পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১৮৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8 বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী হিরণাস্ত্রী লতামণ্ডপের কাষ্ঠে ললাট রক্ষা করিলেন, পুরনার দেখিলেন, তাহার ললাট কুঞ্চিত হইতেছে, অধর ফুরিত হইতেছে, নাসিকারন্ধ স্ফীত হইতেছে। দেখিলেন যে, হিরন্ময়ী কাদিয়া ফেললেন। পুরনার মুখ ফিরাইলেন। তিনিও একবার আকাশ, পৃথিবী, নগর, সমুদ্র সকল দেখিলেন, কিন্তু কিছুতেই রহিল ন-চক্ষুর জল গণ্ড বহিয়৷ পড়িল । পুরন্দর চক্ষু মুছিয়া বলিলেন, “এই কথা বলিবার জন্য আসিয়াছি। যে দিন তোমার পিতা বলিলেন, কিছুতেই আমার সঙ্গে তোমার বিবাহ দিবেন না, সেই দিন হইতে আমি সিংহলে যাইবার কল্পনা স্থির করিয়াছিলাম। ইচ্ছা আছে যে, সিংহল হইতে ফিরিব না। যদি কখন তোমায় ভুলিতে পারি, তবেই ফিরিব । আমি অধিক কথা বলিতে জানি না, তুমিও অধিক কথা বুঝিতে পারিবে না, ইহাতে বুঝিতে পারিবে যে, আমার পক্ষে জগৎসংসার এক দিকে, তুমি এক দিকে হইলে, জগৎ তোমার তুল্য নহে ।” এই বলিয়া পুরন্দর হঠাৎ পশ্চাৎ ফিরিয়া পদচারণ করিয়া অন্ত একটা বৃক্ষের পাতা ছিড়িলেন। আশ্রবেগ কিঞ্চিৎ শমিত হইলে, ফিরিয়া আসিয়া আবার কহিলেন, “তুমি আমায় ভালবাস, তাহা জানি । কিন্তু ষবে হউক, তুমি অন্তের পত্নী হুইবে । অতএব তুমি আর আমায় মনে রাখিও না । তোমার সঙ্গে যেন এ জন্মে আমার আর সাক্ষাৎ না হয় ।” এই বলিয়া পুরন্দর বেগে প্রস্থান করিলেন । হিরণ্ডায়ী বসিয়া কঁাদিতে লাগিলেন । রোদন সংবরণ করিয়া একবার ভাবিলেন, “আমি যদি মরি, তবে কি সিংহলে যাইতে পারে ? আমি কেন গলায় লতা বাধিয়া মরি না, কিংবা সমুদ্রে ঝাপ দিই না ? আবার ভাবিলেন, “ষাকৃ না যাকৃ, তাতে আমার কি ? এই ভাবিয়া হিরন্ময়ী আবার র্কাদিতে বসিলেন । দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ কেন যে ধনদাস বলিয়াছিলেন যে,"আমি পুরন্দরের সহিত হিরণের বিবাহ দিব না, তাহা কেহ জানিত না । তিনি তাহা কাহারও সাক্ষাতে প্রকাশ করেন নাই । জিজ্ঞাসা করিলে বলিতেন, “বিশেষ কারণ আছে।” হিরন্ময়ীর অন্তান্ত অনেক সম্বন্ধ আসিল, কিন্তু ধনদাস কোন সম্বন্ধেই সম্মত হুইলেন না । বিবাহের কথামাত্রে কর্ণপাত করিতেন না। "কন্যা বড় হইল” বলিয়া গৃহিণী তিরস্কার করিতেন, ধনদাস শুনিতেন না ; কেবল বলিতেন, “গুরুদেৰ আমুন, তিনি আসিলে এ কথা হইবে।” পুরন্দর সিংহলে গেলেন । তাহার সিংহুলষাত্রার পর দুই বৎসর এইরূপে গেল । পুরন্দর ফিরিলেন না । হিরন্ময়ীর কোন সম্বন্ধ হইল না। হিরণ অষ্টাদশ বৎসরের হইয়া উদ্যানমধ্যস্থ নবপল্পবিত চুতবৃক্ষের ন্যায় ধনদাসের গৃহশোভা করিতে লাগিলেন। হিরণ্ময়ী ইহাতে দুঃখিত হয়েন নাই। বিবাহের কথা হইলে পুরন্দরকে মনে পড়িত ; র্তাহার সেই ফুল্লকুসুমমালামণ্ডিত, কুঞ্চিত কৃষ্ণ-কুন্তলাবলীবেষ্টিত, সহাস্য মুখমণ্ডল মনে পড়িত ; র্তাহার সেই দ্বিরদরদপ্তভ্র স্কন্ধদেশে স্বর্ণপুষ্পশোভিত নীল উত্তরীয় মনে পড়িত ; পদ্মহস্তে হীরকাঙ্গুরীয়গুলি মনে পড়িত ; হিরন্ময়ী কাদিতেন । পিতার আজ্ঞা হইলে যাহাকে তাহাকে বিবাহ করিতে হইত, কিন্তু সে জীবন্ম ত্যুবৎ হইত । তবে তাহার বিবাহোদ্যোগে পিতাকে অপ্রবৃত্ত দেখিয়া, আহলাদিত হউন বা না হউন, বিস্মিতা হইতেন । লোকে এত বয়স অবধি কন্যা অবিবাহিত রাখে না —রাখিলেও তাহার সম্বন্ধ করে । তাহার পিতা সে কথায় কর্ণ পর্য্যন্তও দেন না কেন ? এক দিন অকস্মাৎ এ বিষয়ে কিছু সন্ধান পাইলেন। ধনদাস বাণিজ্য হেতু চীনদেশে নিৰ্ম্মিত একটি বিচিত্র কোঁটা পাইয়াছিলেন । কোঁটা অতি বৃহৎ— ধনদাসের পত্নী তাহাতে অলঙ্কার রাখিতেন। ধনদাস কতকগুলি নুতন অলঙ্কার প্রস্তুত করিয়া পত্নীকে উপহার দিলেন। শ্রেষ্ঠিপত্নী পুরাতন অলঙ্কারগুলি কৌটাসমেত কন্যাকে দিলেন । অলঙ্কারগুলিন রাখাঢাকা করিতে হিরন্ময়ী দেখিলেন যে, তাহাতে একখানি ছিন্ন লিপির অৰ্দ্ধাবশেষ রহিয়াছে। হিরন্ময়ী পড়িতে জানিতেন । তাহাতে প্রথমেই নিজের নাম দেখিতে পাইয়া কৌতুহলাবিষ্ট হইলেন । পড়িয়া দেখিলেন যে, যে অৰ্দ্ধাংশ আছে, তাহাতে কোন অর্থবোধ হয় না । কে কাহাকে লিখিয়াছিল, তাহাও কিছুই বুঝা গেল না। কিন্তু তথাপি তাঁহ পড়িয়া হিরন্ময়ীর মহা ভীতিসঞ্চার হুইল । ছিন্ন পত্রখণ্ড এইরূপ —

  • জ্যোতিষীগণনা করিয়া দেখিলা হিরণ্ময়ী তুল্য সোনার পুত্তলি বাহ হইলে ভয়ানক বিপদ । সবু মুখ পরস্পরে। হিরন্ময়ী কোন অজ্ঞাত বিপদ আশঙ্কা করিয়া অত্যন্ত ভীত হইলেন। কাহাকে কিছু না বলিয়া পত্রখণ্ড তুলিয়া রাখিলেন।