পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২০৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


*আইসেন নাই ।”–এই কথাটি মৃণালিনীর অস্তস্তল হইতে ধ্বনিত হইল। ক্ষণেক উভয়ে নীরব। তৎপরে মৃণালিনী জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন আসিলেন না ?” গি । তাহা অামি জানি না। এই পত্ৰ দিয়াছেন। এই বলিয়া গিরিজায় তাহার হস্তে পত্র দিল । মৃণালিনী কহিলেন, “কি প্রকারেই বা পড়ি ? গৃহে গিয়া প্রদীপ জালিয়া পড়িলে মণিমালিনী উঠিবে।" গিরিজায়। কহিল, “অধরা হইও না । আমি প্রদীপ, তেল, চকুমকি, সোলা সকলই আনিয়া রাখিয়াছি। এখনই অালো করিতেছি ” --- গিরিজায়৷ শীঘ্রহস্তে অগ্নি উৎপাদন করিয়া প্রদীপ জালিত করিল। অগ্ন্যুৎপাদনশব্দ এক জন গৃহবাসীর কণে প্রবেশ করিল—দীপালোক সে দেখিতে পাইল । গিরিজায়। দীপ জ্বলিত করিলে মৃণালিনী নিম্নলিখিতমত মনে মনে পাঠ করিলেন । “মৃণালিনি ! কি বলিয়া আমি তোমাকে পত্র লিখিব ? তুমি আমার জন্য দেশত্যাগিনী হইয়া পরগৃহে কষ্টে কালাতিপাত করিতেছ। যদি দৈবানুগ্রহে তোমার সন্ধান পাইয়াছি, তথাপি তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম না। তুমি ইহাতে আমাকে অপ্রণয়া মনে করিবে—অথবা অন্ত হইলে মনে করিত –তুমি করিবে না। আমি কোন বিশেষ ব্রতে নিযুক্ত আছি—যদি তৎপ্রতি অবহেলা করি, তবে আমি কুলাঙ্গার । তৎসাধন জন্য আমি গুরুর নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছি যে, তোমার সহিত এ স্থানে সাক্ষাৎ করিব না। আমি নিশ্চিত জানি যে, আমি যে তোমার জন্য সত্যভঙ্গ করিব, তোমারও এমন সাধ নহে । অতএব এক বৎসর কোনক্রমে দিনযাপন কর। পরে ঈশ্বর প্রসন্তু হয়েন, তবে অচিরাৎ তোমাকে রাজপুরবধু করিয়া আত্মসুখ সম্পূর্ণ করিব। এই অল্পবয়স্ক। প্রগলুভবুদ্ধি বালিকাহস্তে উত্তর প্রেরণ করিও ” মৃণালিনী পত্র পড়িয়া গিরিজায়াকে কহিলেন,— “গিরিজায়া! আমার পাতা, লেখনী কিছুই নাই যে, উত্তর লিখিব। তুমি মুখে আমার প্রত্যুত্তর লইয়া যাও। তুমি বিশ্বাসী, পুরস্কারস্বরূপ আমার অঙ্গের অলঙ্কার দিতেছি ।" গিরিজায় কহিল, "উত্তর কাহার নিকট লইয়া যাইব ? তিনি আমাকে পত্ৰ দিয়া বিদায় করিবার সময় বলিয়া দিয়াছিলেন যে, ‘আজ রাত্রেই আমাকে প্রত্যুত্তর আনিয়া দিও। আমিও স্বীকার করিয়ী ছিলাম। আসিবার সময় মনে করিলাম, হয় ত মৃণালিনী ల তোমার নিকট লিখিবার সামগ্রী কিছুই নাই ; এজন্স সে সকল যোটপাট করিয়া আনিবার জন্য র্তাহার উদ্দেশে গেলাম । তাহার সাক্ষাৎ পাইলাম না, শুনিলাম, তিনি সন্ধ্যাকালে নবদ্বীপ যাত্রা করিয়াছেন - মৃ । নবদ্বীপ ? গি । নবদ্বীপ । মৃ ৷ সন্ধ্যাকালেই ? هي : গি । সন্ধ্যাকালেই । শুনিলাম, তাহার গুরু আসিয়া তাহাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়াছেন। মু । মাধবাচার্য্য ! মাধবাচার্য্যই আমার কাল । পরে অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া মৃণালিনী কহিলেন, “গিরিজায়া, তুমি বিদায় হও । আমি ঘরের বাহিরে থাকিব না ।” গিরিজায়া কহিল, “আমি চলিলাম ।” এই বলিয়া গিরিজায়। বিদায় হইল। তাহীর মৃদু মৃদু গীতধ্বনি শুনিতে শুনিতে মৃণালিনী গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন । মৃণালিনী বাটীর মধ্যে প্রবেশ করিয়া যেমন দ্বার রুদ্ধ করিবার উদ্যোগ করিতেছিলেন, অমনি পশ্চাৎ হইতে কে আসিয়া তাহার হাত ধরিল । মৃণালিনী চমকিয়া উঠিলেন । হস্তরোধকারী কহিল,—“তবে সাধিব ! এইবার জালে পড়িয়াছ। অনুগৃহীত ব্যক্তিটা কে, শুনিতে পাই না ?” মৃণালিনী তখন ক্রোধে কম্পি তা হইয়া কহিলেন, “ব্যোমকেশ ৷ ব্ৰাহ্মণকুলে পাষণ্ড ! হাত ছাড় ।” ব্যোমকেশ হৃষীকেশের পুত্র । এ ব্যক্তি ঘোর মুর্থ এবং দুশ্চরিত্র। সে মৃণালিনীর প্রতি বিশেষ অনুরক্ত হইয়াছিল, এবং স্বাভিলাষ-পুরণের অন্য কোন সম্ভাবনা নাই জানিয়া বলপ্রকাশে কৃতসঙ্কল্প হইয়াছিল । কিন্তু মৃণালিনী মণিমালিনীর সঙ্গ প্রায় ত্যাগ করিতেন না, এ জন্য ব্যোমকেশ এ পর্য্যস্ত অবসর প্রাপ্ত হয় নাই । মৃণালিনীর ভৎসনায় ব্যোমকেশ কহিল, “কেন হাত ছাড়িব ? হাতছাড়া কি কবৃতে আছে ? ছাড়াছাড়িতে কাজ কি, ভাই ? একটা মনের দুঃখ বলি, আমি কি মনুষ নই? যদি একের মনোরঞ্জন করিয়াছ, তবে অপরের পার না ?” মৃ । কুলাঙ্গার । যদি না ছাড়িবে, তবে এখনই ডাকিয়া গৃহস্থ সকলকে উঠাইব । ব্যো। উঠাও । আমি কহিব, অভিসারিকাকে ধরিয়াছি । মু । তবে অধঃপাতে যাও । এই বলিয়৷ মৃণালিনী সবলে হস্তমোচন জন্য চেষ্টা করিলেন ; কিন্তু কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিলেন না।