পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২০১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


** বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রস্থাবলী কোন বিঘ্ন জন্মিতেছিল না। সেই কথোপকথনের মূধ্যভাগ হইতে পাঠক মহাশয়কে শুনাইতে আরম্ভ করিব। এক যুবতী অপরকে কহিলেন, “কেন, মৃণালিনী, কথার উত্তর দিস না কেন ? আমি সেই রাজপুত্রটির কথা শুনিতে ভালবাসি।” “সই মণিমালিনি ! আমি আনন্দে শুনিব ।” মণিমালিনী কহিল, “আমার সুখের কথা শুনিতে শুনিতে আমিই জ্বালাতন হইয়াছি, তোমাকে কি শুনাইব ?” মৃ । তুমি শোন কার কাছে, তোমার স্বামীর কাছে ? মণি। নহিলে আর কারও কাছে বড় শুনিতে পাই না। এই পদ্মটি কেমন আঁকিলাম দেখ দেখি ? মৃ। ভাল হইয়াও হয় নাই। জল হইতে পদ্ম অনেক উৰ্দ্ধে আছে, কিন্তু সরোবরে সেরূপ থাকে না ; পদ্মের বোটা জলে লাগিয়া থাকে, চিত্রেও সেইরূপ হইবে । আর কয়েকটা পদ্মপত্র তাক, নহিলে পদ্মের শোভা স্পষ্ট হয় না। আরও পার যদি, উহার নিকট একটি রাজহাস আঁকিয় দাও । মণি । হাস এখানে কি করিবে ? মৃ। তোমার স্বামীর মত পদ্মের কাছে সুখের কথা কহিবে । মণি । ( হাসিয়া ) দুই জনেই সুকণ্ঠ বটে। কিন্তু আমি স্থাস লিখিব না। আমি সুখের কথা শুনির শুনিয়া জালাতন হইয়াছি। মু । তবে একটি খঞ্জন আক । মণি। খঞ্জন আঁকিব না । খঞ্জন পাখা বাহির করিয়া উড়িয়া যাইবে । এ ভ মৃণালিনী নহে যে, স্নেহ-শিকলে বাধিয়া রাখিব । মৃ খঞ্জন যদি এমনই তুষ্ট হয়, তবে মৃণালিনীকে যেমন পিঞ্জরে পূরিয়াছ, খঞ্জনকেও সেইরূপ করিও । মণি। আমরা মৃণালিনাকে পিঞ্জরে পূরি নাই —সে আপনি আসিয়া পিঞ্জরে ঢুকিয়াছে। মৃ। সে মাধবাচার্য্যের গুণ । মণি । সখি ! তুমি কতবার বলিয়াছ যে, মাধবাচার্য্যের সেই নিষ্ঠুর কাজের কথা সবিশেষ বলিৰে ; কিন্তু কৈ, আজও বলিলে না । কেন তুমি মাধবাচার্য্যের কথায় পিতৃগৃহ ত্যাগ করিয়া আসিলে ? মৃ। মাধবাচার্য্যের কথায় আসি নাই । মাধবাচার্য্যকে আমি চিনিতাম না । আমি ইচ্ছাপূর্বকও এখানে আসি নাই। এক দিন সন্ধ্যার পর তোমাব মুখের কথা বল, আমার দাসী আমাকে এই আঙ্গটি দিল এবং বলিল যে, যিনি এই আঙ্গটি দিয়াছেন, তিনি ফুলবাগানে অপেক্ষা করিতেছেন । আমি দেখিলাম যে, উহা হেমচন্দ্রের সঙ্কেতের আঙ্গটি । র্তাহার সাক্ষাতের অভিলাষ থাকিলে তিনি এই আঙ্গটি পাঠাইয়। দিতেন । আমাদিগের বাটীর পিছনেই বাগান ছিল । যমুনা হইতে শীতল বাতাস সেই বাগানে নাচিয়া বেড়াইত । তথায় তাহার সহিত সাক্ষাৎ হইত। মণিমালিনী কহিলেন, “ঐ কথাটি মনে পড়িলেও আমার বড় অসুখ হয় । তুমি কুমারী হইয়া কি প্রকারে পুরুষের সহিত গোপনে প্রণয় করিতে ?” মু । অসুখ কেন সখি—তিনি আমার স্বামী । তিনি ভিন্ন অন্ত কেহ কখন আমার স্বামী হইবে না । মণি । কিন্তু এ পর্য্যস্ত ত তিনি স্বামী হয়েন নাই । রাগ করিও না সখি ! তোমাকে ভগিনীর ষ্ঠায় ভালবাসি ; এই জন্য বলিতেছি । মৃণালিনী অধোবদনে রহিলেন । ক্ষণেক পরে চক্ষুর জল মুছিলেন । কহিলেন, “মণিমালিনি ! এ বিদেশে আমার আত্মীয় কেহ নাই, আমাকে ভাল কথা বলে এমন কেহ নাই । যাহারা আমাকে ভালবাসিত, তাহাদিগের সহিত যে আর কখনও সাক্ষাৎ হইবে, সে ভরসাও করি না । কেবলমাত্র তুমি আমার সখী—তুমি আমাকে ভাল না বাসিলে কে আর ভালবাপিবে ?” মণি । আমি তোমাকে ভালবাসিব, বাসিয়াও থাকি ; কিন্তু যখন ঐ কথাটি মনে পড়ে,তখন মনে করি— মৃণালিনী পুনশ্চ নীরবে রোদন করিলেন । কহিলেন, ”সখি, তোমার মুখে এ কথা আমার সহ হয় না । যদি তুমি আমার নিকটে শপথ কর যে, যাতা বলিব, তাহ। এ সংসারে কাহারও নিকটে ব্যক্ত করিবে না, তবে তোমার নিকট সকল কথ। প্রকাশ করিয়া বলিতে পারি। তাহা হইলে তুমি আমাকে ভালবাসিবে ।” মণি । আমি শপথ করিতেছি । মৃ। তোমার চুলে দেবতার ফুল আছে, তাহা ছুঁয়ে শপথ কর । মণিমালিনী তাই করিলেন । তখন মৃণালিনী মণিমালিনীর কাণে ষাহ কহিলেন, তাহার এক্ষণে বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নাই । শ্রবণে মণিমালিনী পরমপ্রীতি প্রকাশ করিলেন । গোপন কথা সমাপ্ত হইল ।