পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৩৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8e বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী মৃণালিনী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি হেমচন্দ্রের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছ ?” গিরিজায়া কিছু ইতস্ততঃ করিয়া কহিল, “করিয়াছি।” মু । তিনি কি কহিলেন ? গি । তোমার কথা জিজ্ঞাসা করিলেন । মু। তুমি কি বলিলে ? গি । আমি বলিলাম, তুমি ভাল আছ । মু । আমি এখানে আসিয়াছি, তাহ বলিয়াছ ? গি । না । মু। গিরিজায়, তুমি ইতস্ততঃ করিয়া উত্তর দিতেছ, তোমার মুখ শুকন । তুমি আমার মুখপানে চাহিতে পারিতেছ না ; আমি নিশ্চিত বুঝিতেছি, তুমি কোন অমঙ্গল সংবাদ আমার নিকট লুকাইতেছ। আমি তোমার কথায় বিশ্বাস করিতে পারিতেছি না । যাহা থাকে অদৃষ্টে, আমি স্বয়ং হেমচন্দ্রকে দেখিতে যাইব । পার আমার সঙ্গে আইস, নচেৎ আমি একাকিনী যাইব । এই বলিয়া মৃণালিনী অবগুণ্ঠনে মুখাবৃত করিয়া বেগে রাজপথ অতিবাহন করিয়া চলিলেন । গিরিজায় তাহার পশ্চাদ্ধাবিত হইল। কিছু দূর আসিয়া তাহার হস্ত ধরিয়া কহিল, “ঠাকুরাণি ! ফের, আমি যাহা লুকাইয়াছি, তাহ প্রকাশ করিতেছি ।” মৃণালিনী গিরিজায়ার সঙ্গে সঙ্গে গৃহে ফিরিয়৷ আসিলেন । তখন গিরিজায়া যাহা যাহা গোপন করিয়াছিল, তাহা সবিস্তারে প্রকাশিত করিল । গিরিজায় হেমচন্দ্রকে ঠকাইয়াছিল । মৃণালিনীকে ঠকাইতে পারিল না ।

  • so

কিন্তু অষ্টম পরিচ্ছেদ মৃণালিনীর লিপি মৃণালিনী কহিলেন, “গিরিজায়, তিনি রাগ করিয়া বলিয়া থাকিবেন, "উত্তম হইয়াছে; ইহা শুনিয়া তিনি কেনই বা রাগ না করিবেন ?” গিরিজায়ারও তখন সংশয় জন্মিল । সে কহিল, "ইহা সম্ভব বটে " তখন মৃণালিনী কহিলেন, “তুমি এ কথা বলিয়া ভাল কর নাই । এর বিহিত করা উচিত ; তুমি জাহারাদি করিতে যাও । আমি ততক্ষণ একখানি পত্র লিখিয়া রাখিব । তুমি খাইবার পর, সেইখানি লইয়া তাহার নিকট যাইবে ।” গিরিজায়াস্ত্রীকৃত হইয়া সত্বরে জাহারাদির জন্ত গমন করিল। মৃণালিনী সংক্ষেপে পত্র লিখিলেন । লিখিলেন,— “গিরিজায়া মিথ্যাবাদিনী । যে কারণে সে তোমার নিকট মৎসম্বন্ধে মিথ্যা বলিয়াছে, তাহা জিজ্ঞাসা করিলে, সে স্বয়ং বিস্তারিত করিয়া কহিবে । আমি মথুরায় যাই নাই। ষে রাত্রিতে তোমার অঙ্গুরীয় দেখিয়া যমুনাতটে আসিয়াছিলাম, সেই রাত্রি অবধি আমার পক্ষে মথুরার পথ রুদ্ধ হইয়াছে । আমি মথুরায় না গিয়া তোমাকে দেখিতে নবদ্বীপে আসিয়াছি । নবদ্বীপে আসিয়াও যে এ পর্য্যস্ত তোমার সহিত সাক্ষাৎ করি নাই, তাহার কারণ এই, আমার সহিত সাক্ষাৎ করিলে তোমার প্রতিজ্ঞাভঙ্গ হইবে । আমার অভিলাষ তোমাকে দেখিব, তৎসিদ্ধিপক্ষে তোমাকে দেখা দেওয়ার আবশ্বক কি *" গিরিজায়৷ এই লিপি লইয়া পুনরপি হেমচন্দ্রের গৃহাভিমুখে যাত্র করিল । সন্ধ্যাকালে মনোরমার সহিত কথোপকথন সমাপ্তির পরে, হেমচন্দ্র গঙ্গাদর্শনে যাইতেছিলেন, পথে গিরিজায়ার সহিত সাক্ষাৎ হইল। গিরিজায় তাহার হস্তে লিপি দিল । হেমচন্দ্ৰ কহিলেন, “তুমি আবার কেন ?" গি । পত্র লইয়া আসিয়াছি । হে । পত্র কাহার ? গি । মুণালিনীর পত্র । হেমচন্দ্র বিস্মিত হইলেন, “এ পত্র কি প্রকারে তোমার নিকট আসিল ?” গি । মুণালিনী নবদ্বীপে আছেন । আমি মথুরার কথা আপনার নিকট মিথ্যা বলিয়াছি । হে । এই পত্র তাহার ? গি । কঁ, র্তাহার স্বহুস্তলিখিত । হেমচন্দ্র লিপিখানি না পড়িয়া তাহ খণ্ড খণ্ড করিয়া ছিন্ন-ভিন্ন করিলেন । ছিন্ন খণ্ড সকল বনমধ্যে নিক্ষিপ্ত করিয়া কহিলেন,—“তুমি যে মিথ্যাবাদিনী, তাহা আমি ইতিপূৰ্ব্বেই শুনিতে পাইয়াছি । তুমি যে দুষ্টার পত্র লইয়া আসিয়াছ, সে যে বিবাহ করিতে যায় নাই, হৃষীকেশ তাহাকে তাড়াইয়া দিয়াছে, তাহা আমি ইতিপূৰ্ব্বেই শুনিয়াছি। আমি কুলটার পত্র পড়িব না। তুমি । আমার সম্মুখ হইতে দূর হও ।” গিরিজায়া চমৎকৃত হইয়া নিরুত্তরে হেমচন্দ্রের মুখপানে চাহিয়৷ রহিল।