পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১৬৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দাড়াইয়া ভ্ৰকুট কুটিল করিয়া, চক্ষু আরক্ত করিয়া, যেন শতমুখে দেবেন্দ্রকে তিরস্কার করিল। মুখরা পাপিষ্ঠ স্ত্রীলোকেই স্বেরূপ তিরস্কার করিতে জানে, সেইরূপ ভিরস্কার করল । তাঁহাতে দেবেন্দ্রের ধৈর্য চুতি হইল । তিনি হীরাকে পদাঘাত করিয়া * প্রমোদোস্তান হইতে বিদায় করিলেন। হীর পাপিষ্ঠ। --দেবেন্দ্র পাপিষ্ঠ এবং পশু । এইরূপ উভয়ের চিরপ্রেমের প্রতিশ্রুতি সফল হইয় পরিণত হইল । " দ্বীর পদহত হইয়া গৃহে গেল না। গোবিন্দপুরে এক জন চণ্ডাল চিকিৎসা ব্যবসায় করিত ! সে কেবল চণ্ডালাদি ইতর জাতির চিকিৎসা করি তু। চিকিৎসা বা ঔষধ কিছুই জানিত না-কেবল বিষবড়ীর সাহায্যে লোকের প্রাণসংহার করিত। হীর জানি ত যে, সে বিষবড়ী প্রস্তুত করার জন্য উদ্ভিজ্জবিষ, খনিজবিঘ, সর্পবিষাদি নানা প্রকার সদ্যঃ প্রাণাপ হারী বিষ সংগ্ৰহ করিয়া রাখিত। হীরা সেই রাত্রে তাহার ঘরে গিয়া তাহীকে ডাকিয় গোপনে বলিল যে, “একটা শেয়ালে রোজ আমার গড়ী খাইয়া খায় । আমি সে শেয়ালটাকে না মারিলে তিষ্ঠিতে 'পারি না। মনে করিয়াছি, ভাতের সঙ্গে বিষ মিশাইয়া রাখিৰ—সে আজ হাড়ী থাইতে আসিলে, বিষ খাইয়া মরিবে । তোমার কাছে অনেক বিষ আছে । সদ্যঃ প্রাণ নষ্ট হয়, এমন বিষ আমাকে বিক্রয় করিতে পার ?” চণ্ডাল শিয়ালের গল্পে বিশ্বাস করিল না। বলিল, “আমার কাছে যাহা চ হ, তাহ আছে ; কিন্তু আমি তাহ বিক্রয় করিতে পারি না । আমি বিয বিক্রয় করিয়াছি, জানিলে আমাকে পুলিসে ধরিবে ” হীরা কহিল, “তোমার কোন চিন্ত নাই। তুমি যে বিক্রয় করিয়াছ, ইহা কেহ জানিবে না—আমি ইষ্টদেবতা আর গঙ্গীর দিব্য করিয়া বলিতেছি । দুইটা শিয়াল মরে, এতটা বিন আমাকে দাও, আমি তোমাকে পঞ্চাশ টাকা দিব ।” চণ্ডাল নিশ্চিত মনে বুঝিল যে, এ কাহার প্রাণ বিনাশ করিবে। কিন্তু পঞ্চাশ টাকার লোভ সংবরণ করিতে পারিল না। বিষবিক্রয়ে স্বীকৃত হইল । হীরা গৃহ হইতে টাকা আনিয়া চণ্ডালকে দিল । চণ্ডাল তীব্র মানুষখাতী হলাহল কাগজে মুড়িয়া হীরাকে দিল। হীরা গমনকালে কহিল, “দেখিও, এ কথা কাহারও নিকট প্রকাশ করিও ন—তাহ হইলে আমাদের উভয়েরই অমঙ্গল ।” চণ্ডাল কহিল, “মা ! আমি তোমাকে চিনিও ম৷ ” হীরা তখন নিঃশঙ্ক হইয়া গৃহে গমন করিল। গৃহে গিয়া, বিষের মোড়ক হস্তে করিয়া অনেক রোদন করিল। পরে চক্ষু মুছিয়া, মনে মনে কছিল, “আমি কি দোষে বিষ খাইয়া মরিব ? যে আমাকে মারিল, আমি তাহাকে ন মারিয়া আপনি মরিব কেন ? এ বিষ আমি খাইব না। যে আমার এ দশা করিয়াছে, হয় সে ই ইহা খাইবে, নহিলে তাহার প্রেয়সী কুন্দনন্দিনী ইহা ভক্ষণ করিবে। ইহাদের এক জনকে মারিয়া, পরে মরিতে হয় মরিব ।” একচত্বারিংশত্তম পরিচ্ছেদ হীরার আয়ি “হীরার আয়ি বুড়ী। গোবরের ঝুড়ি । হাটে গুড়ি গুড়ি । দাতে ভাঙ্গে মুড়ি । কাটাল খায় দেড় বুড়ি ।” হীরার আয়ি লাঠি ধরিয়া গুড়ি গুড়ি যাইতেছিল, পশ্চাৎ পশ্চাৎ বালকের পাল এই অপূৰ্ব্ব কবিতাটি পাঠ করিতে করিতে করতালি দিতে দিতে এবং নচিতে নাচিতে চলিয়ছিল। এষ্ট কবিতাতে কোন বিশেষ নিন্দার কথা ছিল কি না, সন্দেহ –কিস্তু হীরার আয়ি বিলক্ষণ কোপ|বিষ্ট হইয়াছিল । সে বালকদিগকে যমের বাড়ী যাইতে অনুজ্ঞ। প্রদান করিতেছিল—এবং তাহাদিগের পিতৃপুরুষের অtহারাদির বড় অন্যায় ব্যবস্থা করিতেছিল। এইরূপ প্রায় প্রত্যহই হইত । নগেন্দ্রের দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া হীরার আয়ি বালকদিগের হস্ত হইতে নিস্কৃতি পাইল, দ্বারবান্‌দিগের ভ্রমরকৃষ্ণ শ্মশ্রীরাজি দেখিয়া তাহারা রণে ভঙ্গ দিয়া পলাইল ; পলায়নকালে কোন বালক বলিল ;– "রামচরণ দোবে, সন্ধ্যাবেল শোবে, চোর এলে কোথায় পালাৰে ?” কেহ বলিল ;– “রামদীন পাড়ে, বেড়ায় লাঠি ঘাড়ে, চোর দেখলে দৌড় মারে পুকুরের পাড়ে । কেহ বলিল ;– “লালচাদ সিং, নাচে তিড়িং মিড়িং, ডালরুটির ষম কিন্তু কাজে ঘোড়ার ডিম।"