পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১৭০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বিষবৃক্ষ বালকের দ্বারবানদিগের দ্বারা নানাবিধ অভিধানছাড়া শব্দে অভিহিত হইয়া পলায়ন করিল। হীরার অায়ি লাঠি ঠক্ ঠক্‌ করিয়া নগেন্দ্রের বাড়ীর ডাক্তারখানায় উপস্থিত হইল। ডাক্তারকে দেখিয়া, চিনিয়া বুড়ী কহিল,—

  • হঁ। বাবা— ডাক্তার বাবা কোথা গা ?” ডাক্তার কছিলেন, “আমিই ত ডাক্তার ” বুড়ী কহিল, “আর বাবা, চোখে দেখতে পাইনে--বয়স হ'লে পাচ সাত গণ্ডা, কি এক পোনই হয়—আমার দুঃখের কথা বলিব কি—একটি বেটা ছিল, তা যমকে দিলাম— এখন একটি নাতিনী ছিল, তারও—” বলিয়া বুড়ী হাউ—মাউ—খাউ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে র্কাদিতে লাগিল ।

ডাক্তার জিজ্ঞাস করিল, “কি হইয়াছে তোর ?” বুড়ী সে কথায় উত্তর না দিয়া আপনার জীবন চরিত আখ্যাত করিতে আরম্ভ করিল এবং অনেক কাদাকাটার পর তাহ সমাপ্ত করিলে, ডাক্তারকে আবার জিজ্ঞাসা করিতে হইল—“এখন তুই চাহিস কি ? তোর কি হইয়াছে ?” বুড়ী তখন পুনৰ্ব্বার আপন জীবনচরিতের অপূৰ্ব্ব কাহিনী আরম্ভ করিতেছিল, কিন্তু ডাক্তার বড় বিরক্ত হওয়ায় তাহা পরিত্যাগ করিয়া হীরার ও হীরার মাতার ও হীরার পিতার ও হীরার স্বামীর জীবনচরিত আখ্যান আরম্ভ করিল। ডাক্তার বহুকষ্টে তাহার মৰ্ম্মার্থ বুঝিলেন—কেন না, তাহাতে আত্মপরিচয় ও রোদনের বিশেষ বাহুল্য। মৰ্ম্মার্থ এই যে, বুড়ী হীরার জন্য একটু ঔষধ চাহে । রোগ, বাতিক । হীরা গর্ভে থাকা কালে, তাহার মাতা উন্মাদগ্ৰস্ত হইয়াছিল । সে সেই অবস্থায় কিছুকাল থাকিয় সেই অবস্থাভেই মরে । হীরা বাল্যকাল হইতে অত্যন্ত বুদ্ধিমতী—তাহাতে কখনও মাতৃব্যাধির কোন লক্ষণ দৃষ্ট হয় নাই, কিন্তু আজিকালি বুড়ীর কিছু সন্দেহ হইয়াছে। হীরা এখন কখনও কখনও একা হাসে, একা কাদে, কখনও বা ঘরে দ্বার দিয়া নাচে, কখনও চীৎকার করে । কখনও মূৰ্ছা যায়। বুড়ী ডাক্তারের কাছে ইহার ঔষধ চাহিল। ডাক্তার চিস্তা করিয়া বলিলেন, “তোর নাতিনীর হিষ্টিরিয়া হইয়াছে।” so জিজ্ঞাসা করিল, “তা বাবা । ইষ্টিরসের ঔষধ নাই ?” ডাক্তার বলিলেন, “ঔষধ আছে বৈ কি । উহাকে খুব গরমে রাখিস আর এই কাষ্টর-অয়েলটুকু লইয়া అt য-ক'ল প্রাতে খাওয়াইস। পরে অন্য ঔষধ দিব।” ডাক্তার বাবুর বিদ্যাটা ঐ রকম। বুড়ী কাষ্টর অয়েলের শিশি হাতে, লাঠি ঠক্ ঠক্‌ করিয়া চলিল। পথে এক জন প্রতিবাসিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হইল। সে জিজ্ঞাসা করিল, “কি গো হারের আয়ি, তোমার হাতে ও কি ?” - হীরার আয়ি কহিল যে, “হীরের ইষ্টিরস হয়েছে, তাই ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম, সে একটু কেষ্টরস দিয়েছে। তা হুঁ গা, কেষ্টরসে কি ইষ্টিরস ভাল হয় ?” প্রতিবাসিনী অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া বলিল,— “তা হবেও ব। কেষ্টই ত সকলের ইষ্টি । তা তার অনুগ্রহে ইষ্টিরস ভাল হইতে পারে । আচ্ছা, হীরার আয়ি, তোর নীতিনীর এত রস হয়েছে কোথা থেকে ?” হীরার অয়ি অনেক ভাবিয়া বলিল, “বয়সদোষে আমন হয় ” - প্রতিবাসিনী কহিল, “একটু কৈলে বাচুরের চোন! খাইয়ে দিও। শুনিয়াছি, তাহাতে বড় রস পরিপাক হয় । বুড়ী বাড়ী গেলে, তাঙ্গার মনে পড়িল যে, ডাক্তার গরমে রাখার কথা বলিয়াছে । বুড়ী হীরার সম্মুখে এক কড়া আগুন আনিয়া উপস্থিত করিল । হীরা বলিল, “মৰ্ব, আগুন কেন ?” বুড়ী বলিল, “ডাক্তার তোকে গরম করতে বলেছে।” দ্বিচতুরিংশত্তম পরিচ্ছেদ অন্ধকার পুরী—অন্ধকার জীবন গোবিন্দপুরে দত্তদিগের বৃহৎ অট্টালিকা, ছয় মহল বাড়ী—নগেন্দ্র স্বৰ্য্যমুখী বিনা সব অন্ধকার । কাছারীবাড়ীতে আমলারা বনে, অন্তঃপুরে কেবল কুন্দনন্দিনী, নিত্যপ্রতিপাল্য কুটুম্বিনীদিগের সহিত বাস করে। কিন্তু চন্দ্র বিনা রোহিণীতে আকাশের কি অন্ধকার : ষায় ? কোণে কোণে মাকড়সার জাল—ঘরে ঘরে ধূলার রাশি, কাৰ্ণিসে কাৰ্ণিসে পায়রার বাসা, কড়িতে কড়িতে চড়ুই। বাগানে শুকনা পাতার রাশি, পুকুরেতে পান। উঠানেতে শিয়ালা, ফুলবাগানে জঙ্গল, ভাণ্ডার ঘরে ইন্দুর। জিনিষপত্র ঘেরাটোপে ঢাকা, অনেকেতেই ছাতা ধরেছে। অনেক ইন্দুরে কেটেছে। ছুঁচো, বিছা, বাদুড়, চামচিকে অন্ধকারে অন্ধকারে দিবারাত্র বেড়াইতেছে। স্বৰ্য্যমুখীর পোষা পার্থীগুলিকে প্রায় বিড়ালে ভক্ষণ করিয়াছে । কোথাও