পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২০৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী سb “সই, কোথায় গান মৃণালিনী কহিলেন, করিতেছে ?” মণিমালিনী কহিলেন, “বাহির-বাড়ীতে গায়িতেছে।” গায়িকা গায়িতে লাগিল— *কহ লে। নাগরি, গেহ পরিহরি, কাহে বিবাসিনী রে ” মৃ ! সখি ! কে গায়িতেছে জান ? মণি । কোন ভিখারিণী হইবে । আবার গীত – “বৃন্দাবনধন, গোপিনীমোহন, কাহে তু তেয়াগী রে ; দেশ দেশ পর, সো শুtমসুন্দর, ফিরে তুয়া লাগি রে ।” মৃণালিনী বেগের সহিত কহিলেন, “সই ! সই ! উহাকে বাটীর ভিতর ডাকিয়া আন ।” মণিমালিনী গায়িকাকে ডাকিতে গেলেন ঃততক্ষণ সে গায়িতে লাগিল— * .. “বিকচ নলিনে, যমুনা-পুলিনে, বহুত পিয়াসা রে । চন্দ্রমাশালিনী, যা মধু্যামিনী, না মিটল আশা রে । স! নিশা সমরি—” এমন সময়ে মণিমালিনী উহাকে ডাকিয়৷ বাটার ভিতর আনিলেন – সে অন্তঃপুরে আসিয়া পূৰ্ব্ববৎ গায়িতে লাগিল – *স নিশা সমরি, কহ লো সুন্দরি, কাহা মিলে দেখা রে । শুনি ষাওয়ে চলি, বাজয়ি মুরলী, স্বনে বনে এক রে ” মৃণালিনী তাহীকে কহিলেন, “তোমার দিব্য গল, তুমি গীতটি আবার গাও।” গায়িকার বয়স ষোল বৎসর । ষোড়শী, খৰ্ব্বাকৃত এবং কৃষ্ণাঙ্গী। সে প্রকৃত কৃষ্ণবর্ণ। তাই বলিয়। তাহার গায়ে ভ্রমর বসিলে ষে দেখা যাইত না, অথবা কালি মাখিলে জল মাখিয়াছে বোধ হইত, কিংবা জল মাখিলে কালি বোধ হইত, এমন নহে । যেরূপ কৃষ্ণবর্ণ আপনার ঘরে থাকিলে শু্যামবর্ণ বলি, পরের ঘরে হইলে পাতুরে কালে বলি, ইহার সেইরূপ কৃষ্ণবর্ণ। কিন্তু বর্ণ যেমন হউক না কেন, ভিখারিণী কুরূপ নহে । তাহার অঙ্গ পরিষ্কার, মুমাজ্জিত, চাকচিক্যবিশিষ্ট । মুখখানি প্রফুল্প, চক্ষু দুটি বড় চঞ্চল, হাস্তময় ; লোচনতারা নিবিড়কৃষ্ণ, একটি তারার পাশ্বে একটি তিল। শুষ্ঠাধর ক্ষুদ্র, রক্তপ্রভ, তদন্তরে অতি পরিষ্কার অমলশ্বেত, কুন্দকনিকাসন্নিভ দুই শ্রেণী দস্ত । কেশগুলি সুহ্ম ; গ্ৰীবীর উপরে মোহিনী কবরী, তাহাতে যুথিকার মালা বেষ্টিত । যৌবনসঞ্চারে শরীরের গঠন সুন্দর হইয়াছিল, যেন কৃষ্ণপ্রস্তরে কোন শিল্পকার পুন্তল ক্ষোদিত করিয়াছিল । পরিচ্ছদ অতি সামান্ত, কিন্তু পরিষ্কার—ধূলিকর্দম-পরিপূর্ণ নহে । অঙ্গ একেবারে নিরাভরণ নহে, অথচ অলঙ্কারগুলি ভিখারীর যোগ্য বটে। প্রকোষ্ঠে পিত্তলের বলয়, গলায় কাষ্ঠের মালা, নাসিকায় ক্ষুদ্র একটি তিলক, ভ্রমধ্যে ক্ষুদ্র একটি চন্দনের টপ । সে আজ্ঞামত পূৰ্ব্ববৎ গায়িতে লাগিল। “মথুরাবাসিনি মধুরহাসিনি, শু্যামবিলাসিনি রে । * কহ লো নাগরি, গেহ পরিহরি, কাহে বিবাসিনী রে ॥ বৃন্দাবনধন, গোপিনীমোহন, কাহে তু তেয়াগী রে । দেশ দেশ পর, সো শু্যামসুন্দর, ফিরে তুয়া লাগি রে ॥ বিকচ নলিনে, যমুনা-পুলিনে, বহুত পিয়াসা রে । চন্দ্রমাশালিনী, যা মধু্যামিনী, না মিটিল আশা রে ॥ স নিশা সমরি, কহ লো সুন্দরি, কাহা মিলে দেখা রে । শুনি ষাওয়ে চলি, বাজয়ি মুরলী, বনে বনে এক রে l" ত সমাপ্ত হইলে মৃণালিনী কহিলেন, “তুমি সুন্দর গাও । সই মণিমালিনি, ইহাকে কিছু দিলে ভাল হয় । একে কিছু দাও না ?” মণিমালিনী পুরস্কার আনিতে গেলেন । ইত্যবসরে মৃণালিনী বালিকাকে নিকটে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “শুন, ভিখারিণি ! তোমার নাম কি ?” ভি। আমার নাম গিরিজায়া । মু। তোমার বাড়ী কোথায় ? গি । এই নগরেই থাকি । মু। তুমি কি গীত গায়িয়া দিনপাত কর ? গি । আর কিছুই ত জানি না ।

  • এই গীত টিমে-তে তালা তলৰোগে জয়জয়ন্ত্রী রাগিণীতে গেয় ।