্ম্মতলে পতিত হইয়াছে, এবং সমীপস্থ দীধিকার প্রদোষবায়ুসন্তাড়িত স্বচ্ছজলের উপর নাচিতেছে। উদ্যানপুষ্পের সৌরভে আকাশ উন্মাদকর হইয়াছিল। এমন সময় হীরা অকস্মাৎ লতামণ্ডপমধ্যে পুরুষমূৰ্ত্তি দেখিতে পাইল । চাহিয়৷ দেখিল যে, সে দেবেন্দ্র । আদ্য দেবেন্দ্র ছদ্মবেশী নহেন, নিজবেশেই আসিয়াছেন । হীরা বিস্মিত হুইয়া কহিল, “আপনার এ অতি দুঃসাহস ! কেহ দেখিতে পাইলে আপনি মারা পড়িবেন ।” দেবেন্দ্র বলিলেন, “যেখানে হীরা আছে, সেখানে আমার ভয় কি ?” এই বলিয়। দেবেন্দ্র হীরার পাশ্বে বসিলেন। হীরা চরিভার্থ হইল । কিয়ৎক্ষণ পরে কহিল, "কেন এখানে এসেছেন ?” যার আশায় এসেছেন, তার দেখা পাইবেন না ।”

  • তা ত পাইয়াছি। আমি তোমারই আশায় এসেছি ।”

হীরা লুন্ধচাটুকারের কপটালাপে প্রতারিত না হইয়া হাসিল এবং কহিল, “আমার কপাল ষে এত প্রসন্ন হুইয়াছে, তা ত জানি না। যাহা হউক, যদি আমার ভাগ্যই ফিরিয়াছে, তবে যেখানে নিষ্কণ্টকে বসিয়া আপনাকে দেখিয়া মনের তৃপ্তি

  1. *

(t७ হুইবে, এমন স্থানে যাই চলুন । বিঘ্ন ।” দেবেন্দ্র বলিলেন, “কোথায় ষাইব ?” হীরা বলিল, “যেখানে কোন ভয় নাই । আপনার সেই নিকুঞ্জবনে চলুন ।” * * দে । তুমি আমার জন্য কোন ভয় করিও না । হী। যদি আপনার জন্য ভয় না থাকে, আমার জন্ত ভয় করিতে হয় । কেহ দেখিলে, আমার দশা কি হইবে ? দেবেন্দ্র সঙ্কুচিত হইয়া কহিলেন, “তবে চল । ভোমাদের নূতন গৃহিণীর সঙ্গে আলাপটা একবার ঝালিয়ে গেলে হয় না ?” হীরা এই কথা শুনিয়া দেবেন্দ্রের প্রতি যে ঈর্ষ্যানলজলিত কটাক্ষ করিল, দেবেন্দ্র অস্পষ্টালোকে ভাল দেখিতে পাইলেন না । হীরা কহিল,—“র্তাহার সাক্ষাৎ পাইবেন কি প্রকারে ?” দেবেন্দ্র বিনীতভাবে কহিলেন, “তুমি কৃপ করিলে সকলই হয় ।” হীরা কহিল, তবে এইখানে আপনি সতর্ক হইয়া বসিয়া থাকুন, আমি তাহাকে ডাকিয়া আনিতেছি।” এই বলিয়। হীরা লতামণ্ডপ হইতে বাহির হইল । কিযুদ্ধর আসিয়া এক বৃক্ষান্তরালে বসিল, এবং তখন তাহার কণ্ঠসংরুদ্ধ নয়নবারি দরবিগলিত হইয়া বহিতে লাগিল। পরে গাত্রোথনি করিয়া বাটীর মধ্যে প্রবেশ করিল, কিন্তু কুন্দনন্দিনীর কাছে গেল না । বাহিরে গিয়া দ্বাররক্ষকদিগকে বলিল, “তোমরা শীঘ্র আইল, ফুলবাগানে চোর অসিয়াছে ” তখন দোবে, চোবে, পাড়ে এবং তেওয়ারি পাকা বাশের লাঠি হাতে করিয়া অস্তঃপুরমধ্য দিয়! ,অনেক تعifگی আমাকে আপনার কাছে ' ফুলবাগানের দিকে ছুটিল। দেবেন্দ্র দূর হইতে । তাহাদের নাগরা জুতার শব্দ শুনিয়া, দূর হইতে. তাহাদের কালো কালো গালপাট্ট দেখিতে পাইয়া;

লতামণ্ডপ হইতে লাফ দিয়া বেগে পলায়ন করিল। " তেওয়ারি-গোষ্ঠী কিছুদূর পশ্চাদ্ধাবিত হইল। তাহার দেবেন্দ্রকে ধরিতে পারিয়াও ধরিল না । কিন্তু দেবেন্দ্র কিঞ্চিৎ পুরস্কৃত না হইয়া গেলেন না। পাক বাশের । লাঠির আস্বাদ তিনি প্রাপ্ত হুইয়াছিলেন কি না; আমরা নিশ্চিত জানি না, কিন্তু দ্বারবান কর্তৃক - “শ্বশুরা” “শালা” প্রভৃতি প্রিয়সম্বন্ধস্বচক নান মিষ্ট: সম্বোধনের দ্বারা অভিহিত হইয়াছিলেন, এমন আমর। শুনিয়াছি ; এবং তাহার তৃত্য এক দিন তাহার প্রসাদী , ব্রাণ্ডি পাইয়া পরদিবস আপন উপপত্নীর নিকট গল্প